page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আমাদের বড়দা

উনিশশো সাতষট্টি সনের কথা।

সেদিন বাসায় খুব হই চই হচ্ছে। অনেক মানুষের আনাগোনা। ডেকোরেটরের মানুষ শামিয়ানা টাঙ্গাচ্ছে বাইরে। আমার বড় বোন কামরুনের বিয়ে হবে বাসায়।

বাবা তখন পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। রাতে বিয়ের অনুষ্ঠানে দেশের বড় সব হোমড়া চোমড়ারা আসবে। তার আয়োজন চলছিল। বাবা যতটুকু না তদারকি করতো তার চেয়ে বেশি চিলাচিল্লি করে সবার ভিতর আতঙ্ক তৈরি করতো।murad hai logo

একই দিনে আমার সন্তান সম্ভবা মা’র লেবার পেইন উঠলে মাকে ডাক্তার মেহেরুন্নেসার তত্ত্বাবধানে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হল।

সন্ধ্যায় বিয়ের অনুষ্ঠানে মা থাকতে পারলেন না। শুধু তাই নয়, সেদিনই মা মারা গেলেন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। কিন্তু তাই বলে নিমন্ত্রিত এত ভিআইপি অতিথিদের নিয়ে আয়োজিত বিয়ের অনুষ্ঠান থেমে রয় নাই। একদিকে হাসপাতাল থেকে মার লাশ এনে একটা ঘরে বরফ চাপা দিয়ে রাখা হল। অন্যদিকে ধুমধাম করে বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হল।

hatia 3

আমাদের দোতলা টিনের বাড়ি – লেখক

কয়দিন পর ছোট চার ভাই বোনের ভিতর শুধু আমাকে গ্রামের বাড়ি হাতিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হল বড়দার কাছে। আমার বয়স তখন সাত পুরা হয় নাই। অথচ কী আজব ব্যাপার, সেই দিনগুলির সব কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে।

বড়দা হলেন আমাদের একাধিক মায়ের ঘরের অনেক ভাই বোনদের ভিতর সবার বড় ভাই। নাম আবদুল হালিম সেলিম। ভীষণ বদরাগী, ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার বেলায় রীতিমত সামরিক নিয়ম পালন করতেন।

আমাদের সবার যমদূত—জীবন্ত আতঙ্ক ছিলেন বড়দা। বাবা তার ছেলেমেয়ের শাসনের বেলায় যতটা কঠোর ছিলেন বড়দা তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ছিলেন।

এই শাসনের বেলায় তিনি কোন পক্ষপাতিত্ব করতেন নাা। সবার জন্য সমান আইন চালু ছিল। তার ভিতর বড়দের উপর আইনের প্রয়োগ অনেক তীব্র ছিল। ছোট হিসাবে আমি অনেক কিছুতে মাফ পেয়ে যেতাম। বড়দা ভাইদের ভিতর সবার বড় ছিল কিন্তু ওনার চেয়েও বড় আমাদের কয়েক বোন ছিল। বড় বোনদের বিয়ে হয়ে গেলেও ওরা বড়দাকে সমান ভয় পেতো।

বড় বোনদের কথাই আগে বলি। ধরুন আমরা সবাই মিলে উঠানে কিংবা ঘরে চৌকির উপর বসে জমিয়ে বোনের শশুরবাড়ির গল্প শুনছি, হঠাৎ কেউ খেয়াল করল সাদা পাঞ্জাবী পরা বড়দা নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে এক কোনায় দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনতেছে, যেই ওনাকে দেখল, ব্যাস সবার মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল। আসর ভেঙে যেত সাথে সাথে। বড়দের অনেক দরকারী কাজ আছে বলে যে যার মত সরে যেত। মুহূর্তেই আসর ফাঁকা হয়ে যেত।

বাড়ির সব পুরুষদের উনি বাধ্যতামূলকভাবে মসজিদে পাঠাতেন নামাজ পড়তে। কিন্তু নিজে মসজিদে যেতেন না সব সময়। ভোরবেলায় শীত-বর্ষা যাই হোক মক্তবে যেতে হত কায়দা পড়তে। কায়দা ,আমপারা শেষ হলে বাড়ির উত্তর বারান্দায় লম্বা কাঠের টেবিলে বসে কোরান শরিফ পড়তে হত জোরে জোরে যেন উনি ওনার দক্ষিণের বারান্দায় বসে সেটা পরিষ্কার শুনতে পান।

hatia 5

দক্ষিণের বারান্দায় বড়দা আবদুল হালিম সেলিম ও আমি (২০০৮) – লেখক

এই লম্বা কাঠের টেবিল আমাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে আছে। ভোরবেলায় কোরান শরিফ পড়ার পর সেই টেবিলে নাস্তা মানে পান্তা ভাত দিয়ে লইট্টা মাছ কিংবা চেঁউয়া মাছের তরকারি,পরে নারিকেল মিঠাই খাওয়া হত। মাঝে মাঝে উঠানের মাটির চুলায় বানানো চিতই পিঠা আর নারিকেল মিঠাই খেতাম কপাল ভাল হলে। তারপর আবার সেই টেবিলে বসে স্কুলের পড়া পড়তে বসতাম রাতের বেলায় হারিকেনের আলোয়।

