page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আমরা কেন অলস? ‘কাউচ পটেটো জিন’-এর কারণে আমরা অলস!

শর্টকাট কে না পছন্দ করে? কোনো কাজ অল্প পরিশ্রমে হয়ে গেলে বাড়তি পরিশ্রম কে করতে চায়?

যারা নিজেদেরকে খুব কর্মঠ ভেবে থাকেন তাদের জীবনেও রয়েছে কিছু অলস মুহূর্ত। কখনও ব্যায়াম করতে আলসেমি লাগে, কখনও বা কোনো কাজ ডেডলাইনের আগেই শেষ করে ফেলতে আলসেমি লাগে। ফলে সেদিক থেকে বলা যায় যে আমরা সবাই অলস।

কিন্তু সবাই কেন অলস হয়?

আমাদের আলসেমির জন্য দায়ী আমাদের মস্তিষ্ক এবং জিন

কাউচ পটেটো জিনের (Couch Potato Gene) কারণেই আমরা অলস। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ খুব আগ্রহ নিয়ে জিম-এ যায় আর নিয়মিত ব্যায়াম করে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ আলসেমি করে কুমড়োপটাশ হয়ে বাসায় বসে থাকে। কেন এমনটা হয়?

কারণটা বায়োলজিকাল।

২০১০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক শ্রমের মোটিভেশন নিয়ন্ত্রণ করে এমন জিনগুলি রূপান্তরের মাধ্যমে এক ধরনের অলস জিনে পরিণত হয়। গবেষকরা এই ধরণের অলস জিনের নাম দিয়েছেন ‘কাউচ পটেটো জিন’। এই কাউচ পটেটো জিনের কারণেই মানুষ অলস হয়ে থাকে।

জিনের এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক জিনের ডোপামাইন রিসেপ্টরগুলি সংকুচিত হয়ে আসে বা এমনকি পুরোপুরি হারিয়ে যায়। এই ডোপামাইন রিসেপ্টরগুলিই আমাদের মোটিভেশন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই কারণে কাউচ পটেটো জিনঅলা মানুষগুলি শারীরিক শ্রমে কোনো রকম আনন্দ খুঁজে পায় না। যেখানে, তাদের স্বাভাবিক জিনে ডোপামাইন রিসেপ্টরগুলি ঠিকঠাক থাকে বলে ফিটনেস ইনস্ট্রাকটর বা খেলোয়াড়রা শারীরিক শ্রমে মোটিভেটেড থাকে।

কাউচ পটেটো জিনগুলি বংশপরম্পরায় সংক্রমিত হয়। অর্থাৎ আপনি যদি শারীরিক শ্রমে আনন্দ খুঁজে পাওয়াদের একজন না হন, আপনার সন্তানের মধ্যেও সেই প্রবণতা থাকাটা খুব স্বাভাবিক।

মস্তিষ্ক শক্তি বাঁচাতে চায় বলেই আমরা অলস হই

আলসেমির ব্যাপারে আমাদের আরেক বায়োলজিকাল সীমাবদ্ধতা হলো, আমাদের মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি। আমাদের মস্তিষ্ক বেশিরভাগ সময় অলস সময় কাটাতে চায়।

ওজনের দিক থেকে, মানবদেহের মোট ওজনের মাত্র ২% ভাগ হল মস্তিষ্ক। কিন্তু অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় আমাদের দেহের ২০% শক্তি মস্তিষ্ক একাই খরচ করে। মস্তিষ্ক চায় শারীরিকভাবে আমরা যেন ক্লান্ত হয়ে না পড়ি। এর ফলে মস্তিষ্ক প্রায় সময়ই কোনো কাজ না করে চুপচাপ বসে থাকে। এটিকে তুলনা করা চলে ফোন বা কম্পিউটারের পাওয়ার সেভিং মোডে চলে যাওয়ার সাথে।

