ইয়ুভাল নোয়াহ হারারির ‘স্যাপিয়েন্স’ প্রসঙ্গে বিল গেটস

শেয়ার করুন!

ইজরায়েলি লেখক ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি’র ২০১৪ সালের বই  ‘স্যাপিয়েন্স : আ ব্রিফ হিস্টোরি অফ হিউম্যানকাইন্ড’ নিয়ে বিল গেটস এই রিভিউটি লেখেন ২০১৬ সালের মে মাসে। মানবজাতির সামগ্রিক ইতিহাস নিয়ে লেখা এই বইয়ের আকর্ষণীয় বিষয়বস্তু তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের মতামত দেন তিনি।

মানুষ স্মার্ট হলো কীভাবে?

বিল গেটস

অনুবাদ: 

বসন্তের ছুটিতে যাওয়ার আগে আমি মেলিন্ডাকে ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি’র ‘স্যাপিয়েন্স : আ ব্রিফ হিস্টোরি অফ হিউম্যানকাইন্ড’ বইটা সাথে নিয়ে যেতে বলেছিলাম। আমি নিজে ওই বইটা কয়েকদিন আগেই শেষ করেছি, তাই কারো সাথে বইটার ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য উশখুশ করছিলাম খুব। বইটা প্রচণ্ড উত্তেজনাকর আর সেই সাথে মানুষের ইতিহাস নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুলেছে। আমি জানতাম, ডিনার টেবিলে এই প্রসঙ্গে দারুণ সব আলোচনা করা যাবে। শেষ পর্যন্ত হতাশ হই নি। এমনকি, আমাদের ছুটি থেকে ফিরে আসার এত সপ্তাহ পরেও আমরা এখনো ‘স্যাপিয়েন্স’ নিয়ে আলাপ করি।

ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি (জন্ম. কিরইয়াৎ আতা, হাইফা, ইজরায়েল, ১৯৭৬)

ইজরায়েলি ইতিহাসলেখক হারারি এই বইয়ে বেশ ভয়াবহ একটা চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছিলেন—মানবজাতির সমগ্র ইতিহাস মাত্র ৪০০ পৃষ্ঠার ভেতর নিয়ে আসা। যেসব লেখক সূত্রের সাথে সূত্র মিলিয়ে এত বিশদ ইতিহাসের একটা মানে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন, তাদেরকে আমি সবসময়ই পছন্দ করি। সম্ভবত ডেভিড ক্রিশ্চিয়ানই এই কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পেরেছেন। তার ‘বিগ হিস্টোরি’ লেকচারগুলিতে তিনি প্রায় সাড়ে তেরশ’ কোটি বছরের ইতিহাস একাট্টা করেছেন—যেখানে বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের বহু আলোচনা উঠে এসেছে। সেদিক থেকে হারারির সময়কাল অবশ্য অনেক কম ছিল—৭০,০০০ বছরের মানব ইতিহাস—তবু তার কাজটাও ছিল যথেষ্ট কঠিন। তিনি এই বইয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন যে, ঠিক কীভাবে আমরা—মানে হোমো স্যাপিয়েন্স (এই ল্যাটিন শব্দ দুটির অর্থ ‘বুদ্ধিমান মানুষ’)— পৃথিবীটাকে শাসন করা শুরু করলাম আর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য ঠিক কী অপেক্ষা করছে।

বেশিরভাগ মানুষই ধরে নেয়, শুরু থেকে সব কিছুর দায়িত্বে আমরাই ছিলাম। বাদবাকি প্রাণিদের ওপর প্রথম থেকেই আমরা নিজেদের কর্তৃত্ব দেখিয়ে এসেছি। কিন্তু হারারি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, পিরামিড তৈরি বা সিম্ফনি লেখা কিংবা চাঁদের উপর পদচারণার অনেক অনেক আগে আমরা আসলে বিশেষ কিছুই ছিলাম না। হারারি বলেন, “প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের সম্বন্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, তারা একেবারে অন্য সব তুচ্ছ প্রাণীর মতোই ছিল। আশেপাশের প্রকৃতির ওপর গরিলা, জেলিফিশ বা জোনাকিপোকার চাইতে খুব বেশি প্রভাব তাদের ছিল না।”

এক লক্ষ বছর আগে, মানব প্রজাতির অনেকগুলি প্রকারভেদের মাঝে একটা ছিল হোমো স্যাপিয়েন্স। বাকি সবার সাথে দখলদারির জন্য প্রতিযোগিতা করছিল তারাও। আজকে যেমন ভাল্লুক বা শূকরের ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি দেখা যায়—সে সময় মানুষেরও বিভিন্ন প্রজাতি ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা বেশিরভাগ পূর্ব আফ্রিকায় ছিলেন। আমাদেরই জ্ঞাতিভাই ‘হোমো নেয়ানদেরথালেনসিস’ থাকতেন ইউরোপে। সবাই তাদেরকে ‘নেয়ানদেরথালস’ বলে চিনে। ‘হোমো ইরেকটাস’ নামের আরেকটা প্রজাতি ছিল এশিয়ায়। আর জাভা দ্বীপ ছিল ‘হোম সোলেনসিস’ এর বাসস্থান।

প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। কেউ কেউ ছিল বিশালদেহী ভয়ানক শিকারী, আবার অনেকেই ছিল বেঁটে তৃণভোজী। এই প্রজাতিগুলি যতই আলাদা হোক না কেন, তাদের মধ্যে সঙ্কর প্রজননের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেমন নেয়ানদেরথাল জিনোম পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষদের মাঝে খুব অল্প শতাংশ জিন তাদের নেয়ানদেরথাল পূর্বসূরিদের কাছ থেকে এসেছে। (অনেক বংশলতিকাতেই ব্যাপারটা খুবই ইন্টারেস্টিং এক সংযোজন হতে পারে!)

আজকের পৃথিবীতে অবশ্য মানুষের একটা প্রজাতিই টিকে আছে। অন্যরা যেখানে পারল না, সেখানে আমরা হোমো স্যাপিয়েন্সরা এত সফল হলাম কীভাবে? হারারি বিশ্বাস করেন, আমাদের অনন্য বোধশক্তিই আসল পার্থক্যটা তৈরি করে দেয়। প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে হোমো স্যাপিয়েন্সরা একটা ‘কগনিটিভ রেভল্যুশন’ এর ভেতর দিয়ে যায়, যার ফলে তারা পূর্ব আফ্রিকা থেকে ধীরে ধীরে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে সরিয়ে পুরো পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বাকি প্রজাতিদের মাথাও বেশ ভালো ছিল, কিন্তু হোমো স্যাপিয়েন্সদের বৃহৎ পরিসরে পারস্পরিক সহযোগিতা করার ক্ষমতা আছে বলেই তারা এতটা সফল। নিজেদেরকে কীভাবে রাষ্ট্র, কোম্পানি বা ধর্মের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ করতে হয় তা আমরা জানি—যার সাহায্যে আমরা কঠিন কাজগুলির সমাধান করতে পারি সহজে। হারারির ‘কগনিটিভ রেভল্যুশন’ দেখে আমার ডেভিড ক্রিশ্চিয়ানের ‘কালেক্টিভ লার্নিং’ ধারণাটার কথা মনে পড়ে গেল—কীভাবে সংরক্ষণ, সহযোগিতা আর তথ্যের ভিত্তিতে উন্নয়নের ক্ষমতা আমাদেরকে মানুষ হিসাবে বৈশিষ্ট্যময় করে তুলেছে।

তবে হারারির বর্ণনার অনন্য ব্যাপারটি হলো, মানুষের একাত্ম হবার পেছনে গল্প এবং মিথোলজির শক্তির ওপর তিনি আলাদাভাবে আলোকপাত করেছেন। বেবুন, নেকড়ে এবং আরো কিছু প্রাণীও দল বেঁধে কাজ করতে পারে, কিন্তু তাদের দলগুলি একেবারে ঘনিষ্ঠ সামাজিক বন্ধনের ভিত্তিতে তৈরি—ফলে একেকটা দল অনেক ছোট হয়। অন্যদিকে কোটি কোটি অপরিচিত লোককে কোনো সাধারণ মিথোলজি বা গল্পের সাহায্যে একজোট করার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মানুষের। স্বাধীনতা, মানবাধিকার, ঈশ্বর, আইন আর পুঁজিবাদের মতো ধারণাগুলি একেবারেই আমাদের কল্পনা থেকে উদ্ভূত—অথচ এসবই আমাদেরকে একত্র করে রাখে এবং জটিল কোনো সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে।

‘স্যাপিয়েন্স’ বইটা অনেক উপভোগ করলেও, দ্বিমত হবার মত অনেক জিনিসই আছে এই বইয়ে। যেমন হারারি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, কৃষিভিত্তিক বিপ্লব মানব সভ্যতার ইতিহাসের বড় ভুলগুলির একটি। তার মতে, এতে সভ্যতার উন্নয়ন ঘটলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা শিকারি মানুষ হিসাবেই ভাল ছিলাম। কৃষক হবার পর মানুষদেরকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে ঠিকই অথচ বিনিময়ে তারা শিকারি মানুষদের তুলনায় কম পুষ্টিকর খাবার পেয়েছে। তাছাড়া কৃষিভিত্তিক সমাজের ফলে শুরু হয় সামাজিক শ্রেনিবিভক্তি—যাতে বেশিরভাগ মানুষ ক্ষেতমজুর হিসাবে অভিজাত শ্রেণিদের কাছে শোষিত হয়ে এসেছে।