আমাদের বড় দুলাভাই লুতফুর রহমান আমাদের বাড়িতে থাকতেন তখন। পেশায় তিনি কাজী ছিলেন। বয়সে বাড়ির সবার বড় কিন্তু আমাদের কাছে ছিলেন প্রিয় বন্ধুর মত। বড়দার কঠিন শাসনে যখন আমাদের নাভিঃশ্বাস অবস্থা হত, কাজী দুলাভাইর ঠাট্টা, চুটকি, নানা রকম দুষ্টামি এসব আমাদের আনন্দের খোরাক হত। কোনো অপরাধের কারণে যখন কারো উপর কঠিন শাস্তি নাযিল হত বড়দার, দুলাভাই তখন আমাদের হয়ে দেনদরবার করে শাস্তির মেয়াদ কমানোর চেষ্টা করতেন।

আমাদের ভাইরা ছাড়াও আমাদের সঙ্গী-সাথী ছিলো আরো অনেকে। চাচাতো ভাই কায়সার, ফুফাতো ভাই মাহমুদ , আরেক বোনের জামাই শফিক দুলাভাই, ভাই হুমায়ুনের বন্ধু শের আলী, ডিপটি, এমন আরো অনেক মানুষ। বয়সের অনেক ফারাক হলেও বড়দার বিপক্ষে আমরা সবাই এক জোট ছিলাম। কিন্তু এই শক্তিশালী একনায়কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস কারো ছিল না।

বাবা ঢাকায় থাকতেন বেশির ভাগ সময় ওনার পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে। বড়দা ছিলেন আমাদের হাতিয়া রাজত্বের একচ্ছত্র অধিপতি।

ধবধবে সাদা ফিনফিনে পাঞ্জাবি, ভিতরে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি, সাদা লুঙ্গি, পকেটে থ্রি ক্যাসলস সিগারেটের সবুজ বাক্স, তেলের লাইটার, হাতে তিন ব্যাটারির রুপালি টর্চ লাইট এই ছিল আমাদের বড়দার চিরাচরিত অবয়ব।

একটা ইয়ামাহা মটর সাইকেল ছিল ওনার। কিন্তু ওটা খুব কদাচিৎ উনি চালাতেন। চালানোর চাইতে প্রায় প্রতিদিন ওটার সব কিছু খুলে তেল মবিল লাগিয়ে আবার জোড়া লাগাতেই মজা পেতেন সারা দিন ধরে।

আমার কাজ ছিল ওনার পাশে দাঁড়িয়ে রেঞ্চ, স্ক্রু ড্রাইভার এসব এগিয়ে দেয়া। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার দুই পা ব্যথা হয়ে যেত, পেশাব ধরে হাফ প্যান্ট ভিজে যাবার অবস্থা হলেও ভয়ে বলতাম না।

সেই সকাল বেলায় শুরু হত ওনার মেকানিকগিরি, সারাদিন চলত। এর ভিতর প্রচুর চিনি দিয়ে ৫/৭ কাপ কড়া লিকারের ঘন জ্বাল দেয়া দুধের চা, তার চাইতে বেশি সিগারেট খেতেন। তারপর কোথায় কী লাগাতে হবে ভুলে গেলে ওভাবেই ফেলে রেখে উঠে যেতেন। পরদিন আবার নতুন উদ্যমে শুরু করতেন মেকানিকগিরি।

এছাড়া আমাদের বড়দার আরেকটা প্রিয় খেলনা ছিল। সেটা একটা দোনলা বন্দুক।

বড়দা ওটা নিয়ে এমন ভাবে নাড়াচাড়া করতেন যেন ওটা কোনো মহামূল্যবান , বিপদজনক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। গুলি রাখার জন্য সেনাবাহিনীর জলপাই রঙের গুলির বাক্স ছিল একটা। মটর সাইকেলের মত উনি ওনার এই বন্দুক প্রায় সময় সব কিছু খুলে লম্বা ব্রাশে তেল লাগিয়ে বন্দুকের নলের ভিতর পরিষ্কার করতেন। আবার জোড়া লাগাতেন। আমাদের সবার উপর কড়া আদেশ ছিল যেন আমরা ভুলেও এই বন্দুকে হাত না দেই।

