page contents
Breaking News

আমাদের স্টুপিড জীবন

ঢাকা এয়ারপোর্টের ডিপারর্চার লাউন্জে এখন আর বিদায় জানাইতে আসা লোকদের উঠতে দেওয়া হয় না।

এয়ারপোর্টের দোতলার ডিপারর্চার লাউন্জ থিকা যে ঢাল নাইমা আসছে, তার গোড়ায় আপনি যাত্রীকে আলবিদা জা্নায়া গাড়ি থিকা নাইমা পড়বেন। ব্যাগেজ লাগেজ সহ যাত্রীরে নিয়া গাড়ি দোতলায় গিয়া যাত্রীরে নামায়া দিব, আর পরে ফিরা আইসা আপনারে সেই ঢালের মুখ থেকে কালেক্ট করব। খোলা আকাশের নিচে আপনার এই অপেক্ষার সময়টুকু ঝড়ঝঞ্ঝা যাই ঘটুক, আপনারে খাড়ায়া থাকতে হইব ফুটপাতের কিনারায়।

সুবেহ সাদেকের ওয়াক্তে এয়ারপোর্টে আমারে তুইলা দিতে যে বালিকা লগে আসছিল, সারাটা রাস্তা সে আমার কনুই ধইরা বইসা ছিল, আর গুনগুনায়া কইতেছিল,  তুমি আমারে ছাইড়া যাইতাছো গা…?  এক সময় তার গুনগুনানি ফোঁপানির আওয়াজে পরিণত হইলে আমার গলায়ও কিছু বাষ্প পয়দা হইল। উপরে আইসা ড্রাইভার সাব আমার লাগেজ নামায়া ট্রলিতে বসাইতেছিলেন, ইশারায় উনার সেলফোনটা দিতে কইলাম। শেষ রাইতে সেইদিন হঠাৎ একটু বৃষ্টি হইছিল, বাতাসের আবহাওয়া ছিল আর্দ্র। ঢাকার মাটিতে নামনের দ্বিতীয় দিনেই আমার যে একটা সরকারি অফিসের কেরানি মার্কা খকখকা কাশি হইছিল, আজ প্রায় বিশদিন পরে ফিইরা যাওনের টাইমেও সেই কাশির জের গলার ভিত্তরে কিছুটা ছিলই।  ফোনের অপর প্রান্তের বালিকারে আমি ভারি গলায় কইলাম, আমি ভিত্তরে যাইতেছি, তোমার আর অপেক্ষা করনের দরকার নাই। ঘরে যাও গিয়া।

biswajit-munshi-logo

ফোন কল সাইরা, ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে আবিষ্কার করলাম, সারা এয়ারপোর্টে ঢুকনের একটাই মাত্র গেট খুইলা রাখছে, আর সেই আলো আন্ধার ভোরের বেলাতেও পাঁচ/ছয় জন মানুষ ট্রলি নিয়া সেই গেটের সামনে খাড়ায়া আছে। কাচের দরজার ভিত্তরে এক উর্দিধারী, যাত্রীদের পাসপোর্ট টিকেট হাতে নিয়া তিন/চার মিনিট ধইরা বাতচিত করতেছে, তাগোর সব কিছু খুটায়া চেক করতেছে। লাইনের সবার পিছে আমি খাড়ায়া আছি মাল-সামানের ট্রলি লয়া। আমি একটা টিশার্ট পিন্ধা ছিলাম, আমার নাঙ্গা হাতে এইবার মশা কামড়ানি শুরু করল। একটা দুইটা না, ঝাঁকে ঝাঁকে, হাজারে হাজারে। চাপড় দিলেই একটা দুইটা মশা ভত্তা হইতেছে, লালচিয়া রঙ হাতে দেখতে পাইতেছি।

মশা আমারে সব সময় যেমন জ্বালায়, এইবার ঢাকায় আমার পুরা সময়টাও অনেক জ্বালাইছে। এইটা ছোট পুলাপান যেমন মা বাবারে জ্বালায়,ঠিক তেমনটা নয়। এইটা হইলো গিয়া লিটারারি জ্বালানি, কামড়ের লগে লগে চামড়ার উপরে ঢিপি হইয়া ফুইলা ওঠে আর চামড়ায় জ্বালাপুড়া করতে থাকে। মশা খেদাইতে আমি তখন হাত পা ছুইড়া লাফ ঝাপ মারতেছি, এদিকে লাইনও আগাইতেছে না, অথচ দেখতে পাইতেছি, আমার সামনে মাত্র তিনখানা ট্রলি। মনে মনে ভাবতেছি একবার ভিত্তরে ঢুইকা পড়তে পারলে, মশায় আর আমার নাগুল পাইব না। হঠাৎ দেখি ড্রাইভার সাব আবার ফিইরা আইছেন, হাতে উনার সেলফোন। এইবার আমি ডরাইলাম, কিছু কি ফালায়া থুয়া আসছি নাকি?

ফোন কানে দিয়া শুনি, আমার বালিকা। ফোনে উনি আমারে কইলেন, বাইরে বহুত মশা বুঝছো? তোমার একটা ফুলহাতা ভেস্ট আছে হাতব্যাগে, ওইটা পইরা নাও।

ইস্তানবুল এয়ারপোর্টের লাউন্জে।

ইস্তানবুল এয়ারপোর্টের লাউন্জে।

এই বছর টরন্টোর উইন্টার স্মরণাতীত কালের মৃদু উইন্টার। প্রায় দিন প্লাস ২ অথবা ৩ ডিগ্রি, তাপমাত্রা মাইনাসের নিচে নামেই না। জানুয়ারি মাস জুইড়া খুব ভাব-সাব নিয়া দুই একদিন বেশ বরফ পড়ল, মাটিতে পইড়া সেই বরফ জমাট বাঁধার প্রাণপণ চেষ্টা করল। ঢাকায়  আর্ট ফিল্মের  নামে ফালতু টাইপের কিছু মুভি যেমন দেখা যায়, খুব ভাব-সাব নেওয়ার চেষ্টা কইরাও শেষ পর্যন্ত আর জমাইতে পারে না… জানুয়ারি মাসে সেই বরফও তেমনি ভাল মতো আর জমল না। দিনের পর দিন প্লাস টেম্পারেচার থাকনের ফলে গ্রাউন্ড টেম্পারেচার ছিল অনেক বেশি, এই বাড়তি টেম্পারেচারই বরফের ভাবগাম্ভীর্যরে আর  মাটিতে জমতে দিল না। মাটিতে ঘাসের উপর হালকা পানির আভাস, তার উপরে বরফের টুকরা গইলা গইলা ক্ষয় হইতেছে। পুরাই উইন্টার নামের কলঙ্ক আর কি। ঠিকঠাক উইন্টার হইলে এই বরফের জইমা পাত্থর হইয়া মাঠ-ঘাট ঢাইকা ফালানির কথা। যেই বরফের পাত্থর গইলা পানি হইতে সাধারণত মে মাস লাইগা যাইত।

ফেব্রুয়ারি ৪তারিখে ঢাকার উদ্দেশ্যে যেইদিন টরন্টো ছাড়ছিলাম, সেইদিন শহরের তাপমাত্রা ছিল প্লাস ফোর। যেইখানে ফেব্রুয়ারি মাসে টরন্টোর গড় তাপমাত্রা সাধারণতঃ মাইনাস ২০/২৫ এর আশপাশে ওঠানামা করে।  ঢাকার শীতের কথা ভাইবা আমি এবার কোনো উইন্টার জ্যাকেট সাথে রাখি নাই। তার বদলে হাতব্যাগে রাখা ছিল পাতলা থেকে মোটা বিভিন্ন লেয়ারের কয়েকটা ভেস্ট আর একটা সোয়েটার। আশায় ছিলাম, আজ প্রায় ২০ দিন পর, ফিরবার টাইমে এইগুলান দিয়াই চামে চামে টরন্টোর মাইল্ড উইন্টারের ভিত্তরে ঘরে পৌঁছাইয়া যামু গিয়া।

এত্ত ভোরে ঢাকা এয়ারপোর্ট ফাঁকা শুনশান। ইমিগ্রেশন পার হয়া দেখি, টার্কির এয়ারলাইন্স তখনও ঢাকায় পৌঁছায়ে সারে নাই। আমগো বোর্ডিং হইব চার নম্বর গেইট দিয়া, সেইখানে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বিজ্ঞাপন আঁটা একটা গ্যাংওয়ে চুপচাপ খাড়ায়া রইছে। ঘড়িতে প্রায় ছয়টার মতন বাজতেছে। কাচের দেয়ালের পাশে বইসা বাইরের আন্ধারে একটা কাতার এয়ারলাইন্সরে দেখতে পাইতেছিলাম। বিশাল একটা উটের মতন রানওয়ের একপাশ দিয়া হাঁইটা যাইতেছিল। তারপর আস্তে আস্তে এক সময় আন্ধারে মিলায়া গেল।

টার্কি এয়ারলাইন্স আসলেন আরও ১০ মিনিট বাদে, সেই আন্ধার ফুঁইড়া সেই একই রাস্তা দিয়া। এইবার অবশ্য আলো ফুটতে শুরু করছে। এই সময় আমি আবিষ্কার করলাম আমার ক্যামেরার অটো ফোকাস কাজ করতেছে না। ছবি তুলতে পারতেছি না। শাটারের বাটনে চাপ দিলে লেন্স তার ইচ্ছা মতন ডাইনে বাঁয়ে ঘুইরা অ্যাডজাস্ট করার কথা, কিন্তু তা হইতেছিল না। ক্যামেরা ছাড়া ইদানিং নিজরে কানা কানা লাগে, মনটা বেজার হইয়া এয়ারক্রাফটের ভিত্তরে গিয়া সাঁধাইলাম।

নতুন একটা বিপদ লাউন্জে অপেক্ষা করার সময় থিকাই টের পাইতেছিলাম। ভিত্তরে ঢুইকা এইবার সেই বিপদের মুখামুখি হইলাম। আমার সিট পড়ছে ইকনমি ক্লাসের শুরুর দিকে, মাঝের সারির তিন নাম্বার রো-এর বাম দিকের আইলে। সেখানে বইসা এক চক্কর মাথা ঘুরাইয়া আমি টের পাইলাম, আমার ২০/২৫ ফুট রেডিয়াসের মধ্যে অন্ততঃ ৭ থেকে ৮টা বাচ্চা আমাদের সাথে ট্রাভেল করতেছে। এদের মধ্যে পালাক্রমে ২ থেকে ৩টা বাচ্চা চিল্লাইতেই আছে, যে কারণে তাদের আমি আইডেন্টিফাই করতে পারলাম অতি সহজে। তাদের বয়স মনে হইলো সবাই ২/৩ বছরের নিচে। তাদের কান্নার আওয়াজ দুই ধরনের, একটা হইল একটু সরল আর একঘেয়ে উঙ্গা উঙ্গা আর দ্বিতীয়টা হইল একটু ক্লাসিক ধাঁচের লম্বা টানের—আঁ আঁ আঁ (এক্সট্রা আরও কয়টা চন্দ্রবিন্দু লাগায়া লইতে পারেন আর কি), এইটা হইলো ননস্টপ? বেশ বুঝা যাইতেছিল, প্রত্যেকটা বাচ্চার সাথে আছে একটা ক্যাবলাকান্ত বাবা অথবা মা, কিংবা বোথ। যাদের নিজ নিজ বাচ্চাদের সাথে প্রপার কোনো কমিউনিকেশন গইড়া ওঠে নাই, বাচ্চা কিংবা বাবা-মা, তাদের কেউ কারো ভাষা বোঝেন না। এক বাবারে দেখলাম চিল্লানিরত বাচ্চারে কাঁধে ফালাইয়া খাড়ায়া খাড়ায়া টিভি মনিটরের ডিসপ্লে দেখতেছেন। ভাব-সাব দেইখা মনে হইল না, নিজের বাচ্চা কীসে খুশি আর কীসে বেজার হয়, তার বিন্দুমাত্র ধারণা ঊনার মগজে আছে।

ট্যাক্সিং কইরা রানওয়ের কিনারায় যখন যাইতেছি, এতক্ষণে ভিত্তরের হুলস্থুল কিছুটা মিনিমাইজ হইছে, এয়ার ক্রু আপা উনার সিটে বইসা কাঁধের উপর দিয়া সিট বেল্ট বাঁধতেছেন। আমার সিটের দুই ধাপ আগে, বাম দিকের প্রথম রো-এর আইলে এক আফ্রিকান কিংবা ক্যারিবিয়ান লেডি বসছেন, খুবই আকর্ষণীয় ভাবে ফিজিক্যালি ফিট, শরীরের বিভিন্ন বাঁক প্রদর্শনে যথেষ্ট সফল। আমাদের এয়ার ক্রু আপা বসছেন উনার মুখামুখি, বিজনেস ক্লাসের দিকে পিঠ দিয়া। পয়লা রো-এর সিটের সামনে কোনো ট্রে কিংবা টেবিল কিছু থাকে না, ফলে ক্যারিবিয়ান আপা তার হাতের বইটা রাখছেন বিজনেস ক্লাস আর ইকনমি ক্লাসের মাঝামঝি যে ইমারজেন্সি এক্সিট ডোর, তার একটা পাটাতনের উপর। আমার আইলের সিটে বসেই আমি বইটার নাম পড়তে পারতেছিলাম। সবাই এই মুচমুচা ক্রিশপি বইটার নাম জানেন মনে হয়—এরিকা মিশেলের ফিফটি শেডস অব গ্রে

কী একটা কারনে রানওয়ের মাথায় গিয়া আমরা বইসা আছি, তো বইসাই আছি। টেক অফ আর হইতাছে না। কতক্ষণ পর ক্রু আপা আনমনে বোরডম কাটানির উদ্দেশ্যে হাত বাড়াইয়া বইটা হাতে নিলেন। আপন মনেই পৃষ্ঠা উল্টাইতে লাগলেন। কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টানির পর দেখলাম তার মুখের চেহারায় একটা ভাব বদল ঘটতেছে, চক্ষু বড় হইয়া উঠতেছে, ঠোঁটের কোণে একটা হাসির ভাঁজ ফুইটা উঠতেছে। দোষের মধ্যে আমি সেই সময় অশিষ্টের মতন উনার মুখের দিকে তাকায়াছিলাম, হঠাৎ মুখ তুইলা উনি দেখলেন আমি উনারে দেখতেছি—এইবার উনি আর সামলাইতে পারলেন না, ফিক কইরা হাইসা দিলেন। আমিও খানিকটা ব্যাক্কলের মতো হাসলাম, যদিও সিউর হইতে পারলাম না ক্যান আমরা দুইজন একলগে হাসলাম।

প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টার জার্নি শেষ কইরা ইস্তানবুলে পৌঁছালাম দুপুর সাড়ে বারটা লোকাল টাইমে। আমাদের কানেক্টিং ফ্লাইট দুইটার সময়। মনের মধ্যে খচ খচ করতেছে, ক্যামেরা আর বিগড়ানোর টাইম পাইল না। কানেক্টিং ফ্লাইটে উঠতে গিয়া দেখি আমাদের জন্য বাস খাড়ায়া আছে। যাওনের সময়ও দেখছি টরন্টো ফ্লাইটের যাত্রীদের তারা কেন জানি বাসে চড়ায়া নিয়া যায়, আর সিঁড়ি দিয়া এয়ারক্রাফটের ভিত্তরে ঢুকায় কিংবা নামায়। টরন্টো ফ্লাইটের জন্য ক্যান তাগো কোনো গ্যাংওয়ে থাকে না, এই রহস্য ভেদ করা গেল না। হইতে পারে দুপুরের এই সময়টা তাগো রাশ আওয়ার, এই সময় সব গ্যাংওয়ে বিজি থাকে। আমি অবশ্য খুশি, সিঁড়ি দিয়া এরোপ্লেনে ওঠা আমার কাছে খুব নস্টালজিক লাগে। বাংলা মুভিতে এককালে বিলাত ফিরত নায়কেরা এই সিঁড়ির গোড়ায় খাড়ায়া তাগো নায়িকাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়তেন। কখনও গান গাইতেন, আমি তোমার কাছেএএ ফিরে এসেছি…।

ক্যাফে কিচেনেতে

ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে ক্যাফে কিচেনেট-এর ওয়েটারদের সাথে।

সমস্যা হইলো শখের ফটোগ্রাফার হওনের কারণে, ম্যানুয়াল ফটোগ্রাফিতে আমি ততটা উস্তাদ না। তবুও বাস থিকা নাইমা আমি ছবি তুলতে চেষ্টা করতেছিলাম, এয়ারক্রাফটের চাক্কা আমার ১০/১৫ ফুট সামনে। ম্যানুয়ালি ফোকাস করার চেষ্টা করতেছি, দেখি সিকিউরিটি ভাই আপত্তি জানাইতেছে, আমারে ইশারায় সিঁড়িতে উঠতে কইতেছে।

টরন্টোর ফ্লাইট টেক অফ করছে, আমার হঠাৎ ঢাকার কথা মনে হইল। গত কয়েকদিনের নানান কিসিমের স্মৃতি মাথার মধ্যে ঘুরতেছিল। কোথাও যাওয়ার সময় কয়েক ঘণ্টা জ্যামের মধ্যে বইসা থাকা, রিক্সা চইড়া খোলা বাতাসে ঘুরাফিরা, ভিড়ের রাস্তায় গাড়ি রিক্সার ফাঁকফোকড় দিয়া ওরাংওটাং-এর মতো রাস্তা পার হওয়া… টাঙ্গাইলের গ্রামে বেড়াইতে যাওয়া, খক খক কইরা ঘ্যান ঘ্যান করা নাছোড়বান্দা কাশি সারাইতে বাসকপাতার রস ছেইচা খাওয়া, আর তার ম্যাজিকাল থেরাপিউটিক গুণে মুগ্ধ হওয়া। সব মিলায়া এইটাই বাংলাদেশ, ভাল কিংবা মন্দ—এইটাই এখানকার স্টাইল। কত দিকে কত কিছুতে তারা খাটো হইয়া থাকে, অনেক কিছুতেই তাড়া তত দড় নয়। তা সত্ত্বেও কী অদম্য প্রাণশক্তি, এখানের মানুষের।

মনে আছে ‘৯১ সালের দিকে ঢাকায় জুয়েল একটা ৮০০ সিসির সুবারু গাড়ি কিনছিল। সে গাড়ি নিয়া আমরা বন্ধুরা খু্ব ঘুইরা বেড়াইতাম। এমন কি জোশের ঠেলায় সেই পিচ্চি গাড়ি নিয়া ঢাকার বাইরেও ঘুরতে যাইতাম। একদিন ময়মনসিং থেকে ফিরতেছি… জুয়েল গাড়ি চালাইতেছে, তার সিট বেল্ট বাঁধা, আমি বইসা রইছি পাশে। ত্রিশালের কাছে এক জ্যামে আমরা খাড়ায়া আছি, পাশে আইসা খাড়াইল এক বিশাল মালবাহী ট্রাক। ট্রাকের ড্রাইভার আছিল মহা ফাজিল। জুয়েলের পিচ্চি গাড়ি আর সিট বেল্ট বান্ধা দেইখা, তার হাসি আর থামে না। এত হাসি যে কথাই বলতে পারছিল না।… ও স্যার, এই ম্যাচ বাক্সের লাহান গাড়ি, তাতে আবার ফেটি বাঁধছুইন… হি হি হি। এতেই তার তামাশা শেষ হইল না, এরপর তার হেল্পারের কাছ থিকা তার গামছা চায়া নিয়া সেও একটা সিটবেল্ট-এর মতো ফেটি বাঁধলো।

biswajit3

“বাংলা ম্যুভিতে এককালে বিলাত ফিরত নায়কেরা এই সিঁড়ির গোড়ায় খাড়ায়া তাগো নায়িকাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়তেন।”

সিকিউরিটি নিয়া ফাজলামি করা এই ট্রাক ডাইভারের চালচলনরে তো আমরা স্টুপিডিটি কইতেই পারি। কিন্তু মানতেই হবে, তার উইট ছিল আনপ্যরালাল। এমন কি জীবনের কোন অনিত্য বোধ আর অনিশ্চয়তা থিকা মানুষের মনে এই ধরনের কৌতুক পয়দা হয়, তার হদিশও আমরা চাইলেই করতে পারি।

টরন্টোর আকাশে আইসা পড়ছি, সামনের ডিসপ্লেতে দেখাইতেছে আর বিশ মিনিটের মধ্যে আমরা ল্যান্ড করুম। মাটি থিকা আমাদের উচ্চতা ধাপে ধাপে কমে আসতেছে। এবড়াখেবড়া রাস্তায় গাড়ির ঝাকুনির মতো সবকিছু ঝন ঝন আওয়াজ করতেছে। এ সব কিছুর সাথে পাল্লা দিয়া ড্যানিয়েল ক্রেইগ সাব ইনফ্লাইট মুভির স্ক্রিনে বন্ডগিরি ফলাইতেছে… টম ক্রুজ সাব মিশন একমপ্লিশমেন্ট করতেছে। বাস্তব আর অবাস্তবতার মাঝামাঝি এই অবস্থায় ভিতরের সব উজ্জ্বল আলো নিভায়া দিয়া উইন্ডো প্যানেলের লাল নীল আলো জ্বালায়া দেওয়া হইছে। চারপাশে একটা মোহময় পরিবেশ… দ্রুত আগায়া আসতেছে টরন্টোর শক্ত মাটি।

এখনও টরন্টো আইসা নামি নাই, বাংলাদেশের অনিত্য বোধ আর অনিশ্চয়তা কি এখনও আমাকে ঘিরা রাখছে? ভাঙা রাস্তার গর্ত কিংবা খোলা ম্যানহোল পাশে রাইখা অবহেলায় হাঁইটা যাওয়া, ভিড়ের রাস্তায় ওরাংওটাং-এর মতো রাস্তা পার হওয়া… এই সব দক্ষতা তো চাইলেই আমি মুইছা ফেলতে পারব না।

পিয়ারসন এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে যাইতেছি, এখনি চাক্কা রানওয়ে টাচ করবে। ধরতে পারলে এয়ার ক্রু’রা আমারে অবশ্যই মহা স্টুপিড ঠাওরাইব…। তবুও সারা রাস্তা যা কইরা আসছি, এইবারও সিটবেল্ট না বাইন্ধা আমি বইসা রইলাম। দেখি, ফেটি না বান্ধলে কী সমিস্যা হয়!

ভাবতেছি টরন্টো ফিরা গিয়া মাঝে মাঝেই রেড লাইটে ওরাংওটাং-এর মতো রাস্তা পার হমু।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

বিশ্বজিৎ মুনশি
বিশ্বজিৎ মুনশি

জন্ম বাংলাদেশের দিনাজপুরে, ১৯৬২ সালে। ছোটবেলার দীর্ঘ সময় কেটেছে বাংলাদেশের বাইরে। ১৯৭৬ সাল থেকে ছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজকল্যাণে অনার্স এবং মাস্টার্স। সক্রিয় ভাবে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।

২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বাইরে। প্রথমে ছিলেন লন্ডন ইউনাইটেড কিংডম, সেখানে বাংলা ইংরাজি ইন্টারপ্রেটিং-এ ডিপ্লোমা করেন। ২০১০ সাল থেকে আছেন কানাডার টরন্টো শহরে।

Leave a Reply