এই বিতর্কটা যদিও বেশ প্ররোচনাদায়ক, তবু আমি ঠিক সম্মত হতে পারলাম না। প্রথমত, কৃষকদের বদলে শিকারি মানুষ হিসাবে আমরা বেশি সুখী ছিলাম—এই দাবির মাধ্যমে একটা বাছাই করার ব্যাপার চলে আসে। কিন্তু আমাদের কাছে বাছাই করার কোনো সুযোগ আসলে নাই। আমরা তো আর চাইলেই ঘড়ির কাঁটা উলটে দিয়ে শিকারি মানুষ হিসাবে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারব না। দ্বিতীয়ত, আমার মনে হয় হারারি শিকারিদের পরিশ্রমকে খাঁটো করে দেখছেন। তিনি বলতে চান, কৃষিজনিত বিপ্লবের আগে মৃত্যু ও সহিংসতার হার নাকি অনেক কম ছিল। কিন্তু সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতার কারণে সহিংসতার পরিমাণ বেশিই হবার কথা। একটা কৃষিসমাজ প্রতি বর্গমাইলে কোনো শিকারি সমাজের চাইতে অনেক বেশি মানুষকে জায়গা দিতে পারবে। জনসংখ্যার ঘনত্ব কম রাখার জন্য শিকারিদের মাঝে সংঘর্ষ হওয়াটা ছিল অপরিহার্য। সব শেষে, কৃষিকাজ অবলম্বন করাকে ‘ভুল’ বলে আখ্যায়িত করায় হারারি এই ব্যাপারটা এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, কৃষিসমাজের মাধ্যমেই আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছি; ফলে লিখিত ভাষা, আধুনিক প্রযুক্তি আর শিল্পের মতো মূল্যবান সব জিনিসের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বিল গেটস।

তারপরও যদি কেউ মানব সভ্যতার শুরুর দিককার ইতিহাস নিয়ে মজাদার ও উত্তেজনাকর কোনো বই পড়তে আগ্রহী থাকেন—তাহলে তাকে এই বইটা সাজেস্ট করব আমি। ‘বিগ হিস্টোরি’র মত এই বই পড়েও আমি আমাদের ঐতিহাসিক কাঠামো সম্বন্ধে সুবিশাল এক ধারণা পেয়েছি; যা পরবর্তীতে নতুন বিষয় জানার মাধ্যমে আরো সমৃদ্ধ হবে। সেই সাথে, হারারি আমাদের ইতিহাস এতটা সহজপাঠ্য করে বলেছেন যে, বইটা রেখে দিতেও অনেক কষ্ট হবে আপনার। প্রাণবন্ত ভাষা, ছবি আর ডায়াগ্রাম ব্যবহার করে নিজের বক্তব্যগুলির বিবরণ দিয়েছেন তিনি। ভদ্রলোক বেশ ক্ষিপ্র একজন লেখক। উপভোগ্য সব ঐতিহাসিক গল্প অনেক দক্ষভাবে বুনেছেন; যেমন সমুদ্র ভ্রমণে টক বাঁধাকপি কতটা প্রয়োজন আর ৫০০০ বছর আগের সবচাইতে পুরাতন লিখিত শব্দগুলি কেন কিছুটা হতাশাজনক ছিল।

আমার মনে হয় বইটার শেষ অংশটুকু পাঠকদের মাঝে আগ্রহ জাগাবে সবচাইতে বেশি। হাজার বছরের ইতিহাস ঘুরে দেখার পর হারারি অনেকটা দার্শনিক হয়ে যান। বর্তমান সময়ে আমাদের প্রজাতির অবস্থান ও তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য প্রযুক্তি আমাদের প্রজাতিকে কতটা বদলে দিবে তা বোঝার চেষ্টা করেন তিনি।

তাছাড়া ‘সুখ’ নিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন করেন হারারি। বিস্তৃত এই ইতিহাসের ঠিক কোন পর্যায়ে আমরা সবচাইতে সন্তুষ্ট ছিলাম? প্রকাণ্ড জন্তুদের ধাওয়া করে বেড়ানো শিকারি হিসাবে? জমি চাষ করা কৃষক হিসাবে? নাকি মধ্যযুগের ঈশ্বরভক্ত মজুর অবস্থায় সবচেয়ে সুখী ছিলাম আমরা? আরো সারাংশে গেলে, হারারি আসলে জানতে চান : প্রজাতি হিসাবে আমরা আসলে কারা? আমরা কোথায় যাচ্ছি?

এই বড় বড় প্রশ্নগুলি আমাদের প্রজাতির ইতিহাসের সমানই পুরানো। আমি নিশ্চিত, বইটা শেষ করার পর আপনিও আমার মতো আপনার প্রিয় কিছু হোমো স্যাপিয়েন্সের সাথে সে সবের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবেন।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here