—আহমদ ছফা’র জীবনের আরো নানান গল্প আমরা শুনি রাগীব আহসানের মুখে।—

বেশ কিছুদিন ধরে নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকাতে একটি আড্ডা গড়ে উঠেছে। এর মূল আয়োজক ছড়াকার শাহ আলম দুলাল, তিনিই প্রতি রোববার সকাল থেকে ডাকাডাকি শুরু করেন, সন্ধ্যায় আমরা গিয়ে হাজির হই।

সাহিত্যের গুরুগম্ভীর আলোচনা শোনার ভয়ে কেউ যেন পালিয়ে না যায় এই আশঙ্কা থেকেই হয়ত দুলাল ভাই বলতে থাকেন, আসেন, জাস্ট আড্ডা দিব, সাহিত্য-টাহিত্য কিছু না, গল্প-গুজব করব আর চা-সিঙ্গারা খাবো।

কিন্তু আমাদের চায়ের কাপগুলো অতি অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে যায় মকবুল ফিদা হুসেইনের শিল্পকর্ম, আমাদের সিঙ্গারাগুলো হয়ে যায় শামসুর রাহমানের কবিতার শব্দ।

জানুয়ারির ২১ তারিখে বসেছিলাম ঘরোয়া রেস্টুরেন্টে। এবার আড্ডায় এসেছিলেন শিল্পী রাগীব আহসান, কবি মাহবুব হাসান, ছড়াকার শাহ আলম দুলাল, সাংবাদিক লুৎফা শাহানা এবং কণ্ঠশিল্পী নাসিমা আখতার। আর আমি তো ছিলামই।

কথা হচ্ছিল, লেখকের আত্মমর্যাদা নিয়ে। বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে আত্মমর্যাদা গড়ে ওঠে খুব কমই, নানান কারণে। এর বড় কারণ প্রাপ্তির প্রত্যাশা, হারানোর ভয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুভয়ও।

মৃত্যুভয়ে কেউ যদি তার আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেন, আমরা হয়ত তাকে কাপুরুষ বলতে পারি, কিন্তু সেইরকম বীরপুরুষই বা ক’জন আছে আমাদের সমাজে।

এই অজুহাত মেনে নিতে আমার আপত্তি নেই। জানই যদি না বাঁচে লিখবো কী করে। কিন্তু প্রাপ্তির প্রলোভনে যখন সত্য উচ্চারণ থেকে বড় বড় লেখক/বুদ্ধিজীবী বিরত থাকেন বা মিথ্যাচারে লিপ্ত হন তখন আমরা কষ্ট পাই। আমাদের আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না।

বাঁ থেকে রাগীব আহসান, শাহ আলম দুলাল, কাজী জহিরুল ইসলাম, মাহবুব হাসান ও লুৎফা শাহানা

এ প্রসঙ্গে আমি সব সময় নীরদ সি চৌধুরীর একটি গল্প বলি। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর প্রচুর হিন্দু শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যায়। সেই সময়ে নীরদ সি চৌধুরীর লেখালেখির ওপর ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু ভারতের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী টিটি কৃষ্ণমাচারি তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাকে একটি কাজ দিতে চান। কাজটি ছিল শরণার্থী শিবির ঘুরে ঘুরে তাদের দুর্দশার কথা লিখে ইংরেজিতে একটি বুকলেট তৈরি করা। যেটি ভারত সরকার ছাপিয়ে তাদের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে পৌঁছে দেবে পশ্চিমা সরকারগুলোর কাছে। এতে করে ত্রাণ সাহায্য পেতে সুবিধা হবে আবার পাকিস্তানের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হবে।

নীরদ সি চৌধুরীর কাছে প্রস্তাবটি আসে তার বন্ধু খুশবন্ত সিংয়ের মাধ্যমে। তিনি খুশবন্ত সিংকে সাফ জানিয়ে দেন, ভারত সরকার আমার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে কিন্তু আমি তো ভারত সরকারের ওপর থেকে আমার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেই নি।

অথচ তখন তিনি চরম অর্থকষ্টে ছিলেন। এইরকম দৃঢ় মনোবলের লেখক কই আমাদের এখানে?

“ছিল, আমাদের এখানেও ছিল”—বলতে শুরু করেন রাগীব আহসান। লেখক আহমদ ছফা ছিলেন সেই ইস্পাত কঠিন মনোবলের লেখক। কতবার কত লোভনীয় অফার তিনি ফিরিয়ে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরির অফার পরোক্ষভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাকে ইন্টারভিউ বোর্ডে ডাকা হয়েছিল। তিনি ইন্টারভিউয়ারদের তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। একবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে চায়ের দাওয়াত দিলে তিনি বলেন, আপনি যদি নিজের হাতে চা বানিয়ে খাওয়ান তাহলে যাব।

আহমদ ছফা’র জীবনের আরো নানান গল্প আমরা শুনি রাগীব আহসানের মুখে। আহমদ ছফার বেশ কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলেন রাগীব আহসান। তার মধ্যে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’, গ্যেটের কাব্যনাট্যের অনুবাদ ‘ফাউস্ট’, ‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’ এই তিনটি বইয়ের নাম তিনি মনে করতে পারলেন।

‘ফাউস্ট’ এর প্রচ্ছদ করা নিয়ে একটি মজার ঘটনা আছে। তিনি রেখায়নে এসে বলেন, রগিব প্রচ্ছদ কই? টেবিলের ওপর ড্রয়িং দেখিয়ে রাগীব আহসান বলেন, ওই তো ছফা ভাই। তিনি সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেন, কিচ্ছু হয় নাই। এভাবে ১৩টি প্রচ্ছদ বাতিল করে দিয়ে টেবিলের ওপর থেকে রাগীব আহসানের আঁকা গ্যেটের প্রতিকৃতি হাতে নিয়ে বলেন, এখানে নামটা লিখে দেন। এটাই প্রচ্ছদ।

এভাবে ফাউস্টের প্রচ্ছদ তৈরি হয়। পরে অবশ্য একজন বড় মাপের শিল্পী মুক্তধারায় বসে রাগীব আহসানের প্রচ্ছদ বাদ দিয়ে ফাউস্টের প্রচ্ছদ করতে চাইলে তিনি মুক্তধারা থেকে পাণ্ডুলিপি ফেরত নিতে চেয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে শুরু করে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে তিনি ‘ফাউস্ট’ অনুবাদ করে ১৯৮৩-তে শেষ করেন। পরে ১৯৮৬ সালে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

আহমদ ছফা লর্ড ম্যাকিন্সের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা করেন। এই অনুবাদ সাহিত্যটি বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক পণ্ডিত আব্দুর রাজ্জাকের মতে আহমদ ছফার অনুবাদে গ্যেটে এবং আহমদ ছফা দুজনকেই পাওয়া যায়। আহমদ ছফা ‘ফাউস্ট’ এর দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদে আর হাত দেন নি। তিনি বলেন, এটি একটি অসম্ভব ব্যাপার।

***

অনেকেই একথা জানেন যে আহমদ ছফা কোনো বই পড়তে শুরু করলে তা শেষ না করে উঠতেন না। অনেক সময় দেখা গেছে ফুটপাতের বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো একটি বই পড়ে শেষ করে ফেলেছেন।

১৯৮৫/৮৬ সালের একটি ঘটনা বলেন রাগীব আহসান।

“একদিন আহমদ ছফা আমাকে ডাকলেন, আমি তার বাসায় গেলাম। তার একটি হারমোনিয়াম ছিল। প্রায়শই এটা বাজিয়ে বেসুরো গলায় গান করতেন। আমি সেদিন বাসায় গিয়ে দেখি, খুব পুরনো একটি পিয়ানো এসেছে কোত্থেকে যেন। প্যাডেলে পাম্প করে এটি বাজাতে হয়। আমাকে তিনি বললেন, রগিব (আমাকে তিনি কখনোই রাগীব বলতেন না), এই হারমোনিয়ামটা আপনি নিয়ে যান। এটা আর আমি বাজাবো না।

এরপর হারমোনিয়ামসহ আমাকে রিকশায় তুলে দেন। আমি রিকশায় উঠে বসেছি, ঠিক সেই মুহূর্তে বলেন, হারমোনিয়ামটা কেন দিয়ে দিলাম জানেন? এটা আর বাজাবো না। এখন থেকে পিয়ানোটা বাজাবো। এটা হলো আহমদ ছফার হারমোনিয়াম। আর ওই পিয়ানোটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।

আমি আজও জানি না, সত্যিই ওটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিয়ানো ছিল, না তিনি ঠাট্টা করেছিলেন।

দার্শনিক, সাহিত্যিক, সমাজবিজ্ঞানী আহমদ ছফা জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে পাঠদান করেন বেশ ক’বছর।

***

১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে আমার সম্পাদনায় বের হয় ‘কাজীর কাগজ’। সেই সংখ্যাটি আমি করেছিলাম লিটল ম্যাগ সম্পাদক আন্‌ওয়ার আহমদের ওপর। শিরোনাম ছিল ‘একজন পাগলের কথা’। পত্রিকাটির মোড়ক উন্মোচন করেন কবি শামসুর রাহমান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে।

ছফা ভাইয়ের সাথে শামসুর রাহমানের তখন সম্পর্ক ভালো ছিল না। আন্ও‌য়ার ভাই তাকে দাওয়াত করেছিলেন। তিনি হাঁটতে হাঁটতে অডিটোরিয়ামের দরোজায় এসে দেখেন ভেতরে শামসুর রাহমান। দেখেই অ্যাবাউট টার্ন করে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করেন। আন্‌ওয়ার ভাই আর আমি পেছন পেছন অনেকখানি পথ গিয়ে তাকে অনুরোধ করলাম। তিনি আর ফিরে এলেন না।

হলিসউড, নিউ ইয়র্ক, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮


পুনশ্চ

লেখাটি ফেইসবুকে পোস্ট করার সাথে সাথে অনেকেই আহমদ ছফার সাথে তাদের স্মৃতিচারণ করেন। কেউ কেউ মন্তব্যের ঘরে, কেউ কেউ ইনবক্সে। এর মধ্য থেকে সুবিমল চক্রবর্তী এবং ড. নূরুন নবীর স্মৃতিচারণ এখানে তুলে দিলাম—

১.

সুবিমল চক্রবর্তী

ছফা ভাই আর আমি কিছুদিন আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে থাকতাম। ক্যান্টিনে দেখা হত। তার সাথে দেখা করতে আসতেন শামীম শিকদার (সিরাজ শিকদারের ছোট বোন)। আরো আসতেন অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। শামীম শিকদারকে তিনি কালী বলে পরিচয় দিতেন।

দীর্ঘদিন পরে আবার আমেরিকায় দেখা হয়। আমরা, ড. সৌম্য দাশগুপ্তর নেতৃত্বে, অবাক-এর ব্যানারে একবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্মেলন করেছিলাম। সেখানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বাদল সরকার, সুধীর চক্রবর্তী, প্রশান্ত দাশগুপ্ত, আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী,  আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সমরেশ বসু এসেছিলেন। এবং এসেছিলেন আহমদ ছফা।

সুবিমল চক্রবর্তী

সবাই চলে গেলেন। কবি শিবলী সাদিক ছফা ভাইকে রেখে দিলেন নিজের অ্যাপার্টমেন্টে কয়েক মাসের জন্য। নিয়মিত দেখা হত। রাজনীতি, সাহিত্য সবকিছু নিয়েই আলাপ হত। আলাপ হত তার সময় ও জীবন নিয়ে। ভাব বিনিময় হত। আমার অ্যাপার্টমেন্টেও এসেছেন। এখান থেকে দেশে ফিরে যাবার পর বেশি দিন বাঁচেন নি।

শিবলীর বাড়িতে যতদিন ছিলেন নিয়মিত কোরান পড়তেন। শিবলী হেসে হেসে আমাকে বলত, ছফা ভাইয়ের বিয়ারও চলে নিয়মিত।

আশ্চর্য মানুষ ছিলেন উনি। আমাকে বলেছিলেন,  ‘ঘর করলাম না রে আমি, সংসার করলাম না’ গানটি উনি লিখেছিলেন।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দুর্বা ঘাসের শিশির নোলক’ এই চমৎকার উপমাটি কী করে তার মাথায় এল! সবিনয়ে হেসেছিলেন। তার একটি কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে। স্মৃতিকে একদিন বলেছিলেন,  সুবিমলের মনে কষ্ট দিলে ভগবানও কষ্ট পাবেন।

লেখাটা লিখতে লিখতে চোখ দুটো কেমন ঝাপসা হয়ে এল।

২.

ড. নূরুন নবী

ঢাকা শহরে আমার কোনো থাকার জায়গা ছিল না। ছাত্রজীবনে ফজলুল হক হল। শিক্ষক জীবনে আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস। এখানেই পরিচয় হল এক অনন্য ব্যক্তির সাথে। তিনি আহমদ ছফা।

তখন তিনি বাংলা একাডেমীতে গবেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ডায়নিং হলে একাকী খাচ্ছিলাম। একটু পরে একজন ক্ষীণকায় ভদ্রলোক খাবারের ট্রে হাতে আমার টেবিলে এসে বসার অনুমতি চাইল। নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি নুরুন নবী। প্রাণরসায়ন বিভাগের লেকচারার। তিনি বললেন, আমি আহমদ ছফা।

এরপর থেকে প্রায়ই একসাথে ডিনার টেবিলে গল্প করতাম। ছফা ভাই একজন অসাধারণ ব্যক্তি। মুখের অবয়বের দিকে তাকালে মুগ্ধ হতে হয়। বিশেষ করে তার চোখ দুটো। কালো শুকনো মুখে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে যেন আলো ছড়াতো। সদা হাস্যমুখে মৃদুস্বরে কথা বলতেন। কিন্তু তির্যক মন্তব্য করতে গলা একটুও কাঁপত না। হাসি একটুও মলিন হত না।

ড. নূরুন নবী

ছফা ভাইয়ের সাথে গল্প করতে করতে আমি তার আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্তের লোক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর আগ্রহ। তরুণ লেখকদের নিয়ে অনেক চিন্তা করেন। তরুণরা যেন প্রগতিশীল লেখক হন, তার জন্য উৎসাহ দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন লেখক শিবির, ১৯৭০ সালে।

প্রতিদিন ডিনারে অপেক্ষা করতাম ছফা ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিতে। কিন্তু তাকে মাঝে মাঝে পাওয়া যেন না। মাঝে মাঝে আমাদের তুমুল বিতর্ক হত। কিন্তু তর্ক শেষে তার দার্শনিক ও জ্ঞানগর্ভ মতামতের প্রতি আমি সব সময় শ্রদ্ধাশীল ছিলাম।

একদিন ডিনার খাচ্ছিলাম। ছফা ভাই যোগ দিলেন। খেতে খেতে বললেন, নবী ভাই, চলুন, আমরা একটা কাজ করি। আমাদের উভয়ের খুব প্রিয় ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদের জন্য একটু ক্যাম্পেইন করি।

কীসের ক্যাম্পেইন, কী করতে হবে খোলাসা করে বলার জন্য অনুরোধ করি।

তিনি বলেন, হুমায়ূন একটি উপন্যাস লিখেছেন। নাম ‘নন্দিত নরকে’। অসাধারণ উপন্যাস। চারদিকে প্রশংসা। অধ্যাপক আহমদ শরীফ খুব প্রশংসা করে হুমায়ূনের এই উপন্যাসের ওপর মন্তব্য করেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি পড়েছেন? আমি অপ্রস্তুত হয়ে জানালাম, না এখনও পড়া হয় নাই।

আমি ছফা ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, হুমায়ূনের জন্য আমরা কী করতে পারি? তিনি জানালেন, হুমায়ূনের বইটি তিনি লেখক শিবির এবং বাংলা একাডেমীতে পুরস্কারের জন্যে জমা দিয়েছেন। কিন্তু এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে লবিং না করলে পুরস্কারের কোনো আশা নেই। তিনি আরও যোগ করলেন, জানেন তো শিশু না কাঁদলে মা দুধ খাওয়ায় না। চলুন, আমরা দুজন মিলে ঢাকায় অবস্থিত এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বাসায় যাই এবং হুমায়ূনের পক্ষে পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করি।

হুমায়ূনের জন্য আমার ভালোবাসা রয়েছে। আমি ওর শুভাকাঙ্ক্ষী। তবুও বললাম, ছফা ভাই এ কাজের জন্য আপনি একাই যথেষ্ট। আপনি একাধারে লেখক এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক। তদুপরি, বাংলাদেশ লেখক শিবিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আপনার মতামতের ওপর এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিবে। আমি সাহিত্যের ছাত্র নই, বিজ্ঞানের শিক্ষক।

ছফা ভাই বললেন, না আপনাকেও কাজে লাগবে। আপনি একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার ওপরে মুক্তিযোদ্ধা বাঘা সিদ্দিকীর সহযোদ্ধা। আপনাকে সবাই চিনে। কিছুটা হলেও প্রভাব পড়বে।

অকাট্য যুক্তি। তার ওপর হুমায়ূন আমার বন্ধু। রাজি হয়ে গেলাম।

ছফা ভাই আর আমি প্রতিদিন সন্ধ্যার পর রিকশায় চেপে ঐ দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বাসায় যেতাম এবং হুমাহূন আহমেদের পুরস্কার পেতে যুক্তি তুলে ধরতাম।

ছফা ভাই মূলত কথা বলতেন। আমি ছিলাম একটি শো-পিস।

আড্ডা ২ — ফজল শাহাবুদ্দীন