page contents

অ-প্রেম

শেয়ার করুন!

আজকে সেই ছেলেটার সাথে দেখা হলো, যে একবার রাত একটায় ফোন করে বলেছিল, “কী খবর! ভুইলাই গেছো!”

ছেলেটা ব্যাকডেটেড ছিল। তার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দুনিয়ার সবচেয়ে সহজ বস্তু বলে মনে হত। মিথ্যে বলত টুকটাক, তবে অনভিজ্ঞতার দোষে দুষ্ট হওয়ায় সেসব বুঝতে সময় লাগত না। হাড়কিপটা, জনমকিপটা টাইপ মানুষ। ইন্টার্নি ছিল তখন। বেশ ব্যস্ত থাকতে হত। সারাদিনে আর তেমন কথা হত না। কথা না বলতে পারলে আমার গলা শুকিয়ে থাকত—এমন না। তবে সে ডিউটি করে বের হয়েই সবসময় ফোন দিত। ফোন দিয়ে বলত—”ইনিসী, একটু ব্যাক করা যায়?”

আমি সবসময় তীক্ষ্ম কণ্ঠে “না” বলে লাইন কেটে দিতাম। কারণ, আমি কোনোদিন ইন্টার্নাল সৌন্দর্যবিহীন মানুষের জন্য দয়ামায়া অনুভব করি নাই। খুব সাধারণ একটা ছেলে, আমিও সাদামাটা চোখেই দেখতাম তাকে। তবে, ছেলে হিসেবে খারাপ না, সহজ সরল ধরনের। চাওয়া-পাওয়াগুলি আর পাঁচজন মানুষের মত খুব স্বাভাবিক।

একদিন খুব অপরাধবোধ নিয়ে আমাকে সে বলেছিল—সে সিগারেট খায়। এটা আমার কাছে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, অপরাধ বলে মনে করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সে অপরাধবোধে ভুগতো এইজন্য। খুব স্ট্রাগল করে বড় হইছে—সেসব কথা বলত মাঝেমধ্যে।

তার বয়স যখন চার অথবা পাঁচ, তখন তার মায়ের ক্যান্সার ধরা পরে। প্রায় বিনাচিকিৎসায় সে মারা যায়। বাবা ফের বিয়ে করার পর নানান ঝামেলা শুরু হয়েছিল বাসায়। একসময় তাকে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। বাসা থেকে বের করে দেয়ার পর কী কী করছে, কীভাবে টিউশনি করে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে, অ্যাডমিশন কোচিং করছে, চান্স পাইছে—এসব শুনতাম মাঝেমধ্যেই। পড়াশোনা না করতে পারলে খুব ডিপ্রেসড থাকত। সম্ভবত ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভাবত, আগের জীবনের অনিশ্চয়তার ভীতি তার মধ্যে ছিল। অনিশ্চিত, ভালোবাসাহীন, টানাটানির জীবনে অস্বস্তি ছিল।

তেমন গল্পের বইটই পড়ত না। তবে, আমার পড়ার বেশ প্রশংসা করত। কবে কোন বই পড়ছি, কার লেখা, কবে নাগাদ শেষ হচ্ছে—খোঁজ রাখত। যেদিন পড়া শেষ হত, ওইদিন রাতে অনেক ক্ষণ কথা হত। বইয়ের সারসংক্ষেপ বলতে হত তাকে। বই পড়তে ভাল্লাগত না, কিন্তু আমি যখন বলতাম খুব আগ্রহ নিয়ে শুনত। শুনে প্রতিবারই মারাত্মক উত্তেজনা নিয়ে বলতো—”ইনিসী, এই বইটা পড়তেই হবে।”

আমার তাকে বই দিতে কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু পরে তার আগ্রহেই ভাটা পড়ত। একবার শুধু হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ পড়ার জন্য নিয়েছিল। সেটা আর ফেরত দেয় নি। ফেরত দেয়ার জন্য বলতেই বলতো, “ওটা তো পড়াই হয় নি!”

—”পড়া না হলেও ফেরত চাই। আপনার আর পড়া হবে না।”

—”থাক না! আমি তো আছি, পালিয়ে তো যাচ্ছি না!”

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠত, হলে থেকে কেউ এত সকালে কী ভাবে ঘুম থেকে ওঠে এটা আশ্চর্যের বিষয় ছিল আমার কাছে। ফোন করত সেই সাতসকাল বেলা। মাঝেমধ্যে এইজন্য বাড়াবাড়ি রকম বিরক্ত হতাম। ফোন অফ করেও রাখতাম। সকালে উঠে সে নাকি পুকুর পাড়ে পা ডুবিয়ে বসে থাকত। আমি আধঘুমে কল্পনা করতাম—একটা আঁতেল টাইপ ছেলে পা ডুবিয়ে বসে আছে পুকুর পাড়ে, হঠাৎ তার চশমা পুকুরে পড়ে গেল। কিন্তু সে নির্বিকার, যেন জলপরী এসে সোনার চশমা, রুপার চশমা সাধবে তাকে!

রাতে যখন ফোন করত তখন মাঝেমধ্যেই “মশা!” “মশা!! “বলে চিৎকার করে উঠত। জিজ্ঞেস করলে শুনতাম সে ছাদে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে সে চাঁদ, তারা, জ্যোৎস্না নিয়ে বিভিন্ন উদ্ভট আলোচনা করত আমার সাথে। একদিন হুট করে জিজ্ঞেস করলো, “তোমার রিকশায় ঘুরতে ভাল্লাগে?”

—”না, দিনে তো একেবারেই না।”

—”আমার খুব ভাল্লাগে।”

—”কেন?”

—”দুজন যখন রিকশায় বসে, তখন তাদের মধ্যে দূরত্ব থাকে না। কোনো দূরত্ব ছাড়া কাছাকাছি বসে থাকায় প্রেম আছে।”

 

ঘুরতে গিয়েছিলাম দুইদিন। প্রথম দিন আইসক্রিম না সেধে খাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল ফোনে। এজন্য দ্বিতীয় দিন আমি কিছুই খাই নি। কী খাবো, আবার না সেধে খাবো—রিঅ্যাক্ট করবে—ধুর! এর চেয়ে না খাওয়া ভাল।

দ্বিতীয় দিন যখন আমাকে রিকশা ডেকে দিচ্ছিল, তখন প্রথম আমি তাকে একটু ভাল ভাবে দেখলাম। আমার বাসায় যেতেই ওর মেডিকেলের হল পরে, ওকে ওখানেই নামিয়ে দেয়া যায়। আমি রিকশায় উঠতেই যখন সে “সাবধানে যেও” বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তাকে বলার সুযোগ না দিয়ে আমিই আগে বলে ফেললাম, “উঠে আসুন। হলের সামনে নেমে যাবেন।”

—”না থাক। তুমি যাও।”

—”উহু। এই তো পাঁচ মিনিট। এখানে রিকশা পাওয়া যায় না। আমার রিকশায় না গেলে হেঁটে যেতে হবে।”

সারা পথে গাছ হয়ে বসেছিল আমার পাশে। আমার কিছু চুল উড়ে তার মুখের ওপর পড়ছিল। তাতেও তার মুখ ভাবলেশহীন, সরিয়েও দেয় নি আর আমাকেও কিছু বলে নি। আমি নিশ্চিত ছিলাম আমার পাশে রিকশায় যাচ্ছে এইজন্যেও তার অপরাধবোধ জন্মাবে!

রিকশাওয়ালাকে “থামো” বলতেই আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। বললাম, “খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন না?”

“ইনিসী, আমি রুমে গিয়ে তোমাকে ফোন দিচ্ছি।”—বলেই হলের ভেতর ঢুকে গেল। একবারও পেছন ফিরে তাকায় নি। আমার মুখে তখনও হাসির রেশ লেগে ছিল।

বাসায় যেতেই ফোন আসল।—”ইনিসী, আমার ভয় হচ্ছিল আসলে। আমি এর আগে কোনো মেয়ের সাথে রিকশায় কোথাও যাই নি।”

—”আপনিই না বললেন রিকশায় পাশাপাশি বসায়ও প্রেম আছে। আপনার মধ্যে তো প্রেমের চেয়ে অপ্রেম ঢের বেশি।”

—”কেন জানি না ভয় হচ্ছিল।”

—”কেন ভয় হচ্ছিল? আমাকে ভয় পান নাকি?”

—”ইনিসী প্লিজ! আমার এখনও কেমন জানি লাগতেছে।”

—”আপনি একজন অ-প্রেমিক আঁতেল! ফোন রাখেন।”

কথা হত প্রায় প্রতিদিন ফোনে, ফেসবুকে আলাপ তো আছেই। তার সব কথাবার্তা সিরিয়াস, আমার সব কথাই ঠাট্টা। ক্ষেপে যেত মাঝেমধ্যে। ঠিক প্রেম ছিল না আমাদের, আবার প্রেমের চেয়ে কিছু কমও ছিল না। চলছিল এমনই, প্রেম না কিন্তু প্রেমময় সম্পর্ক।

যোগাযোগ হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল। কেন হল জানি না। আমিও ফোন দিতাম না আর। ভাটা পরায় আমার তেমন কোনো শীতগ্রীষ্ম অনুভব হল না। ওরও হচ্ছিল না হয়ত বা হয়ত হচ্ছিল। ওর অনুপস্থিতি আমাকে ভাবিয়ে তোলে নি। আমি আমার মতই চলছিলাম, একঘেয়ে রুটিনের বাঁধাধরা জীবন।

কথা হল কথা বন্ধের তিন মাস পরে। কথা না ঠিক, ঝগড়া হয়েছিল। আমি যেহেতু বেশ ঝগড়াটে, প্রতিপক্ষ আমার সামনে যুক্তিতর্ক পেশ করতেও থতমত খাচ্ছিল। তবুও, ঝগড়া একপেশে হয় নি। একঘণ্টার ঝগড়া, রগরগে ঝগড়া। তবে সেই ঝগড়ায় প্রথম বারের জন্য আমি ভালবাসা টের পাচ্ছিলাম। কোলকাতার আর্ট ফিল্মের মত তুই বলে সম্বোধন করে সোয়াগী ঝগড়াও হয়েছিল শেষে। তারপর সুনসান, আগের মত—আর কোনোদিন যোগাযোগ হয় নি।

এক বছর পর, প্রায় এক বছর পর দেখা হল আবার। আমি সাইডওয়াক ধরে হাঁটছিলাম। একটা রিকশা, একজন পরিচিত মানুষ মনে হল। আগের সেই চশমাটা এখনও আছে, চেহারায় অপ্রেম ছিল না, আজকে তাকে প্রেমিক বলে মনে হচ্ছে। মানুষটা হাসছে। না এই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, অনিশ্চয়তা নেই, ভয় নেই! পাশে খোলা চুলের প্রাণোচ্ছল তরুণী, হাসছে!

না, এই এক বছরেও আমার একবার মনে পড়ে নি এসব কথা। আজ বেশ মনে পড়ছে। আজ কেন জানি সে সব কথা মনে পড়তে শিরদাঁড়া বেয়ে কী নেমে যাচ্ছে। কী জানি একটা গোলমাল হচ্ছে। আমি পায়চারি করছি বারান্দায়, এরকম পায়চারি আগেও করতাম—যখন উদ্দেশ্যহীনভাবে রাতের পর রাত ফোনালাপে কাটিয়েছি।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সানজিদা আমীর ইনিসী
সানজিদা আমীর ইনিসী

জন্ম. বরিশাল ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক (দ্বিতীয় বর্ষ)।

Leave a Reply