আমি তো একধরনের গল্প লিখি, যেটা আমারদের কথ্য ঐতিহ্যে স্থাপিত। গল্প বলার ঐতিহ্য। লেখার না। ভাষার কারুকাজ, বা ওই গভীরে চলে যাওয়া, ভাষার… ওটা না।

সাদ রহমান: আপনের বইমেলাতে যেই বইগুলা আসছে, ওগুলার নামগুলা একটু জানতে চাই।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: এবার আমার তিনটা বই আসছে। তবে একেবারে নতুন বলা যাবে না। দুটো হচ্ছে গল্প সংকলন, পুরোনো গল্পের সংকলন। একটা হচ্ছে সেরা দশ গল্প। এটি, অন্য প্রকাশ থেকে একটি সিরিজ বেরিয়েছে, সেরা দশ গল্পের।দশজন গল্পকারের। তারমধ্যে আমার একটা। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে ভুলে থাকা গল্প। সেটা পাঠক সমাবেশ বের করেছে।

সাদ: ভুলে থাকা গল্প, এটার ভিতর কি কয়েকটা গল্প?

মনজুরুল : আমার পুরোনো গল্প। ভুলে থাকা গল্প আমার বারোটা গল্প বোধহয় থাকবে, সংকলন। যেটা পাঠক সমাবেশ বের করেছে। নিয়েছি সেই বই থেকে,  যেগুলি পাঠক সমাবেশ আগে আমার প্রকাশ করেছে।

সাদ: এই পিরিয়ডটা কেমন হবে? এই বইগুলো প্রকাশের।

boimela-logo-2016

মনজুরুল : এটা অনেক, অনেক। নব্বুই সাল থেকে ধরুন, কুড়ি বছরে পুরোনো গল্প। কুড়ি-পনেরো বছরের পুরোনো গল্প। নাম দিয়েছি, ‘ভুলে থাকা গল্প’। মানুষ ভুলে গেছে। আর তৃতীয় একটা হচ্ছে ‘লেখাজোখার কারখানাতে’। এটা হচ্ছে ওই  ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামে একটা কলাম লিখতাম, ২০০৪ সাল পর্যন্ত চলেছে, ১৯৮২ সাল থেকে। সেখান থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের ছাব্বিশটি প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য প্রধানত, বিষয়বস্তু, তার একটা সংকলন। লেখাজোখার কারখানাতে। এই শিরোনামটা নিয়েছি রবীন্দ্রনাথ থেকে। আর এটি প্রকাশ করেছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স। এই হলো মোটামুটি এই বছর আমার বই।

সাদ: ভুলে থাকা গল্পগুলা, যে বারোটা গল্পের কথা বললেন, এগুলার ভিতরে ভ্যারিয়েশন কী ধরনের?

lekhajokharমনজুরুল : বৈচিত্র আছে। আমি তো একধরনের গল্প লিখি, যেটা আমারদের কথ্য ঐতিহ্যে স্থাপিত। গল্প বলার ঐতিহ্য। লেখার না। ভাষার কারুকাজ, বা ওই গভীরে চলে যাওয়া, ভাষার… ওটা না। যেমন গ্রামের মানুষ সহজে গল্প বলে সেই ধারাটা আমি রেখেছি। পাশাপাশি একটু যাদুর ছোঁয়া দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমাদের ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির মতো। বা আমাদের রাজপুত্র চলে যাচ্ছেন আকাশে একটা ঘোড়া চড়িয়ে। এখানে তো আসলে, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একেবারে ভুল। কিন্তু কল্পনার দৃষ্টিতে অত্যন্ত সহজ।এই বিষয়টি আমি আমার গল্পে রেখেছি। অনেকে যাদুবাস্তবতা বলেছেন। হয়তো অন্য নামেও ডাকা যায়। কিন্তু আমি যাদু বাস্তবতা বলতে আপত্তি নেই। কারণ যাদুবাস্তবতা এই দক্ষিণ আমেরিকার সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট না। এটি আমাদের সাহিত্যেও, বিশেষ করে আমাদের গ্রামীণ যে সাহিত্য, কথ্য সাহিত্যের যেই ঐতিহ্য সেখানে বহুদিন থেকে, তো সেটি আমি আনার চেষ্টা করেছি। বিষয়বস্তু আমার ওই নাগরিক জীবন। গ্রামের জীবন। মানুষের ভিতরে দ্বন্দ্ব। মানুষের সহিংসতা, ভালোবাসা…।

