page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

“আমার কোনো পরিবেশ লাগে না।… একা হওয়াটা খুব সোজা।”—ফরিদ কবির

সাঈদ রূপু: জন্ম কত সালে, কোথায়?

ফরিদ কবির: জন্ম ঢাকা শহরেই ১৯৫৯ সালে, ২২ জানুয়ারি।

সাঈদ: লেখালেখিতে আসলেন কীভাবে ?

ফরিদ: লেখালেখিতে একেবারেই বাই চান্স। মানে কখনো স্বপ্নই দেখি নি। একদিন আমি স্কুলে গেলাম। আমাকে স্কুলের টিচার বলল যে, আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, বললো যে একটা সংকলন বের হচ্ছে তুমি একটা কবিতা দাও। মানে কবিতা দাও আমাকে বলে নাই। সবাইকে বলেছে ক্লাসে, যে তোমরা কবিতা দাও। কেউ লেখে নি আমার ক্লাসে। আমার মাথায় এসে ঢুকল একটা কবিতা দিতে হবে এবং আমি সারারাত ভেবে একটা কবিতা লিখলাম। এবং স্কুলে দিলাম, ম্যাগাজিনে সেইটা ছাপা হলো। পুরনো ঢাকায় থাকি। ছাপা হওয়ার পরে আমার এক বন্ধু, সে বলল, যেহেতু পুরান ঢাকার ছাত্র, সে বলল, আব্বে হালায় তুই বি দেখি কবি হইয়া গেছিস গা। ও বলল ঠিক এইভাবে। কিন্তু আমি আসলে, আমার মধ্যে কাজ করতে শুরু করল যে তাহলে তো আমি কবি হয়েই গেছি। রবীন্দ্র বা নজরুলের মতো একটা কিছু। এইটা আমাকে আসলে ইন্সপায়ার করলো। পরে এই লেখা শুরু হলো।

boimela-logo-2016
সাঈদ: কত সালে এটা?

ফরিদ: ইন নাইনটিন সেভেন্টি থ্রি।

সাঈদ: এ পর্যন্ত আপনার কয়টা বই বের হইছে?

ফরিদ: পঁচিশটার মতো।

সঈদ: আর এই বইমেলাতে কয়টা আসছে?

ফরিদ: এই বইমেলাতে দু’টো।

সাঈদ: নামগুলো কী?

ফরিদ: একটা নাম হচ্ছে, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামে একটা বই বেরুচ্ছে। আরেকটা হচ্ছে আমার কবিতার বাংলা এবং ইংরেজি ভাষা, মানে দ্বিভাষিক আর কি—একটা সংকলন, সিলেক্টেড পোয়েমস্, ফরিদ কবিরের কবিতা ।

সাঈদ: এইগুলা কী নিয়ে লেখা?

ফরিদ: না। এইগুলি কবিতার বই।

সাঈদ: কবিতাই তো। মানে কী তুলে আনছেন আপনার কবিতার মাধ্যমে?

farid-kabir-bookফরিদ: আমার কবিতায় আসলে আমি মানুষের কথাই বলি। যখন আমি গাছ নিয়ে লেখি তখনও আসলে মানুষের কথা বলি। গাছের মধ্যে মানুষ। যখন আমি কাক নিয়ে কবিতা লিখি, তখন কাকের মধ্যে আমি মানুষকে দেখি। অথবা মানুষ নিয়ে যখন কবিতা লিখি তখন তার মধ্যে অসলে কাক… মানে এই  যে আমার যেইটা মনে হয় যে, এখন মানুষের মধ্যে আসলে প্রকৃতির সবগুলো উপাদান মানুষের মধ্যে আছে। অর্থৎ একটা মানুষ একই সঙ্গে শকুন, একই সঙ্গে সাপ, একই সঙ্গে হায়না, একই সঙ্গে নেকড়ে, একই সঙ্গে সে মানুষও। হ্যাঁ, মানে মানুষের মধ্যে সব কিছু উপাদান আছে। গাছের উপাদানও আছে। কখনো কখনো নিজেকে আমার গাছও মনে হয়। তো, এইগুলিই আমার বিষয়।

সাঈদ: আচ্ছা আপনার বই থেকে যে কোনো একটা কবিতা শুনান, যেটা আপনার পছন্দের।

ফরিদ: আমার কোনো কবিতা আসলে মুখস্থ নাই। দু লাইনের একটা কবিতা বলা যাইতে পারে, সেটা হচ্ছে—বৃষ্টিকেও আমার মানুষ বলেই মনে হচ্ছে, বৃষ্টিকেও আমার মানুষ বলেই মনে হচ্ছে

সে যখর ঝরে সে যখন ঝরে মনে হয় মাটি নয় ভিজে যাচ্ছি আমি তোমার স্পর্শে।

সাঈদ: আচ্ছা আচ্ছা। আপনার প্রিয় লেখক, কবি?

ফরিদ: বাংলাদেশের? না…

সাঈদ: বাংলাদেশের।

ফরিদ: বাংলাদেশের প্রিয় কবি কয়েকজন। শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, সিকদার আমিনুল হক, মান্নান সৈয়দ।

সাঈদ: কাউকে কি আপনি অনুকরণ করেন?

ফরিদ: না ।

সাঈদ: আপনার মতো আপনে করেন?

