“যেন টারানটিনো একটা রেড ক্যামেরা নিয়ে ঢাকায় সত্যজিৎ রায়ের সাথে দেখা করলো এবং একটা ছবি বানালো।”—সুগিথ ভারগুস

“সাসপেন্স, থ্রিলার, প্রতিশোধ সব মিলিয়ে হলিউডের মত করে আমি বাংলা ভাষায় বাংলাদেশের একটি গল্প বলতে চেয়েছি,”—উধাও কী ধরনের ছবি তা নিয়ে বললেন পরিচালক অমিত আশরাফ।

অমিত আশরাফ বড় হয়েছেন আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায়। ছোটবেলায় গল্প লিখতনে আর সব গল্পকে স্টেজের জন্য ‘প্লে’ বানানোর চেষ্টা করতেন। যখন স্কুলে পড়েন নিজের হ্যান্ডি ক্যামেরা দিয়ে তৈরি করেন শর্ট ফিল্ম। নাম ‘দি-ঘোস্ট’। ১৯৯৯ সালের দিকে।

“এটাকে ঠিক ফিল্ম বলব না, কিন্তু প্যাশনেটলি করা কাজ ছিল। এডিটিং এর ঝামেলা যেন না হয়, ওইভাবেই প্রতিটা শর্ট নিয়েছিলাম। আর ছবিতে কোন সংলাপ ছিল না।” বললেন অমিত।

২০০৫ সালে অনেকটা পরিবারের ইচ্ছায় অনেকটা নিজের ইচ্ছায় নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফিল্ম ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনা শুরু করেন। তার গ্র্যাজুয়েশনের বিষয় ছিল স্ক্রিপ্ট রাইটিং, ফিল্ম আর অ্যানিমেশন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডরমিটরিতে তার রুমমেটের সুবাদে দেখা হয়ে যায় বিচিত্র ধরনের সিনেমা। অমিত আশরাফ মনে করেন সিনেমা মানেই একটা ইউনিটের ব্যাপার, একা একা ছবি বানানো সম্ভব না।

সিনেমা বানানোর জন্য প্রোডাকশন-এক্সপ্রিরিয়েন্স বা ইউনিটির সাথে থাকা দরকারি। ইউনিভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্ট আর পার্টটাইম জব হিসাবে বানিয়েছেনে বেশ কয়েকটা শর্ট ফিল্ম আর ডকুমেন্টারি মিলিয়ে ১০-১২ টার মতো।

সনি ব্রাভিয়ার তিন পর্বের বিজ্ঞাপনের দ্বিতীয়টি ছিল রঙিন খরগোশ নিয়ে। পুরাতন বিল্ডিং, ম্যানহোল, পাইপ ইত্যাদি থেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় রঙিন খরগোশ বের হয়ে ব্যস্ত রাস্তায়, পার্কে দল বাঁধতে থাকে। সবগুলো খরগোশ মিলে একটা বড় খরগোশে রূপান্তরিত হয়। এরপর সেই বড় খরগোশ বিভিন্ন রঙের বাক্স হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিজ্ঞাপনের অ্যানিমেশনের কাজ করেন অমিত আশরাফ।

এরপর কাজ করেন বাংলাদেশের পি.এস.এল নামের একটি এনজিওর জন্য। কাজটি ছিল এনজিওর সৌর বিদুৎ প্রজেক্ট নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করা। পরে আমেরিকার একটি স্থানীয় টিভি চ্যানেলে শর্ট ডকুমেন্টারি হিসাবে দেখানো হয়।

প্রতিবছরই গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশে আসতেন তিনি। একবার তার নানির বাসার গৃহকর্মী তাকে নিজের জীবনের একটা গল্প শোনায়। সেই মহিলাকে বাচ্চাসহ রেখে তার স্বামী চলে গেছে। অনেক বছর তার কোনো খোঁজখবর জানেন না তিনি। সেই মহিলা তার স্বামীকে আর ফিরে পেতে চায় না। শুধু তার সন্ধান জানতে চায়, তাকে একবার দেখতে চায়।

অমিত আশরাফ এইসব সন্ধানহীন, উধাও হয়ে যাওয়া, গ্রাম ছেড়ে কাজের জন্য শহরে আসা উদ্বাস্তু লোকদের নিয়ে তৈরি করেন ‘উধাও’ এর চিত্রনাট্য। ২০০৯ সালে ‘উধাও’ এর শুটিং শুরু করেন রেড ক্যামেরায় (ডিজিটাল ফর্ম্যাটে)।


ট্রেইলার 

অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে সিনেম্যাটোগ্রাফার নির্বাচন করেন ব্রিটিশ নাগরিক কাইল হেসলপকে। অমিত আশরাফের মত তার জন্যও এটা ছিল বাংলাদেশে প্রথম কাজ। এবং প্রথম ফিচার ফিল্ম। সুমন আরেফিন সিনেমার প্রযোজক।

“আমি আমেরিকায় ছবি বানাতে চাই নাই। বাংলাদেশকে বেছে নিছি কারণ ওখানে আমাকে ইনভেস্ট করবে কে ? আমি ইনভেস্টর কোথায় পাব? বাংলাদেশে ছবি বানানোটাই আমার বেটার অপশন মনে হয়েছে।” বলেন অমিত আশরাফ।

২০০৯ সালের পর ২০১১ সালে সেকেন্ড লটের কাজ শুরু দিয়ে ছবির শুটিং শেষ হয়। শুটিং যখন চলছিল তখন গুটেনর্বাগ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সিনেমা নির্মাণ পরবর্তী অনুদান দেয়। সেই অনুদানের টাকার কিছু অংশ ছবির শুটিং-এও কাজে লাগে। তারপর ছবির সম্পাদনা ও অন্যান্য কাজ হয় নিউইয়র্কে।

ছবির আবহ সংগীত আর সাউন্ডের কাজ হয় লস-অ্যানজেলসে। পরিচালক অমিত আশরাফ ছবির মিউজিক আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করেছেন ভারতীয় ক্লাসিকাল আর ওয়েস্টার্ন জ্যাজ মিলিয়ে। আর যন্ত্র ব্যবহার করেছেন একতারা, সেতার, ঢোল, বাসৌরি বাঁশি, তবলা, ইলেক্ট্রিক্যাল আর সাধারণ গিটার। উধাও ছবির সাউন্ড এডিটর কেনেথ এল জনসন তিনবার এমি অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। লাস্ট সামুরাই, ইটালিয়ান জব, মিশন ইম্পসিবল-৩ এসব ছবিতে কাজ করেছেন কেনেথ এল জনসন। কম্পোজার ছিলেন জ্যাকব ইয়োফি। তিনিও নিউইর্য়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

উধাও-এর সব কাজ শেষ হলে প্রথম প্রিমিয়ার হয় সুইডেনের গুটেনবার্গ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। এরপর সব মিলিয়ে ১৯টির মত ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাঠানো হয় ছবিটিকে।

কানাডা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অনারেবল মেনশন সহ উধাও পেয়েছে মোট নয়টি পুরস্কার। ছবিটির গল্প সম্পর্কে পরিচালকের মন্তব্য উধাও-এর গল্প অনেকটা থ্রিলার ধরনের।

ছবির প্রধান চরিত্র বাবু ঢাকা শহরে স্কুল-ভ্যান চালায়। সন্ধ্যার পর ফিরে যায় শহরের বাইরে নিজের বাড়িতে। কিন্তু রাতে বাবুর কাজ নির্মাতার ভাষায় অনেকটা রবিনহুডের মত। সমাজে ন্যায় আর নেই বলে নিজেই সে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যাওয়া লোকগুলোকে খুঁজে বের করে তার গ্রামে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসে সে। একসময়ে প্রভাবশালী আকবরকে স্কুল ভ্যানে বন্দি করে অন্ধকার পথে বাবু ভ্যান নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হয়। উন্মোচিত হতে থাকে আকবরের অতীত। “এই জার্নিই উধাও-এর গল্প।”

সাউথ-এশিয়ান টরেন্টো ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালের প্যানেলিস্ট সুগিথ ভারগুস উধাও নিয়ে মন্তব্য করেছেন—”যেন টারানটিনো একটা রেড ক্যামেরা নিয়ে ঢাকায় সত্যজিৎ রায়ের সাথে দেখা করলো এবং একটা ছবি বানালো।”

“গ্রাম থেকে শহরে কাজ করতে আসা বা শহরের উদ্বাস্তু লোকদের কেন শহরের বাইরে নিয়ে যেতে চায় বা শহরকে এইসব মানুষমুক্ত করতে চায়?” প্রশ্নের জবাবে অমিত আশরাফের উত্তর “তা ঠিক না, গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা, পরিবার যাদের কোনো সন্ধান জানে না আসলে তাদের পরিবারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় ছবিতে, যারা আসলে পরিবার বা আত্মীয় স্বজনের কাছে উধাও।”


উধাও ছবির গান