page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

আম্মুর যত পশুপাখি বাহিনী

আমি যখন অনেক ছোট ছিলাম বাসার পেছনে বিশাল উঠানে আম্মু বেড়া টেড়া দিয়ে ছোট চালাঘর করে ফেললেন একদিন। তার পরদিন দেখি আমার বড় খালার বাসার দারোয়ান একটা গরু দড়ি দিয়ে টানতে টানতে আনছে।

তো চালাঘর বা গোয়ালঘর হল আমাদের পরিবারের নতুন সদস্যের নতুন ঘর। নতুন সদস্য বলার কারণ আমার মা এই গরুরে যে যত্ন করতেন আমারে কোনোদিন এর একভাগ করছেন কিনা সন্দেহ আছে!

শরীফ নামের এক ছেলে রাখা হলো তার যত্নআত্তি, দেখাশুনার জন্য। দিনে দুইবার গোসল, খানাপিনার বাহার—এবং নদীর পাড়ে তার লেজ নাড়িয়ে দুলে দুলে ড্যাম কেয়ার হাঁটা দেখলে মনে হত গরুর জীবন কী আনন্দময়!

shafin-logo

যাই হোক, এই বান্দা ছিল দুই বছর আমাদের সাথে। কিংবা আরেকটু বেশিদিন। তবে যেদিন সে চলে যায় সেদিন আমরা বুঝতে পারি আমাদের মায়ের সাথে তার মায়ার বাঁধন।

আমার মা কান্না করতে করতে তারে বিদায় দিল। গরুরে টেনেও তখন তার ঘর থেকে বের করা যাচ্ছিল না। পরে কোতোয়ালির মোড় থেকে সে দড়ি ছিঁড়ে দৌড়ে আবার আম্মুর কাছে চলে আসে। আম্মু আদর-টাদর করে দিয়ে আবার ফেরত পাঠায়।

পশুদের বোধশক্তি প্রবল। সে বুঝে নেয় এই আশ্রয় সে হারিয়েছে। এখানে বার বার ফিরে এসেও লাভ নাই। আমি জীবনে প্রথম বাকশক্তিহীন প্রাণীর চোখে পানি দেখলাম।

আম্মুর তিন চারটা মুরগি নিয়ে একটা মুরগিঘরও ছিল। আর আমি কেন যেন মুরগি ভয় পেতাম! এই মুরগিগুলার অবাধ যাতায়াত ছিল আমাদের ঘরের ভিতরে। আর এক বদ মুরগি আমি ভয় পাই দেখে আমারে দেখলেই তাড়া করত!

shafin-biral-1

আমি বড় হতে হতে এসব গরুর ঘর, মুরগিঘর তুলে দেয়া হল। আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এবং আমাদের আর কোনো পশুপাখি পালা-পোষার মতো কারণ ঘটলো না।

অনেক দিন এভাবেই গেল। আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন পাড়ার ছেলেরা ক্রিকেট খেলে বাসার ভেন্টিলেটরের প্রায় সব কাচ ভেঙে দিয়েছিল। তো একদিন সকালে দেখি পাখির কিচিরমিচির ঘরের এই মাথা থেকে ওই মাথা ওড়ছে। আম্মু দ্রুত শোয়া থেকে উঠে সব রুমের ফ্যান বন্ধ করে দিলেন। এভাবে প্রতিদিন ভাঙা ঘুলঘুলি দিয়ে তাদের উড়াউড়ি চলতে লাগলো নতুন কাচ লাগানোর আগে পর্যন্ত।

আমার মায়ের সাথে যে পশুপাখির আত্মিক কানেকশান আছে এটা আমি নিশ্চিত হলাম আরও পরে গিয়ে।

আমার স্কুল এবং কলেজ সকাল সকাল থাকায় অনেকদিন আমার অজানা ছিল প্রতিদিন তিনটা কাক ঠিক নয়টার পর আসে। এসে জানলার কার্নিশে বসে কা কা করলে আম্মু তাদের খাবার দেন।

খাবার দেয়া ব্যাপার না। ব্যাপার হল তিনটা কাক তিন ধরনের খাবার খায়। একজন ভাত, একজন পাউরুটি এবং অন্যজন মুড়ি বিস্কুট! আম্মু ডাক শুনেই বুঝে নিতেন কে কোনটা খাবে!

আমি একবার একজনকে পাউরুটি দিতেই আম্মু বলে উঠেছিলেন, “ভাত দে, ইবে মুড়ি খাইত নঁ!”

আমি ধমক দিয়ে বলে উঠেছিলাম, “তুমি বেশি বোঝো। এইগুলার খাসলত তুমি খারাপ করছো, কাকের আবার পছন্দ কী? যা দিব তাই খাবে!”

আম্মু বললেন, ‘‘আইচ্ছা দে। কিন্তু খাইত নঁ। আঁই কই দিলাম।’’

এবং আমি তাজ্জব হয়ে দেখলাম শালীর বেটি কাক পাউরুটি দেখে এমনভাবে মুখ ফিরাইলো যেন আমি তারে বিষ দিছি খাইতে! সে ছুঁয়েও দেখে নাই।

আম্মুকে বললাম, এর ক্ষুধা আছে যখন অবশ্যই সে এটা খেতে বাধ্য। নইলে তাকে আজকে আর অন্য খাবার দেয়া হবে না। কিন্তু কীসের কী! একটু পর দেখি ঠিকই আম্মু ভাত দিছেন তাকে। এবং আমাকে উদাস গলায় বললেন, “পশু পাখি বলতে পারে না বলে ওদের কষ্ট দিতে নাই!”

তবে আম্মু না থাকলে আমি অবশ্যই যতই কা কা করে আমার কান ফাটাই ফেলুক খাবার দিতাম না সেদিন।

এই কাকদের পাশাপাশি আম্মুর তিনটা বিড়াল ছিল। শাদা-বাদামি, শাদা আর ধূসর রঙের। অবশ্যই আমাদের ঘরে ঢোকার অনুমতি তাদের ছিল না। আম্মু যখন রান্নাঘরে কাজ করতে যেতেন, উঠানের দিকের দরজা খুলে দিলেই তিনটা বিড়াল চলে আসতো। এসে দরজার কাছে বসে মিউ মিউ করত। আমার মায়ের দুঃখ বোঝানোর সঙ্গী সাথী এরা ছিল। প্রতিদিন এদের খাবার দিয়ে আম্মু আল্লাহর নামে শুরু করতেন চেঁচামেচি!

shafin-biral-2আমি একদিন ভার্সিটি থেকে ফিরে দেখি আম্মু তার জীবনের যাবতীয় সম্ভাবনা আমার বাবার সংসার করতে করতে কীভাবে শেষ হল, এই কিচ্ছাকাহিনী বোঝাচ্ছেন সামনে বসে থাকা ধূসর রঙের বিড়ালকে! আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, “এই তো নবাবজাদী আসছেন এতক্ষণে। আমার বাপ তো বাঁধা বান্দি পাঠাইছে এদের ঘরে আমাকে বুঝলা! এনারা এনাদের ইচ্ছামত আসবেন যাবেন। রেডিমেড খাবার পাবেন। আমি বান্দি আছি এসব করতে!”

আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘‘তুমি এসব এই বিলাইরে বুঝায় লাভ কী?’’

আম্মু ফোঁস করে উঠলেন, “এই বিলাই অন্তত মন দিয়ে চুপ করে আমার কথা শুনে, দুঃখ বুঝে। তোরা বাপ বেটির মতো না!”

আমি ভেতর রুমে দেখি আব্বু পত্রিকা পড়ছেন। আমি হাসতে হাসতেই বললাম, “আম্মুর কী হইছে?”

আব্বু দার্শনিকের মতো ভঙ্গি করে বলে উঠলেন, “বলতে দাও। আমরা কিছু বললেই যদি রাগ করে রান্না বন্ধ করে দেয়, তার চেয়ে এই ভালো।’’ বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।

About Author

শাফিনূর শাফিন

গল্প কবিতা অনুবাদের চেষ্টা করি। একটা ইংরেজি ওয়েবজিন 'প্রাচ্য রিভিউ'র কবিতা বিষয়ক সম্পাদক। চট্টগ্রাম নিবাসী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। প্রথম কবিতার বই 'নিঃসঙ্গম'। নিজেকে নিয়ে মূল ব্যস্ততা।