page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আমার নিরাপত্তা কখনোই আমার উদ্বেগের বিষয় না—শাহ রুখ খান

২০১৩ এর জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের আউটলুক ম্যাগাজিনে শাহ রুখ খানের একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়—’বিইং এ খান‘।  সে সময় লেখাটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আর্টিকেলটির এক জায়গায় শাহ রুখ খান লিখেছেন,  “নেতারা আমাকে আমার দেশ ছেড়ে সেখানে ফিরে যেতে বলেছেন যেটাকে তারা আমার ‘আসল দেশ’ বলেন।”

outlook-shah-rukh-1

মূলত এই লাইনকে কেন্দ্র করেই বিতর্কের শুরু।

বিতর্কের প্রতিক্রিয়ায় সে সময় শাহ রুখ খান মিডিয়ায় একটি বিবৃতি দেন।  সাম্প্রতিক ডটকমে শাহ রুখ খানের সে আর্টিকেলটির বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছিল। এখানে বিবৃতিটি ছাপা হচ্ছে।

***

শাহ রুখ খানের বক্তব্য

আমার মতে, আমাদের সবার জীবনেই আমরা তিনটি পরিচয় দ্বারা সংজ্ঞায়িত।

এই তিনটি পরিচয়ের দুইটি মূলত আমরা সৌভাগ্যবশত জন্মসূত্রে পেয়ে থাকি। আর এই পরিচয় দুটি নিঃশর্তভাবে ভালোবাসার ও গ্রহণ করার ব্যাপার।

প্রথম পরিচয়টি পাওয়া যায় একজন কোথায় জন্মগ্রহণ করে তার ভিত্তিতে। আমাদের মাতৃভূমি। এটা আমাদের সংজ্ঞায়িত করে। ফলে এখানকার সবাই সর্বপ্রথমে আমার মতই গর্বিত ইন্ডিয়ান।

দ্বিতীয়টি হল আমাদের পারিবারিক নাম এবং আমাদের বাবা মা যেভাবে আমাদের লালন পালন করে। এখানকার অনেকের মতই আমার নাম হল খান। এখানকার সবার মতই আমি আমার বাবা-মা কে নিয়ে গর্বিত। আমি তাদেরকে নিঃশর্তভাবে ভালবাসি।

লাদাখে ঈদের নামাজে শাহ রুখ খান

লাদাখে ঈদের নামাজে  শাহ রুখ খান, ২০১২

তৃতীয়টি হল, আমরা যে প্রফেশন বেছে নেই তা আমাদের সংজ্ঞায়িত করে। নিয়তির কিছু চালাকির কারণে আমি একজন সেলিব্রিটি। আর্ট ও মিডিয়ার ক্ষেত্রে একজন পাবলিক ফিগার। এখানে উপস্থিত বেশিরভাগের মতই।

আমি আগেই বলেছি যে ইন্ডিয়ান হওয়া ও আমার বাবা-মা’র সন্তান হওয়া আমার জীবনে নিঃশর্তভাবে গ্রহণযোগ্য সত্য, এবং আমি এই দুইটি ব্যাপারেই গর্বিত।

তৃতীয়টি… পাবলিক ফিগার হওয়ার কারণে আমাকে যে কোনো ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, ভালো অথবা খারাপ বিশেষণ দিতে হয় এবং মাঝে মাঝে লোকজন আমার নাম এবং বক্তব্য কোনো পজিটিভ অথবা নেগেটিভ সেন্টিমেন্টের সাথে জুড়ে দিয়ে আমাকে বিতর্কের বিষয়ে পরিণত করে। আমি সবার আগেই এই সব কিছু মেনে নেই কারণ আমি এই জীবন বেছে নিয়েছি এবং আমি এটাতেই থাকব। আমি যা আমি তা হয়েছি আমার প্রফেশনে আমি হয়ে যে ভালোবাসা ও প্রশংসা পেয়েছি তার কারণে… আমাকে স্টার বানানোর জন্য আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।

এখন পুরো ইস্যুটি নিয়ে বলব, আমার আর্টিকেল নিয়ে ব্যাপারটি অপ্রত্যাশিতভাবে ভুল দিকে মোড় নিয়েছে। এমনকি আমি বুঝতেও পারি না এই বিতর্কের ভিত্তি আসলে কী।

আরো পড়তে পারেন: ‘একজন খান হিসাবে’—শাহ রুখ খানের আত্মজৈবনিক রচনা

কিছু ধর্মান্ধ ও সংকীর্ণ মনা লোকজন ধর্মীয় আদর্শকে ক্ষুদ্র স্বার্থ অর্জনের জন্য ভুলভাবে ব্যবহার করে।  একজন ইন্ডিয়ান মুসলিম ফিল্ম স্টারকে তাদের ভুলভাবে ব্যবহার করার  বিষয়টি আরেকবার বলার জন্য আমি আসলে আর্টিকেলটি লিখেছিলাম (হ্যাঁ, এটা আমিই লিখেছি)… আর পরিহাসমূলকভাবে এই আর্টিকেলের ক্ষেত্রেও সেই একই জিনিস ঘটেছে… আরো একবার।

এটা হওয়ার মূল কারণ হলো… আমার মনে হয় কিছু কিছু লোকজন লেখাটি না পড়েই অন্যদের কথা শুনে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, যাদের কথা শুনে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে তারাও লেখাটি পড়ে নি। ফলে আমি প্রথমে আপনাদের সবাইকে লেখাটি পড়তে বলছি।

দ্বিতীয়ত, আপনারা যদি লেখাটি পড়েন, লেখাটির কোথাও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বলা হয় নি যে আমি ইন্ডিয়াতে অনিরাপদ, সমস্যায় আছি বা বিপদগ্রস্ত।

এই লেখাটিতে এমনকি দুর্বলভাবেও এটা বলা হয় নি যে আমি আমার বিশ বছরের ক্যারিয়ারে যে ভালোবাসা পেয়েছি তার জন্য অকৃতজ্ঞ। বরং লেখাটিতে বলা হয়েছে আমাদের আশেপাশের লিছু লোকের ধর্মান্ধ চিন্তা সত্ত্বেও অন্য কোথাও যাওয়ার চিন্তা আমাকে কখনো স্পর্শ করে নি কারণ আমি আমার দেশের নারী ও পুরুষের প্রচণ্ড ভালোবাসা পেয়েছি।

বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য এবং আমার অবস্থান বোঝানোর জন্য আমি এখন আর্টিকেলের শুরু এবং শেষ থেকে কিছু অংশ তুলে ধরব।

“তারপর আমার মনে আসে যে ইমেজটি আমি বাস্তব জীবনে সবচেয়ে বেশি দেখি, আমার নিজের দেশে আমি—মেগাস্টার হিসেবে স্বীকৃত, অনেক ভালোবাসা পাওয়া এবং মহিমান্বিত একজন মানুষ, আমার ভক্তরা আমার জন্য ভালোবাসা এবং প্রশংসা নিয়ে ভিড় করে।

তাই আমি একজন খান, কিন্তু আমি কে সে ব্যাপারে আমার ধারণায় কোনো সরলীকৃত, বাঁধাধরা বা ছোট বক্সের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত কোনো ইমেজ নেই। বরং আমার জীবন কাটানোর পদ্ধতির কারণে আমি ইন্ডিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা গভীরভাবে পেয়েছি। আমার সম্প্রদায় ইন্ডিয়ার জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু এই সত্যটাকে অগ্রাহ্য করে গত বিশ বছর ধরে আমি এই ভালোবাসা অনুভব করে আসছি। আমি জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক সীমানার বাইরেও এই ভালোবাসা দ্বারা স্নাত হয়েছি। একজন এন্টারটেইনার হিসাবে আমি তাদের জন্য যা করেছি তারা তার প্রশংসা করেছে—এটাই সব। আমার জীবন আমাকে দেখিয়েছে এবং বুঝিয়েছে যে ভালোবাসা একদম শুদ্ধভাবে বিনিময় হয়, সংজ্ঞায়িত করার আঘাত থেকে মুক্ত থাকে এবং সংকীর্ণ চিন্তার বন্দিত্ব থেকে মুক্ত থাকে।