আমাদের মনেও এই ভয় জন্মে গিয়েছিল যে ওটা ধরলেই মনে হয় গুলি বের হয়ে যাবে। নানা রঙের গুলির কালেকশন ছিল। কোনোটা কমলা রঙের—ওটার নাম ছররা। কোনোটা ছিল লাল রঙের, কোনোটা সবুজ। সবুজ রঙের গুলি নাকি খুব ডেনজারাস । সত্যি মিথ্যা জানি না, ওটা নাকি হাতি মারতে ব্যবহার হয়। গুলির বাক্স সারাজীবন ভরাই দেখেছি। ছররা গুলি ছাড়া আর কোনোটাই কোনো দিন ব্যবহৃত হয় নাই।

মাঝে মাঝে বাড়ির পুকুর পাড়ের গাছে পানকৌড়ি দেখা যেত । দৌড়ে এসে বড়দাকে এই খবর দিতাম। সাথে সাথে বড়দা অ্যাকশনে চলে যেতেন।

ওনার সে কী প্রস্তুতি শিকারের। যেন যুদ্ধে যাচ্ছেন। হাতে গ্লাভস, চোখে কালো চশমা, মাথায় ক্যাপ পরে পুকুর পাড়ে শুয়ে খুব সাবধানে বন্দুকের নিশানা ঠিক করতেন। তখন তো জানতাম না। কিন্তু এখন যুদ্ধের ছবিটাতে স্নাইপাররা যেমন করে ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে টার্গেট ঠিক করে, বড়দাও একটা পানকৌড়ি শিকার করার জন্য তেমনি করতেন। আমি, ছোট ভাই আজাদ, আমার বড় জামাল আমরা তিনজন ছিলাম খুব কাছাকাছি বয়সের। সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। আমরা বড়দার শিকার দেখার জন্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতাম।

আমাদের বলা হত একদম কোনো আওয়াজ না করার জন্য। কিন্তু এত এক্সাইটেড হতাম যে আমাদের নিঃস্বাস খুব ঘন আর জোরে হত। নিজের নিঃশ্বাসের আওয়াজে নিজেরাই বিরক্ত হয়ে যেতাম যেন এই আওয়াজেই পাখি উড়ে চলে যাবে।

দেখা যেত, বড়দার অনেক বেশি সময় নেয়ার কারণে পাখি উড়ে চলে যেত। তখন আমাদের খুব মন খারাপ হত। কিন্তু মাঝে মাঝে ঠিক শিকার করে ফেলত বড়দা। গুলির আওয়াজে তালা লেগে যেত আমাদের কানে। কানের ভিতর রিনিঝিনি বাজত অনেকক্ষণ ধরে।

গুলি খেয়ে গাছের মাথা থেকে ধপাস করে পুকুরের পানিতে পড়ত পানকৌড়ি। বাড়ির দেখাশুনা করার জন্য ছিল দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ভৃত্য (নাম মনে আসছে না)। সে পুকুরে নেমে পাখি উঠিয়ে আনত। বড়দা আবার ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতেন গুলি কোন জায়গায় লেগেছে। তারপর বন্দুক ব্যবহার হয়েছে বলে সেটা আবার খুলে পরিষ্কার করতে বসে যেতেন।

বড়দার দক্ষিণের বারান্দার পাশেই ছিল বাড়ির ভিতরের পুকুর। এই পুকুর শুধুমাত্র মেয়েদের ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। পুকুরের চারপাশে খুব ঘন বড় বড় গাছপালায় ভরা ছিল। বরই গাছ, আম গাছ, লিচু গাছ, তুলা গাছ, সৈয়দি পেয়ারা গাছ, আমলকি গাছ, নারিকেল গাছ, খেজুর গাছ ছিল। শানবাঁধানো পুকুরঘাট বেড়ার ছাউনি দিয়ে ঘেরা ছিল। বাড়ির নারী বাসিন্দাদের উপর কড়া আদেশ জারি করা ছিল কেউ যেন গোসল করতে গিয়ে ঐ ছাউনির বাইরে সাঁতার কাটার চেষ্টা না করে।

hatia 13

চর ঈশ্বর গ্রামে আমাদের পুকুর – লেখক

বিশাল দোতলা ছাড়াও, বড়মার ঘর, চাচাদের ঘর মিলিয়ে নারীমহল অনেক বড় ছিল। অবিবাহিতা বোন ছিল চারজন তখন। ওদের উপর কঠিন সব নিষেধাজ্ঞা ছিল পর্দার ব্যাপারে। বড়দা বাড়ি থেকে সচরাচর বের হতেন না। আমরা নামাজ পড়ে দুই হাত তুলে সবাই একটাই দোয়া করতাম , যেন বড়দা কোনো কাজে বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য বাড়ির বাইরে হাতিয়া টাউনে যায়।

