page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আকিরা কুরোসাওয়ার সাক্ষাতে আব্বাস কিয়ারোস্তামি

আকিরা কুরোসাওয়া বলেছিলেন, “সত্যজিৎ রায় মারা যাবার পর আমি খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আব্বাস কিয়ারোস্তামি’র ছবি দেখে আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই—তিনি সত্যজিতের জায়গায় একদম ঠিক লোককেই পাঠিয়েছেন।” 

১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আব্বাস কিয়ারোস্তামি ও ‘ফিল্ম ইন্টারন্যাশনাল’ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদক শোহরেহ গোলপারিয়ান জাপানি সিনেমার এই কিংবদন্তীর সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।

আড়াই ঘণ্টার আলাপে নিজেদের সিনেমা বানানোর ধরনে তাদের মিল ও পার্থক্যের দিকগুলি উঠে এসেছে। সেই সাথে চলচ্চিত্রের ব্যাপারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান জানাতেও তারা ছিলেন স্পষ্ট ও একমত। কথোপকথনটি ‘ফিল্ম ইন্টারন্যাশনাল’ ম্যাগাজিনের ১৯৯৩ সালের ৪র্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

akira-kurosaowa-65

আকিরা কুরোসাওয়া (১৯১০ – ১৯৯৮)

‘সম্রাট এবং আমি’: আকিরা কুরোসাওয়ার সাক্ষাতে আব্বাস কিয়ারোস্তামি

শোহরেহ গোলপারিয়ান

অনুবাদ: 

কুরোসাওয়ার মেয়ে দরজা খুলে দিলেন। সাথে সাথে এগিয়ে এলেন দীর্ঘদেহী কুরোসাওয়া। পরনে গোলাপি জামা, বাদামি প্যান্ট। পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম, আব্বাসের সাথে দেখা করার সময় রঙচঙে টি-শার্ট পড়ার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ওই গোলাপি শার্টেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাকে।

দোতলায় নিয়ে গিয়ে নিজের স্টাডি রুম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন আকিরা। মৃদু আলোতে কালো চামড়ার ফার্নিচার আর অস্কারের মূর্তি দিয়ে সাজানো সেই রুম দেখার পুরোটা সময় যেন তার মহিমায় আচ্ছন্ন হয়েই থাকলাম আমরা। অন্যান্য আসবাবের মাঝে ছিল কিছু ইরানি তামার জিনিসপত্র। দেওয়ালে ঝুলছিল আকিরার স্ত্রীর একটা পোর্ট্রেট আর কয়েকটা জাপানি পেইন্টিং।

“আপনি যেবার কানে (কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল) আসলেন, সেইবার আমিও ওইখানে ছিলাম,” আকিরাই আলাপ শুরু করলেন, “অবশ্য তখনো আপনার একটা ছবিও দেখা হয় নি।”

“সেইবার কানে আপনার ‘মাদাদিয়ো’ দেখার সুযোগ হয়েছিল,” বলে উঠলেন কিয়ারোস্তামি, “আপনি আমার ঠিক দুই সারি সামনেই বসেছিলেন। আপনার সিনেমা আর আপনাকে একসাথে দেখার সুযোগ পেয়ে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল নিজেকে। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না ইরানে আপনাকে কত লোকে চেনে! বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবার মাঝেই আপনি সমান বিখ্যাত। আলফ্রেড হিচকক আর আপনিই মনে হয় বিদেশি নির্মাতাদের মাঝে সবচাইতে বেশি জনপ্রিয়! একবার ইরানি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, একমাত্র আপনার আর তারকভস্কি’র সিনেমাগুলিতেই নাকি ইরানি শিল্পের মূল্যবোধ খুঁজে পাওয়া যায়। ইরানের বাকিদের সাথে নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারলে খুব ভাল লাগত।”

seven-samurai-1

১৯৫৪ সালের এপিক মুভি ‘সেভেন সামুরাই’-এর সেটে আকিরা কুরোসাওয়া।

“তারকোভস্কি আমার বন্ধু ছিলেন। তার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল মস্কোতে গিয়ে। তেহরান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বিচারক হওয়ার জন্য দুইবার করে ইরানে যাওয়ার অফার দেওয়া হয় আমাকে। তাও বছর দশেক আগের কথা। সিনেমার ভাল-মন্দ বিচার করা আমার কাছে খুবই কঠিন কাজ বলে মনে হয়। তাই আর যাওয়া হয় নাই। আপনি তো ইয়ামাগাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বিচারক হিসাবে এসেছিলেন—তা আপনার কাছে কঠিন লাগে নাই?”

“তা লেগেছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড না থাকায় ব্যাপারটা অনেক বেশি কষ্টকর হয়ে যায়। যখনই আমি এরকম কোনো জুরি বোর্ডে থাকি, প্রতিবারই নিজেকে বোঝাই—আর না, এইটাই শেষ। কিন্তু নতুন করে আমন্ত্রণ পেলে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারি না। নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণে যাওয়ার লোভ সামলানো আমার পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া মাঝে মাঝে ব্যতিক্রমী কিছু করতে কার না ভালো লাগে,” বললেন কিয়ারোস্তামি।

কুরোসাওয়া বললেন, “আমি আপনার সাথে একমত। কিন্তু এখন ভ্রমণে যাওয়া আমার জন্য খুবই কষ্টকর। পায়ে ব্যথা, আর তাছাড়া এইসব অফিশিয়াল ট্রিপগুলি আমার কাছে জবরদস্তি মনে হয়। ভ্রমণ তো হয়ই না, বরং ওরাই আপনাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়।”

১৯৯৩ সালে কুরোসাওয়ার আঁকা মাদাদায়ো ছবির পোস্টার।

কুরোসাওয়ার আঁকা মাদাদায়ো (১৯৯৩) ছবির পোস্টার।

তবে সামনে যদি ইরানে যাওয়ার সুযোগ হয়, তাহলে কুরোসাওয়া যেন নিজের ইচ্ছামত সব জায়গায় ঘুরতে পারেন—সে ব্যাপারে সব দায়িত্ব নেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন কিয়ারোস্তামি। যদিও সেই সম্ভাবনা খুবই কম, তবু ইরানের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখালেন কুরোসাওয়া, “আমি নিশ্চিত ইরানে আরো অনেক ভাল ভাল নির্মাতা আছেন। আপনার সিনেমাগুলি সরল আর সাবলীল বলেই এত ভাল লাগে আমার। যদিও কথায় বর্ণনা করা সম্ভব না, ভাল করে বোঝার জন্য আপনার সিনেমা শুধু দেখতে হয়। আর আপনি যে অপেশাদার অভিনেতাদের সাথে কাজ করেন, এই ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত লাগে আমার কাছে। বিশেষ করে বাচ্চাদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?”

“আপনার প্রশ্নের সেরা উত্তর হবে—আমি জানি না,” বললেন কিয়ারোস্তামি, “আমি এটা আপনার কাছ থেকেই শিখেছি। কথাটা আপনাকে প্রথম ব্যবহার করতে দেখি গত বছরের টোকিও ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে, আর তারপর থেকে আমি নিজেও এটা অনেক সহজে বলে বেড়াচ্ছি। মাঝে মাঝে এই নন-প্রফেশনাল অ্যাক্টররা প্রচণ্ড অবাক করে দেয়। হ্যাঁ, সবকিছুর জন্যই নির্দিষ্ট নিয়ম আছে; কিন্তু অনেক সময় এমন অনেক কিছুই পাওয়া যায় যার সাথে নিয়ম মেনে চলার কোনো সম্পর্ক নাই।”

কুরোসাওয়ার নিজের কাছেও ব্যাপারটা একই সাথে ইন্টারেস্টিং আর কঠিন বলে মনে হয়। “অবশ্য পেশাদারদের সাথে কাজ করাও অত সোজা না। প্রতিটা নতুন ছবির জন্য তাদেরকে ভেঙেচুরে একেবারে নতুন করে বানিয়ে নিতে হয়”—বললেন তিনি। কিয়ারোস্তামি জানালেন, আকিরার সর্বশেষ ছবিতে যে অভিজ্ঞ অভিনেতা কাজ করেছেন, শুটিংয়ের সময় তার সাথে আকিরা কী রকম আচরণ করেছিলেন সেই কথা তিনি শুনেছেন। “ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের স্বাস্থ্য নিয়ে সবাই বেশ দুঃশ্চিন্তায় ছিলেন,” বললেন কিয়ারোস্তামি।

kurosaowa-satyajit-2

১৯৮২ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আকিরা কুরোসাওয়া ও সত্যজিৎ রায়।

কুরোসাওয়া হাসতে হাসতে বললেন, “আসলে ও রকম করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। অভিনেতাদের কাছ থেকে চমৎকার পারফর্মেন্স বের করে আনতে প্রথমে তাদের ব্যক্তিত্ব ঝেড়ে ফেলতে হয়। আর সেটার জন্যই রূঢ় আচরণ করেছিলাম। একটু চাপ না দিলে আসলে হয় না। তা আপনি কি কখনো প্রফেশনালদের সাথে কাজ করেছেন?”

“আমার শেষ ছবিতেই পেশাদার একজন অভিনেতার সাথে নতুন এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আপনি যেমন বললেন, পেশাদার অভিনেতারা তাদের আগের চরিত্রগুলির সাথে আটকে থাকেন। আমাদের নিজেদের ব্যাপারেও এই ঝুঁকি দেখা যায়। অনেক সময় এমন হয়, নিজেদের পুরানো ছবির যে আইডিয়াগুলি আর বাস্তবায়ন করা হয় নাই, সেগুলিই আবার নতুন সিনেমাতে ব্যবহার করি আমরা। কথায় বলে, কেউ নিজের সব অভিজ্ঞতা ভুলে যেতে পারলে সে আর কখনো বুড়ো হত না। তেমনি আমরাও নিজেদের পুরানো অভিজ্ঞতা ভুলে যেতে পারলে আমাদের সিনেমাগুলি একেবারে নিখুঁত না হলেও অন্তত ঝরঝরে হত। দুঃখের বিষয়, অভিজ্ঞ অভিনেতারা শক্তিমান হলেও তাদের মাঝে আর সতেজতা থাকে না। তাদের মাঝে সেই আদিম আবেগ ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন ব্যাপার,” আফসোস করলেন কিয়ারোস্তামি। কুরোসাওয়া সহমত জানালেন, তিনিও একই রকম পরিস্থিতিতে পড়েছেন বহুবার।

Akira-Kurowasa-on-the-set-of-Yojimbo,-1961

১৯৬১ সালের ছবি Yojimbo-এর সেটে পরিচালক কুরোসাওয়া।

“অভিনয়ে শুদ্ধতা আনার জন্য আমি তাই মঞ্চের মত লম্বা লম্বা টেক ব্যবহার করি। যদি খুব ছোট সিক্যুয়েন্সও হয়, তারপরও দেখা যায় আমি লং টেক নিচ্ছি। মুভিতে কাটিং এর কারণে ব্যাপারটা আরও কঠিন হয়ে যায়। কখনো কখনো দুইজন অভিনেতা একজন আরেকজনের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারেন না বলেও কিছু সমস্যা দেখা দেয়। ধরেন দুইজনের একজন খুব ভাল অভিনয় করছেন, এতে দেখা যায় অন্যজনের উপর এর খারাপ প্রভাব পড়তে থাকে; প্রচুর চেষ্টা করার পরও তিনি আর ভাল করতে পারেন না। আবার পরের জন যখন ভাল অভিনয় শুরু করেন, ততক্ষণে দেখা যায় প্রথম জন একেবারে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। সবচেয়ে বাজে ব্যাপারটা হল—দুইজন অভিনেতা যখন একসাথে কাজ করেন, তারা কিন্তু একজন আরেকজনের কোনো কথা শোনেন না। মানে একজন অভিনেতা সংলাপ বলার সময় আরেকজন তো আসলে মনে মনে নিজের সংলাপ বলার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ফলে তার চেহারায় সেই কথা শোনার কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখা যায় না। এই জন্য আমি একসাথে তিন-চারটা ক্যামেরা দিয়ে লং টেক নিই। এতে করে অভিনেতারা বুঝতে পারেন না, ঠিক কোন ক্যামেরায় তাদের চেহারার ক্লোজ-আপ ধারণ করা হচ্ছে। তাই তাদের খুঁতখুঁতে ভাবটা কেটে যায় আর ন্যাচারাল অভিব্যক্তি বেরিয়ে আসে,” বললেন কুরোসাওয়া।

কিয়ারোস্তামি বেশ অবাক হলেন। কারণ সবকিছু একটু বেশিই ন্যাচারাল বলে এর আগে তার ছবির অভিনয় নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে, “ক্রিটিকরা ভাবেন মঞ্চ আর চলচ্চিত্র একেবারেই পবিত্র কোনো জায়গা। এ সব জায়গায় সাধারণ কিছুই করা যাবে না। সবকিছু হতে হবে অতিরঞ্জিত। তারা তো আপনার ছবিকেও অতিরঞ্জিত বলে।”

বিস্মিত হওয়ার হাসি দিলেন কুরোসাওয়া, “হয়ত আমার অভিনেতাদের আচরণ আপনাদের দেশে অতিরঞ্জিত লাগে দেখতে। কিন্তু এইখানে ওইটাই ন্যাচারাল। সাংস্কৃতিক তফাতের সাথে অতিরঞ্জন গুলিয়ে ফেললে তো আর হবে না। আমি কিন্তু সত্যিই আপনার কাজ অনেক পছন্দ করি। আপনার কাজ করার ধরনের প্রতিও আমার শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। আপনি শিশুদের সাথে ঠিক কাজ করেন কীভাবে? ওরা তো আমার সিনেমায় ঠিক মানিয়ে নিতে পারে না, শুধু আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকে।”

“আপনি ‘কুরোসাওয়া’ বলেই হয়ত এমন হয়। যে সব শিশু আমার সাথে কাজ করে, তারা তো আমাকে ভাল করে চেনেই না। শুটিং এর সময় আমি এমন ভাব করে থাকি যাতে আমাকে দেখে মনে না হয় যে আমি মাতব্বর কেউ। তাদের অ্যাক্টিং কেমন হল সেই ব্যাপারে আমি সবসময় অন্যান্য ক্রু মেম্বারদের মতামত নিই। তবে সব শিশুর ব্যাপারে তো এক জিনিস খাটে না, তখন আবার অন্য ফন্দি আঁটতে হয়।”

“এই ধরনের সিনেমাগুলিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে সমর্থন করা উচিত। আমার ছেলে-মেয়ে আর নাতি-নাতনিরা কখনো আমেরিকান মুভি দেখে না। তারা নিজেদের মত করে সিনেমা বয়কট করে, তাই তাদের লিস্ট থেকে ভায়োলেন্ট সিনেমা পুরোপুরি বাদ পড়ে যায়। আশা করি এসব মানবতাবাদী ছবি সব রকম নোংরামির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারবে,” বললেন কুরোসাওয়া। তিনি আরও বললেন, “আমি জানি ভাল সিনেমা সবখানেই তৈরি হয়। কিন্তু ইউরোপ আর আমেরিকার সিনেমা শুধু পিছনের দিকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়া থেকে প্রচুর ভালো ভালো সিনেমা বের হয়ে আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলিতে জায়গা করে নিচ্ছে। গ্লোবাল স্ক্রিন তো শুধু একটা দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একটা চলচ্চিত্র তার দর্শকদের নিজ দেশ সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেয়। কোনো চলচ্চিত্র যদি একটা নির্দিষ্ট জাতীয় সংস্কৃতি অনুসারে বানানো হয়, তাহলে বিদেশেও তা সমাদৃত হবে। আমি আর আমার নাতি-নাতনিরা ইরানের লোকজন ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়েছি তো আপনার সিনেমা দেখেই।”

“আপনি বলেছেন, সিনেমা বানাতে হবে হৃদয় দিয়ে এবং দেখতেও হবে হৃদয় দিয়েই,” বললেন কিয়ারোস্তামি।

where 3

আব্বাস কিয়ারোস্তামির ছবি ‘হোয়্যার ইজ দ্যা ফ্রেন্ডস হোম?’ (১৯৮৭) এর দৃশ্য।

কুরোসাওয়া স্বীকার করলেন, “হ্যাঁ। কিন্তু বেশিরভাগ জাপানি লোকজন শুধু মাথা দিয়ে মুভি দেখে আর ভুল খোঁজার চেষ্টা করে। অনেক ক্রিটিক আমার মুভি দেখে এমন সব প্রশ্ন করেন যেগুলির কোনো উত্তর আমার কাছে থাকে না। কারণ, মুভিটা বানানোর সময় ওই বিষয় আমার মাথায়ই আসে নাই। সিনেমা অনুভব করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের সিনেমাগুলিতে অনুভূতির পরিমাণ সামান্য।”

কিয়ারোস্তামি মতে চলচ্চিত্র নির্মাতারা দর্শকদের পছন্দকে ভুল পথে নিয়ে গেছেন। লেজার ডিস্কে করে পুরানো সিনেমা সংগ্রহ করা হলে দর্শকদের স্বাস্থ্যকর সিনেমা দেখানোর ভাল একটা উপায় তৈরি হবে বলে ধারণা করেন কুরোসাওয়া।

কুরোসাওয়া এরপর তার ‘মাদাদায়ো’ আর কিয়ারোস্তামি’র ‘হোয়্যার ইজ দ্যা ফ্রেন্ডস হোম?’ এর শুরুর দৃশ্যের মিল নিয়ে আলাপ করলেন।

“যা বোঝা যাচ্ছে তাতে অনেক জিনিসেই আমাদের মিল আছে,”—কুরোসাওয়ার পর্যবেক্ষণ।

madadayo-7

কুরোসাওয়ার ছবি ‘মাদাদায়ো’ (১৯৯৩) এর দৃশ্য।

কিয়ারোস্তামি আবারও কুরোসাওয়ার খ্যাতি নিয়ে আড়ম্বর করলেন কিছুক্ষণ। বিনয়ী কুরোসাওয়া ‘দোদেসকাদেন’ সিনেমার শুটিংয়ের কথা মনে করলেন—কীভাবে তাকে বিভিন্ন জিনিসপত্রের ছায়া পর্যন্ত আঁকিয়ে নিতে হয়েছিল। কারণ রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের জন্য অপেক্ষা করার মত বাজেট তার ছিল না।

“শুটিং শেষ হওয়ার পরও আমরা দুজনেই কোনো লোকেশনের কথা সহজে ভুলতে পারি না,” বললেন কুরোসাওয়া, “শুটিং শেষ হওয়ার পর সেই ছবির নায়ককে বিদায় জানাতেও প্রচণ্ড দুঃখ হয় আমাদের।”

দুই পরিচালকই একমত হলেন যে, যারা শুধু ভুল খুঁজে বের করার জন্য মুভি দেখে, তারা উপভোগের আনন্দ পায় না কখনোই।

“আমার পেইন্টিং টিচার সবসময় বলতেন, পৃথিবীটা দেখতে হয় অর্ধেক চোখ বন্ধ রেখে। সবকিছু দেখতে হয় একসাথে। কেবল এভাবে দেখলেই সত্যটা দেখা সম্ভব।”

মাঝখানে দুইবার করে চা এনে দিলেন কুরোসাওয়ার মেয়ে। এবার বিদায় নিতে হবে। জাপানি কিংবদন্তীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত কিয়ারোস্তামি বললেন, “আপনাকে আর ক্লান্ত করতে চাই না।”

আমাদের হাতে সময় থাকলে সবাইকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ানোর ইচ্ছা ছিল কুরোসাওয়ার। আশা করি তার সাথে খুব শীঘ্রই আবার দেখা হবে আমাদের।

পড়ুন: আব্বাস কিয়ারোস্তামির সাক্ষাৎকার (২০০০)

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)