মাঝে মাঝে তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে তারা কোন ধর্মের এবং হিন্দী ছবির একজন আদর্শ নায়কের মত আমি আমার চোখ ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তুলি এবং দার্শনিকভাবে বলি, তোমরা প্রথমে ভারতীয় এবং তোমাদের ধর্ম হলো মানবতা অথবা তাদের পুরাতন হিন্দী সিনেমার একটি গান শোনাই, ‘তু হিন্দু বানেগা না মুসলমান বানেগা—ইনসান কি আওলাদ হ্যায় ইনসান বানেগা’—গ্যাংনাম স্টাইলে।

আমরা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করতে নামের শেষ অংশ ব্যবহার করার পরিবর্তে কেন শেষ শব্দ হিসেবে ভালোবাসা ব্যবহার করব না? আপনাকে ভালোবাসা দিতে পারার জন্য একজন সুপারস্টার হতে হয় না। এর জন্য শুধু একটি হৃদয়ের প্রয়োজন এবং আমি যতদূর জানি, পৃথিবীতে কোনো শক্তিই এই জিনিস থেকে কাউকে বঞ্চিত করে রাখতে পারে না।

আমি একজন খান, এবং এটা হওয়ার অর্থ যা আমি তাই-ই, শুধু আমাকে ঘিরে যে সরলীকৃত ইমেজগুলি আছে সেগুলি বাদ দিয়ে। খান হওয়া হলো ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়া।”

আমি এখানে সবাইকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব আর্টিকেলটি পড়ার জন্য এবং এই আর্টিকেলের সব ভালো ভালো জিনিসগুলি আপনাদের নিজের নিজের মাধ্যমে তরুণ ও আমার সহনাগরিক ইন্ডিয়ানদের কাছে প্রকাশ করার জন্য। এটা আমার একেবারে হৃদয়ের কথা এবং আমার জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতার প্রকাশ এটা এবং দুই সন্তানের পিতা হওয়ার জায়গা থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি এটা।

আরো পড়তে পারেন: শাহ রুখ খানের হৃদয় পাকিস্তানে—অভিযোগ বিজেপি নেতার

যারা আমাকে অযাচিত উপদেশ দিচ্ছেন তাদের বলব আমরা ইন্ডিয়াতে মারাত্মক নিরাপদ এবং সুখী। আমাদের অসাধারণ গণতান্ত্রিক, মুক্ত ও ধর্মনিরপেক্ষ জীবনধারা আছে। আমার দেশ ইন্ডিয়াতে যেরকম পরিবেশে আমরা থাকি, আমাদের জীবন এবং জিনিসপত্র নিয়ে কোনো ধরনের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা এখানে নেই। যে ইস্যু নেই তা নিয়ে কথা বলা আমার জন্য খুবই বিরক্তির ব্যাপার। যারা আমার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাঁড়া করাচ্ছেন এবং আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন, তাদেরকে যথাযথ সম্মানের সাথে বলছি, আগে আমার লেখাটি পড়ুন।

এই আর্টিকেল নিয়ে যে ধরনের কমেন্ট আমি এখন পর্যন্ত পড়েছি তার কিছু হলো সেলেব্রিটিদের লক্ষ্য করে যে ধরনের মন্তব্য হয় সেরকম এবং আর কিছুগুলিতে মনে হয়েছে কারো কারো ইচ্ছা হল উস্কানিমূলক পরিবেশ তৈরি করে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করা। আমি সবাইকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব বোঝার জন্য যে, আমার আর্টিকেলটি ঠিক এই ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো এবং এই ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণের বিরুদ্ধে।

যারা ধর্মকে অস্থিতীশীলতা তৈরি, মানুষকে বিভক্ত ও শাসন করার জন্য ব্যবহার করে তাদের নেতৃত্বে ভুল পথে যাবেন না।

এত কিছু বলার পর আমি এখন বলব, একজন অভিনেতা হিসেবে আমার প্রফেশন আমাকে জাতি এবং সাংস্কৃতিক সীমারেখা ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। আমি সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির মানুষের কাছে থেকে যে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা পাই, সেটা আমাকে সারা পৃথিবীতেই নিরাপদ বোধ করায়, এবং আমার নিরাপত্তা কখনোই আমার উদ্বেগের বিষয় না… সুতরাং এটা নিয়ে অন্য কারোও উদ্বিগ্ন হওয়া উচিৎ না। আমরা সবাই শিক্ষিত ও দেশপ্রেমিক লোকজন। কিছু মানুষের রাজনৈতিক বিভেদের জন্য তা আমাদের কখনোই এবং বার বার প্রমাণ করতে হবে না।

আমার নিজের বন্ধু ও পরিবার, তারা একটা মিনি ইন্ডিয়ার মত… সেখানে সব ধর্মের লোক আছে, এবং কিছু ভুল লোকও আছে, সবাইকে সহনশীলভাবে দেখা হয় এবং একজনের প্রতি আরেকজনের বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমি শুধু ভালোবাসা বিক্রি করি… যে ভালোবাসা আমি লাখ লাখ ইন্ডিয়ান ও নন-ইন্ডিয়ানদের কাছে থেকে পেয়েছি… এবং আমার দেশে ও সারা পৃথিবীর দর্শকদের কাছে আমি সব সময় ঋণী থাকি। এটা দুঃখের বিষয় যে আমাকে প্রমাণ করার জন্য এটা বলতে হয়—স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমার বাবা আমার দেশের জন্য লড়েছেন।

আরো পড়তে পারেন: শাহ রুখের সিনেমায় আসা

এটাই আমার কথা, এবং এত কিছু বলার পরে এখানে উপস্থিত সবাইকে অনুরোধ করব… আমাকে আমার পরবর্তী ছবি নিয়ে প্রশ্ন করবেন। আমি যে গান রেকর্ড করেছি সেটা নিয়ে। আমার ছবি মুক্তির তারিখ নিয়ে। ছবির নায়িকাদের নিয়ে। ভ্যাংকুভারে Toiffa অ্যাওয়ার্ডস নিয়ে, কারণ আমি একজন অভিনেতা এবং আমার হয়ত উচিৎ এই ব্যাপারে লেগে থাকা, কারণ আপনারা এই ব্যাপারে আমার মতামত আশা করেন। আর বাকিটা বলতে গেলে… মন্তব্য করার মত বা কিছু বলার মত সঠিক ধরনের মিডিয়া পরিবেশ আমার নেই। ফলে আমি এটা থেকে বিরত থাকব।

আর দয়া করে যদি আপনারা পারেন… আমি যা বলেছি তা আপনাদের চ্যানেল, গণমাধ্যমে প্রকাশ করবেন, আমি যা বলেছি এবং যা বুঝিয়েছি ঠিক তাই প্রকাশ করবেন। ২৪ ঘণ্টাই এই অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক আমাদের সবার জন্যই যথেষ্টর চেয়েও বেশি, আমি তাই মনে করি। সুতরাং জাতীয় সমস্যা এবং ধর্ম সংক্রান্ত ইস্যুগুলিকে রোমাঞ্চকরভাবে এবং যেনতেনভাবে ব্যবহার করবেন না এবং কোনো মুভি স্টারকে এর মাঝে নিয়ে আসবেন না… আর আমি যা সবচেয়ে ভালো পারি আমাকে সেটাই করতে দিন… আমাকে ছবি বানাতে দিন।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।