ইরা ও শফিক

হঠাৎ একদিন ইরা এসে আমার কাছে কান্নাকাটি করে পড়ল।

তার এক ছেলেরে ভাল্লাগছে, খুব মারাত্মকভাবে ভাল্লাগছে। তার সাথে গতকাল সামনাসামনি দেখা হইছে, দুইএকটা বাক্যালাপ হইছে। তাতেই তার মন গলে গেছে, সে তারে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠছে।

ফেসবুকের জনপ্রিয়তা তখন এখনকার চেয়ে কম। ফেসবুকে আলাপের কথা আমরা কেউ ভাবলামই না। ইরা তার ফোন নাম্বার যোগাড় করছে। কীভাবে এই কাজ সে করছে, তা আমাকে বলে নাই। আমি অনেক জোর জবরদস্তি করলাম, কিন্তু সে রাজি হইল না বলতে। গল গল করে চোখ থেকে পানি পড়তেছে। হেঁচকি উঠছে কাঁদতে কাঁদতে।

একটু পরে কান্না থামায়ে সে আমার কাছে মাথা নিচু করে জানাইল, এই প্রেম তারে আমার করায়ে দিতে হবে।

আমি শুনে আকাশ থেকে পড়লাম—তার প্রেম আমি কেমনে করায়ে দেব!

প্রেম করবে তারা, আমার কাজ কী এইখানে!

ইরারে তবুও বললাম—বল, কীভাবে তোরে হেল্প করতে পারি?

সে বলল, সেই ছেলের সাথে আমার ফোনে কথা বলতে হবে, ‘ইরা’ হইয়া কথা বলতে হবে।

এবার মেজাজ খারাপ হইল আমার।

সে তারে ফোন দেবে, প্রেম করবে, কথা বলবে—আমি কথা বইলা কী করব এর মধ্যে! আর মিথ্যা দিয়ে একটা প্রেম শুরু করার পক্ষে আমি ছিলাম না।

ইরারে বুঝাইলাম, বললাম—তুই কথা বললেই সবচেয়ে ভাল হয়। তুই তো উনারে পছন্দ করিস, তুইই ভাল এক্সপ্রেস করতে পারবি। আমি কথা বললে সেইটা রসকষহীন হবে।

ইরা জানাইলো—সে কথা বলার সাহস পাইতেছে না। আর সে গুছায়ে কথা বলতেও পারবে না, তাতে শুরুতেই একটা খারাপ ইম্প্রেশান তৈরি হবে।

আমি সোজাসুজি তারে বলে দিলাম—তোমার প্রেমের জন্য কাঠখড় তোমারই পোড়াইতে হবে। আমি এই সবের মধ্যে নাই। নিজের পথ নিজে দেইখা নেও।

অনুনয় বিনয় চলল অনেক ক্ষণ। আমি তারে হুমকি দিলাম। ঘ্যান ঘ্যান করলে মামার কাছে নালিশ কইরা দেব।

রাত্রে ইরা না খাইয়াই শুইয়া পড়ল। আমি ইরাদের বাসায় বেড়াইতে গেলে ইরার সাথেই ঘুমাই।

ইরা আমার বড় মামার মেয়ে, আমার চেয়ে এক বছরের বড়।

তার জন্য মায়া আমার তেমন না, কিন্তু ইরার আমার জন্য অনেক মায়া এইটা বুঝি। আমরা সমবয়সী হওয়ার পরেও ইরা মাঝেমধ্যে আমারে ভাত খাওয়ায়ে দিত, এইটা ওইটা কিনা আইনা দিত।

ইরার পাশে শুইয়া টের পাইলাম—সে এখনও কাঁদতেছে। বয়স অল্প তখন, আবেগ অনেক বেশি তাই। আমি উইঠা লাইট জ্বাললাম। ইরা ভালমন্দ কিছু বলল না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম—নাম্বার কই টুকে আনছিস?

