page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

আমির খানের প্রিয় কয়েকটি বই

কিন্তু আমার সমস্যা হল আমি খুব বেশি ছবি দেখি না, কারণ আমার মনে হয় আমি পড়াটা বেশি উপভোগ করি। এটা আমার ছোটবেলার অভ্যাস। বই পড়া আমার অনেক বড় নেশা এবং আমার এক নাম্বার শখ। তাই আমি যখন বাড়িতে আসি, আমি একটা বই তুলে নিই। আমি সবসময়ই পড়ছি, এমনকি এখনো আমি পড়ছি, এবং আমি সবসময় বই পড়ার উপরেই থাকি। সিনেমায় দেখতে যাওয়াটাও সম্ভব হয় না। তাই আমি খুব বেশি ছবি দেখি না। পড়ার ব্যাপারে খুব বেশি গোঁড়া হওয়ার কারণে আমি কত ছবি মিস করেছি শুনলে অবাক হবেন!
—বই পড়া সম্পর্কে আমির খান

পারফেকশন এবং পেশাদারিত্বের প্রতি আমির খানের বিশেষ আসক্তি। তিনি বলিউডের অল্প কয়েকজন মেথড অ্যাক্টরদের মধ্যে একজন। তিনি অভিনয়কে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। একজন অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, কণ্ঠশিল্পী, একটা প্রদেশের টেনিস চ্যাম্পিয়ন, কারো কারো জন্য মেন্টর—এই সবগুলি পরিচয় সহ আরো অনেক পরিচয় তার।

নিচে আমির খানের কয়েকটি পছন্দের বইয়ের কাহিনি বর্ণিত হলো। শুরুতে বইগুলি সম্পর্কে আমির খানের বিভিন্ন সময়ে করা কমেন্ট।

১.

“আমি সব ধরনের বই পড়ি। ফিকশন, নন-ফিকশন। আমি মাত্রই বিল ব্রাইসনের একটা নন-ফিকশন পড়লাম। এটা আমেরিকা জুড়ে তার ভ্রমণের ট্রাভেলগ।”

দ্য লস্ট কন্টিন্যান্ট—ট্রাভেলস ইন স্মল টাউন আমেরিকা – বিল ব্রাইসন

ভ্রমণ কাহিনী লেখক বিল ব্রাইসনের বই ‘দ্য লস্ট কন্টিন্যান্ট—ট্রাভেল ইন স্মল টাউন আমেরিকা’।

১৯৮৭ সালের শরৎ এবং ১৯৮৮ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রে বিল ব্রাইসনের ১৩,৯৭৮ মাইল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বই। ব্রাইসন প্রায় সম্পূর্ণ ভ্রমণই গাড়িতে করে ঘুরেছেন। আইওয়াতে তার শৈশবের শহর ডেস ময়েনস থেকে তিনি ভ্রমণ শুরু করেন, সেখান থেকে মিসিসিপি নদীর দিকে আগাতে থাকেন। মাঝে মাঝে তিনি তার শৈশবের আইওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন। তার বাবা মারা যাওয়ার পরে তিনি এই যাত্রা শুরু করেছিলেন। ডেস ময়েনসে তার বেড়ে ওঠার সময়ের স্মৃতিকথায় তার বাবার স্মৃতিও উঠে এসেছে।

২.

“এ শর্ট হিস্টোরি অব নিয়ারলি এভরিথিং বইটার জন্য তিনি (বিল ব্রাইসন) খুব বিখ্যাত। এটা খুব অসাধারণ একটা বই। মূলত বিজ্ঞানের উপরে লেখা এই বই, এবং একই সাথে পৃথিবীর ইতিহাস নিয়েও। তবে তিনি খুব আনন্দদায়ক স্টাইলে বইটা লিখেছেন, আর পড়তে খুব মজার… এ শর্ট হিস্টোরি অব নিয়ারলি এভরিথিং এমন একটা বই যে আপনি অবশ্যই এটা আবার পড়তে পারেন।”

এ শর্ট হিস্টোরি অব নিয়ারলি এভরিথিং – বিল ব্রাইসন

আমেরিকান লেখক বিল ব্রাইসনের লেখা ‘এ শোর্ট হিস্টোরি অব এভরিথিং’ খুব জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক বই। এই বইতে বিজ্ঞানের কিছু ব্যাপার ভালভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বইয়ের ভাষা সহজেই বোধগম্য, তাই এই বিষয়ের অন্য অনেক বইয়ের তুলনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বইটা বেশি আগ্রহ তৈরি করে।

যুক্তরাজ্যে ২০০৫ সালে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় বেস্টসেলিং বিজ্ঞান বিষয়ক বই ছিল এটা। ৩ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল। ‘ওয়ান সামার’ বইয়ের বেস্টসেলিং লেখক এবং পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজন, বিল ব্রাইসন এই বইতে খুব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার জন্য যাত্রা শুরু করেছেন।

৩.

“আমি ইতিহাস ভালোবাসি, আমি ইতিহাস বিষয়ে বেশ কয়েকটা বই পড়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে আমি পড়লাম লাস্ট্রাম (রবার্ট হ্যারিসের), প্রাচীন রোমের কাহিনি নিয়ে এই বই। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ সালে সেখানে কী হয়েছিল, সীজারের কী হয়েছিল সেটার কাল্পনিক-ঐতিহাসিক কাহিনি নিয়ে এই বই।”

লাস্ট্রাম – রবার্ট হ্যারিস

রবার্ট হ্যারিসের রোমান সাম্রাজ্য নিয়ে অসাধারণ ট্রিলজির দ্বিতীয় খণ্ড এটি। রবার্ট হ্যারিস ফাদারল্যান্ড, অ্যানিগমা, আর্চ্যাঞ্জেল, পম্পেই, ইম্পেরিয়াম ও দ্য ঘোস্টের মত বেস্টসেলিং ও প্রশংসনীয় বইয়ের লেখক। খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ সালে, রোমান সাম্রাজ্যে সিয়েরো এবং সীজারের মধ্যে বিরোধ নিয়ে এই উপন্যাসের কাহিনি। অর্থোডক্স ও বিপ্লবী দুই গ্রুপের বিরোধ ও উচ্চাশাকে কেন্দ্র করে কাহিনি আবর্তিত হয়। সীজারের ক্ষমতা বাড়তে থাকে, এবং সে কারণে সিয়েরোকে ছাড় দিতে হয়। প্রশ্ন তৈরি হয় যে প্রজাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য অবৈধ পন্থা অবলম্বন করা ন্যায়সম্মত কিনা?

রবার্ট হ্যারিস এই বইতেও প্রমাণ করেছেন ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ।

৪.

“অনেকগুলি বই আছে যেগুলি আমি বার বার পড়তে পারি। তার মধ্যে একটা হল মহাভারত…”

মহাভারত – কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ বছর আগে সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছে এটি। এক লাখ স্তবকের মহাভারত পৃথিবীর দীর্ঘতম কবিতাগুলির একটি। রাজ পরিবারের দুই অংশের মধ্য বিরোধ ও আঠারো দিন ব্যাপী যুদ্ধ নিয়ে মহাভারতের কাহিনি। সময়ের উর্ধ্বের বা সময় নিরপেক্ষ তিনটি বিষয়, যথা ধর্ম, অর্থ ও আনন্দ—এই তিনটি জিনিসকে পৌরাণিক যুদ্ধ, জাদু ও সৌন্দর্যের  মধ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে। হিন্দু ধর্ম ও ভারত সংস্কৃতির অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই মহাভারত

৫.

