page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

আয়াম নট এ বেগার

সান দিয়েগো ক্যালিফোর্নিয়া, নভেম্বরের ঊষা। প্রাতঃরতির পর বউ নিশ্চিন্তে পাশে ঘুমিয়ে থাকলেও আমার  ঘুম আসছে না, ঘড়ির কাঁটা চারটে তিরিশ ছুঁই ছুঁই করছে। শব্দ না করে বিছানা থেকে নেমে দোতারা নিয়ে স্টুডিওতে ঢুকে ছিলাম যাতে শব্দে ওর ঘুম না ভাঙে।

দিনটা ছিল শনিবার, ঘণ্টা খানেক টুংটাং এর পর ফুর ফুরে মন নিয়ে হাল্কা কাপড় পরে সোজা গলফ কোর্সে। অন্যান্য বছর এই সময়ে প্রচুর শীত, এমনকি মাঝে মাঝে বরফ পড়লেও এবছর  প্রত্যুষেও তাপমাত্রা পয়ষট্টি র নিচে নামে নি।

আমার গলফের সাথীরা হচ্ছেন কিতামুরা—ছিয়াত্তর, জাপানি; জন—বিরানব্বই, পিট—উনষাট, আমেরিকান। আর সকলেই আমরা পায়ে হেঁটে আঠারো হোল—মোটামুটি সাড়ে সাত হাজার গজ চড়াই-উৎরায় পার হই পৌনে তিন ঘণ্টা সময়ের মধ্যে, যা নাকি আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে চিন্তা করাও অসম্ভব।

সতের নম্বর হোল শেষ করেছি মাত্র, আর তখনই টের পেলাম বৌর কল।

ঘুম থেকে উঠেছে—গলা শুনেই বুঝলাম আজকে আমাদের দিনটা দারুণ কাটবে। যদিও আরও চার পাঁচ ঘণ্টা আগেই তার আভাস পেয়েছিলাম।

খেলা শেষ হয়েছে?—প্রশ্ন।

না, আর এক হোল বাকি আছে—উত্তর দিই।

কী নাস্তা করবে?—বলে।

—তুমিই বলো।

—চলো খেতে বের হই।

—আচ্ছা, ফিরছি চল্লিশ মিনিটের মধ্যে, রেডি থেকো।

২.
গলফ কোর্স থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় চল্লিশ মাইল। শেষ হোল খেলে বাড়ি ফিরতে লেগেছিল তিতাল্লিশ মিনিট। দ্রুত গোসল সেড়ে তৈরি হয়ে বেরুলে দেখলাম বৌয়ের সাথে ছোট ছেলে অসীম—বিশ, ও নাতনি অদিতী—পাঁচ, তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে।

কোথায় খাওয়া যায় প্রশ্ন করাতে জবাব এলো ‘পারডন মাই ফ্রেঞ্চ’ নামক এক  ফ্রেঞ্চ রেস্টুরেন্টের নাম। বাড়ি থেকে ওটার দূরত্ব মোটামুটি মাইল পঞ্চাশেক আর সময়ের হিসেবে পয়তাল্লিশ মিনিট। ছুটির দিন বলে রাস্তাঘাটে তেমন গাড়ি নেই।

আগে থেকেই রিজার্ভ করা ছিল টেবিল, অদিতী জীবনের প্রথম আমাদের সঙ্গে খেতে বেরিয়েছে। রেস্টুরেন্টের সামনে প্রচুর খদ্দের অপেক্ষমান থাকলেও আমরা সাথে সাথেই আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করা টেবিলে ঢুকে প্রথমেই পানীয়ের অর্ডার দেই।

অদিতী কমলার রস, বৌ শ্যাম্পেইন, অসীম অরেঞ্জিনা (কমলার রসের পানীয়) ও আমি মিমোসা (শ্যাম্পেইন ও কমলার রসের মিশ্রণ)।

পানীয় নিয়ে আসার পর খাবার অর্ডারের পালা। অদিতী—আমেরিকানা (আমেরিকান ব্রেকফাস্ট), বউ—ওয়াফল ও ফ্রেঞ্চ কায়দায় মুরগী ভাজা, অসীম বিফ রোস্ট আর আমি ক্র্যাব কেক এগ বেনেডিক্ট।

মূল খাবার আরম্ভের আগে ছিল অক্টোপাস ভাজা ও এসকারগট (শামুক)—সকলে শেয়ারের জন্য।

প্রায় ত্রিশ বছর এদেশে বসবাসের পরও ইংরেজি ভাল আয়ত্তে আনতে পারি নি বিধায় ফ্রেঞ্চ ওয়েটারকে ঠিকমত অর্ডারগুলো বোঝাতে পারি নি। শুধু ইংরেজি কেন কোনো ভাষাই কুক্ষিগত হয় নি আমার, এমকি মাতৃভাষা বাংলাও নয়।

পারডন মাই ফ্রেঞ্চ, বার অ্যান্ড কিচেন, সান দিয়েগো, ক্যালিফোর্নিয়া

ফলে প্রায় সব সময় যা হয় তাই হলো। বলতে চেয়েছি অদিতীর জন্য হাফ অর্ডার (শিশুদের) আর আমাদের ওয়েটার নিয়ে এল অদিতীর জন্য ফুল, আর বউর জন্য হাফ। খুব সম্ভবত ভেবেছিল বউ ডায়েট কন্ট্রোল করছে। হাফ অর্ডার দেখে ক্ষুধার্ত ব‌উর চক্ষু কপালে। আমি ওয়েটারকে বোঝাতে কিছুক্ষণ পর সে আবার এক ফুল অর্ডার নিয়ে আসে, হাফ এর বদলে।

৩.
বেঁচে যায় প্রচুর খাবার। আগে খাবার প্যাক করে না নিয়ে আসলেও বছর পাঁচেক আগে যখন জানতে পেরেছি আমেরিকানরা গড়পরতায় প্রতি বছর দুইশ পঞ্চাশ পাউন্ড খাবার নষ্ট করে, সেদিন থেকে আমাদের পরিবারে খাবার প্রায় নষ্ট হতে দেইই না।

বেঁচে থাকা খাবারগুলো ভালো করে প্যাক করে সকলে যাই শহর কেন্দ্রের পার্শ্বে  হারবার-এ। প্রশান্ত মহাসাগরের উপর ভাসছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত এক জাহাজ থেকে আরম্ভ করে হাল সময়ের এয়ার ক্র্যাফ্ট ক্যারিয়ার।

ট্যুরিস্টদের প্রচণ্ড ভিড় থাকায় নামা হয় নি আমাদের। আরেক দিন আসব বলে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে এসেছি।

গাড়ি চালাচ্ছিলাম শহর কেন্দ্র চিড়ে। হঠাৎ চোখে পড়ে এক আশি বছরের বেশি শক্ত সমর্থ ছেঁড়া কাপড় পরিহিত উদ্বাস্তু—ডাস্টবিন খুলে খাবার খুঁটে খাচ্ছে। উল্টা দিকের রাস্তার ওপারে। দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। চোখে ভেসে উঠল অনেক চেনা ও পরিচিত আমার আত্মার খুব কাছের কিছু দৃশ্য। বউ বলল, রাস্তার এ পাড়ে থাকলে খাবারগুলো দিয়ে দিতাম।

যে রাস্তায় চালাচ্ছিলাম সেখানে বামে মোড় অথবা ইউ টার্ন নিষেধ। মাইল খানেক চলে এসেছি। আমার ভেতরটায় কেউ চিৎকার করছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাফিক আইন জ্ঞাতসারে জীবনে প্রথমবারের মত ভেঙে ইউটার্ন করে আগের জায়গায় চলে আসার পর ওকে পাই উল্টাদিকের রাস্তার পাশের ডাস্টবিন খুঁটতে থাকা অবস্থায়।

আবার ট্রাফিক আইন ভাঙার পালা। কাছাকাছি এসে “হেই” বলে হাঁক দিলেও সাড়া পাই না।

সদ্য রাস্তা পার হওয়া এক সাদা চামড়ার মধ্যবয়সী মহিলা ব্যাপার বুঝতে পারে। নিজে থেকে এসে গাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দেয়া খাবারটা ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়। সে তা প্রত্যাখ্যান করে। মহিলা ওকে ‘পাগল’ বলে গালি দিয়ে খাবারগুলো আমাদের ফিরিয়ে দিয়ে নিজের রাস্তা ধরে।

আমি আশ্চর্যেরও অধিক কিছু হয়ে গাড়ি পার্ক করি কাছেই আর বউর প্রচণ্ড বারণ সত্বেও ওর কাছে গিয়ে কারণ জিজ্ঞেস করি।

—আমি যদি এগুলো ডাস্টবিনে ফেলি তাহলে কি তুই খাবি? প্রশ্ন করি।

—না তিনটে কারণে—বলে। প্রথমটি হচ্ছে, ঐ বাচ্চা মেয়েটা পরে খাবে বলে রেখে দেয়া খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমি ডাস্টবিনের খাবার খাই মানে আমি অপচয় নিরোধ করছি। আর তৃতীয়টি হচ্ছে, আমি ভিখেরি নই।

এখনও কানে বাজছে আয়াম নট এ ফাকিং বেগার। দেয়ার আর মিলিয়নস অফ পিপ্‌ল্‌ ইন দিস ওয়ার্ল্ড হু উড লভ টু হ্যাভ দ্য প্রিভিলেজ টু ফাইন্ড ফুড ইন ডাস্টবিন।

হ্যাঁ, পৃথিবীর কোটি লোক তার এভাবে বেঁচে থাকাকে সৌভাগ্য বলে মনে করবে।

ক্যালিফোর্নিয়া, ২৬ নভেম্বর ২০১৭

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

আনিসুজ্জামান
আনিসুজ্জামান

জন্ম. মানিকগঞ্জ ১৯৬২। ১৯৮৫ সাল থেকে প্রবাসী। প্রথমে জাপানে ছিলেন; পরে মেহিকোতে থাকার সময় নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সন্তান ও স্ত্রীসহ ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করেন। অনুবাদ: গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের 'নিঃসঙ্গতার একশ বছর' (২০১৭, অন্যপ্রকাশ)।

Leave a Reply