সাদ: এই যে ভাষার সৌন্দর্য থেকে ঐতিহ্যের গভীরতাকে যে বেশি মূল্যায়ন করা, এই ক্ষেত্রে আর কে কে অবদান রাখছে বিশেষভাবে এরকম ভাবে, মনে করতে পারেন?

মনজুরুল : প্রচুর, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যারা লিখছেন, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শহীদুল জহির, মঈনুল আহসান সাবের, আবার এখন তরুণ যারা লিখছেন, শাহীন আখতার বলুন, মনিরা কায়েস, অসংখ্য। আমি তো মনে করি আমাদের কথাসাহিত্য খুব সমৃদ্ধ। আমি কবিতা নিয়ে খুব একটা মন্তব্য করতে চাই না। কবিতা আমার নিজস্ব পড়াশোনার বিষয় কিন্তু আমি নিজে কখনো ওই ধরনের কবিতা লিখি নি, কয়েকটা কবিতা বাদ দিলে। তো কথাসাহিত্য যেহেতু আমার নিজস্ব বিষয়, আমি বলতে পারি যে এখানে মানসম্পন্ন কিছু লেখক আছেন যারা লিখছেন। এখন আমাদের ভাষায় বই তো খুব বেশি বিক্রি হয় না, পাঠকও তেমন উৎসাহ পায় না কিন্তু যারা পড়েছে তারা আবার ফিরে আসে তাদের কাছে।

সাদ: কিন্তু একটা প্রচলিত আছে, কবিতা থেকে গল্প বা উপন্যাস, কথাসাহিত্য একটু পিছিয়ে আছে। এই যে একটা, মানে গ্যাপ, এই গ্যাপটা?

bhule-thaka-galpoমনজুরুল : পিছিয়ে নেই কিন্তু। আমি তো মনে করি এখন কথাসাহিত্য অনেক বেশি পড়ছে। কবিতা তো সবসময়ই পড়া যায়। কবিতা তো অনুভূতির ব্যাপার, আবেগের ব্যাপার। বা পকেটে নিয়েই ঘোরা যায়। কথাসাহিত্য তো পকেটে নিয়ে ঘোরা যাবে না, বই লাগবে। কিন্তু আমি তো মনে করি যে কথাসাহিত্য মানুষ পড়ছে। উপন্যাস হয়তো একটু বেশি পড়ছে। এ বছর আমার একটা ছোটগল্পের বই প্রচুর বিক্রি হয়েছে। প্রকাশকরাও আমাদের উৎসাহিত হচ্ছে। নাইলে এতগুলো বই কেন প্রকাশকরাই উৎসাহিত হয়ে ছাপবেন। তাই না? কাজেই আমি মনে করি যে আমাদের কথাসাহিত্যের দিন এখন খুব ভালো। ছোটগল্পের আসলেই একটা বড় ভিত্তিভূমি তৈরি হয়ে গেছে। অনেক তরুণরা লিখছেন। অনেক তরুণ লিখছেন। ফলে আমাদের কথাসাহিত্য নিয়ে আমার একটা ভালো, কী বলা যায়, বিশ্বাস জন্মেছে।

সাদ: যে প্রবন্ধের বইটি, লেখাজোখার কারখানাতে। ১৯৮২ সাল থেকে যেগুলো প্রকাশিত হইছে, বিশেষভাবে কোথায় কোথায় প্রকাশিত হইছে লেখাগুলো?