“অনেকগুলি বই আছে যেগুলি আমি আবার পড়তে পারি… তার মধ্যে আরেকটা হল এ কনফেডারেসি অব ডিউনসেস (জন কেনেডি টুলের)।” আমির খান তার ব্লগে লিখেছেন, ‘উইথনেইল দেখে আমার প্রিয় একটি বইয়ের কথা মনে পড়ল, জন কেনেডি টুলের এ কনফেডারেসি অব ডিউনসেস। এটা এমন এক কাজ যেটা আমার কাছে দারুণ আনন্দের ও একইসাথে দুঃখের মনে হয়। অ্যাবস্যলিউটলি ব্রিলিয়ান্ট। অবশ্যই পড়ার মত জিনিস, তবে আমি জানি না আপনাদের মধ্যে কাদের এই বইটা ভালো লাগবে। আমি দুইবার বইটা পড়েছি এবং কয়েক বছর পর পর একবার করে পড়তে চাই।”

এ কনফেডারেসি অব ডিউনসেস – জন কেনেডি টুল

লেখক জন কেনেডি টুলের আত্মহত্যার ১১ বছর পরে, ১৯৮০ সালে লেখক ওয়াকার পার্সি ও টুলের মায়ের উদ্যোগে বইটি প্রকাশিত হয়। প্রথমে বইটি কাল্ট-ক্লাসিক হয় এবং পরে মূলধারায়ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৮১ সালে ফিকশনে পুলিৎজার পুরস্কার পায় বইটি। আমেরিকান সাহিত্যের সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্রগুলির একটি ইগানিটাস রিলেকে এই বই এর মাধ্যমে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অরেলিয়ান্সের কাহিনি নিয়ে এই উপন্যাস। এই বইয়ের চরিত্ররা তাদের অঞ্চল এবং সাহিত্যকে সত্যিকার অর্থেই বদলে দিয়ে গেছেন।

৬.

“আমি এয়ন কোলফারের বইয়ের জন্য অপেক্ষা করি। আমি সবগুলিই পড়েছি। আমি এবং আমার ছেলে দুজনই আরটেমিস ফউল পড়ি।”

আরটেমিস ফউল সিরিজ – এয়ন কোলফার

আইরিশ লেখক এয়ন কোলফার শিশুদের জন্য বই লেখেন। তিনি আগে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, পরে সেটা বাদ দিয়ে শুধু লেখালেখিতে নিয়োজিত হয়েছেন। আরটেমিস ফউল সিরিজের জন্য তিনি বিখ্যাত।

বারো বছর বয়সী আরটেমিস ফউল একজন মিলিয়নিয়ার। সে খুবই জিনিয়াস। এবং সবচেয়ে বড় কথা, সে একজন ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ড। তবে আরটেমিস যখন লেপ্রেকন ইউনিটের ক্যাপ্টেন হলি শর্টকে কিডন্যাপ করে, সে জানেও না সে কীসের মধ্যে জড়িয়ে গেছে। এই রূপকথাগুলি নিরীহ ধরনের রূপকথা না, এগুলি অস্ত্র ও বিপদের রূপকথা।

৭.

“আমি এখন ভি এস রামাচন্দ্রনের ফ্যান্টমস অব দ্য ব্রেইন পড়ছি। এই বইটা মানুষের মন নিয়ে লেখা।”

ফ্যান্টমস ইন দ্য ব্রেইন—প্রোবিং দ্য মিস্টিরিস অব দ্য হিউম্যান মাইন্ড – ভি এস রামাচন্দ্রন, সান্দ্রা ব্লেকসলি

নিউরো সায়েন্টিস্ট মানুষের স্বভাব সম্পর্কে গভীর ও জটিল প্রশ্নের উত্তর বের করে ভি এস রামাচন্দ্রন আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত। মানুষের ব্রেইন নিয়ে তার অন্তর্দৃষ্টি খুবই সাহসী। তার পরীক্ষা বা এক্সপেরিমেন্টও খুব সাধারণ এবং অল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি এক্সপেরিমেন্ট করেন। তুলার বল, পানির গ্লাস, সস্তা আয়না ইত্যাদি জিনিস দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেন তিনি।  মারাত্মক  ধরনের নিউরোলজিকাল সমস্যাগ্রস্ত রোগীদের সাথে কাজ করা ব্রেইনের জটিল আর্কিটেকচার সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে—এই অভিজ্ঞতাগুলিই এই বইতে শেয়ার করেছেন ড. রামাচন্দ্রন।

এসব রোগীদের সাথে কাজ করতে গিয়ে ড. রামাচন্দ্রন যেসব তথ্য পেয়েছেন সেগুলি এইসব বিষয়ে কী বলে তা এই বইতে লিখেছেন তিনি—আমরা কে, শরীরের ইমেজ আমাদের ব্রেইনে কীভাবে তৈরি হয়, আমরা কেন হাসি বা বিষণ্ণ হই, কেন আমরা খোদায় বিশ্বাস করি, আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেই, কীভাবে নিজেদের ধোকা দেই ও স্বপ্ন দেখি, আমরা কী কারণে দর্শন, মিউজিক ও আর্টে এত বুদ্ধিমান।

৮.

২০০৫ এর আগস্টে আমির খান ম্যান’স ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের কভার স্টোরিতে এই বইয়ের কথা উল্লেখ করেন। তার ব্লগে একজনের প্রতি একটা কমেন্টে তিনি বলেছিলেন, আপনি যে বইটির কথা উল্লেখ করেছেন, ‘হোয়েন নিৎসে ওয়েপ্ট’ আরেকটা বিধ্বংসী বই।

হোয়েন নিৎসে ওয়েপ্ট – আরভিন ডি ইয়ালম

আরভিন ডি ইয়ালমের ১৯৯২ সালের উপন্যাস হোয়েন নিৎসে ওয়েপ্ট। আরভিন ডি ইয়ালম স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রির এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি অস্তিত্ববাদী এবং সাইকোথেরাপিস্ট। উনিশ শতকের (১৮৮২ সালের) অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা এই বইটির কাহিনি-প্রেক্ষাপট। বিখ্যাত চিকিৎসক জোসেফ ব্রিউয়ার ও ফিলোসফার ফ্রেডরিখ নিৎসের মধ্যে একটা কাল্পনিক মিটিং এই বইয়ের কাহিনির সাথে সম্পর্কযুক্ত। উনিশ শতকের শেষভাগের আরো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গও এই উপন্যাসের কাহিনিতে এসেছেন।

৯.

২০০৫ এর আগস্টে ম্যানস ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের কভার স্টোরিতে প্রথম উল্লেখ করেন। তার ব্লগের একটা কমেন্টে বলেছিলেন, “আকবরের মেন্টর ছিলেন বেহরাম খান।”

বায়োগ্রাফি অব বৈরাম খান – (সংকলন)

বায়রাম খান নামেও বৈরাম খান পরিচিত (ইরানিয়ান, মৃত্যু – ১৫৬১)। বৈরাম খান ছিলেন মুঘল সেনাবাহিনির উচ্চপদস্থ জেনারেলদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একজন কমান্ডার। পরে তিনি মুঘল আর্মির প্রধান সেনাপতি হন। তিনি হুমায়ুন ও আকবরের রাজসভার শক্তিশালী প্রতিনিধি ও দূত হয়েছিলেন। তিনি হুমায়ুনের একজন অভিভাবক, প্রধান মেন্টর, উপদেষ্টা, শিক্ষক এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন। হুমায়ুন তাকে খান খানান উপাধীতে ভূষিত করেন, এর অর্থ হল রাজাদের রাজা।

১০.

তার ব্লগের একটা কমেন্টে আমির খান দ্য গার্ল উইদ দ্য ড্রাগন ট্যাটু ট্রিলজির উল্লেখ করে বলেন, লারসনের দুইটি বই-ই পড়েছি, খুব ভালোভাবে উপভোগ করেছি।

দ্য গার্ল উইদ দ্য ড্রাগন ট্যাটু – স্টিয়েগ লারসন

দ্য গার্ল উইদ দ্য ড্রাগন ট্যাটু সুইডিশ উপন্যাস। সুইডিশ ভাষায় বইয়ের নাম—মান সম হাতার কভিন্নর, এর অর্থ, যেসব মানুষ নারীদেরকে ঘৃণা করে। মিলেনিয়াম ট্রিলজির প্রথম বই এটা। ২০০৫ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বেস্ট সেলার হয়।

আরো পড়ুন: আমির খানের সঙ্গে আলাপ — ‘দাঙ্গাল’ ও অন্যান্য প্রসঙ্গে

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক

Leave a Reply