ইরা উত্তর দিল না।

হাত ধইরা আমার দিকে ফিরাইলাম। দেখি চোখমুখ লাল হইয়া ফুইলা গেছে।

আমি তখন খুব সিরিয়াসনেস নিয়া বললাম—আমি কথা বলতে পারি, তবে শুধু এই এক সপ্তাহ, এই এক সপ্তাহ তো আমি তোদের বাসায়ই আছি।

দেখলাম ইরার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

সে মশারি সরায়ে বের হয়ে ব্যাগের মধ্যে থেকে ছোট এক টুকরা কাগজ বের করল। আমার দিকে বাড়ায়া দিল কাগজ।

একটা ফোন নাম্বার লেখা তাতে, নিচে লেখা “শফিক”।

আমি তখন তারে জিজ্ঞেস করলাম, এই কোন শফিক? বাদল মামার ছাত্র?

ইরা জানাইল, ওই শফিক ভাইই।

বাদল মামা আমার ছোট মামা। টিউশনি কইরাই চলেন। পড়াশোনা শেষ করছেন অনেক দিন, কিন্তু চাকরি-বাকরি হয় নাই। বাদল মামারই ছাত্র শফিক ভাই। বাদল মামার সাথে তারে একদিন দেখছিলাম।

আমার সাথে শফিক ভাইয়ের কোনোদিন সামনা-সামনি কথা হয় নাই। ফোনে কথা বললে কোনো অসুবিধা হবে না। তাই ইরার কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়া নিলাম।

আমাদের কথা হইত তারপরে, রাতদিন কথা না হইলেও দুইবেলা নিয়ম করে কথা হইত। শফিক ভাই একটু কড়া স্বভাবের মানুষ, কথায় রূঢ়তা বেশি। আমি তাই একটু আহ্লাদ কইরা কথা বলতাম। শফিক ভাই কঠোরভাবে কিছু বললেও সহজভাবে নিয়া নিতাম। অবশ্য ইরারে ঝাড়তাম এইজন্য। ইরার কোনো সমস্যা ছিল না, আমার সবরকম ঝাড়ি খাইতে সে প্রস্তুত।

কথা বলার সময় ইরা আমার পাশেই থাকত। হেডফোনে কথা বলতাম। একটা আমার কানে গোঁজা থাকত, আরেকটা ইরার কানে।

ইরা তখন দিনরাত প্রাক্টিস করে—কীভাবে কথা বলবে। বিশেষত আমি যেভাবে বলতেছি এই ধারা ধইরা রাইখা তার কথা বলতে হবে। এইটা তারে মাঝেমধ্যে চিন্তায় ফেলত।

কয়েকদিন পরে আমরা গভীর রাতেও কথা বলতাম। ইরা ঘুমে ডুইবা থাকত হেডফোন কানে গোঁজা অবস্থাতেই।

শফিক ভাইয়ের গানের প্রতি খুব দুর্বলতা ছিল। বিশেষত রবীন্দ্রসঙ্গীত। আগে এইসব জানতাম না। কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন গানের কথা।

একরাতে সে আমার কাছে একটা গান শোনার আবদার করে বসল। তার বলার ধরনে সেদিন রূঢ়তা ছিল না। খুব স্বাভাবিক, স্নিগ্ধ একটা কণ্ঠ।

আমি গান জানি না, ছোটবেলায় ঘটা কইরা নাচ শেখার দরুন আমার ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও গান শেখা হয় নাই।

শীত তখন, আমি কম্বলের ভেতর শুইয়া আস্তে আস্তে কথা বলি। ইরা থাকায় সমস্যা নাই, সে সবটা ম্যানেজ করে রাখে। কিন্তু এই কম্বলের ভেতর শুইয়া গান গাওয়া সম্ভব না।

আমি উঠলাম, গায়ে ইরার একটা চাদর দিলাম। বারান্দার ছিটকিনি খুললাম। ইরা তখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে।

কী নিষ্পাপ, করুণ মুখশ্রী!

বারান্দায় শীতের কনকনে বাতাস। পাশের রাস্তায় আলো জ্বলতেছে। দূরে কুয়াশার জন্য সব অস্পষ্ট, ঝাপসা। ফ্লোরের ঠাণ্ডায় আমার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতেছিল।

গান শুনাইলাম তারে, তার আবদারের দুই লাইন না। পুরো গান। ভাঙা ভাঙা গলা, শীতে কথা পর্যন্ত জড়ায়ে যাচ্ছিল। তার ভাল লাগছিল কিনা আমি জানি না, তবে ঠাণ্ডা হাওয়ায় চুল খোলা দিয়ে চোখ বন্ধ করে গান গাইতে আমার খুব ভাল্লাগতেছিল। মনে হচ্ছিল, আমি অন্যজগতে আসছি, অল্প অল্প আলো আর কুয়াশা, সেইখানে কেউ আরেকজনরে দেখতে পায় না, কেবল অনুভব করতে পারে।

সকালে ইরাকে সব বললাম।

ইরা শুইনা খুশি হইছিল খুব। ইম্প্রেস করতে পারছি—এইটা ইরার কাছে সোনার হরিণ পাওয়ার মত ব্যাপার।

আমি তারপর আরও কয়েকদিন তারে গান শুনাইছি। ইরা ঘুমাইত, আমি ফোনালাপে ব্যস্ত থাকতাম। শেষের দিকে সে স্বাভাবিকভাবে কথা বলত। আগের মত আর হুটহাট মেজাজ দেখাইত না।

পরে একদিন দেখা করতে বলল, চওড়া লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে।

ইরা দেখা করলো—লাল পাড়, সাদা শাড়ি, হাতে লাল কাঁচের চুড়ি, কপালে বড় লাল টিপ।

ইরাকে সাজায়ে দিতে দিতে সব ফোনালাপের কথা বললাম। যেন কোনো সমস্যাতে না পড়ে।

সাতদিন না—আমরা প্রায় দশ বারোদিন কথা বলছি। ইরা যেমন সহজ, স্বাভাবিক অবস্থা চাইত, তেমন অবস্থাতেই কথা বলা বন্ধ করলাম।

আমার আর ইরার কথা বলার ধরন আলাদা হইলেও কণ্ঠ অনেকটা একরকম। বিশেষত ফোনে পার্থক্য বোঝা যায় না। আমাদের এই নিয়া অনেক হাসাহাসি হইত। আমার ফোন আসলে আর আমি না থাকলে ইরাই মাঝেমধ্যে কথা বইলা-টইলা ফোন রাইখা দিত।

শফিক ভাইও আর সবার মত। কোনো পার্থক্য বুঝতে পারলেন না।

কোনো সমস্যাই হয়ত হইত না যদি না কয়েকদিন পর শফিক ভাই ইরার কাছে রাতে গান শোনাবার আবদার করে বসত।

ইরা কেন আগের মত কথা বলে না, গান শুনায় না—এইসব নিয়া ঝগড়া হইত তাদের।

ইরা অবশ্য আমাকে কখনো দোষারোপ করে নাই এই ঝামেলার জন্য।

কথা বলা কমে গেল তাদের, আগের মত প্রেমের উচ্ছলতা থাকল না।

ইরা সিদ্ধান্ত নিলো, সে সব বলবে—কী কী হইছে, সে কেন এসব করল, সবটা বলবে। আমি মানা করলাম। সে শুনল না। এবারও সে আগের মত অস্থির। না বইলা সে শান্তি পাবে না।

ইরা কীভাবে সব বলছে আমি জানি না। তবে তার মুখচোখ দেইখা বুঝলাম, তার যা বলার তা সব সে বলে দিছে।

শফিক ভাইয়ের সাথে তার পরের দিন আমি দেখা করলাম। ইরা ফোন করে আমাকে দেখা করতে বলল।

আমি আগে চইলা গেছিলাম শফিক ভাইয়ের কলেজের সামনে। অপেক্ষা করছিলাম শফিক ভাইয়ের জন্য।

শফিক ভাই এসে আমার সাথে কোনো কথা বললেন না। তাকালেন না।

আমার হাতে একটা কাগজ ধরায়ে দিয়া শফিক ভাই চলে গেলেন।

আমি বাসায় চইলা আসলাম। কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দিছি রাস্তায়। পড়ে দেখি নাই। আমি জানি, পড়লেই কিছু একটা অনর্থক হইত, পড়লেই ঐ কালো কালিতে লেখা শব্দগুলি আমার দেহমন আঁকড়াইয়া ধরত। ঐ লেখা পড়ে ফেললেই কাঁঠালচাপার গন্ধে ভরে উঠত চারপাশ, কুয়াশায় অস্পষ্ট হইত সব।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here