page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আমার জিনসের শার্ট নাই

১.
আমার জিনসের শার্ট নাই। প্যান্ট একটা কয়দিন আগে কিনছি। ঢাকা কলেজের উল্টা দিকের নুরজাহান মার্কেটের দোতলা থিকা। ৬০০ টাকা নিছে। আমি মাঝে মাঝে পরি এই প্যান্ট। বেল্ট লাগাইতে হয়। খারাপ না। আমি এই প্যান্ট পইরা চিটাগাং, তারপরে কক্সবাজারও ঘুইরা আসছি। এই কয়দিন হইল।

জিনসের প্যান্ট নিয়া আমি কবিতাও লিখছি অনেক আগে। সে প্রায় ১৯৯৪ সালের কথা। তাই জিনস নিয়া বা তাহমিনারে নিয়া যখন বাংলা নিউজ পত্রিকায় লেখাটা আসল তখন আমার খুব ভালো লাগল। যেহেতু আমারও জিনসের প্যান্ট আছে তাই দেখলাম মনের ভিতরে জিনস পরা মেয়েদের প্রতি আমার কেমন একটা পক্ষপাত হইতেছে। একটা গুড ফিলিং। একটা পজেটিভ।

bratya-raisu-logo

এই মাসেই মানে জুনের (২০১৬) ৪ তারিখে আসছে খবরটা। যে ঢাকার বড়লোকের সংস্কৃতি এলাকা রবীন্দ্র সরোবরে নাকি জিনস পইরা এক ‘মেয়ে’ বাদাম বিক্রি করতেছে!

খবরটা দিছে অনলাইনের গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম। পত্রিকার সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট মফিজুল সাদিক ফিচারটা করছেন। ফিচারের নাম: স্মার্ট বাদাম বিক্রেতা ‘তাহমিনা কথা’

জানা গেল তাহমিনা রহমানের বয়স ২৩ বছর। তিনি লালমাটিয়া মহিলা কলেজে তৃতীয় বর্ষে পড়াশুনা করেন।

তাহমিনা আলোচনায় আসছেন কারণ তিনি অভিজাতদের একজন হইয়াও ঢাকার ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ঘুইরা ঘুইরা বাদাম বিক্রি করেন।

ইমেজ লিংকে বাংলা নিউজে প্রকাশিত স্মার্ট বাদাম বিক্রেতা তাহমিনার ছবি।

আমার ভাল্লাগছে এই রকম কেউ একজন বাদাম বিক্রি করেন জানতে পাইরা। আমি ঠিক করছি জিনসের প্যান্ট পইরা রবীন্দ্র সরোবরে যাব বাদাম কিনতে। বাদাম বিক্রেতা মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে কি আমার দেখা হবে না?

আমি তার কাছ থেকে ১০ টাকার বাদাম কিনব।

২.
ছবিতে দেখলাম কালো আর ছোট কাগজের বক্সে ভরা বাদাম বিক্রি করতেছেন তাহমিনা। মফিজুল সাদিকের ভাষায় ‘নান্দনিক কালো ঠোঙ্গায়’।

এই ছোট কালো নান্দনিকে কতটুক বাদামই বা ধরবে, এই রকম একটা দুঃশ্চিন্তাও আমারে কাবু করল। কিন্তু আমার এই লেখার বিষয় আসলে এইসব কিছু না। আমার বিষয়—’স্মার্টনেস’। আমি অনেক স্মার্ট হইতে চাই।

কাকে স্মার্ট বলে? সামাজিক মাধ্যমে বা আরো ভালো কইরা বললে বিপ্লবী গণমাধ্যম ফেসবুকে এই বাদাম বিক্রি করা নারীকে ‘স্মার্ট’ বলায় কিছু আপত্তি উঠতে দেখা গেছে। আমার মনে হইল, আমার দৃষ্টিভঙ্গিটা এই সুযোগে একটু তুইলা ধরি না কেন?