ফরিদ: আমি একেবারেই, যারা অনুকরণ করেন, তাদেরও বিরুদ্ধে। মানে আমি অনুকরণ করি না। হ্যাঁ, প্রভাব থাকতে পারে। আমরা…  প্রভাব কী বলে? প্রভাব হচ্ছে যে, এই যে আপনার সাথে কথা বলছি, আপনি এই রকম করে দাঁড়িয়ে আছেন। আমিও। আমারও মনে হলো যে আমিও এইভাবে একটু দাঁড়াই। ফলে, আসলে আমরা একেকজনের প্রভাব আরেকজনের কাজ করে। কথা বলতে বলতে কাজ করে।

সাঈদ: তো এই যে আপনে বললেন যে আপনি এইটার বিরুদ্ধে, যারা অনুকরণ করে। তো, এইটা নিয়ে কি আপনার পরবর্তী কোনো বই লেখার ইচ্ছা আছে?

ফরিদ: আমার এই বিষয়ে বই আছে। আমার একটা গদ্যের বই আছে, যেটা বেরিয়েছে এইবারই। ও সেইটা আমি বলতে ভুলে গেছি আমার আরেকটা বই বের হয়েছে, সেটা হচ্ছে গদ্যের বই একটা প্রবন্ধের বই, ‘আমার গদ্য’, এই নামে। অ্যাডর্ন-এর।

সাঈদ: এইটা… মানে কী ধরনের মেসেজ দিবে? যে মানে কোন ধরনের জাগরণ তৈরি করবে?

ফরিদ: এটা হচ্ছে, আমি বলতে চেয়েছি যে, আমাদের আসলে নতুন ভাষায় লেখা উচিত। আমাদের নিজেদের কবিতার জন্যে নিজেদের ভাষা, নিজেদের প্রকরণ, নিজেদের একটা টেকনিক আমাদের থাকা উচিত। প্রত্যেকটা কবিরই আসলে একটা নিজেস্ব ভাষা থাকে। এবং নিজস্ব একটা টেকনিক থাকে। সে কীভাবে লিখবে। কীভাবে সে বলবে। তার দেখার চোখটা কী হবে। আমি আপনাকে এই ভাবে দেখছি, আপনার চেহারাটা এই রকম। কিন্তু আমি যদি উপর থেকে দেখি, তাহলে আপনাকে কেমন দেখবো। আমি যদি ডান দিক থেকে দেখি কেমন দেখবো। আমি যদি কৌণিক অবস্থান থেকে দেখি তাহলে কেমন দেখবো। এই যে মানুষের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে আমাদের মানুষের চেহারা বদলে যাচ্ছে। হুম? ফলে আমি মনে করি যে কবিতার ভাষাটাও এই রকম, যে আমাদের দেখার চোখ যদি বদলে যায় তাহলে আমাদের কবিতার ভাষাও বদলে যাবে। কবিতার টেকনিকও বদলে যাবে। আমাদের মুশকিলটা হচ্ছে যে, আমাদেরকে লোকজন বলেছে যে, তুমি এইভাবে কাজটাকে দেখ, ওইভাবে আমরা দেখা শুরু করি।… আমাদের চার পাশের বন্ধুরা, অথবা আমাদের পরিবারের সদস্যরা, অথবা আমাদের বাবা মা বলে দেয় যে, তুমি এইভাবে দেখ। ফলে আমরা দেখি। ঐ দেখার চোখ থেকে যখন বেরিয়ে গিয়ে আমরা বলবো যে, নিজেদের মতো farid-kabirকরে দেখো, তাইলেই আমরা নিজেদের মতো করে লেখতে পারবো।

সাঈদ: আচ্ছা এই বইগুলি কত দিন যাবৎ নিয়ে লিখছেন? মানে এই বইগুলার লেখার সময়টা কী? আপনার কোন সময়টা লেখালেখিতে পছন্দ হয়?

ফরিদ: আমি সাধারণত রাতের বেলায় লিখি। ইদানিং অবশ্য দিনের বেলাও লিখি। মানে দিনের বেলা অফিসেও লিখি। যখন আমি ফাঁকা থাকি তখন অনেক সময় কম্পিউটারে বসে লিখি।

সাঈদ: অফিসে লিখা হয়? মানে অনেকেই আছে, যেইটা, অনেকেই বলে যেইটা লেখালেখির জন্যে একটা পরিবেশ দরকার। অফিসে কি সেই পরিবেশ আছে?

ফরিদ: আমার কোনো পরিবেশ লাগে না। আমার সামনে যদি এই যে আপনারা বসে গল্পও করেন, আমি একা হয়ে যেতে পারি। হু? মানুষ মূলত একা। এমনকি জনসমাবেশে। আমরা এখন তিনজন, এই সমাবেশের আমরা কিন্তু তিনজন হয়ে গেছি। ফলে একা হওয়াটা খুব সোজা। মানে আমি সবার সঙ্গে কথা বলছি, কিন্তু মাথায় হয়তো অন্য কিছু ভাবছি। যখন ভাবছি তখন আসলে আমি কিন্তু একাই। আমি হয়তো কারো কথা ভাবছি না। তখনও আমি একাই। কারণ আমি শুধু তার কথা ভাবছি। ভাবছি না?

সাঈদ: ওকে আপনাকে, থ্যাংক ইউ।

ফরিদ: থ্যাংক ইউ।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ৬/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও

About Author

সাঈদ রূপু

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় অনার্স।