আমাদের এত প্রার্থনা প্রায়ই বিফলে যেত।

যদি কোনো কারণে গ্রামের কোনো বিচার-শালিস করার জন্য বড়দা বাড়ি থেকে বের হতেন, আমাকে স্পাই নিয়োগ করে যেতেন যেন কোথায় কী অনিয়ম হয়েছে সব কিছু উনি বাড়িতে ফিরে এলে রিপোর্ট করি।

উনি বাইরে গেলে বোনদের খুশির কারন ছিল একটাই—ওরা পা দাপিয়ে পুকুরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত সাঁতার প্রতিযোগিতা করতো নিজেদের ভিতর। বড়মা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে নিস্ফল ভাবে ওদের শাসন করার চেষ্টা করত । কিন্তু কে শোনে কার কথা। স্বাধীনতা তো আর প্রতিদিন আসে না। আমি বোনদের ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করতাম। ওদের সাঁতার কাটার কথা গোপন রাখার বিনিময়ে কিছু একটা আদায় করে নিতাম।

বড়রা সবাই মার খেয়েছে, কিন্তু ছোটদের উনি কক্ষনো মারতেন না। ধমক কিংবা চোখ রাঙানিই যথেষ্ঠ ছিল আমাদের জন্য। উনি ছাড়া আর কেউ আমাদের উপর কোনো শাসন কিংবা কর্তৃত্ব ফলাবে এটা কখনো উনি মেনে নিতেন না।

hatia 4

আমার প্রাইমারি স্কুল – লেখক

আমি বরাবর ভাল ছাত্র ছিলাম স্কুলে। কখনো পড়ায় ফাঁকি দেয়া কিংবা ক্লাসে দুষ্টামি করা এসব আমাকে দিয়ে হত না। একবার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বাবু প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কোন কারণে একজন ছাত্রের উপর রেগে ক্লাসের সবাইকে বেত দিয়ে মারতে শুরু করলেন। যথারীতি আমিও বাদ গেলাম না। আমার পিঠে বেতের দাগ কেটে বসে ফুলে গিয়েছিল।

আমি বিনা দোষে শাস্তি পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এসে বড়দাকে জামা খুলে পিঠ দেখালাম। আমার পিঠ দেখে ওনার মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। উনি নিজেও তখন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির কর্মকর্তা ছিলেন। সাথে সাথে আমাকে সাথে নিয়ে ওনার প্রিয় ইয়ামাহা মটর সাইকেল চালিয়ে স্কুলে গেলেন। তারপর অফিস রুমে বসে ঐ শিক্ষককে ডাকিয়ে আমাকে মারার কারণ জানতে চাইলেন। শিক্ষক বেচারা এমন অবস্থায় অপ্রস্তুত হয়ে কাঁচুমাঁচু করতে লাগলেন।

আমি ভেবেছিলাম বড়দা বুঝি ওনাকে মেরেই বসবে। কিন্তু উনি নিজেকে কন্ট্রোল করে সব শিক্ষককে বলে এলেন কেউ যেন ভুলেও কোনো দিন আমাকে না মারে। আমি কোনো ভুল করলে যেন আগে ওনাকে জানানো হয়। তারপর আমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে নিজের হাতে পিঠে তেল মেখে দিয়েছিলেন।

মনে আছে উনিশশো আটষট্টি সনে বড়দার বিয়ে হয়। ঢাকায় বোনের বিয়েতে আমরা কোনো মজা করতে পারি নাই মা অসুস্থ থাকার কারণে। কিন্তু হাতিয়ায় বড়দার বিয়েতে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মজা করেছিল সবাই মিলে। বিয়ের সময় কেন যেন সবাই বড়দার সব নিয়মের কথা বেমালুম ভুলে আনন্দে মেতে উঠেছিল।

আমাদের টিনের দোতলার সামনে উঠানে পানি ঢেলে, ধান ক্ষেত থেকে কাদা এনে একদম পিচ্ছিল করা হল। তারপর সবাই মিলে কাজী দুলাভাইকে ধরে এনে সেই কাদায় ফেলে কাদামাটি মেখে ভরিয়ে ফেলা হয়েছিল। পুরো গ্রাম জুড়ে হলি খেলার মত হলুদ মারামারি হল। মুরুব্বিদেরও ছাড় দেয়া হয় নাই। কিন্তু অবাক কাণ্ড হল, কেউ কিছুই মনে করে নাই। আমাদের খুব গম্ভীর বড়দাও কাজী দুলাভাইর অবস্থা দেখে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন।

