page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আমার দেখা হুমায়ুন আজাদ

১.
হুমায়ুন আজাদ আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন! আমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হলেও বাংলা আমার সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট ছিলো!

জীবনে তার সঙ্গে অনেক বেয়াদবি আমি করেছি! উত্যক্তও তাকে কম করি নি!

তার সামনেই আমি সিগারেট খেতাম! একবার এটা নিয়ে আমাকে কথাও শুনিয়েছিলেন! আমাকে দেখিয়ে তার এক সহকর্মীকে বলেছিলেন, দ্যাখো, আমাদের শিক্ষকদের সামনে দাঁড়ালে আমাদের হাঁটু কাঁপত! আর, এই বদমাশ আমার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে!

আমি আজন্ম বেয়াদব। ত্বরিৎ জবাব দিলাম, স্যার, আপনাদের শিক্ষকরা ছিলেন জ্ঞানী। তাদের সামনে দাঁড়ালে হাঁটু কাঁপাই স্বাভাবিক!

তিনি ভয়ানক ক্ষেপে গেলেন, বললেন, তুমি দূর হও আমার সামনে থেকে।

হুমায়ুন আজাদকে উত্যক্ত করার জন্য সব চাইতে বেশি আমাকে উসকে দিতেন কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর সাংবাদিক মশিউল আলম।

farid-kabir-logo

বইমেলার সময় হুমায়ুন আজাদ নিয়মিত আগামী প্রকাশনীর স্টলে বসতেন। আর বইমেলায় দেখা হলে প্রায়ই মশিউল আমাকে বলতেন, চলেন স্যারকে একটু খোঁচায়া আসি!

আমি একদিন আগামীর স্টলে গিয়ে বললাম, স্যার, আপনি কিন্তু সেলসম্যান হিসেবে খুব ভাল! আমি ভাবছি, আগামীবার আমিই একটা স্টল দেব আর আপনাকে সেলসম্যানের দায়িত্ব দেব।

স্যার তখন খুব ক্ষেপে গেলেন, বললেন, আমার সাথে বেয়াদবি করবে না! তুমি দূর হও এখান থেকে।

আমরা সেখান থেকে চলে এলাম!

সেদিন রাত আটটা পর্যন্ত আমরা বইমেলায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে আমার বউ আর মেয়েও ছিল! ছিল মশিউল আলমসহ আরও অনেকেই। হঠাৎ দেখি, হুমায়ুন আজাদ আমার দিকেই এগিয়ে আসছেন!

আমার ধারণা ছিলো, তিনি আমাদের সামনে অন্তত দাঁড়াবেন না! অন্য দিকে চলে যাবেন! কিন্তু না! তিনি এসে আমাদের সামনেই দাঁড়ালেন এবং যেন কিছুই হয় নি, এমন স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, আছো এখনো?

আমি আমার বউ আর মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে বললাম, স্যার, এটা আমার বউ, আর এটা আমার মেয়ে।

স্যার আমার বউ আর মেয়ের দিকে একবার দেখে নিয়েই বললেন, তুমি এত কুৎসিত আর তোমার মেয়ে এত সুন্দর হল কী করে?

শুনে আমার বউ খুবই অপ্রস্তুত হয়ে গেল! সেখানে দাঁড়ানো আমার অন্য বন্ধুরাও।

আমি বললাম, স্যার, এটা আমারই মেয়ে, আমি নিশ্চিত!

স্যার আর দাঁড়ালেন না! তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন!

mashiul-alam-1

“হুমায়ুন আজাদ নিয়মিত আগামী প্রকাশনীর স্টলে বসতেন। আর বইমেলায় দেখা হলে প্রায়ই মশিউল আমাকে বলতেন, চলেন স্যারকে একটু খোঁচায়া আসি!”

আমার বউ বলল, তোমার শিক্ষক হয়ে তিনি এমন একটা কথা কী করে বলতে পারলেন!

আমি বললাম, স্যারের মধ্যে একটা ছেলেমানুষি প্রতিশোধ-স্পৃহা আছে! কিছুক্ষণ আগে তাকে আমি একটা খোঁচা দিয়ে এসেছিলাম। সেটারই প্রতিশোধ নিলেন!

হ্যাঁ, আমাদের সম্পর্কটা এমনই ছিল! খোঁচাখুঁচির, অম্লমধুর।

কিন্তু এমন কথা বলার পরেও তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা এতটুকু কমে নি! আমার ধারণা, তিনিও আমাকে স্নেহই করতেন! কারণ, আমাকে তার আশেপাশে দেখলে তিনিই এগিয়ে আসতেন, কুশল জিজ্ঞেস করতেন।

মৃত্যুর বছরদুয়েক আগে ‘অন্যদিন’ পত্রিকার ঈদসংখ্যার জন্য আমি তার একটি ইন্টারভিউ করেছিলাম! আমার সঙ্গে কবি তুষার দাশ ও নাসরীন জাহানও ছিল! ছিল অন্যদিনের সম্পাদক মাজহারুল ইসলামও!

ইন্টারভিউটি সম্ভবত তার খুব পছন্দ হয়েছিল! সেদিনের আড্ডটাও! দেখা হলেই তিনি আমাকে বলতেন, তুমি আবার কবে আমার ইন্টারভিউ নেবে?

 

২.
বইমেলায় নিয়মিত আগামী প্রকাশনীর স্টলে বসতেন হুমায়ুন আজাদ। সেখানে দেখা হলে কুশল বিনিময় হতো। টুকটাক কথাও। মাঝেমধ্যে এটা সেটা নিয়ে তর্কও।

একবার তিনি একটা সাক্ষাৎকারে বললেন, বাংলাদেশের মাত্র পাঁচজন কবি ভবিষ্যতে টিকে থাকবেন! তাঁদের নামও তিনি জানাতে ভুললেন না! তারা হচ্ছেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ ও হুমায়ুন আজাদ।

সাক্ষাৎকারটি ছাপা হবার দিন দুয়েক পরই তার সঙ্গে আগামী প্রকাশনীর স্টলে দেখা। বললাম, স্যার, আপনার ইন্টারভিউ পডলাম!

স্যার আমার দিকে ফিরে বললেন, তাই? কেমন লাগল?

বললাম, ভালোই। তবে যাঁদের নাম বলেছেন তার সঙ্গে আমি একমত না।

স্যার বললেন, আমি তো তোমার ইন্টারভিউ দেই নি!

আমি বললাম, তা ঠিক। তবে আল মাহমুদের নাম বাদ দেয়াটা বোধ হয় ঠিক হয় নি! তা ছাডা, আপনার নামের আগে আমাদের অনেকের নাম আসবে!

হুমায়ুন আজাদ একটা বইয়ে অটোগ্রাফ দিতে দিতে বিরক্ত মুখে বললেন, তুমি এখন যাও। তোমার সঙ্গে পরে কথা বলবো।

আমি ওখান থেকে সরে এলাম।

zahid-hyder-3

“জাহিদ হায়দার জবাব দিলেন, আপনাকে আমি একজন আধুনিক মানুষ মনে করেছিলাম! কারণ আপনাকেও শামসুর রাহমানকে নাম ধরেই ডাকতে দেখেছি!”

রাত আটটার দিকে কবি জাহিদ হায়দারসহ আমরা কয়েকজন তথ্যকেন্দ্রের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে গল্প করছি। দেখি, হুমায়ুন আজাদ আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন।

সত্যি সত্যি তিনি আমাদের কাছেই এসে থামলেন। তার সঙ্গেও ছিল কয়েকজন তরুণ! সাহসী কথাবার্তা বলার কারণে তিনি তরুণদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন।

আমাদের সামনে দাঁড়াতেই জাহিদ হায়দার জিজ্ঞেস করে বসলেন, হুমায়ুন আজাদ, আপনি কেমন আছেন?

প্রশ্ন শুনেই তিনি ক্ষেপে গেলেন! জাহিদ হায়দারকে বললেন, তুমি আমার ছাত্র, তুমি আমার নাম ধরে ডাকতে পারো না!

জাহিদ হায়দার জবাব দিলেন, আপনাকে আমি একজন আধুনিক মানুষ মনে করেছিলাম! কারণ আপনাকেও শামসুর রাহমানকে নাম ধরেই ডাকতে দেখেছি!

হুমায়ুন আজাদ বললেন, তুমি আর আমি এক নই।

জাহিদ হায়দার জবাব দিলেন, রাহমান ভাই আপনার এক দশকের সিনিয়র, আপনি তাঁকে নাম ধরে ডাকতে পারলে আমি কেন আপনাকে নাম ধরে ডাকতে পারবো না।

হুমায়ুন আজাদ তখন এক বেমক্কা জবাব দিলেন যেটি শোনার জন্য আমরা কেউ তৈরি ছিলাম না!

তিনি বললেন, দেখো, আমি এমএ পাশ, আর শামসুর রাহমান তো বিএ পাশ!

 

৩.
হুমায়ুন আজাদের কবিতা ও উপন্যাস আমার কখনো তেমন প্রিয় ছিল না! তার ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ ও ‘জ্বলো চিতাবাঘ’-এর কিছু কবিতাই আমার ভাল লেগেছিল! তবে তার গদ্যের বইগুলো অসাধারণ! ‘লালনীল দীপাবলি’ বা ‘কতো নদী সরোবর’-এর মতো বই তিনি ছাড়া আর কারোর পক্ষেই লেখা সম্ভব না! তার বাক্যতত্ত্ব, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান, কিংবা দ্বিতীয় লিঙ্গ’-র মতো বইয়ের জন্য এদেশের পাঠক তাঁকে অনেকদিন মনে রাখবেন বলেই মনে হয়।

oloukik-steamer

jolo-chitabagh

তিনি আমাদের সময়ের সব চাইতে সাহসী লেখক।

আমাদের কবি-লেখকদের এখন সবাইকেই পরোয়া করে চলতে হয়। তা রাষ্ট্র হোক, প্রতিষ্ঠান হোক, বা হোক নিছক সাহিত্য সম্পাদক! তিনি অন্তত কোনোকিছুকেই তোয়াক্কা করতেন না।

তার জন্য অশেষ শ্রদ্ধা।

About Author

ফরিদ কবির

কবি ও প্রাবন্ধিক। জন্ম. ঢাকা। প্রকাশিত বই ২৭টি। উল্লেখযোগ্য বই: 'ওড়ে ঘুম ওড়ে গাঙচিল', 'অনন্ত দরোজাগুচ্ছ', 'মন্ত্র', 'ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম', 'আমার কবিতা', 'প্রেমের কবিতা', 'ফরিদ কবিরের কবিতা', 'আমার গদ্য' ইত্যাদি। সম্পাদনা: 'মন্ত্র' (ছোট কাগজ), সাপ্তাহিক কাগজ, মাসিক নতুনধারা।