page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

অনামিকা ম‍্যামের একটা মেয়ে বাবু হইছে

মনোবিজ্ঞান ছিল আমার অপশনাল সাবজেক্ট। পড়াইতেন অনামিকা ম‍্যাডাম। দুই বছরে এই একজনই মেয়ে শিক্ষক পাইছি আমরা।

গার্হস্থ্য বিজ্ঞান নিতেন ঝর্ণা ম‍্যাম। কিন্তু আমি গার্হস্থ্য নেই নাই। আর সব ছিলেন স‍্যার। কিন্তু মনোবিজ্ঞান না নিয়া গার্হস্থ্য নিলেই বেশি ভালো​ ছিল আমার। দুই বছরে এই বিষয় নিয়া অনেক টেনশন করছি,পড়াশোনাও কম করি নাই, তুলনায় ভালো​ নাম্বার পাইছি খুবই কম। এইচএসসিতে এই সাবজেক্টে​ কত পাবো তাও জানি না।

তো এই অনামিকা ম্যাডাম অনেক সুন্দরী ছিলেন। চেহারাটা অনেক মিষ্টি মিষ্টি। শাড়ি পরতেন সব সময়। সাজতেন না। শুধু টিপ পরতেন। লাল রঙের। আর বাধ‍্যগত পরতেন শাখা আর সিঁদুর। তবে ম‍্যাম আমাদের বলছিলেন বিয়ের আগে নাকি তিনি সাজগোজ করতেন। এখন আর করেন না।

ম‍্যাডামকে অনেক বেশি ভালোবাসতাম এই জন্য যে ছাত্রীদের প্রচণ্ড বেয়াদবি ওভারলুক করে যাবার একটা মানসিকতা আর ক্ষমতা ছিল উনার।

যখন সেকেন্ড ইয়ারে উঠছি তখন আমি একদিন দেখলাম ম‍্যাডামের পেট হালকা উঁচু। তখন ভ‍্যাকেশন বা পরীক্ষার জন্যে অনেকদিন পর দেখছিলাম ম‍্যাডামকে। তাই ভাবলাম আমারই ভুল হইতেছে। শাড়ি হয়তো উপরে পরছেন। কারণ ক্লাসেও কাউকে কিছু বলতে শুনি নাই তখন। পরে একদিন কাকে যেন জিজ্ঞাসা করলাম, “ওই ম‍্যাডাম কি প্রেগন‍্যান্ট নাকি?”

বললো, “হুঁ, তুমি জানো না?”

“ও, না, জানতাম না।”

এরপর ম‍্যাডামরে দেখা শুরু হইল আমার। উনি নির্বিকার। আইসা আগের মতোই স্বাভাবিক ঘুইরা ঘুইরা ক্লাস নেন, পড়া জিজ্ঞাস করেন, পরিসংখ‍্যানের অঙ্ক করান (মনোবিজ্ঞানে পরিসংখ‍্যানের অঙ্ক আছে), বুদ্ধ্যঙ্কের অঙ্ক করান বোর্ডে।

আর কয়দিন পর খেয়াল করলাম পড়ার চেয়ে‌ ম‍্যাডামরে দেখি বেশি। অন্য মেয়েরাও আমারই মতো। আমি বাসার সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়াতে মা’র প্রেগন‍্যান্সি দেখি নাই। আপুর যখন বাচ্চা হবে, আমি তখন সেভেন কি এইটে পড়ি। তখন দুনিয়ার কার বাচ্চা হইল তাতে কিছু যায় আসে না আমার। আর আপু বাসায় আইসা বেশি থাকেও নাই। শ্বশুরবাড়িতেই ছিল। তাই অনেক আগ্রহ নিয়া দেখতাম ম‍্যাডামরে। বেশি সুন্দর লাগত তখন। বা হইতে পারে শুনছি যে মেয়েরা সুন্দর হয় বাচ্চা হওয়ার আগে পরে, তাতেই সুন্দর লাইগা গেছে আমার কাছে।

সেই সময় জ‍্যোতি, স্বর্ণা আর অনেকরে প্রায়ই বলতে শুনতাম, ম‍্যাডামের নাকি ছেলে হবে। কিন্তু আলট্রাসনো না জাইনাই তারা এটা বলত। কারণ ম‍্যাডামের নাকি পেট সোজা হয়ে বাড়তেছে। এবং ম‍্যাডাম নাকি অনেক কালো হয়ে যাইতেছেন। এইসব ছেলে হওয়ার লক্ষণ। মেয়ে হইলে নাকি পেট বাড়ে পিছন থেকে, মায়ের কষ্ট হয় কম এবং মা সুন্দর হয়।

আমার মোটেও বিশ্বাস হয় নাই। কিন্তু পেট বাড়ার ব‍্যাপারে একটু দ্বিধা ছিল। পজিশনের কারণে হয়ত দুইরকম হইতে পারে। পরে আপু যখন বলল এইগুলা কিছু না, সব ভুলভাল কথা তখন সেই দ্বিধার জন‍্যে লজ্জা​ লাগছিল।

ম‍্যাডাম আমাদের একদম শেষ পর্যন্ত ক্লাস নিছিলেন। শেষের দিকে ম‍্যাডামের কষ্ট হইত রীতিমতো। লেকচারের সময় চাপ পড়ত বোধহয়, পেটের নিচে হাত দিতেন। চেয়ার আইনা দিলেও বসতে চাইতেন না। তখন একবার তাসখিয়ারে জিজ্ঞাস করলাম, “ম্যাডাম এখনো​ ছুটি নেন না কেন!”

সে বলল, “তোমাদের জন্যই তো​ নেন না।”

এই তোমাদের জন্য কথাটা খুব ঠিক আছে। কারণ আমরা ম‍্যাডাম গেলে গা বই রাইখা ঘুমায় থাকব টাইপ স্টুডেন্ট। আর তাসখিয়ারা ভূমিকম্প হইলে বেঞ্চের নিচে গিয়া পড়বে টাইপ স্টুডেন্ট। আমার তখন খারাপ লাগছিল, “কেন যে আমরা পড়ি না!”

 

এক্সাম শুরু হওয়ার পর আর মনে ছিল না। কয়েকটা পরীক্ষার​ পর মনে হইলে জিজ্ঞাস করলাম সাদিয়ারে যে ম্যাডামের ডেলিভারি হইছে কিনা।

বললো, অনেকদিন আগেই নাকি হইছে, একটা মেয়ে বাবু হইছে।

ভালো লাগলো শুইনা, বেশি ভালো​ লাগলো এই জন্য যে, কুসংস্কার ঠেইলা ফটাফট​ একটা মেয়ে আইসা পড়ল দুনিয়ায়। আসতে আসতেই যেন প্রমাণ করল তা। আর মনে পড়ল ম‍্যাডামের প্রথম মেয়ের​ নাম ছিল প্রতীতি, এইবার কী নাম রাখবেন বা রাখছেন জানি না তো।

মনে হইল এই মেয়ের নাম হবে ‘প্রজ্ঞা’।

About Author

শৈলী নাসরিন
শৈলী নাসরিন

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, এইচএসসি (২০১৫-১৬), সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা।