page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আমার গাঁদা ফুলের গাছ

গাঁদা ফুলের​ একটা গাছ কিনছিলাম দোয়েল চত্বরের​ পাশ থেকে। তখনই গাছটার মধ্যে ফুল ভর্তি। কমলা রঙের গাঁদা ফুল।

আমি অবশ্য কিনতে চাই নাই গাঁদা ফুলের গাছ। মূলত কিনব গোলাপ গাছ। তো গোলাপের যেই জাতটা কিনলাম, তা কিনার পর হাত খালি হইয়া গেল।

আম্মু বলতেছে, যেই পরিমাণ টাকা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়া আমরা একটা গাঁদা তো কিনতেই পারি। কিন্তু গাঁদার মধ্যে কয়েকটা ছাড়া প্রায় সবগুলাই অপুষ্টিতে ভুগতেছে বইলা মনে হইল।

অসুন্দর অসুন্দর সব গাছ। দেইখা কিনতে ইচ্ছা করল না। কিন্তু আম্মুকে বললাম, অন্য গাছ কিনা দেয়ার জন্য এর মধ্যেই​ বেশি টাকা নিয়া আমারে আবার নিয়া আসতে হবে। তারপর গোলাপ গাছ যখন গাড়িতে ওঠানো হইতেছে তখন দেখি আম্মু একটা গাঁদা গাছ নিয়া গাড়ির কাছে আসতেছে।

আমি আর কিছু বললাম না। গাড়িতে​ উইঠা বসলাম।

এরপর গাছ বাসায় আনার পর আমার বারান্দায় সাজায়ে রাখলাম আর প্রতিদিন মোটামুটি নিয়ম কইরা দুই বেলা পানি দিতে থাকলাম। ফলে সব কয়টা কুঁড়ি থেকেই ধীরে ধীরে ফুল ফুটল। ফুল ফোটার এই ব‍্যাপারটা আমি বেশ উপভোগই করলাম।

বাসায় যারা আসতো তারা রুম থেকেই গাছ দেইখা বারান্দায় যাইত আর ফুলভর্তি গাছ দেইখা স্বাভাবিক একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করত। ব‍্যাপারটা ভাল লাগার মতো।

এরপর একসময় পুরাতন ফুলগুলা ধীরে ধীরে ঝইরা গেল এবং বেশ অনেক দিনের ব‍্যবধানে নতুন কুঁড়ি আসল। কিন্তু তা তো কেবল আমার গোলাপ গাছে। পাশে যে গাঁদা ফুলের গাছ পইড়া আছে, তার বেলা?

আমি চিন্তিত হইলাম।

গাঁদা গাছের ফুলও ঝরল, পাপড়ির বর্ণ পরিবর্তন হইল আর পাপড়ির কোমল কোমল ব‍্যাপারটা গিয়া একটা কঠিন ভাব আসল। এবং আমার মনে হইল এই ফুলগুলা ঝইরা গেলে​ এবার নতুন পাতা, নতুন ফুল আসবে। কিন্তু পাপড়ি ঝরতে ঝরতে ফুল সব ঝইরা পরার পর পাতাও শক্ত হইতে থাকল। আমার মনে হইল, “গাছটা কি তাইলে সামহাউ মইরা যাবে?”

কিন্তু তার কোনো কারণই ঘটে আসল না। কোনো অযত্ন বা ভুল পরিচর্যা তো করি নাই আমি। সবার হাতে নাকি বাগান হয় না, আমার হাতে কি গাঁদা গাছ বাঁচে না!

ইন্টারনেট খুইলা বসব, তার আগেই ভাবি আইসা বললেন, গাঁদা নাকি একবার ফুল দিয়াই মইরা যায়। এইটা শুইনা আমি খুবই অবাক হইলাম। এই গাছ এত এভেইলএভেল যে অনেক জায়গায়ই তা দেখছি আমি। আমাদের স্কুলের বাগানেও ছিল গাঁদা ফুলের গাছ। তারাও কি একবার ফুল দিয়া মইরা যাইত? মনে পড়তেছে না। আর যদি তা-ই হয়, তাইলে এই ধরনের আত্মত্যাগের​ মানে কী?

মনটা বিতৃষ্ণায় ভইরা গেল।

তারপর ইন্টারনেট ঘাইটা মোটামুটি যা বুঝলাম তা হইতেছে—তাপমাত্রা, পুষ্টি, সার, যত্ন ইত‍্যাকার জিনিসের উপর গাঁদা গাছের উৎপাদন নির্ভর করে। তা আমার পরিচর্যা অনুযায়ী ঠিকই আছে। কিন্তু এইটা মূলত একটা শীতকালীন ফুল, যদিও এখন গ্রীষ্ম ও বর্ষার সময়ও চাষ করা হয়, কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে শীতকালে ফোটে। আর আমার গাছটাও শীতের সময় কেনা। শীতে এরমধ্যে ফুল দেয়া হইছে এবং শীতের শেষে তা ঝইরাও পড়তেছে। অতএব আর ফুল দেয়ার কথা না।

কিন্তু ইন্টারনেটে​ আমি যতটুকু দেখলাম তাতে একবার ফুল দিয়া গাঁদা গাছ মইরা যাবে এমন কিছু লিখে নাই।

আর আমার গাছটা মইরা যাইতেছিল।

এরপর যে কয়দিন ছিল গাছটা আর কিছু করি নাই। মানে পানি দেয়া, পরিষ্কার করা এইটুকুই।

এরপর​ শেষমেশ গাছটা একসময় পাতাসহ পুরোপুরি শুকায় গেল। দেখতে হইল শক্ত, কড়কড়া মতন। তারপর গাছটা টব থেকে মূলসহ তুইলা আইনা অনেক দিন রাইখা দিছিলাম নিজের কাছে। হইতে পারে মরা গাছটার​ উপর রাগ ঝাড়তে।

এরপর আমার এক বন্ধু হঠাৎ বাসায় আইসা বলল, “তোর গাঁদা ফুলের গাছটা কই?” আমি বললাম যে তা আর নাই। হয়ত একবার ফুল দিয়া তা মইরা যায় বা আমি জানি না যে কেন তা মইরা গেল!

কিন্তু এই একবার ফুল দিয়া গাছ মইরা যায় শুইনা সে অদ্ভুত এক কুরুচিকর​ রসিকতা করল। প্রচণ্ড রাগে আমি মরা গাছটাও ফেলায়ে দিলাম আর ঠিক করলাম এই আত্মত্যাগওয়ালা বৃক্ষ আর জীবনেও কিনব না।

About Author

শৈলী নাসরিন
শৈলী নাসরিন

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, এইচএসসি (২০১৫-১৬), সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা।