অামি মাঠে নাইমা ওদের কাছে গেলাম। একজন জিজ্ঞেস করল, “অামাদের সাথে খেলবা?”

ছোটবেলায়, হিন্দুদের বাড়িঘর দেখার প্রতি অামার প্রবল ঝোঁক ছিল। একটা পরিষ্কার উঠান, উঠানের মাঝামাঝি বা একপাশে একটা তুলসী গাছ। যার গোড়ায় মন্ত্র জপতে জপতে প্রতি সকাল-সন্ধ্যায় জল দিয়ে পূজা করেন বাড়ির কর্ত্রী ।

পূজার সময়, বাড়ির চার পাশের দেয়াল-সিঁড়ির ধাপে থাকে অসংখ্য প্রদীপ। এগুলা ভাবতেই কেমন জানি এক ঘোরলাগা মুগ্ধতা তৈরি হইত অামার মধ্যে।

বিভিন্ন কারণে সব সময়ই ঘন ঘন বাসা বদলাইতে হইছে অামাদেরকে। অামি যখন ফোরে পড়ি। অামার মাকে একদিন বলতে শুনলাম, অামারে অামার পুরান স্কুল থেইকা সরায়া একটা নতুন স্কুলে ভর্তি করায়া দেওয়া হবে। কারণ অামাদেরকে অাবারো বাসা বদলাইতে হবে।

এবং যেই বাসাটায় অামরা এইবার উঠতেছি, সেইটার অার সেইটার অাশেপাশের পরিবেশ এই বাসার তুলনায় অনেক বেশি নিরিবিলি। চারপাশে প্রচুর গাছপালা, বের হইলেই একটা মাঠ পড়ে। অন্যান্য বাসাবাড়িগুলাও বেশ দূরে দূরে। ওইখানে কোনো কিন্ডারগার্টেন স্কুল নাই। তবে একটা সরকারি স্কুল অাছে। তাই অামারে ওই সরকারি স্কুলটাতেই ভর্তি করানো হবে।

তা’ই হইল।

অামি নতুন স্কুলে অাইসা প্রথম প্রথম খুব একটা অারাম পাই নাই। একদম নতুন জায়গা, তার উপর সব নতুন মানুষ। তাদের কারোর সাথেই অামার অাগের চেনাশোনা নাই। বন্ধুত্ব তো দূরের কথা।

তাছাড়া, এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা অামার অাগের স্কুলের ছেলেমেয়েদের মতো না। এরা পরিষ্কার ইউনিফর্ম পরে না, কথাবার্তায় অাঞ্চলিকতা অাছে, অনেকের পায়েই শু’র বদলে স্যান্ডেল, বেশিরভাগই টিফিন অানে না, যারাও অানে—তারা খায় ভাত, এক বেঞ্চে অনেক ছেলেমেয়ে বসে—এমন বহু বিষয় ছিল।

অামি যতক্ষণ স্কুলে থাকতাম, এই তফাৎগুলাই চোখে পড়ত।

ওরাও অামার সাথে কথা বলত না। তাই অামি অামার মতো ক্লাসের এক কোণায় একা একাই বইসা থাকতাম। একা একা টিফিন খাইতাম, নইলে স্কুলের বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়ায়া ওদের খেলাধুলা দেখতাম।

এইটা ঠিক যে, অামার নতুন স্কুল অার সহপাঠীদের নিয়া অামার অনেক অাক্ষেপের কমতি ছিল না, কিন্তু অাবার ওদের ব্যাপারে অাগ্রহও ছিল অনেক। ওরা নতুন, ওরা ভিন্ন—এই ব্যাপারগুলা অামারে ভাবাইত। অামি ওদেরকে মনোযোগ দিয়া দেখতাম।

নতুন স্কুলটার ছিল বিরাট একটা সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ, যেইখানে সকালে ক্লাস শুরুর অাগে পিটি করানো হইত। স্কুলের সাথে একই সারিতে এলাকার হাইস্কুল, মাঠের ওই পাড়ে কলেজ, অার কলেজের পরেই তুরাগ।

টিফিনের ঘণ্টা পড়া মাত্রই ছেলেমেয়েরা সব দৌড়ায়ে বের হয়ে যাইত। মাঠের একপ্রান্ত থেইকা অন্য প্রান্তে ছুটাছুটি করত। বহু রকমের খেলা খেলত। যা অামি এর অাগে কখনোই দেখি নাই।

একটা কী জানি খেলা অাছে, অামি নাম দিছিলাম ‘বৃত্ত খেলা’। দেখতে দারুণ। খেলাটার পদ্ধতি হইল—সবাই প্রথমে হাত ধরাধরি কইরা বিরাট একটা বৃত্ত বানায়া বসবে। তাদের মধ্যেই কেউ একজন থাকবে যে মূলত ওই বৃত্তের বাইরে থাইকা খেলাটা অাগায়ে নিবে। তার হাতে থাকবে একটা রুমাল বা এই জাতীয় কিছু। খেলা শুরু হইলে সে চরকির মতো ওই বৃত্তের চারপাশ দিয়া দৌড়াইতে শুরু করবে। এবং ওই দৌড়ানোর সময়ই, কোনো এক পর্যায়ে কাউরে না বুঝতে দিয়া তার হাতের ওই জিনিসটা বৃত্তের কারোর পিছনে ফেলবে। যার পিছনে ফেলা হবে, সে যদি টের না পায়, তাইলে সে পিটানি খাবে এবং পরের বার বৃত্তের বাইরে তারে দৌড়াইতে হবে।

বড় হওয়ার পরে অামার এক পরিচিত ব্যক্তির মুখে শুনছিলাম, বাচ্চারা হইল সেই শ্রেণীর প্রাণী যারা অকারণে বেশিদিন রাগ, ক্ষোভ বা ঘৃণা পোষে না। ঠিক এই ব্যাপারটাই মনে হয় ঘটছিল অামার ক্ষেত্রে।

পুরা স্কুলে অামার একটাও বন্ধু না থাকার কারণে তৈরি হওয়া খারাপ লাগা, মনে হয় ওদের মধ্যেও খারাপ লাগা তৈরি করছিল। ওরা যে অামারে মনমরা হয়া থাকতে দেখত না, তা না। দেখত, তবে কথা বলত না।

অামি একদিন বারান্দায় দাঁড়ায়া ওদের খেলা দেখতেছি ওই সময় ওদের একজন অামারে ডাকল।

অামি মাঠে নাইমা ওদের কাছে গেলাম। একজন জিজ্ঞেস করল, “অামাদের সাথে খেলবা?”

অামার অনেক ভালো লাগল। অামি এইটা অাশা করি নাই। বললাম, “হ্যাঁ, খেলব।” ওরা তখনই অামারে খেলায় নিল। খেলার অাগে সবাই একে একে হাত মিলায়া ফ্রেন্ডশিপ করল অামার সাথে। অামার নাম জানতে চাইল, ওদের নাম বলল, তারপর অামরা সবাই মিলা খেললাম।

অামি অনেক নতুন বন্ধু পাইলাম সেইদিন। মিম, অজিফা, লিটন, শান্ত, সুমাইয়া, দোলন, কৃষ্ণ, ইতিসহ অারো অনেক বন্ধু হইল অামার। ওরা তখন অামারে অার ওদের থেইকা অালাদা ভাবে না। অামারে ওদেরই একজন মনে করে।

তখন থেইকা অামরা সবাই পছন্দমত পালা কইরা পাশাপাশি বসি, একে অন্যরে পড়া না বুঝলে বুঝায়ে দেই, টিফিন টাইমে প্রতিদিনই বিভিন্ন রকমের খেলা খেলি, সবাই টিফিন শেয়ার করি। ছুটির পরে একসাথে বাসায় যাই।

অামার বন্ধুদের মধ্যে মোট পাঁচজন বন্ধু ছিল হিন্দু। ইতি ছিল তাদের মধ্যে একজন। ও ছিল ক্লাসের মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা অার শান্তশিষ্ট। ওর নাকি কী একটা অসুখ ছিল। এমন অসুখ, যা কখনোই ভালো হয় না। এই অসুখে মানুষ মারা যায়। এইটা নিয়া ইতির একটু অাকটু মন খারাপ হইত মাঝেমধ্যে। তাই সবাই মিলা ওর সাথে অানন্দ করত সব সময়। ওরে খুব বেশি মন খারাপ করতে দিত না।

একদিন ছুটির পর ইতি অামারে অনেক কইরা সাধল ওদের বাসায় যাইতে। অামি ছিলাম মায়ের কথা শুনা ন্যাকা বাচ্চা, তার অনুমতি ছাড়া কোথাওই এক পা ফেলি না। অামি গেলাম না ওইদিন ওর সাথে।

তার কয়দিন পরে স্কুলে লম্বা ছুটি শুরু হইল। বইলা দেওয়া হইল, ছুটি শেষ হইলেই পরীক্ষা শুরু হবে, সবাইরে এখন বেশি বেশি কইরা পড়তে হবে।

অামি পুরা ছুটিটা কাটাইলাম বাসায় পড়াশুনা কইরা, খেইলা। ওদের কারোর সাথেই অার যোগাযোগ হয় নাই ওই সময়টাতে।

অামাদের ছুটি শেষ হইলে পরীক্ষা শুরু হইল। প্রথম পরীক্ষা যায়, দ্বিতীয় পরীক্ষা যায়—অামরা সবাই অাসি, পরীক্ষা দেই—ইতি অার অাসে না, পরীক্ষা দেয় না।

লিটনের বাসা অাবার ছিল ইতির বাসার কাছে। অামি ওরে গিয়া ইতির কথা জিজ্ঞেস করলাম, সে কেন অাসতেছে না? পরীক্ষা কি দিবে না?

লিটন বলল, ওর শরীর খুব বেশি খারাপ হইছে। অাজকে সকালে গিয়া অামি ওরে দেইখা অাসছি। ও তো বিছানা থেকেই উঠতে পারতেছিল না।

লিটন অারো জানাইল, পরীক্ষা শেষে কৃষ্ণ এবং দোলনসহ ক্লাসের অারো কয়েকজন ইতিরে দেখতে যাবে অাজকে। সে অামারে বলল, তুই যাবি?

অামি বললাম, যাব না। অনেক দূর ওদের বাসা।

লিটন সাধল, কতক্ষণ অার লাগবে! বাসা অত দূরেও না অাবার, যতটা তুই ভাবছ। চল!

অামি ওরে না করলাম।

ছুটির পরে ওদেরকে দল বাইঁধা ইতির বাসার দিকে যাইতে দেখলাম। অামি যাইতে পারলাম না বলে খুব মন খারাপ হইল। কিন্তু এইটা ওদেরকে বুঝতে দিলাম না।

ওইদিন—সারাদিন অামি ইতির কথাই ভাবলাম। অামি তো চাইলেই যাইতে পারতাম। লিটন তো ঠিকই বলছিল, দূর বইলা কতই বা দূর হবে অার! মাইল তো না। অার বাসায় অাইসা যদি অাম্মুরে বুঝায়া বলতাম, সে কি বুঝত না? অবশ্যই বুঝত। অামার যাওয়া উচিত ছিল ওদের সাথে।

পুরা পরীক্ষায় অামরা ইতিরে দেখলাম না। পরীক্ষার শেষদিন অামি একটু লেইট কইরা অাসছি। হলে ঢুইকা দেখি ক্লাসের সবাই এক জায়গায় জড়ো হইয়া বইসা অাছে, অাস্তে কথা বলতেছে। সবাই কেমন জানি উদাস। এত দেরিতেও পরীক্ষা শুরু হয় নাই। অামি ওদের দিকে গেলাম। “কী হইছে? পরীক্ষা হবে না অাজকে?”, জিজ্ঞেস করলাম ওদেরকে।

লিটন বলল, “ইতি অাজকে সকালে মারা গেছে, জানছ!”

অামি ওর কথা বুইঝাও মনে হইল বুঝি নাই। অামি অাবার জিজ্ঞেস করলাম, “কী? কী বললি?”

ও অাবারো বলল, “ইতি, অাজকে সকালে মারা গেছে। অামি অাসার সময় দেইখা অাসছি।”

অামি, মনে হইল, অাকাশ থেইকা পড়ছি। মারা গেছে! এমন কিছুও যে ঘটতে পারে সেইটা অামার কল্পনাতেও ছিল না।

অামি এতই অবাক হইছিলাম যে, কতক্ষণ কিছুই বলতে পারি নাই। সবার মুখের দিকে একে একে তাকাইতেছিলাম। দেখি কেউ কিছু বলে না। সবাই বোবা, থ মাইরা অাছে। মানে, ব্যাপারটা সত্যি!
অামি বুঝতেছিলাম না তখন কী বলা উচিত ছিল। এইটা অামাদের সেই লম্বা মেয়েটাই তো, না?

ওইদিনের পরীক্ষাটা বাতিল করা হইছিল। অন্যান্য ক্লাসের ছেলেমেয়েরা বাসায় চইলা গেছে বহু অাগে, পরীক্ষা হবে না শুইনাই। খালি অামাদের ক্লাসের সবাই ছিল। সবাই খুব কষ্ট পাইছে এই ব্যাপারটায়। এইটা নিয়াই সারাক্ষণ কথা বলতেছে। কেউ কেউ কাঁদতেছে। ইতির বেস্ট ফ্রেন্ড স্কুলে অাইসা এই ঘটনা শুনা মাত্রই ইতিদের বাড়িতে গেছে, ও এখন ওইখানেই অাছে।

ক্লাসের সবাই মিলা ঠিক করল, ইতিদের বাড়ি যাবে। লিটন অামারে জিজ্ঞেস করল অামি যাবো কিনা, এইবার অামি অার না করতে পারলাম না। এইবার অামাকে যাইতেই হবে। অামি ওদের সাথে গেলাম।

যাওয়ার পথে অামার পা চলতেছিল না। অসাড় লাগতেছিল। ইতি কি সত্যিই অার নাই? অামি কি ওখানে গিয়া সত্যিই দেখব ইতি অার কথা বলতেছে না অামার সাথে? কারোর সাথেই কথা বলতেছে না দেখব?

অামরা ইতিদের বাড়ি পৌঁছাইলাম একসময়!

ওদের বাড়িতে ঢুকার পথটা সরু, লম্বা একটা গলি। গলিটার দুইপাশে ছোট ছোট অনেক গাছ। কয়েকটা ছোট ছোট ফুলগাছও ছিল। গলির শেষ মাথায় ওদের বাড়ির উঠান শুরু।

উঠানটা মাঝারি অাকৃতির, মাটির। একপাশে ওদের লালরঙা দেয়ালের বাড়ি, একপাশে টিউবওয়েল, একপাশে রান্নাঘর। ঘরে ঢোকার সিঁড়িতে বইসা ইতির মা বিলাপ করতেছেন। তার দিকে তাকাইতে গেলেই কেমন জানি লাগতেছিল। অামি তার কাছে যাই নাই।

উঠানের মাঝখানে একটা তুলসী গাছ। এই গাছেই সকাল-সন্ধ্যা পানি ঢাইলা পূজা করে ওরা। ধূপকাঠি জ্বালায়। তবে গাছটার গোড়া অাজকে শুকায়ে গেছে। সকালে পানি দেয়া হয় নাই হয়তো।

গাছটার পাশেই মেঝেতে একটা পাটি বিছানো। পাটির ওপরে ইতিরে শোয়ানো হইছে। ধূপকাঠি জ্বলতেছে পাশে।

ওর মুখটা খুব সতেজ লাগতেছিল। রোদ পড়তেছিল বইলা হয়তো।

শরীরটা চাদরে ঢাকা। কপালে চন্দন, লাল রঙের টিপ পরানো। চোখে গাঢ় কাজল দেওয়া হইছে, ঠোঁটে টকটকে লাল রঙের লিপস্টিক, গায়ে লাল শাড়ি।

ইতি একদিন বলছিল অামারে—হিন্দু মেয়েরা মারা গেলে তাদেরকে বউয়ের মতো সাজানো হয়। অামি মারা গেলেও, অামারে দেখতে ঠিক বউয়ের মতো লাগবে। তাই লাগতেছিল!

কমেন্ট করুন

মন্তব্য