আই অ্যাম নট হিউম্যান বিং

শেয়ার করুন!

বছর বছর গাজায় বাচ্চা মরে। তারপরেও বছর বছর গাজায় বাচ্চা পয়দা হয়। বয়স্করা কোলে-কাঁখে করে বাচ্চাদের বোমা থেকে বাঁচানোর জন্য পালিয়ে বেড়ায়। নধর শিশুর শরীরে তারপরও বোমার আঘাত লাগে, তারা মারা পড়ে। শিশুদের খুন হওয়ার মতো নিষ্ঠুর ঘটনা দুনিয়ায় আর কি আছে?

মানুষ চায় যুদ্ধ আর না থাকুক। শান্তি আসুক। শান্তির পয়গাম হিসাবে দুনিয়ায় তারা শিশুর আবির্ভাব ঘটায়। শিশুর প্রতিপালক হিসাবে তারা দিন-দুনিয়ার রেষারেষি থেকে মুক্তি পাইতে চায়। মানুষ তার বিপ্লবি সম্ভাবনার প্রকাশ এভাবে ঘটায়।

salahuddins1

এখন যারা মানুষরে তার নানা পরিচয় ও কর্তব্য থেকে রেহাই দিতে চান, নিছক সংখ্যায় বা জনে নামায়া আনতে চান তারা হয় আহাম্মক নয় নিরেট। হিউম্যান বিং বলে যা জাহির করতে চান তারা তা আদতে বারুদে পানি ঢেলে যুদ্ধ থামায়ে দেয়ার ভান করা। যেনবা একটা ভুল বুঝাবুঝিতে কিছু অবলা মানুষ মারা পড়ছে। এবার না হয় থামুক বৃষ্টি।

অথচ গাজায় সাম্প্রতিক হামলা ঘটেছে রোজার মধ্যে। এর আগেও রোজার সময়ে তাদের উপরে হামলা হয়েছে। ফিলিস্তিনে রমজান ধুমাধামে পালন করা হয়। রাস্তায়, বাড়িতে লণ্ঠন জ্বালানো হয়। সেখানে বাচ্চারা রমজানের প্রাণ। মনে করা হয় তারা আগামীর দূত। ফেরেশ্তাদের শাকরেদ। অন্ধকার রাতে তাদের হাঁটা-চলায় যেন কোন সমস্যা না হয়, সে জন্য সন্ধ্যায় বচ্চারা লণ্ঠন জ্বালায়ে রাস্তায় মাতামাতি করে। সেই রোজার মাসেই হামলা যখন, তখন এই নাবালকদেরও মুসলমান না-ভাবতে চাওয়াটা জবরদস্তির আরেক নাম।

জীবিত অবস্থায় প্যালেস্টাইনের শিশু
জীবিত অবস্থায় প্যালেস্টাইনের শিশু

এর আগেও সাদ্দামের ফাঁসি দেয়া হয়েছিল ঈদের দিনে। এখন ঈদের দিনকে বছরের অন্য আরেকটা সাধারণ দিন হিসাবে ভাবার কোশেশ মুসলমানরা কেন করবে? ঈদের দিনটিকে যারা ঈদের দিন ভাববে আর প্রতিবাদ করবে তারা তো জঙ্গী — এই ভয় অথবা যুক্তি নিশ্চয় সবাইকে কাবু করার জন্য যথেষ্ট না। দেশে ও সমাজে মুসলমান-প্রতিবাদকারী মাত্রে তার জঙ্গী সম্ভাবনা থাকে। একটা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও ‌ঈমানে আঘাত করা হবে, আর তারা যখন প্রতিবাদ করতে যাবে, নিজেদের পরিচয় জানাতে যাবে, তখন আপনি বিবেক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তাকে মুসলমান থেকে মানুষে উন্নীতকরণের কাজে শামিল হবেন। পুরো ব্যাকরণটাই পাল্টে দিতে চাইবেন। ইসরায়েলও কিন্তু সন্ত্রাসী নিধনের উছিলায় গাজায় হামলা চালাচ্ছে। এসব খেয়াল করার দরকার আছে।

মানে তারা মুসলমানদের মারছে না। সন্ত্রাসী মারছে। মানুষের মধ্য ভালো থাকবে, খারাপ থাকবে। ভালোরা খারাপদের মারলে ঠিক আছে। কিন্তু খারাপরা যেন অবলা, নিরাপরাধ মানুষ না-মারে — হিউম্যান বিং আমাদের এমন এথিক্স শেখায়। হিউম্যানদের কেউ মার্ক্সবাদী হবেন, কেউ নার্সিসিস্ট। কিন্তু কেউ মুসলমান হলে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ইহুদি পরিচয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া যাবে না। মুসলমান হলেও না। ম্যান আর ন্যাচারালি রিলিজিয়াস নট নেসেসারিলি। ইন্সটিংক্ট মোকাবিলা করতে না পারলে পূর্ণ মানুষ হওয়া যাবে না। প্রয়োজনে অধার্মিক হয়ে উঠুন। লাশের নাম রাখুন মানুষ। মুসলমান রাখার মানে সেই লাশের পুনরুজ্জীবন ঘটে, যা বিপদজনক।

গাজার মৃতদের নাম মুসলমান হলে তাদের উপর হামলাকারীদের নাম ইহুদি দিতে হয়। এতে দুই পক্ষের সংঘাত আর থামবে না। আজ সে ওকে মারবে তো কাল তাকে মারবে। এই অবস্থা থেকে উদ্ধারের উপায় হিসাবে গাজায় মুসলমান পরিচয় লুকিয়ে মানুষ পরিচয়কে একমাত্র করে তোলার চেষ্টা হয়। এখন এই মানুষ মানে কী? তার একটা শরীর, ঠিকানা, সম্পদ, পরিবার — এসব? কিন্তু তার যে আরও সব ঐতিহাসিক যোগাযোগ আছে, সে একটা উম্মাহর অংশ। তার মরণে অন্যদেরও দায় তৈরি হয়ে যায়, মন খারাপ হয়, দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। এসব পরিচয়কে গোপন করে তো নিস্তার পাওয়ার উপায় নাই। আজকেও যে গাজাবাসী মরছে সে ইতিহাসের উত্তরাধিকার। মানবযজ্ঞের শিকার। উম্মাহর অংশ।

মার্ক্স যখন দুনিয়ার মজদুরদের এক হতে বলেন তখন কিন্তু বিতর্ক দেখা যায় না। মজদুরেদের উম্মাহ বিপ্লবী সম্ভাবনা হিসাবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের বেলায় ভাবা হয় এই বুঝি সাম্প্রদায়িকতা হয়ে গেল। মজদুরেরাও যে মালিকদের প্রতি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারেন দুনিয়াজুড়ে এক হওয়ার মধ্য দিয়ে, বা হয়েছেনও নানা সময়ে সেসব আর আলাপ হয় না। মজদুর বলার মধ্য দিয়ে মার্ক্স আরও যেসব কর্তব্যের কথা হাজির করেন তা বুঝতে পারলেই কিন্তু এসব সমস্যা এড়ানো যায়। তেমনি মুসলমান বলার মধ্য দিয়েও আসলে দুনিয়াবি দায়িত্ব ও তা পালনের কথা বলে হয়।

গাজায় মরে পড়ে থাকা শিশুদেরও এমন মুসলমান পরিচয় আছে। মানুষ, এই সার্বজনীন ধারণা তার উপর চাপায়ে দেয়া গুনাহ’র কাজ হবে। মিথ্যা কাজ হবে। সে গাজার শিশু, বেড়ার ঘেরে থাকে। ঘের পেরোলেই ইসরায়েলি গুলিতে তাদের মরতে হয়। মানুষ পরিচয় তার জন্য বর্ম হয়ে দেখা দেয় নাই। ফিলিস্তিনের বাইরেও এই ‘মানুষ’ পরিচয় তার নিজের না। বাজারের ভোক্তা, ক্রেতা, খদ্দের হিসাবে সে মানুষ। এটা তার রাজনৈতিক পরিচয় না। এই পরিচয়ে তার অধিকার আদায় বা প্রতিষ্ঠার কথা কিছু বলা হয় না। টাকা কামাইকারি মানুষ, সাপোর্টার মানুষ — এইটা পুঁজিবাদের তৈরি করা পরিচয়। মার্ক্স যে কারণে মজদুরদের কথা বলেছেন, শোষক-শোষিত বলেছেন।

অতএব হিউম্যান বিং বা সংখ্যা, জন হিসাবে কাউরে পরিচয় করায়ে দেয়াটা একটা স্বৈরাচারী কাজ। যারে তার পরিচয়ে পরিচিত হইতে দেন দয়া কইরা।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here