মস্তিষ্কের, শক্তি বাঁচানোর এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কারণেই আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে কম আগ্রহ পাই। এই কারণেই বেশির ভাগ মানুষ গাণিতিক সমস্যা বা গভীর চিন্তা করতে হয় এমন সব সমস্যার মুখোমুখি হলে বিপদে পড়ে যায়।

কিন্তু আলসেমি আসলে অস্বাস্থ্যকর মানসিকতা ও আচরণের লক্ষণ

আলসেমির অন্য নাম প্রোক্রেস্টিনেশন। যে কাজ এখনই সেরে ফেলার কথা, আলসেমি করে আমরা তা ফেলে রাখি। আর এর ক্ষতিও গুণতে হয় আমাদেরকেই। কিন্তু বায়োলজিকাল সীমাবদ্ধতাগুলিই এর একমাত্র কারণ নয়। সঠিক মানসিকতা আর অভ্যাসের অভাবেই এমনটা হয়ে থাকে।

কখনও কখনও আমরা হেরে যাওয়ার ভয়ে আক্রান্ত হই। ফলে আমরা ভাবি, তার চেয়ে বরং কিছু না করাই ভালো। কখনও আমরা কোনো কাজের জটিলতা ও দুর্বোধ্যতায় খেই হারিয়ে ফেলি। কখনও আমরা মনোযোগ হারিয়ে ফেলি। কখনও আমরা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক না করেই মাঠে নেমে যাই এবং মোটিভেশন খুঁজে পাই না। এগুলি আমাদের সবার ক্ষেত্রেই ঘটে।

আলসেমি আপনাকে দায়িত্বহীন করে তোলে

আত্মোন্নয়ন আর সাফল্যের পথে শক্ত এক বাধা এই আলসেমি। আলসেমি আসলে একটা অজুহাত। এই অজুহাত দিয়ে আপনি দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বেড়ান এবং স্বপ্ন ভুলে থাকেন। আলসেমির ফলে ক্ষণিকের জন্য নিজেকে খুব স্বাধীন আর সুখী মনে হয়। কিন্তু দিনশেষে বেঁচে থাকার জন্য দরকারি জাগতিক সমস্ত আয়োজন আপনাকেই করতে হবে। দিনশেষে বিলগুলি আপনাকেই পরিশোধ করতে হবে। এই কারণে আলসেমি দূর করতে মাঠে নেমে পড়তে হবে আজই।

নিচে খুব সহজে আলসেমি দূর করার সহজ কিছু উপায় দেয়া হলো:

সবকিছুই আগে থেকে প্ল্যান করে রাখুন যেহেতু আপনার অলস মস্তিষ্ক চিন্তা করতে চায় না

আমাদের মস্তিষ্ক যে স্বভাবতই অলস, তা পাল্টানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। ফলে আমরা যা করতে পারি তা হলো সবকিছু আগে থেকে প্ল্যান করে রাখা।

কিন্তু কীভাবে? টু-ডু লিস্ট বা কাজের তালিকা? বেশিরভাগ মানুষই তা করে। কিন্তু লিস্ট খুব একটা কাজের জিনিস না।

যা করতে হবে তা হচ্ছে, প্রত্যেক কাজের জন্য স্পষ্ট করে সময়সীমা ঠিক করে নেয়া। এর ফলে প্রোক্রেস্টিনেশন না করে আপনি সেই কাজটি ওই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই শেষ করার চেষ্টা করবেন।

যেমন, আপনাকে প্রতি সপ্তাহে বাজার করতে হয়। এই কাজের একটা সময় নির্দিষ্ট করে দিন। যেমন, শনিবার, দুপুর ১টা-বিকেল ৩টা। ফলে প্রতি সপ্তাহে এই নির্দিষ্ট সময়সীমাটি আপনি বাজার করার জন্য বরাদ্দ করলেন।

অবসর সময়ে কী করবেন সেটাও ঠিক করে রাখতে পারেন।

এক কথায়, সময়গুলি আগে থেকেই প্ল্যান করা থাকলে ঠিক ওই সময়টিতে আপনাকে আর ভাবতে হবে না।

কোনো কাজে নামার আগে লক্ষ্য ঠিক করুন

কোনো কাজ ঠিকঠাক শেষ করতে না পারার অন্যতম কারণ লক্ষ্য ঠিক না করা।

এডুইন লকড প্রস্তাবিত ‘দ্যা গোল সেটিং থিওরি অফ মোটিভেশন’ অনুসারে কোনো কাজ ঠিকঠাক শেষ করার সাথে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা সরাসরি সম্পর্কিত। তার মতে, সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য ঠিক করাটা খুব জরুরি। স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হলে সেই লক্ষ্য অর্জনে এগোনো সহজ হয়। আর লক্ষ্যটা চ্যালেঞ্জিং হলে আমরা তা অর্জনের মোটিভেশন খুঁজে পাই।

যেমন, “আমি একটি বই লিখতে চাই” স্পষ্ট লক্ষ্য নয়। তারচেয়ে স্পষ্টতর লক্ষ্য হবে যদি বলা হয়—

“আমি আগামী এক বছরের মধ্যে ১,০০,০০০ শব্দের একটি উপন্যাস লিখতে চাই।” আর যদি এই লক্ষ্য খুব সহজেই অর্জন করে ফেলা যায় তাহলে আরো লিখতে পারেন বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে লেখা শুরু করতে পারেন। এক কথায়, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিন নিজেকে।

প্রত্যেক কাজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিন

যখন কোনো কাজ অনেক কঠিন আর বড় মনে হয় তখন আমরা বুঝতে পারি না কীভাবে শুরু করব আর কীভাবেই বা শেষ করব। আমরা তখন কাজটাকে ফেলে রেখে দেই ডেডলাইনের একদম শেষ মুহূর্তগুলি চলে না আসা পর্যন্ত।

প্রত্যেক কাজকে চাইলেই ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ফেলা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে কোনো আর্টিকেল লেখার কথা। পুরো কাজটিকে ছোট ছোট কয়েকটা কাজে ভাগ করে ফেলা সম্ভব। যেমন, আইডিয়ার জন্য রিসার্চ করা, আউটলাইন করা, মূল রচনাটি লিখে ফেলা, প্রুফ দেখা ও সম্পাদনা করা ইত্যাদি।

ধাপে ধাপে ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে এগোলে কাজটাকে আর বড় মনে হয় না। তাছাড়া, যখন ছোট ছোট অংশ শেষ হয়, আপনার ভেতরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। এর ফলে আপনি পরবর্তী অংশটুকু করে ফেলার ব্যাপারেও মোটিভেটেড হয়ে ওঠেন।

পারফেকশনিজমের ফাঁদে পড়বেন না

পারফেকশনিজম একটা অদৃশ্য ফাঁদ। কোনো কাজ নিখুঁতভাবে করতে চাইলে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সময় দেয়া লাগবে। যে কাজ একদিনে করে ফেলা যেত তা শেষ করতে প্রায় সপ্তাহখানেক লেগে যাবে।

পারফেকশন কে না চায়। তাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু তা অর্জনে একটু চালাকি করতে হবে নিজের সাথে।

আরো পড়ুন: কীভাবে আপনি নিজেকে ফেসবুক অ্যাডিকশান থেকে মুক্ত করবেন

আগে কাজটা শেষ করে ফেলুন। তারপর ছোটখাট ভুলভ্রান্তি ঠিক করার মাধ্যমে পারফেকশন আনুন। পুরো কাজটা শেষ হলে আপনি সম্পন্ন কাজটির সম্পূর্ণ একটি ধারণা পাবেন। ফলে তখন পারফেকশনের জন্য ফাইনটিউন করা সহজ হবে। কিন্তু শুরু থেকেই খুঁটিনাটি ভুলভ্রান্তি নিয়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করবেন না।

কোনো কাজে বেশি সময় ব্যয় করলেই যে সেই কাজটি সবসময় ভাল হবে এমন কোনো কথা নেই। ফলে আলেসেমি দূর করার জন্য পারফেকশনের কথা আপাতত সরিয়ে রেখে আগে কাজটা শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক