page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

ইয়রগেন ক্লপের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল এবং লিডারশিপ টেকনিক — বুম বুম বুম

আধুনিক ফুটবলের ম্যানেজারদের কাছে সকল ধরনের একজিকিউটিভ, ম্যানেজার এবং লিডারদের অনেক শিক্ষণীয় আছে।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে, স্পেনের লা লিগা, বা ইতালির সিরিআর খেলা, খেলোয়াড় পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণে স্পন্দন তৈরি করে।

এইসব লিগে খেলোয়াড়দের পেছনে ব্যাপক ইনভেস্টমেন্ট হয়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে বিগত ট্রান্সফার পিরিয়ডেই ১.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। পুরো লিগের রেভেনিও এবং তার সংযুক্ত বিনিয়োগ আমাদের পোশাক শিল্পের থেকে বড় ইন্ডাস্ট্রি। তাতেই বোঝা যায়, মাত্র ২০টি দলকে নিয়ে খেলা এখন শুধু খেলাই নয়, বিশাল বড় ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। এবং এই পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পজিশন হচ্ছে, দলীয় ম্যানেজার।

klopp-9

একজন ভাল ম্যানেজার একটা দুর্বল দলকেও এগিয়ে নিতে পারে আবার একটা দুর্বল ম্যানেজারের হাতে একটা ভাল দলের পারফর্মেন্সও দুর্বল হতে পারে। এই জন্যে, এই ম্যানেজারদের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল, স্ট্র্যাটেজি, টেকনিক, লিডারশিপ স্টাইল আজকে স্পোর্টসের সব চেয়ে জটিল আর্ট হিসেবে দেখা হয়।

ফুটবলের ইতিহাসে কয়েকজন ম্যানেজার তাদের কর্মপদ্ধতি এবং সাফল্যের কারণে লিজেন্ডে পরিণত হয়েছেন। তার মধ্যে আছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্যার অ্যালেক্স ফারগুসেন, চেলসির মরিনহো, বার্সেলোনার জহান ক্রইয়েফ,বেয়ারন মিউনিখের অটোমার হেজফিল্ড , ইতালির গিয়াভান ত্রাপাত্তিন্নি, আরসেন ওয়েঙ্গার সহ বেশ কয়েকজন।

zia-hassan-logo

আজকে আমরা আলোচনা করবো, বর্তমান ফুটবল জগতের সব চেয়ে কঠিন দায়িত্বে অধিষ্ঠিত লিভারপুলের ফুটবল দলের ম্যানেজার ইয়রগেন ক্লপের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল নিয়ে। ইয়রগেন ক্লপ ইতোপূর্বে উল্লেখিতদের কারো মতই অনেক সাফল্য পান নি।

লিভারপুলের দায়িত্ব নেয়ার আগে, জার্মানির বুনডেসলিগার ডরট্মমুন্ডের কোচ হিসেবে তিনি মাত্র দুই বার বুনডেসলিগার কাপ জয় করেছেন এবং একবার ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে দলকে নিয়ে গেছেন।

বলে রাখা ভালো, বিগত ৫টি লিগ কাপ টুর্নামেন্টের ফাইনালে ক্লপ বিজিত হয়েছেন। তাই, তার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

ইউরগেন ক্লপ ২০১৫

অ্যানফিল্ডের লিভারপুল ক্লাবে নতুন ম্যানেজার ইয়রগেন ক্লপ; অক্টোবর ৯, ২০১৫।

কিন্ত, তবুও আমরা ইয়রগেন ক্লপের ম্যানেজমেন্ট এবং লিডারশিপ টেকনিক নিয়ে আলোচনা করব, কারণ, তিনি একটা অসাধারণ অর্জন করেছেন, যা খুব কম কোচই পেরেছে। তা হচ্ছে অত্যন্ত কম সম্পদ, কম অর্থ থাকা সত্ত্বেও একটা তুলনামূলক দুর্বল দল ডরট্মুন্ডকে নিয়ে, তিনি লিগের প্রতিষ্ঠিত অসীম সম্পদের পর পর চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখকে পরাজিত করে, বুনডেসলিগার শিরোপা জিতেছেন। এবং তার বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত দল লিভারপুলকেও মাত্র ছয় মাসে তিনি যেভাবে উন্নতি ঘটিয়েছেন এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে অর্থ এবং সম্পদে এগিয়ে থাকা বাকি চারটি দল থাকলেও তিনি যেভাবে দলকে অনুপ্রাণিত করে তাদের সাথে কম্পিট করেছেন তা লিভারপুলের কোটি কোটি সমর্থকের মনে সাফল্যের প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। তাই, তাকে বিশ্ব ফুটবলের একটা বিস্ময় হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এই কারণেই ইয়রগেন ক্লপের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল এবং টেকনিক আজকে বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ম্যানেজমেন্ট গুরু সহ বিশ্বের বড় বড় নেতারা খেয়াল করছেন, তার থেকে শিক্ষণীয় কী আছে।

আমরাও তা শিখব।

১. ক্লপের প্রথম যে বৈশিষ্ট্য যা তার সাথে সকলকে পার্থক্য গড়ে দেয় তা হচ্ছে প্যাশন, ইমোশান এবং অ্যাটিচুড।

এর মধ্যে ক্লপের প্যাশনটা সব চেয়ে বড় শক্তি। সে যে জয়ের ব্যাপারে প্যাশনেট এইটার মধ্যে চরম একটা ইন্টেন্সিটি আছে। এইটা একটু কাব্যিক ভাষাতেই বলি, বডি স্প্রের মত চারিদিকে ছড়ায় যায়। তার কথায়, তার ভাবনায় সেইটা এমন ভাবে উৎসারিত হয়, সেইটা সবাই ছুঁয়ে যায়।

বলতে পারেন জয়ের প্রতি এই প্যাশন তো সবার আছে। নাহ, আমি বলব ক্লপ স্পেশাল। তার ইমোশানটা স্পেশাল। তাই তার জন্যে খেলোয়াড়রা জানবাজি করতে পারে, একটা মাইল এক্সট্রা দৌড়াইতে পারে।

klopp-1

২. এই প্যাশান ইমোশান এবং অ্যাটিচুড দিয়ে ক্লপ যেইটা করে সেইটা হইল সে প্রত্যাশা সৃষ্টি করে। ম্যানেজমেন্টের একটা ভাষা আছে—আন্ডার প্রমিজ, ওভার ডেলিভার। ক্লপ মনে করে, সেইটা মিডিওকারের কাজ। ক্লপ, ওভারপ্রমিজ করে। এবং সেই লক্ষে কাজ করে। সে যখন ওভার প্রমিজ করে, সেইটা সে তখন তার টিমের কাছে ডিমান্ড করে। সে বলে, আমি ওভার প্রমিজ করছি, কারণ আমি বিশ্বাস করি, তোমরা পারবা। সো, ডু ইট। ওভার ডেলিভার।

এইটা রবিন শর্মার একটা বইয়েও পেলাম। ওভার প্রমিজ, যেন তুমি নিজের কাছে প্রতিশ্রুতি দাও, যে আমি কঠিন টার্গেট অ্যাচিভ করব।

৩. ক্লপ এইটা করে, কারণ তার একটা পরিকল্পনা আছে।

সে জানে ফুটবল কীভাবে খেলতে হয়। ক্লপের এই পরিকল্পনা একটা টার্মে পরিণত হয়েছে ফুটবলের পরিভাষায়। একে বলা হচ্ছে , গেগেনপ্রেসিং। যেইটা একটা জার্মান শব্দ।

গেগেনপ্রেসিং-এর সাতটা বৈশিষ্ট্য যেগুলোর আমরা ম্যানেজমেন্টের পরিভাষায় ভিন্ন অর্থ পাই।

High Pressing—প্রতিপক্ষের সীমানায় তাকে আক্রমণ করা।

Defending on High Lines—নিজের কাজ এমন ভাবে গুছিয়ে রাখা যেন, আপনার প্রতিপক্ষের খেলার স্থান সংকুচিত হয়ে আসে।

Blistering Counter Attacks—প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণে থাকবে তখন তাকে তীব্র গতিতে আঘাত করা।

High Work Rate—কঠোর পরিশ্রম।

Strategy not down to a single player or a single department performed by all Midfielders & Attackers—একটা টিমে, আলাদা ভাবে দায়িত্ব থাকবে না। সবাইকে সবার কাজে হেল্প করতে হবে, কোম্পানির গোল অ্যাচিভ করার জন্যে।

Perfect Defensive Shape—নিজের ডিফেন্সকে খুব ছকে বেঁধে রাখতে হবে।

Pushing the Ball Wide while possession to the opponent—আউট ফিল্ডে প্লেয়ার রেখে মাঠের প্রস্থকে বাড়িয়ে নেয়া যেন প্রতিপক্ষকে হেডার বা ক্রস থেকে গোল করা যায়। এইটার অনেক শানে নজুল আছে।

৪. এই পরিকল্পনা সে বাস্তবায়িত করে, তার খেলোয়াড়দেরকে উদ্দীপ্ত করে।

ক্লপ হচ্ছে কুল ড্যাড। অর্ধেক বন্ধু, অর্ধেক বাপ।

klopp-6

খেলার পরে মাঠে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় ক্লপ।

সে সব সময়েই হাস্যোজ্জ্বল। ইজি গোয়িং। কিন্ত যখন দরকার সে খুব কঠিন হইতে। দলের জন্যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্লেয়ার সাখোকে সে আমেরিকা থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। কারণ, তারা অ্যাটিচুড ঠিক ছিল না। অথচ, সাখো বিগত বছরেরে সেরা ডিফেন্ডার।

কিন্ত সেইটা ক্লপ দেখে নাই। তার কাছে টিম স্পিরিট আসল।

সাখো তিন বার দেরি করে মাঠে আসছে ওয়ার্নিং দিছে—কাজ হয় নাই। ক্লপ অ্যাকশন নিছে।

আবার খেলার পরে ক্লপ তার খেলোয়াড়দেরকে যেভাবে জড়িয়ে ধরে তাতেই বোঝা যায় সে খুব কুল, সবার সাথেই ক্লোজ।

৬. সেই পরিকল্পনা অনুসারে রিক্রুটমেন্ট।

ক্লপ তার পরিকল্পনা অনুসারে রিক্রুটমেন্ট করে।

ক্লপ এই সিজনে যে প্লেয়ারগুলো কিনেছে কেউই ফুটবল বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় না। কিন্ত তারা সবাই ক্লপের গেগেনপ্রেসিং-এর জন্যে উপযুক্ত প্লেয়ার।
ফলে রিক্রুটমেন্টের সময়ে ক্লপ সেরা খেলোয়াড় খোজে নাই। সে খুঁজেছে, তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে উপযুক্ত প্লেয়ার। যেইটা ইতোমধ্যেই কাজ দিচ্ছে।

৭. ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট।
এইটা সব কোচই করে। কিন্ত, ক্লপ সেইটা অন্য লেভেলে নিয়ে গেছে।

ক্লপ রিক্রুটমেন্টের সময়ে এমন সব প্লেয়ার চিহ্নিত করে, যারা এখনো ওয়ার্ল্ড ক্লাস হয় নাই। কিন্ত, তাদের ট্যালেন্ট আছে। ক্লপ তাদেরকে ট্রেনিং দিয়ে ওয়ার্ল্ড ক্লাস বানিয়েছে। ডরটমুন্ডে থাকতে ক্লপ বেশ কয়েক জন প্লেয়ারকে হাই এভারেজ থেকে ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্লেয়ারে পরিণত করেছে, যাদের মধ্যে রয়েছে মার্ক রিয়েজ, মাট হামেল, সাবোটিক, লিউডনেস্কি। এদের সবার দাম এখন ৩০ মিলিয়ন ডলারের উপরে। সকল কোচ ট্যালেন্ট ডেভেলপ করে। কিন্ত ক্লপের বিশিষ্টতা হচ্ছে, সে আগে থেকে চিহ্নিত করে কার কার বিশ্বের সেরা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে এই টিমটাকে নিয়েই কাজ করে।

৮. মিডিয়ার সাথে বিশ্বাস এবং আস্থার সম্পর্ক।

ক্লপ সব সময়েই মিডিয়া ফ্রেন্ডলি। তার প্রতিটা প্রেস কনফারেন্সে সে হাসির বন্যা বইয়ে দেয়।

klopp-4

সে কোনো বাজে কথা বলে না। প্রতিপক্ষকে সব সময়েই সম্মান দেয়।

এবং মিডিয়ার কাছে ক্লপ একটা ফ্রেন্ডলি চরিত্র হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে। এবং মিডিয়াকে সে খুব গুরুত্ব দেয়। কারণ, সে জানে সর্বোচ্চ লেভেলে জনমানস কী ভাবছে, সেইটা নির্মাণের জন্যে মিডিয়ার সাথে একটা আস্থার সম্পর্ক তৈরি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

৯. ক্লপের কাছে টিম স্পিরিট সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ। সে কখনোই পাব্লিকলি কোনো খেলোয়াড়ের সমালোচনা করে না।

এমন কি প্রতিপক্ষদেরকেও সে সব সময়েই সম্মান দেখায়, যেইটা সবাই দেখতে পারে বলে সে সম্মানটা পায়। এবং হেরে গেলে ক্লপ কখনোই দায় অস্বীকার করে না। নিজে দায় নেয়।

১২. কঠোর পরিশ্রম।

ফুটবল বা যে কোনো খেলাতেই পরিশ্রম করার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত ক্লপের কাছে এইটা প্রধান জিনিস। ক্লপের টিম সব সময়েই, যে কোন দলের থেকে বেশি দৌড়ায়। বিগত সবগুলো বছরেই ক্লপের টিমের এভারেজ প্রতি ম্যাচে দৌড়ের পরিমাণ লিগে সর্বোচ্চ ছিল। এইটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বৈশিষ্ট্য।

ক্লপ তার টিমের কাছে সর্বোচ্চ পরিশ্রম চাহিদা করে। এবং যে সব খেলোয়াড় বেশি পরিশ্রম করে, তারা ক্লপের কাছে গুরুত্ব পায়। কারণ ক্লপ বোঝে ট্যালেন্ট থাকতে পারে, কিন্ত পরিশ্রম তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১৩. শেষ মুহূর্তের আগেও হাল না ছাড়ার অ্যাটিচুড।

এইটা হয়ত সকল কোচই বলেন। কিন্ত ক্লপ এইটা শুধু বিশ্বাস করে না, এইটা সে সমর্থকদেরকেই বিশ্বাস করতে বলে। লিভারপুলে জয়েন করার প্রথম দিকে একটা খেলায়, লিভারপুল দুই গোলে পিছিয়ে ছিল এবং ফাইনালি লিভারপুল হেরেছিল। খেলার শেষে ক্লপ, সমর্থকদের উদ্দেশ্য বলেছিল যে তারা বিশ্বাস করে না, লিভারপুল দুই গোলে পিছিয়ে থেকে জিততে পারে।

এবং তারপরে ইউরোপা লিগে সহ বেশ কিছু খেলায় লিভারপুল শেষ কিছু মিনিটের গোলে জেতার অভ্যাস করেছে যে লিভারপুলের সমর্থক, প্রতিপক্ষ, খেলোয়াড় জানে যতক্ষণ না শেষ বাঁশি বাজবে, তার আগে ক্লপের টিম যে কোনো রেজাল্ট আনতে পারে।

১৪. ঐতিহ্য এবং কৃষ্টিকে গুরুত্ব দেয়া এবং সমর্থকদের সাথে স্পেশিয়াল সম্পর্ক।

ক্লপ লিভারপুলে জয়েন করার পর থেকেই বলেছে, ফুটবল শুধু একটা খেলা নয় এবং লিভারপুল শুধু একটা ক্লাব নয়। ফুটবলের সাথে অনেক মানুষের প্যাশন জড়িত। এবং লিভারপুলের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এইটাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

klopp-3

বিজয় উদযাপন।

খেলায় হারজিত থাকতে পারে। কিন্ত হারজিতটাই খেলা নয়। কিন্ত এই ঐতিহ্য এবং সম্মান এবং কৃষ্টি এইগুলোকে বর্জন করা যাবে না।

ক্লপের এই আইডিওলজি সমর্থকরা খুব অন্তর থেকে নিয়েছে। এবং তার সাথে সমর্থকদের একটা অসাধারণ বন্ডেজ তৈরি হয়েছে।

ইন্টারেস্টিং হচ্ছে এই বন্ডেজ সবাই তৈরি করতে চায়। কিন্ত অনেক কোচ ভয় পায় যে যদি অতিরিক্ত প্রত্যাশা সৃষ্টি হয় এবং সে যদি ফেইল করে! ক্লপের কাছে এই ফেইলর নিয়ে ভয় নাই। সে জানে সে বেস্ট দিচ্ছে, এবং বেস্ট থেকে বেস্ট আসবে। তারপরে রেজাল্ট আসবেই। এইটা ক্লপের স্টাইল, ওভার প্রমিজ, ওভার ডেলিভার। যদি এই প্রমিজটা ক্লপ মুখে বড়াইয়ের মাধ্যমে করে নাই, বরং সে তার অ্যাটিচুডে এই অভারপ্রমিজ করে।

১৫. কালচার।

এইটা সবার শেষে বললেও, এইটা সবার আগে উল্লেখ করার দাবি রাখে। কারণ, সাম্প্রতিক কালে পড়া একটা বইয়ের এই ক্লপের এই ফিলসফিকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই বইটাতে বলা হয়েছে যে শুধু মানুষ নয়, একটা প্রতিষ্ঠান বা দলেরও হ্যাবিট থাকে। এবং হ্যাবিটগুলোর বাহিরে কেউ যেতে পারে না। এইটাকে, অন্য ভাষায় কালচার বলা যায়।

ক্লপ এই হ্যাবিটগুলো তৈরি করার চেষ্টা করছে।

ভ্যালুজ—যে আমরা শেষ মুহূর্তের আগে হারব না। আমরা সব চেয়ে বেশি পরিশ্রম করব। আমরা নতুন নতুন খেলোয়াড় তৈরি করব। আমাদের টিমের স্পিরিট থাকবে। কেউ কারো উপরে নয়। সবাই হাসি-খুশি থাকব। দলীয় গোলকে ব্যক্তিগত ইগো থেকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে। ভাল পারফর্মেন্স করলে, মূল্যায়িত করা হবে, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা হবে, ট্রেনিং মাঠে সবার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করা হবে।
এই যে ভ্যালুগুলো এইগুলো—এইগুলোই কালচার।

ক্লপ জানে সে চলে গেলেও, সে যে কালচার তৈরি করবে তা রয়ে যাবে। এবং তার ছেড়ে আসা টিম, ডরটমুন্ডেও তাই হয়েছে। ক্লপ চলে আসার পরেও, এক সময়ের রেলিগেশান ফাইট করা টিম আজকে বুনডেসলিগার সারা দলগুলোর মধ্যে একটা কারণ ক্লপ কালচারের বিজ বপণ করে দিয়ে গেছে, যা সে চলার আসার পরেও প্রস্ফুটিত হয়েছে।

klopp-5

খেলার প্রথমার্ধে খেলোয়াড়দের ইঙ্গিতে নির্দেশ দিচ্ছেন ক্লপ।

ইয়রগেন ক্লপকে দেখে, তাই আবার বিশ্বাস জাগে যে একজন ভাল নেতা কীভাবে একটা এভারেজ টিমকে দিয়ে উচ্চ মানের পারফর্মেন্স আদায় করে নিতে আসতে পারে।

আসলে একটা ফুটবল দলের সাথে, একটা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, একটা এনজিও, বা একটা রাষ্ট্রের তেমন কোনো পার্থক্য নেই। সব জায়গায়, টিম এবং লিডারশিপ গুরুত্বপূর্ণ।

এবং ক্লপ ইতোমধ্যেই গ্রেটনেস অর্জন করেছে কারণ সে আন্ডারডগ বা দুর্বল দলকে ইন্সাপায়ার করে সেরাদের কাতারে নিয়ে আসতে পারে। ক্লপের ডরটমুন্ড পেরেছে। মনে হচ্ছে, লিভারপুলও পারবে।

এবং লিভারপুলের মোট বিগত কয়েক বছরের হারুপাট্ট দল যদি পারে, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশও পারবে। আমাদের শুধু দরকার একজন ইয়রগেন ক্লপ, যে আমাদেরকে তার প্যাশন, ইমোশান এবং অ্যাটিচুড দিয়ে ইন্সপায়ার করবে, একটা পরিকল্পনা দিবে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।

About Author

জিয়া হাসান

সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট এক্টিভিস্ট। সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিশ্লেষক। প্রথম উপন্যাস: 'দুর্ঘটনায় কবি'। গ্রন্থ: 'শাহবাগ থেকে হেফাজত: রাজসাক্ষীর জবানবন্দি'।