আগের জমানায় বনেদি মানুষেরা পালকিতে চড়ে এক গাঁ থেকে আরেক গাঁয়ে কাজে কিংবা বেড়াতে যেত। আমার বাবার তেমন দুইটা পালকি ছিল। ইয়া বড় পালকি। এতই বড় যে ঐ পালকি বহন করতে আটজন করে বেয়ারা লাগতো। অনেকদিন ধরে পালকিগুলি বাড়ির ছাদের সাথে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা ছিল। বড়দা আমাদের পরিবারের বড় ছেলে। তাই তার বিয়েতে সেই দুই পালকির একটা নামিয়ে পরিষ্কার করা হল। তারপর বড়দা বর সেজে সেই পালকিতে চড়ে ভাবিদের বাড়ি গিয়েছিলেন।

মনে আছে, পালকিবাহকেরা কী যেন একটা গান সুর করে গাইছিল আর দুলে দুলে পালকি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। আমরা সবাই পালকির পিছু পিছু হেঁটে গিয়েছিলাম অনেক দূরের পথ।

বিয়ের পর রাতের বেলায় সেই পালকিতে চড়েই ভাবিসহ বড়দা বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন।

কিন্তু উনি এতই বেরসিক ছিলেন যে বাড়িতে এসে আগের মত নিজের স্বাভাবিক কাজ শুরু করে দিলেন। বাড়ির দাওয়ায় বসে সবার সাথে গল্প করছিলেন। চা সিগারেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ওদিকে ভাবি বাসর ঘরে মাথা নিচু করে যেভাবে বসেছিলেন ওভাবেই রাত পার হয়ে গেল। পরের কয়েকদিন উনি আর ঘাড় সোজা করতে পারেন নাই।

বিয়ের পর সবাই ভেবেছিল বড়দা বুঝি এবার বদলে যাবে। আগের মত আর যখন তখন গর্জন করবে না। কিন্তু মোটেই তেমন কিছু হয় নাই। বরং ওনার তর্জন গর্জন সহ্য করার জন্য আরেকজন মানুষ বাড়ল।

আগেই বলেছি, আমাদের সবার একটাই চাওয়া ছিল। আর সেটা হল বড়দা যদি বাড়ির বাইরে দূরে কোথাও যায় অনেকক্ষণের জন্য। একদিন রাতে জানলাম উনি পরদিন জরুরি কাজে হাতিয়া টাউনে যাবেন।

তখন হাতিয়া টাউন আমাদের বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে ছিল। তার মানে উনি সারাদিনের জন্য বাইরে থাকবেন। এটা জেনে খুশিতে সবাই আত্মহারা। সকালে উনি নাস্তা খেয়ে খুব আস্তে আস্তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আর আমরা খুব বিরক্ত হচ্ছি এই ভেবে যে উনি এত স্লো কেন!

সিদ্ধান্ত হল, মটর সাইকেলে নয়, উনি বেবি ট্যাক্সিতে যাবেন। ট্যাক্সিওয়ালা সেই সাত সকালে এসে বসে আছে। আমাদের সকল টেনশনের অবসান ঘটিয়ে বেলা এগারোটার সময় বড়দা সবাইকে বলে, সাবধান করে ট্যাক্সিতে এসে উঠলেন। এমন ভাব করছিলেন উনি যেন এক বেলার জন্য সাত মাইল দূরে যাচ্ছেন না, বরং ঢাকায় যাচ্ছেন কয়েকদিনের জন্য। ট্যাক্সিওয়ালা পায়ের কাছে রাখা হ্যান্ডেল ধরে কয়েকবার ঝালি দেয়ার পর ফট ফট করে ট্যাক্সি স্টার্ট নিল। বড়দা ফি আমানিল্লাহ বলে রওয়ানা দিলেন।

hatia 9

মূল রাস্তা থেকে আমাদের বাড়ির দৃশ্য – লেখক

বাড়ির সামনে ঊঠানের পাশে অনেকগুলি নারিকেল গাছ। উঠান থেকে রাস্তায় নামার মুখেই একটা নারিকেল গাছের গুড়ি উঁচু হয়ে আছে। বেখেয়ালে কিংবা বড়দার ভয়ে ড্রাইভার তার ট্যাক্সির এক সাইড সেই গুড়ির উপর উঠিয়ে দিল। ব্যাস, বড়দাসহ ট্যাক্সি একদিকে কাত হয়ে পড়ে গেল। সবাই দৌড়ে গিয়ে এক যোগে ট্যাক্সি ধরে উঠিয়ে সোজা করে ফেলল। বড়দাকে নামানো হল। কিছুই হয় নাই। তবুও মুরুব্বিদের অনেকে ফতোয়া দিলো, যাত্রায় বাধা পড়েছে। আজ আর যাওয়া ঠিক হবে না।

বড়দা এমনিতেই ঘরকুনো মানুষ। সবাই মিলে নিষেধ করল। উনিও আর না গিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন। অন্যদিকে আমাদের সবার যেন বুক ফেটে কান্না আসতে লাগলো। কত কী প্ল্যান করে রেখেছিলাম, বড়দা বাইরে গেলে সে সব করব, কিন্তু আশা দুরাশা হয়ে গেলো। সবাই মুখ কালো করে যে যার কাজে ফিরে গেলাম।

সপ্তাহে দুই দিন হাট বসত আমাদের বাড়ির কাছের বাজারে। বুধবার এবং শনিবারে। হাটের দিনে বাজারে যেন মেলা বসে। রাস্তার উপর দূর-দুরান্ত থেকে আসা মানুষ কত কী নিয়ে বসে বেচার জন্য। একবার দেখেছি। তাই বার বার যেতে ইচ্ছা করত। কিন্তু আমাদের কারোই অনুমতি ছিল না বাজারে যাবার। বাজারে নাকি খারাপ ছেলেরা আড্ডা মারে, তাই ওখানে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

হাটবারে বাজারে এত মানুষ আসত, সবাই হারিকেন, হ্যাজাক বাতি জালিয়ে তাদের পণ্য নিয়ে বসত। আমরা বাড়ির উঠানে বসে বাজারের দিকে তাকালে আকাশে অনেক আলোর দ্যুতি দেখতে পেতাম। বড়দা মাঝে মাঝে হাটে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বের হত টর্চ লাইট হাতে নিয়ে। আমরা ওনার গতিবিধি অনুসরণ করে দেখতাম উনি কখনো আমাদের বাড়ির সীমানায় বড় পুকুরের ঘাটে বসে হয়ত শালিস করছে, কখনো বাড়ির সীমানায় তিন রাস্তার মোড় যাকে ‘তেমোহনী’ বলা হত সেখানে চায়ের দোকানে বসে কারো সাথে কথা বলছে। আমাদের কপাল খুব ভাল হলে মাসে দুই এক বার উনি সেখান থেকে উঠে বাজারে যেতেন। নইলে প্রায় সময় সোজা বাড়িতে চলে আসতেন।

মাঝে মাঝে মেজাজ মর্জি ভাল থাকলে বড়দা মসজিদের বড় পুকুরে মাছ ধরতে বসতেন ছিপ ফেলে। ছিপ ফেলার আগে সে কী আয়োজন। মাছ কাছে আনার জন্য অনেক রকম মাছের খাবার ফেলা হত পুকুরে। তারপর শান বাঁধানো ঘাটে চা-সিগারেট নিয়ে বসতেন বড়দা। সাথে আমাদের কয়েকজনকে বসে থাকতে হত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হলেও কোনো মাছ ঠোঁকর দিতো না। কখনো পাওয়া যেত দুই একটা মৃগেল কিংবা রুই মাছ। কখনো কিছুই ধরত না। যদি কোনো মাছ পাওয়া যেত আমাদের সবার সে কী আনন্দ হত বলে শেষ করা যাবে না।

ঊনসত্তরের শুরুতে আমাকে আর আজাদকে ঢাকায় নিয়ে এল বাবা। ঢাকায় মহাখালী আদর্শ বিদ্যালয়ে মাত্র স্কুল শুরু করেছি। কিন্তু দু’বছর না যেতেই দেশে যুদ্ধ লেগে গেল। আমরা সবাই ঢাকা থেকে পালিয়ে হাতিয়া চলে গেলাম। আবার চলে গেলাম বড়দার তত্ত্বাবধানে।

hatia 8

বড়দা আবদুল হালিম সেলিম – লেখক

অনেক বেশি রাগী মানুষ ছিলেন। কিন্তু মন অনেক ভাল ছিল। এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আমাদের ছোটদের উপর ওনার কড়া অনুশাসন না থাকলে আমরা সবাই হয়ত ঠিকমত পড়াশুনা শেষ করে বের হতে পারতাম না। কড়া শাসনে ছিলাম বলেই পরের বার গ্রামে গিয়ে চার বছর কাটিয়েও স্কুলে অনেক ভাল ছাত্র হিসেবে টিচারদের খুব প্রিয়পাত্র ছিলাম।

