ইস্টার আইল্যান্ডের দৈত্যাকার মাথাগুলির শরীর আছে, শরীরে ট্যাটুও আছে!

চিলির ২০০ মাইল পশ্চিমের ইস্টার আইল্যান্ডের রহস্যময় মূর্তিগুলির মাথা শুধু মাটির উপরে, শরীরের বাকি অংশ মাটির নিচে। অনেকে না জানলেও এই তথ্য বেশ পুরাতন।

২০১২ সালের মে থেকে এই মূর্তিগুলির খননকার্যের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আর এই মূর্তিগুলির শরীরও যে মাটির নিচে লুকানো অবস্থায় আছে তা আর্কিওলজিস্ট বা পুরাতত্ত্ববিদরা প্রথম জেনেছেন ১০০ বছর আগে, ১৯১৪ সালে যখন প্রথম এই দ্বীপে পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা শুরু হয়।

ইস্টার আইল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত ১৫০টি মূর্তি আগ্নেয়গিরির ঢালে অবস্থান করছে। সাধারণত এই ১৫০টি মূর্তির ছবিই বেশি দেখা যায়। ২০১২ সালে প্রথম অনলাইনে প্রকাশিত ইস্টার দ্বীপে খননকার্যের ছবিতে দুটি মূর্তির শরীরের বাকি অংশ অর্থাৎ মাটির নিচে লুকানো অংশ দেখা যায়। ছবিগুলি ছিল ২০১০ এর ছবি। এর পর একইসাথে তিন মিলিয়ন হিটের কারণে ইস্টার আইল্যান্ড স্ট্যাচু প্রজেক্টের ওয়েবসাইট ক্রাশ করে।

এবার এই মূর্তিগুলির শরীরের নতুন ছবি প্রকাশিত হয়েছে। এই ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে এই মূর্তিগুলির শরীরে ট্যাটুও আছে।

পাথরের মূর্তিগুলির শরীরে এই ট্যাটুগুলি খোদাই করা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন মূর্তির গায়ের চিত্রগুলিতে পলিনেশিয়ানদের ব্যবহৃত ডিঙি নৌকা দেখা যাচ্ছে। এই পাথরের মূর্তিগুলি নির্মাণ করেছে পলিনেশিয়ানরা।

ইস্টার দ্বীপের এই মূর্তিগুলি কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল তা এখনো অস্পষ্ট।

মনে করা হচ্ছে শুরুতে মূর্তিগুলির সম্পূর্ণ অবয়ব দৃশ্যমান ছিল। অনেক অনেক বছর ধরে প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে মূর্তিগুলির শরীরের বাকি অংশ মাটির নিচে ঢাকা পড়েছে।

এই স্ট্যাচুগুলিকে মোয়াই নামে ডাকা হয়। ১২৫০ থেকে ১৫০০ শতকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে এই মূর্তিগুলি তৈরি করেছে রাপা নুই গোষ্ঠীর লোকেরা।

ইস্টার দ্বীপে মোট ৮৮৭ টি মোয়াই রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা মোয়াইয়ের দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট এবং ওজন ৮২ টন। মোয়াইগুলি ইস্টার দ্বীপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সবগুলি মূর্তি বা মোয়াই-ই আগ্নেয় শিলা থেকে বানানো হয়েছে।

ইস্টার দ্বীপ নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায় নি।

এই দ্বীপে জনবসতি কীভাবে হয়েছিল? মূর্তিগুলি কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল? সারা দ্বীপ জুড়ে মূর্তিগুলি কীভাবে স্থানান্তরিত করা হয়েছে? ১৭৭৪ সালে ক্যাপ্টেন জেমস কুক আসার পরে ক্যানিবাল বা নরখাদক সম্প্রদায়ের কী হয়েছিল?

গত কয়েক দশকে নৃবিজ্ঞানী জেয়ার্ড ডায়মন্ড এবং অন্যান্যরা ইস্টার আইল্যান্ডকে পরিবেশ বিপর্যয়ের উদাহারণ হিসেবে দাঁড়া করেছেন। তারা বলেছেন, বনভূমি অতিরিক্ত উজাড় করার প্রভাব পড়েছিল ইস্টার আইল্যান্ডের জনগোষ্ঠীর ওপর।
১৯১৯ সালে প্রথমবার পুরাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইস্টার দ্বীপ সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেটা পরিচালনা করেছিলেন ক্যাথেরিন রাউটলেজ।

বর্তমানে ইস্টার আইল্যান্ড স্ট্যাচু প্রজেক্টের পরিচালক ভ্যান টিলবার্গ বলেছেন, তিনি তখনকার খননকার্য খুব দুর্বলভাবে ডকুমেন্টেড করেছিলেন। ফলে তার কাজে অনেক গোঁজামিল রয়েছে। এগুলি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলির একটি এই ইস্টার দ্বীপ। দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূমি থেকে এটি ৩৫৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে।

এই দ্বীপে প্রথম বসতি স্থাপন করে পলিনেশিয়ানরা। প্রশান্ত মহাসাগরের পথ পাড়ি দিয়ে যে উপনিবেশিকতা শুরু হয়েছিল তার শুরুর দিকে পলিনেশিয়ানরা ডিঙি নৌকা নিয়ে ইস্টার দ্বীপে পৌঁছেছিল।

ধারণা করা হয় ইস্টার দ্বীপের জনসংখ্যা ছিল ৭০০০-এর মত এবং সবাই এই মূর্তি বা স্ট্যাচু নির্মাণে অংশ নিয়েছিল।

ভ্যান টলবার্গ বলেন, দ্বীপে বৃক্ষনিধনের জন্য মানুষই দায়ী ছিল এবং এই বৃক্ষনিধনের ফলেই তাদের সামাজিক বিন্যাসে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছিল, আমার মনে হয় না এখনকার গবেষকদের এই মতবাদের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন আছে।
আসলে, এই মূর্তিগুলির ব্যবহার মারাত্মকভাবে বদলে গিয়েছিল, কিন্তু মূর্তিগুলি তৈরির উদ্দেশ্য বদলায় নি। আমি মনে করি বেশিরভাগ মানুষেরই ‘ধ্বংস’ শব্দটি নিয়ে সমস্যা। তাদের কাছে এই শব্দটির মাধ্যমে দোষ দেওয়া হচ্ছে এমন মনে হয়।

ইস্টার আইল্যান্ড থেকে বর্তমানের মানব সভ্যতা কী শিক্ষা নিতে পারে এ প্রসঙ্গে ভ্যান টিলবার্গ বলেন, সোসাইটি দীর্ঘক্ষণ ধরে বৃহৎ ছবিটি থেকে শিক্ষা নিতে পারে। রাপা নুই সোসাইটি খুব রক্ষণশীল ছিল, আবার কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখলে তার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারত।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক

Leave a Reply