মনজুরুল : না, এটা একটাই। সংবাদ নামের একটা পত্রিকা। সেটি এখনো তার চার পৃষ্ঠার সাহিত্য সাময়িকী বিজ্ঞাপন ছাড়াই ছাপছে। এটা কিন্তু বিরাট জিনিস। এবং শুরু থেকেই এই যে চার পৃষ্ঠার সাময়িকী, তাতে খুব ভালো ভালো লেখকদের জায়গা হতো। এবং খুব সাহসের সঙ্গে অনেক লেখা ছাপা হতো। কলাম ছিলো সাহিত্যের কলাম—সংবাদ ছাড়া আমি দেখি নি কোথাও। এবং সেখানে ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামের একটা কলাম লিখতাম। সেই কথাটাও রবীন্দ্রনাথ থেকে নেয়া। এবং সেটা বিশ্বসাহিত্যের পঠন-পাঠন নিয়ে। মাঝে মাঝে বাংলাদেশের সাহিত্য আসতো, চিত্রকলা আসতো কিন্তু প্রধানত বিশ্বসাহিত্যের পঠন-পাঠন। তো সেটা বিরাশি সাল, চুরাশি সাল থেকে…। এবং তখন তো আর গুগল ছিল না, তখন লাইব্রেরি থেকে, আমার নিজের বাইরে থেকে  কিছু বই নিয়ে অাসা ছিল, আমার বন্ধুবান্ধব যখন বাইরে থেকে আসত, তাদেরকে বই আনতে বলতাম। অনেক বই আমি সংগ্রহ রেখেছিলাম, অনেক ম্যাগাজিন-জার্নাল। সেগুলি, আর বই পড়তাম, বই পড়ে পড়ে আমি আমার নিজস্ব মতামতগুলি তুলে ধরতাম। একধরনের প্রবন্ধের আদলে, বা নিবন্ধের আদলে, এই কলামটা ছাপা হতো এক বৃহস্পতিবার পর পর। তো সেখান থেকে প্রায় আমি একশোটার মতো প্রবন্ধ এক করেছি।

সাদ: মোটা দাগে জানতে চাইলে, বিশ্বসাহিত্যের এই, বিশেষভাবে কোন জায়গাটা বাংলা সাহিত্যে আইসা সংযোজিত হইল। মোটাদাগে জানতে চাইলে।

মনজুরুল : সব সাহিত্য একটা জায়গায় সম্পর্কিত। কল্পনার জায়গাতে। অনুভূতির জায়গাতে। সবাই একটা জায়গায়। কিন্তু ভাষার তারতম্যের জন্য, সংস্কৃতির তারতম্যের জন্য, প্রকাশটা ভিন্ন। আমাদের সংস্কৃতিগত যে তারতম্য আছে, বিশ্বের সঙ্গে, অনেক দেশের সঙ্গে, সে কারণে হয়তো আমার সমাজের অবস্থা নিয়ে আমি যা লিখি, সেটা পশ্চিমের অতটা বোঝার কথা নয়। আমাদের রিকশাঅলার জীবন নিয়ে যখন লিখি, তখন তো আর পশ্চিমের লোক সেটা বুঝতে পারবে না। কারণ তাদের তো সেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটা নেই। তারপরেও যখন আমি অনুভূতির দিকে গভীরে চলে যাই, বিষয়বস্তুর গভীরে যখন মানুষকে ছাপিয়ে, তার কষ্ট দৈন্য এগুলো রপ্ত হয়ে যায় এবং ভাষার মাধ্যমে তাকে আমি সাবলীলভাবে প্রকাশ করি তখন আমি বিশ্বের সাহিত্যের সঙ্গে একটা সংযোগ তৈরি করতে পারি।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ১৮/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও