page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

অল ঘোড়া কন্ট্রোল (৩)

শুরুর কিস্তি   আগের কিস্তি

অধ্যায় ৩

১.

টুটুলের মাথায় ও মনে তীব্র অ্যামফিটামিন। গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত সে খুলশি টু ফেরিঘাট, ফেরিঘাট টু খুলশি ননস্টপ ড্রাইভ করে যাচ্ছে সারা রাত না ঘুমিয়ে। কিন্তু এখন আমরা ফেরিঘাট যাচ্ছি না। আমরা যাচ্ছি কর্ণফুলি ব্রিজ। আমরা যে তিনটা ট্রাক ঘেউ করে দিয়েছি এই খবর দশ ট্রাক চালানের সাথে জড়িতদের কাছে চলে গেছে। তাই চার নম্বর ট্রাক রুট বদল করেছে।

জিইসি মোড়ে ঢোকার আগে জ্যাম। স্যামুয়েল বার বার ঘড়ি দেখে। গাড়ি থেকে নেমে দেখতে চায় কী হয়েছে। জ্যাম ছেড়ে দেয় বলে নামে না। জিইসি মোড়ের সিগন্যাল ক্রস করে বাম দিকে বাঁক নিব আবার জ্যাম। মঞ্জু ঘুমায়। নোমান বদ্দা ওয়ার্লেস হাতে হেডফোনে গান শোনে আর টুটুল নোমান বদ্দার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কোনো কথা বলে না।

স্যামুয়েল গাড়ি থেকে বের হয়। আমিও গাড়ি থেকে নামি। এক বিশাল জনস্রোত যাচ্ছে মুরাদপুরের দিকে। জনগণ ভিড়ের মধ্যে থাকা এক ফর্সা দাড়িওলা লোকের গায়ে ফুল ছিটায়, লোকটা জনস্রোতের দিকে হাত নাড়ে। স্যামুয়েলের মাথা নষ্ট হয়ে যায়।

স্যামুয়েল আমাকে বলে—ব্রো, এই ঘোড়াটারে শ্যুট করে দিব নাকি? হুদাই জ্যাম লাগায় রাখছে মাদারফা…।

স্যামুয়েল জিজ্ঞাসে—এই ঘোড়াটা কে, ব্রো?

এই হলো রসূলের আওলাদ নাদের শাহ! পাকিস্তান থেকে প্রতি বছর আসে। জিইসি থেকে লালখান বাজার ভরে গেছে রসূলের আওলাদের আশেকানদের ভিড়ে।

স্যামুয়েল জিজ্ঞাসে—পাকিস্তান থেকে এসে ঘোড়াটা কী করে?

আমি বলি—সুফিগিরি করে।

স্যামুয়েল বলে—সুফিগিরি মানে? তুমি তো সুফিদের অবমাননা করতেছো। আই লাভ সুফি, ব্রো।

আমি বলি—তুমি ভালোবাসতে থাকো, খালাতো ভাই। আমি সুফি-টুফি একদম নিতে পারি না। সুফিবাদ ইসলামের জন্য ক্ষতিকর।

স্যামুয়েল বলে—ব্রো, আমি কিন্তু তোমারে গুলি করে দিব এখন।

আমি বলি—দাও।

স্যামুয়েল একটু ভাবে। তারপর আবার বলে—না, আজ করব না।

আমি বলি—ওকে, কইর না।

স্যামুয়েল বলে—কিন্তু কছম আল্লার, একদিন গুলি করে দিব।

আমি বলি—ওকে, কইরা দিও।

স্যামুয়েলের ফোন বাজে। স্যামুয়েল কল রিসিভ করে। মারজিয়ার কল।

“আমার টাট্টু ঘোড়াটা কী কলে?”—মারজিয়ার আদুরে ডাক শুনে মন ভালো হয়ে যায় স্যামুয়েলের।

স্যামুয়েল বলে—আমি তো ঘোড়া কন্ট্রোল কলি, বাবু। বাবু কী কলে?

ঘোড়া কন্ট্রোল কথা শুনেই মেজাজ বিলা হয়ে যায় মারজিয়ার—ঘোড়া কন্ট্রোল মানে, কুত্তার বাচ্চা? তুই তোর নষ্ট কাজিনটার সাথে আছস! না? ওইটার সাথে থাকলেই তো তুই ছ্যাঁচড়া পোলাদের মতো ঘোড়া কন্ট্রোল, ঘোড়া কন্ট্রোল বলা শুরু করস। তুই আগে তোর নষ্ট কাজিনটারে দূর কর, তারপর কথা।

স্যামুয়েল স্পিকারে হাত চেপে আমাকে বলে—ব্রো, এখন যাও তো তুমি। একটু কথা বলি ঘোড়াটার সাথে।

আমি যাই না। আমি স্যামুয়েলের কানে কানে বলি—তুমি ওরে বলো যে আমি এখন নাই।

স্যামুয়েল স্পিকার থেকে হাত সরায়, মারজিয়াকে বলে—বাবুতা, ও চলে গেছে, এবার বলো।

মারজিয়ার গলায় আবার ফূর্তি ফিরে আসে—আচ্ছা, আমার টাট্টু ঘোড়া, তুমি টাকা জমা দিতে যাবা না?

স্যামুয়েল বলে—টাকা তো সকালেই দিয়ে দিসি, বাবু। পরশু জয়েনিং! সিনিয়র অফিসার পোস্ট।

মারজিয়া বলে—‘ওহ! তাহলে তো তুমি ফ্রি। এখনি আমার বাসার নিচে চলে আসো। তোমার চাকরি হলে আমরা তো ভালো করে ঘুরতেও পারব না আর।

এই কোন ফাঁপড়! স্যামুয়েল অপারেশন শেষ হবার আগ পর্যন্ত কোথাও যাবে না। স্যামুয়েল স্পিকার হাত দিয়ে চেপে আমাকে বলে—ব্রো, ঘোড়া তো দেখা করতে চায়।

আমি স্যামুয়েলের কানে কানে বুদ্ধি দিই।

আমার কথা শুনে স্যামুয়েল স্পিকার থেকে হাত সরিয়ে মারজিয়াকে বলে—বাবু, আমাকে তো যেতে হবে বারে, লইয়ারের সাথে দেখা করতে। ওইখান থেকে যাব পাথরঘাটার দিকে, জেলে, আম্মুকে দেখতে।

এর মধ্যে জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে। মুরাদুপুর, বহদ্দারহাট, বাকলিয়া হয়ে আমরা পৌঁছে যাই কর্ণফুলি ব্রিজে। টুটুল গাড়ি পার্ক করে ব্রিজ থেকে একটু দূরে। গ্রীস্মকালের নয়টার সূর্যের আলো পড়ে গাড়ির কাচে, কাচ ভেদ করে পড়ে আমাদের বিনিদ্র চোখের পাপড়িতে।

স্যামুয়েলের চোখ জ্বলে। এই রুট বড় সেনসিটিভ। চারিদিকে সতর্ক পুলিশ, র‍্যাব, স্পাই, ইয়াবা ব্যবসায়ী, বার্মিজ বাদাম চোরাচালানকারি। টুটুল গাড়ি পার্ক করে এমন জায়গায় যেখানে ছায়া নাই। সূর্যের আলো ঘুমিয়ে থাকা মঞ্জুর মুখে পড়ে, মঞ্জু চোখ ঢলতে ঢলতে ঘুম থেকে ওঠে। স্যামুয়েলেরও চোখ জ্বলে।

স্যামুয়েল বলে—টুটুল ব্রো, এইখানে তো অনেক রোদ। এইখানে কেন রাখছেন? ওই যে ওইখানেতো বিল্ডিং এর ছায়া আছে। ওইখানে রাখেন।

মঞ্জু বলে—স্যামুয়েল, শুক্কুরে শুক্কুরে আষ্ট দিন হয় নাই তুমি বিছানায় মুতা বন্ধ করছো! বড়দের কাজে নাক গলাও কেন?

নোমান, টুটুল ও বক্কর প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না।

টুটুল বলে উঠে—মঞ্জু, তুমি কেন নাক গলাও আমার আর স্যামুয়েল ব্রো’র কথার মধ্যে?

টুটুল গাড়িটা গাছের ছায়ায় রাখে। শুধু স্যামুয়েল গাড়ি থেকে বের হয়। স্যামুয়েল কর্নফুলি ব্রিজের তলা দিয়ে বয়ে যাওয়া কর্নফুলি নদীতে চোখ রাখে যেখানে এসে ভিড়বে একটা ফিশিং ট্রলার। এই ট্রলার থেকে মাল নামিয়ে তোলা হবে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্রাকে। নদীর পাড়ে একটার পর একটা ফিশিং ট্রলার এসে ভেড়ে, চলে যায়, সেই ফিশিং ট্রলার আসে না।  কিন্তু কিছুক্ষণ পর পর স্যামুয়েলের ফোনে মারজিয়ার কল আসে।

স্যামুয়েল মারজিয়ার সাথে স্পনটেনিয়াসলি মিথ্যা বলে যায়—হ্যাঁ, বাবু, জেলগেইটে… হ্যাঁ এখন আম্মুকে দেখতে ঢুকব।

এক সময় সেই ফিশিং ট্রলার এসে ভিড়ে কর্ণফুলির পাড়ে। মুহূর্তেই পাড়ে এসে পড়ে একটা ট্রাক। স্যামুয়েলে মোবাইলে সেইভ করে রাখা ট্রাকের প্লেইট নম্বর এই ট্রাকটার সাথে মিলিয়ে দেখে গাড়ির কাছে আসে।

স্যামুয়েল নোমানকে বলে—নোমান ব্রো, ঘোড়া তো এসে গেছে।

নোমান স্যামুয়েলকে বলে—তুমি গাড়িতে উঠে ফড়ো, বদ্দা।

স্যামুয়েল গাড়িতে উঠে পড়ে। ট্রলার থেকে মাল খালাস করে তোলা হয় ট্রাকে। ট্রাক ড্রাইভার ট্রাক ছাড়ে। ট্রাকটা উঠে পড়ে পাথরঘাটা যাবার রুটে। নোমান তার হাতে থাকা ওয়ার্লেস মঞ্জুকে দিয়ে বলে—তোমার পোলাপানরে বলো তাদের মাইক্রোবাস যেন তাড়াতাড়ি অলংকার মোড় দাঁড়ায়।

টুটুল গাড়ি স্টার্ট দেয়। মঞ্জু ওয়ার্লেসে বলে—ফোয়া ছা, তোরা আস্তে আস্তে অলংকার মোড় চলি আয়।

নোমান মঞ্জুর দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আমাকে বলে—হইলাম তাড়াতাড়ি, হইয়্যেদে—আস্তে আস্তে! বদ্দা, ফোয়াবে অনের মানুষ ন অইলি ইতেরে এহন আঁই ব্রাশফায়ার গরি দিতাম।

স্যামুয়েল বলে—বদ্দা, মঞ্জু ব্রো’র কমনসেন্স কম হলেও ছেলে ভালো। ব্রো-রে মাফ কইরা দেন।

বলে স্যামুয়েল মঞ্জুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। টুটুল গাড়ি তুলে দেয় পাথরঘাটা রুটে। আমরা চার নম্বর ট্রাকের পিছে পিছে যেতে থাকি। ট্রাক পাথরঘাটা পার হয়। ট্রাকের একটু পিছে আছে আমাদের গাড়ি। আমরা টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার যাবার ব্রিজের উপর, আর লালখান বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ট্রাক।

নোমান মঞ্জুকে বলে—তোমার ফোলাফান দাঁড়াইছে অলংকার মোড়ে?

মঞ্জু বলে—আরো এক ঘণ্টা আগে থেকে ওরা অলংকার মোড়ে দাঁড়ায় আছে, বদ্দা।

হঠাৎ ট্রাক ব্রেক ফেইল করে ঢুকে পড়ে লালখান বাজারের আমিন সেন্টারে। আমিন সেন্টারের দেয়ালে লেগে উল্টায় পড়ে ট্রাক। আর ট্রাক থেকে বের হয় গ্রেনেড আর রকেট লাঞ্চার। ট্রাক ঘিরে নগদে ভিড় জমে ওঠে। টুটুল গাড়ি এক দিকে দাঁড় করায়। আমরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখি।

ভিড় ঠেলে এক চুলে জটা পড়া পাগল বের হয়ে চিৎকার করে বলে—এই অস্ত্র আমাদের, এই অস্ত্র জনগণের। এই অস্ত্র আজ আমাদের হাতে রাষ্ট্র পালটায় দিবার দায়িত্ব তুলে দিয়েছে।

তার কথা শুনে লোকজন হাসে। একটু পর পাগলের পাশে এসে দাঁড়ায় ভারি চশমা ভারি গলার পরা এক লোক।

ভারি চশমা ও ভারি গলা বলে—প্রিয় বন্ধুগণ এই লোক কিন্তু পাগল না। কমরেড ফজলে রাব্বি। আমার নাম বলরাম কর্মকার। বন্ধুগণ, আমি কমরেড ফজলে রাব্বির নামে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ডাক দিচ্ছি।

নোমান বলে—বদ্দা, পরিস্থিতি ভালো না। এখনই পুলিশ সাংবাদিক সব চলে আসবে এইখানে। চলো, চলে যাই।

স্যামুয়েল বলে—দেখি না ব্রো কী হয়।

মঞ্জু বলে—নোমান বদ্দা, বাকি ছয় ট্রাকের আশা ছেড়ে আমাদের হাতে যা মাল আছে তাই আগে বিক্রি করে দিই। চলেন, বদ্দা, ঝাউতলায় চলেন।

দূরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন বাজে।

নোমান স্যামুয়েলকে বলে—বদ্দা, গাড়তে উঠে ফড়ো। চলো চলো…।

সবাই আবার গাড়িতে উঠে বসে। স্যামুয়েলের মুখ থমথমে। গাড়ি চলতে শুরু করে খুলশির উদ্দেশে।

 

২.

সন্ধ্যার লালিমা মেখে খুলশির ঝাউতলায় ঢুকে পড়ে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকার মতো লাল একটা পাজেরো। পাজেরো থেকে নেমে আসে সাদা পাঞ্জাবি পরা ফ্রেন্চকাট এক লোক। তার পিছে পিছে নামে আরো দুই লোক যাদের ভঙ্গিমা দেখে ফ্রেন্চকাটের চ্যালা চ্যালা লাগে। নোমান ফ্রেন্চকাটকে দেখে এগিয়ে গিয়ে মোলাকাত করে। ফ্রেন্চকাটকে দোতলায় নোমান বদ্দার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের পিছে পিছে আমি, স্যামুয়েল ও মঞ্জু ঢুকে পড়ি।

আমি স্যামুয়েলকে একদিকে ডেকে ফিস ফিস করে জিজ্ঞাসা করি—মালটা কে, খালাতো ভাই?

মালটার নাম ডিস্কো শফি।

নোমান বদ্দা স্যাম্পল হিসাবে একটা রাইফেল দেখায় ডিস্কো শফিকে। মঞ্জু একটু পর এনে দেখায় একটা রকেট লান্চার, গ্রেনেড লন্চিং টিউব, মাগাজিন ও বুলেট।

নোমান বলে—ডিস্কো বদ্দা, আমাদের আছে ১০, ০০০ পিস গ্রেনেড, ১০০ পিস রকেট লান্চার, ১০০ পিস রকেট, ৬০০ পিস গ্রেনেড লন্চিং টিউব, ২, ৩৯২ পিস ম্যাগাজিন ও ১,৪০,৫২০ পিস বুলেট।’

নোমান স্যামুয়েলকে বলে—বদ্দা, এগুলা সব তোমার মাল। তুমি বলো।

স্যামুয়েল নোমানকে বলে—না, ব্রো। আমি তো অস্ত্রের হিসাব বুঝি না। আপনি বলেন।

নোমান বলে—আরে আমি তো টাকার হিসাব বুঝি না। তুমি বলো।

স্যামুয়েল সেলফোনের ক্যালুকুলেটর বের করে হিসাব করে।

স্যামুয়েল জানায়—এক হাজার কোটি টাকা।

ডিস্কো শফি বলে—এত টাকা দেয়া সম্ভব না। শুনো বদ্দা, আমি দুই কোটি টাকা দিব। দুই কোটি থেকে আমি এক পয়সাও বাড়ায় দিতে পারব না।

স্যামুয়েল বলে—এক হাজার কোটির থেকে এক পয়সা কমে আমি মাল বেচব না।

নোমান বদ্দা স্যাম্পল হিসাবে একটা রাইফেল দেখায় ডিস্কো শফিকে

নোমান বদ্দা স্যাম্পল হিসাবে একটা রাইফেল দেখায় ডিস্কো শফিকে। মঞ্জু একটু পর এনে দেখায় একটা রকেট লান্চার, গ্রেনেড লন্চিং টিউব, মাগাজিন ও বুলেট।

স্যামুয়েল রুম থেকে বের হয়। আমিও স্যামুয়েলের পিছে পিছে নামি। মাঠে মঞ্জুর পোলাপান অস্ত্র ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে সেলফি তোলে এবং সেলফি ফেইসবুকে আপলোড করা যাচ্ছে না বলে একজন আরেকজনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।

মঞ্জু পোলাপানকে বলে দিয়েছে অপারেশন শেষ হবার আগ পর্যন্ত কোনো ছবি আপলোড করা যাবে না।

হঠাৎ দোতলা থেকে নোমানের গলা ভেসে আসে—সুদানির পোয়া ডিস্কোরে বাঁন। ইতের বইল্লে হাডি লই ফালাইয়ুম আজিয়ে।

কাহিনি কী? শুদ্ধ ভাষার নোমান বদ্দা ক্যান চাঁটগাইয়া বলে? হুঁশ না হারালে তো নোমান বদ্দা চাঁটগাঁইয়া বলে না। নগদে আমি ও স্যামুয়েল দোতলায় উঠি। দোতলায় উঠে দেখি, ডিস্কো শুক্কুরকে তার দুই চ্যালাসহ একসাথে সোফার সাথে বেঁধে ফেলা হচ্ছে রশি দিয়ে।

স্যামুয়েল নোমানকে বলে—ব্রো, কী হয়েছে?

নোমান বলে—আঁল্লই মাম্মি ড্যাডির ডইল্লে ব্রো ব্রো নগরিস, সুদানির ফোয়া।

স্যামুয়েল নগদে ডিপ ফটিকছড়ির স্ক্রিপ্টে চলে যায়।

সে নোমানকে জড়িয়ে ধরে বলে—বদ্দারে, আঁর বদ্দারে, সোয়াবিরিন, বদ্দা সোয়াবিরিন।

কয়েক সেকেন্ডের নিরবতা বয়ে যায় খুলশির ঝাউতলার উপর দিয়ে। নোমান বদ্দার হুঁশ ফিরে আসে।

নোমান সোফায় বন্দি ডিস্কো শফিকে বলে—বদ্দা, আফনি আমারে থ্রেট দিছেন?

স্যামুয়েল নোমানকে জিজ্ঞাসা করে—বদ্দা, কী হয়েছে।

নোমান বলে—ডিস্কো আমারে থ্রেট দিছে দুই কোটি টাকা দিয়ে মাল না ছাড়লে সে ফ্রশাসনরে জানায়া দিবে।

নোমানের কাছ থেকে পুরা ঘটনা শুনে স্যামুয়েল চেতে যায়। স্যামুয়েল অ্যাকশনে যায়। সে উঠে ডিস্কো শফির মুখে জোরে একটা চড় মারে।

মঞ্জুর হাতে ধরা ওয়ার্লেস শব্দ করে। মঞ্জুর পোলাপানদের একটা দল মাইক্রোবাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জিইসি-তে।

ওয়ার্লেসে থেকে ভেসে আসে—মঞ্জু বদ্দা, চারটা র‍্যাবের ট্যাংক যাইতেছে।

নোমান মঞ্জুকে বলে—তোমার পোলাপানরে বলো মাল ট্রাকে তুলতে। শহরে মাল রাখা যাবে না।

মঞ্জু বলে—কই যাব এখন বদ্দা?

নোমান বলে—হাটহাজারির পাহাড়ে। ওইখানে আমার লাইন ঘাট আছে। চিন্তা নাই।

মঞ্জু রুম থেকে বের হয়ে মাঠে আগ্নেয়াস্ত্র ঘিরে থাকা পোলাপানরে বলে—ফোয়া চা, মাল সামানা ট্রাকত তুলি দে। আঁরা আটাজারি যাইয়্যুম।

নগদে সব অস্ত্রপাতি ট্রাকে তুলে ফেলা হয়। স্যামুয়েল, নোমান, মঞ্জু, বক্কর, টুটুল ও আমি নীল গাড়িতে উঠে পড়ি। গাড়ি চলতে শুরু করে।

 

৩.

সকালবেলার ঝিরি ঝিরি বাতাস বয়ে যায় টিলার ঢালুতে বিছিয়ে রাখা তিনশ একুশ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর। একে একে সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ে। খালি স্যামুয়েলকে দেখি না। হালকা টেনশান হয়। কই গেল স্যামুয়েল? ফ্রেশ হয়ে আমি বের হই। বের হয়ে দেখি টিলার উপরে বসে আছে স্যামুয়েল। আমিও টিলাতে উঠি। স্যামুয়েলের পাশে বসি। স্যামুয়েলের চোখ রক্তলাল। আর মুখ বিষণ্ন।

স্যামুয়েলকে বলি—কী, ঘুমাও নাই, খালাতো ভাই?

স্যামুয়েল চুপ।

নোমান টিলার নিচ থেকে আমাদের চিৎকার করে ডাকে—বদ্দা, নিচে চলি আসো। খেয়ে নিই।

আমরা নামি। মাটিতে নানরুটি ও ভাজি দেয়া প্লেইট বিছানো পাটির উপর সবাই বসে। স্যামুয়েলের এক পাশে নোমান বদ্দা অন্য পাশে মঞ্জু। টুটুল আর বক্কর পিছনে বসে আছে। আমি তাদের মুখামুখি। মঞ্জুর ১২৩ জন ছেলে খেতে বসেছে। সবাই একসাথে খায়। স্যামুয়েল চুপচাপ খায়।

স্যামুয়েল বলে—ব্রো, আমরা অস্ত্রগুলা ফ্রশাসনের হাতে তুইলা দিই?

নোমান বলে—কী বলো বদ্দা!

নোমান বদ্দা বেকুব হয়ে আছে শুনে।

নোমান বলে—বদ্দা, তোমার কী হয়েছে বলো তো।

স্যামুয়েল বলে—মারজিয়া আমারে ম্যাসেজ পাঠাইছে ভোরে। গত বিকালে মারজিয়ার বিয়া হয়ে গেছে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি—এই ম্যাসেজ পাঠাইছে? দেখি?

স্যামুয়েল আমাকে তার ফোনে আসা মারজিয়ার ম্যাসেজ দেখায়।

আমি স্যামুয়েলকে বলি—বিয়া হইছে তো লিখে নাই। লিখছে তো এনগেইজমেন্ট হয়ে গেছে।

স্যামুয়েল আমাকে জিজ্ঞাসা করে—এনগেইজমেন্ট মানে বিয়ে না?

আমি কনফিউজড হয়ে যাই।

আমি নোমানকে জিজ্ঞাসি—বদ্দা, এনগেইজমেন্ট মানে বিয়ে না?

নোমান বদ্দাও কনফিউজড।

নোমান বদ্দা মঞ্জুকে জিজ্ঞাসে।

মঞ্জু তার পোলাপানরে জিজ্ঞাসে—এনগেইজমেন্ট মানে বিয়ে না?

সাথে সাথে মঞ্জুর ১২৩ জন পোলাপান এনগেইজমেন্ট ও বিয়ে নিয়ে গবেষণা শুরু করে। গুগলে সার্চ দেয়। পাহাড়ের ঢালুতে  শোরগোল ওঠে।

নোমানের ফোন বাজে। নোমান সবাইকে চুপ করতে বলে কল রিসিভ করে। ডিস্কো শফির কল।

নোমান স্যামুয়েলকে জিজ্ঞাসা করে—সমস্যা নাই, বদ্দা। তুমি যা বলবা আমরা তাই করব। তুমি বলো এখন কি অস্ত্র ফ্রশাসনের হাতে তুলে দিবা না অস্ত্র সেল করবা?

স্যামুয়েল বলে—সেল, বদ্দা, সেল।

খাবার শেষ হয়। স্যামুয়েল ও আমি উঠে যাই টিলার উপরে। স্যামুয়েল মারজিয়ার বন্ধ ফোনে অবিরাম কল দিয়ে যায়। এক পর্যায়ে স্যামুয়েল তার ফোন অফ করে দেয়।

স্যামুয়েল আমাকে বলে—আমার এই সব ইলিগাল কাব্জাব আর ভাল লাগতেছে না, ব্রো। মালগুলা বেইচা ভুইলা যাব জীবনে এইরকম একটা ঘটনা ঘটছিল! মারজিয়ারে বিয়া করব, চাকরি করব, বাবা/মা হব, সিম্পল স্ট্রেইট লাইফ, সুফি লাইফ।

আমি জিজ্ঞাসি—তুমি না একবার কইছিলা, মারজিয়া বাচ্চা টাচ্চা নিবে না।

স্যামুয়েল বলে—আরে অনেক ঘোড়া এইসব নখরা দেখায়! যে যেটা করবে না বলে নখরামি দেখায় সে সেটাই করে।

স্যামুয়েল আমাকে জিজ্ঞাসে—ডিস্কো শফি কখন আসবে? জানো কিছু?

আমি জানি না।

স্যামুয়েল দূরে দাঁড়ানো মঞ্জুকে জিজ্ঞাসে—ডিস্কো শফি আসবে কখন, ব্রো?

মঞ্জু জবাব দেয়—নোমান বদ্দা সব জানে। আর তুমি আমাকে কোনো প্রশ্ন করবা না। তুমি ছোটভাই, ছোটভাইয়ের মত থাকো।

স্যামুয়েল—ব্রো, আপনের মাল কি মাথায় উঠে থাকে সব সময়? সব সময় মাথা হট কেন!

মঞ্জু হঠাৎ চিল্লায় ওঠে—ঐ মাম্মি ড্যাডির ফোয়া, চুদুরবুদুর গরদ্দে না!

বলে মঞ্জু টিলার উপরে উঠতে থাকে। মঞ্জুর পিছে পিছে উঠে আসে তার পোলাপান।

মঞ্জু এসে স্যামুয়েলকে কলার ধরে শূন্যে তোলে।

মঞ্জু বলে—আজিয়ে তোরে ফাই, মনা।

আমি মঞ্জুকে আটকাই। মঞ্জুর পোলাপান আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।

আমি নোমানকে খুঁজতে টিলা থেকে ঢালুতে নামি। ঢালুতে নেমে দেখি মাটির ঘরে ঘুমায় নোমান, বক্কর ও টুটুল।

টিলার উপরে মঞ্জু ও তার পোলাপান একসাথে স্যামুয়েলকে পিটায়। স্যমুয়েল ‘মাগির ফোয়া, হানকির ফোয়া’ বলে চিল্লায়। এই টিলাতে স্যামুয়েলের চিল্লানি ছাপিয়ে যায় একটা একটা গর্গর গর্গর আওয়াজ। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না আওয়াজটা কীসের।

আওয়াজের উৎস বের করার আগেই দেখি রক্তাক্ত স্যমুয়েল টিলা থেকে নেমে আসে দৌড়ে। স্যামুয়েলের পিছে মঞ্জুরা আছে। স্যামুয়েলের পকেট থেকে চাবি পড়ে যায়। একটু থেমে চাবি কুড়িয়ে আবার দৌড়ায়। স্যামুয়েলের পিছে পিছে দৌড়ায় মঞ্জুরা। স্যামুয়েল দৌড়ে নীল গাড়িতে উঠে পড়ে। আমিও গাড়িতে উঠে পড়ি। সামুয়েল গাড়ি স্টার্ট দেয়। টিলা থেকে বের হয়ে আসার সময় দেখি সাতটা র‍্যাবের গাড়ি যাচ্ছে টিলার দিকে।

(কিস্তি ৪)

About Author

তানভীর আহম্মদ চৌধুরী

জন্ম. চট্টগ্রামে। কবি, গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও শর্টফিল্ম নির্মাতা। 'ডিয়ার ট্রটস্কি (২০১৬)' ও 'লাইফ ফ্রম অ্যাকুরিয়াম (২০১১)' দুটি শর্টফিল্ম বানিয়েছেন।