তাই এই লেখা। কম্পিউটারে লিখতেছি।

৩.
খেয়াল করলেই দেখবেন, স্মার্টনেসের সঙ্গে যায় এমন কোনো স্থির নির্ধারিত পোশাক কিন্তু নাই। যে কোনো পোশাকেই মানুষরে স্মার্ট লাগতে পারে। বরং পোশাক ছাড়াই অনেকে বেশ স্মার্ট।

তবে আমরা যেই সমাজে থাকাথাকি করি, মাইনাও নিছি অল্প অল্প, তারেও তো বুঝতে হবে। সমাজে এখনও লুঙ্গি পরা মানুষদের কেউ স্মার্ট কিন্তু বলে না। এই রকম বলে যে, স্মার্ট লোকরাও লুঙ্গি পরে।

তো যুক্তি দিয়া লুঙ্গি কতই না স্মার্ট পোশাক তা অনেক চিন্তাবিদই দেখাইতে পারবেন ঠিকই কিন্তু সমাজে আমি দেখছি জিনস পরা লোকদেরকেই এখনো মানুষ স্মার্ট মনে করে।

অবশ্য খালি জিনস পরলেই হবে এমন না। স্মার্ট মেয়ে বা ছেলেটারে অতি অবশ্যই আসতে হবে স্বচ্ছল ফ্যামিলি থিকা। তবেই আপনি স্মার্ট হবেন। ফকিন্নিকা জিনস ত্যানা বরাবর।

তাই আমি মনে করি, ‘অভিজাত’ পরিবার থিকা নেমে আসা জিনস পরা বাদাম বিক্রেতা নারীকে স্মার্ট বাদাম বিক্রেতা বলা কোনো দোষের কথা না। বরং স্মার্ট’ বলার মধ্য দিয়া সমাজেরই প্রচলিত ধারণারে সমাজের ভাষায় প্রকাশ করা হয় । তিনি স্মার্ট বাদাম বিক্রেতাই।

৪.
সমাজে আমি দেখছি বাদাম বিক্রেতারা প্রায় সবাই লুঙ্গি নাইলে প্যান্ট পরে। প্যান্ট পরলেও দেখছি তাদের স্মার্ট বলতেছে না কেউ। বড়জোর বলে, বাদাম বেচা ছেলেটা বা লোকটা দেখো প্যান্ট পরছে! হাসে।

স্মার্টনেসের বাজার চলতি ধারণা দিয়া লুঙ্গি বা প্যান্ট পরা বাদাম বিক্রেতারে ‘স্মার্ট বাদাম বিক্রেতা’ বলার সুযোগ নাই। খালি কেউ যখন স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত ঘর থিকা আইসা বাদাম বেচার মত ছোট কাজ করবে তখনই সমাজ তারে ‘স্মার্ট বাদাম বিক্রেতা’ বলতে পারবে। সে তিনি লুঙ্গি পইরা বেচলেও।

আমাদের সাহসী নারী তাহমিনা রহমান এখন যদি আমার পরামর্শ পাইয়া লুঙ্গি পইরাও বাদাম বেচতে যান তারে মিডিয়ার কর্তারা বরং আরো বেশি স্মার্ট হিসাবে উপস্থাপন করবেন বইলা আমার ধারণা।

আর লোকে যতই ‘মহৎ’ ‘মহৎ’ করুক আসলে কিন্তু কাজের ছোট বড় আছে। বাদাম বেচা একটা অত্যন্ত ছোট কাজ। ‘অত্যন্ত’টা বড়জোর বাদ দেওন যায়। কিন্তু ছোট কাজই।

তবে বড়লোকরা যখন এই ধরনের ছোট কাজ করতে আসবেন তখন সেই বিক্রেতার পক্ষে স্মার্ট না হইয়া উপায় নাই। যার যা কাজ না সেই কাজ তিনি করলে পরে তবে তা স্মার্ট কাজ হয়!

এমনিতে ছেলেদের লুঙ্গি পরিধানরে স্মার্ট পোশাক হিসাবে আমাদের সমাজে এখনো ধরা হয় না। সামাজিক মেলামেশার অনেক জায়গায় লুঙ্গির এমনকি প্রায় প্রবেশাধিকারই নাই। যারা লুঙ্গিরে স্মার্ট পোশাক বলতে চান তারা তাদের স্মার্ট কর্মক্ষেত্রে স্মার্ট লুঙ্গি পইরা কোনোদিন স্মার্ট অফিস করতে পারবেন বইলা মনে হয় না।

একটিভিজম বা পতাকা হিসাবে লুঙ্গি অবশ্য ঠিকই আছে।

৮/৬/২০১৬

About Author

ব্রাত্য রাইসু
ব্রাত্য রাইসু

কবি, বুদ্ধিজীবী, চিত্রশিল্পী, সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ও বিদূষক।