ঊনিশশো চুয়াত্তরে আমি আবার ঢাকা চলে এলাম। আসার আগে বড়দা আমাকে দিয়ে প্রমিজ করিয়ে নিয়েছিল আমি যেন প্রতি সপ্তাহে ওনাকে চিঠি লিখে সব খবর জানাই।

আমি লিখতাম, উনিও উত্তর দিতেন। ওনার হাতের লেখা ছিল ঝকঝকে সুন্দর। পেঁচিয়ে লিখতেন পাইলট কলম এবং পেলিক্যান কালি দিয়ে। এই কালি ছাড়া উনি ব্যবহার করতেন না।

গ্রামে আমদের প্রচুর ধানচালের ব্যবস্থা ছিল। বাড়িতে বিশাল গোলাঘর ছিল। ধানের মৌসুমে চরের বাড়ি থেকে অনেকগুলি গরুগাড়ি করে চটের বস্তা ভর্তি ধান আসত বাজারের ধানকলে। ধান চালে পরিণত হয়ে আবার গরুগাড়িতে চড়ে আমাদের বাড়ির গোলাঘরে এসে ঢুকতো।

গোলাঘরের চাবি থাকত বড়দার কাছে। আমার ভাই হুমায়ুন, যাকে আমরা হুমায়ুনদা বলে ডাকতাম, উনি ছিলেন বিশাল জনদরদী মানুষ। ওনার অনেক চেলা-চামুণ্ডা ছিল। যাদের বেশির ভাগের খাবার দাবার, পকেট খরচ ওনাকে চালাতে হত। তার জন্য অনেক পয়সা দরকার হত। বড়দাকে সবাই বাঘের মত ভয় পেতাম। তার ভিতরেই সুযোগ বুঝে হুমায়ুনদা বড়দার কাছ থেকে গোলাঘরের চাবির ছাপ নিল সাবানের উপর। তারপর নকল চাবি বানিয়ে রাতের অন্ধকারে গোলাঘর খুলে চাল বের করে ওনার গরীব চেলাদের ভিতর বিলি করত। আমি সব জানতাম, কিন্তু হুমায়ুনদা মানুষ হিসাবে এতই ভাল আর দয়ালু ছিলেন যে এসব কথা কোনো দিন কাউকে বলি নাই।

কলেজে পড়ার সময় একবার গ্রামে গেলাম বেড়াতে। গ্রামে গেলে বড়দা খুব খুশি হতেন । অনেক আদর যত্ন করতেন। একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ওনার শরীর ভাল নাই। আমি যেন কাচারিতে যাই। ওখানে কিছু চাষী বসে আছে ধানের ভাগ দেয়ার জন্য। আমি যেন গিয়ে ধান মাপা দেখে সব বুঝে নেই।

আমার এসবের কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছিল না। তবুও বড়দা বলায় কাচারি ঘরে গেলাম। আমাকে দেখে চাষীরা কেমন আছি টাইপ খোঁজ খবর নিয়ে তারপর বলে বসল, ছোট মিয়া, ঢাকায় থাকেন, কিছু হাত খরচ তো দরকার আপনার।

কেন এমন বলছে সেটা আমার মাথায় ঢুকছিল না। তবে এটা ঠিক, কলেজে গিয়ে হাত খরচ বেড়েছে। সিগারেট খাই, ক্যান্টিনে বসে এটা সেটা খাই, পয়সা লাগে।

হটাৎ চাষীদের একজন উঠে তার পকেট থেকে একটা পুটুলি বের করে তার ভিতর থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিল। এর আগে আমি কখনো কোনো কারণেই একশ টাকার নোট নিজের করে হাতে পাই নাই। তাই ওটা পেয়ে ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’ অবস্থা হল আমার। মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল।

ওরা ধান ভাগ করে দিয়ে হেসে চলে গেল। আমি বুঝতেই পারলাম না যে ওরা একশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে পাঁচশ টাকার ধান নিয়ে চলে গেছে আমার চোখে ঠুঁলি পরিয়ে দিয়ে।

বাড়িতে ফিরে এসে বড়দাকে জানালাম ওরা ধান ভাগ করে দিয়ে চলে গেছে। আমাদের কাজের মানুষ কাচারিতে তালা দিয়ে এসেছে। কিন্তু চোরের মন পুলিশ পুলিশ অবস্থা। আমি খামোকাই কথা বলতে গিয়ে তোতলাচ্ছিলাম বড়দার সামনে। উনি কিছুই বোঝেন নাই।

তারপর কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার পর আমার গ্রামে বেড়াতে যাওয়া অনেক কমে গেল। আগেই বলেছি, বড়দা আমাকে আর আজাদকে অনেক বেশি আদর করতেন। বিশেষ করে মা মারা যাওয়ার পর থেকে আরো বেশি খেয়াল করতেন।

আমি তখন থার্ড ইয়ার ফাইনালে । আজাদ মাত্র থার্ড ইয়ার শুরু করেছে। একই ক্যাম্পাসে হলেও আমি হলে থাকি আর আজাদ বাসায় থাকে। তাই দেখা বেশি হত না। একদিন হঠাৎ বড়দা আমার হলে এসে হাজির। আমাকে রুমে না পেয়ে লোক দিয়ে খুঁজে বের করলেন। তারপর বললেন, আজাদ চিটাগাংয়ে গেছে। তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বাবা ওর চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আজ রাতেই আমাকে নিয়ে বড়দা চিটাগাংয়ে যাবেন।

কেন জানি অশুভ চিন্তায় বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠেছিল। বাসে করে চিটাগাং রওয়ানা দিলাম। সারা রাস্তা আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল কিছু না জেনেই। বড়দা কিন্তু তখন জেনে গেছে আজাদ কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে গেছে। আমাকে কিছুই বলে নাই। কিন্তু আমি কাঁদছি দেখে উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিলেন।

আমি বিদেশে চলে আসার পর বড়দা আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছিল পর পর দুইবার। মানুষ হিসাবে খুব সৎ ছিলেন কিন্তু সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে পারতেন না পারিবারিক অভ্যাসের কারণে। বাড়ির বড় ছেলে হিসাবে সব সময় অহঙ্কার নিয়ে চলেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই অহঙ্কার বিসর্জন দিতে পারেন নাই। মানুষ হয়ত ভুল বুঝতো ওনার বদরাগের জন্য। কিন্তু আসলে মানুষটা অনেক ভাল ছিলেন।

বেশ কয়েক বছর হল আমি দেশে বেড়াতে গেলেই গ্রামে যাই কয়েকদিনের জন্য। অবাক কাণ্ড হল, সিংহের মত সারাক্ষণ তর্জন-গর্জন করা মানুষটা একদম চুপ চাপ হয়ে থাকেন অসুখ আর বয়সের ভারে। আগের মতই দক্ষিণের বারান্দায় চেয়ারে বসে চোখে চশমা লাগিয়ে পত্রিকা পড়েন। চা খান এবং সিগারেট টানেন। আগের অভ্যাস মতই একটু পর পর বলেন, কে রে ওখানে? এদিকে আয়। সবাই ওনাকে আগের মতই ভয় পায়। ডাকলেও চুপ করে সটকে পড়ে। অনেক একা হয়ে গেছেন। কারো সাথে কথা বলতে চান। কিন্তু ভয়ে কেউ কাছে গিয়ে বসে না। একা একা বসে থাকেন সারাদিন।

৩.
আমাদের পরিবারের বটবৃক্ষের মত এই বিশাল মানুষটা বছর খানেক আগে হার্টের অসুখ হয়ে মরে গেছেন। এখন আমাদের সেই বিশাল বাড়িটা খাঁ খাঁ করে। এখনো দক্ষিণের বারান্দায় সেই চেয়ার টেবিল সেভাবেই পড়ে আছে। কিন্তু কেউ সেখানে বসে না। কেউ ডাকে না। সব কিছু সুনশান নীরব হয়ে গেছে।

hatia 2

ভাঙনের মুখে হাতিয়া – লেখক

মেঘনা নদী কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের ছোট্ট সুন্দর হাতিয়া। খেতে খেতে আমাদের জন্মের স্থান সেই বাড়ির পিছনে পৌঁছে গেছে। আর হয়ত বছর খানেক থাকবে। তারপর একদিন আমাদের পরিবারের সব সুখস্মৃতি নিয়ে বড়দর মত আমাদের সুন্দর বাড়িটাও হারিয়ে যাবে চোখের অন্তরালে, নদীর গহবরে।

এরপরের বার দেশে বেড়াতে গেলে আমার আর হাতিয়া যাওয়া হবে না। যাওয়ার জায়গা অনেক থাকলেও নিজের অনেক স্মৃতি বিজড়িত জন্ম নেয়ার সুতিকাঘর আর থাকবে না।

নিউ ইয়র্ক, ২০ জুন ২০১৫

Tagged with:

About Author

মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।

Comments

  1. nipun says:

    আমার বাড়িও হাতিয়া। আপনি কি বুলবুল দাদা’র এবং রশিদুল হাই স্যারের ভাই?