রিপাবলিকান দল রুডি জুলিয়ানিকে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসাবে মনোনয়ন দিলে নির্ঘাত পাশ করে যাবেন।

আমি যখন এই দেশে আসি আশির দশকের শেষে, নিউইয়র্ক সিটির সফল ডেমোক্র্যাট মেয়র এড কোচ তাঁর বার বছর (তিন মেয়াদ) পূর্ণ করে বিদায় নিচ্ছেন এবং আরেক ডেমোক্র্যাট ডেভিড ডিনকিন্স চার বছরের জন্য নতুন নির্বাচিত মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

মেয়র হিসাবে এড কোচ সফল মানুষ ছিলেন। এই শহরের অনেক উন্নয়ন করেছেন। সহায়ক আইন প্রণয়ন করেছেন। যদিও পরবর্তী বাকি জীবন তিনি দল পরিবর্তন করে রিপাবলিকান হিসাবে কাজ করে গেছেন। ইহুদি বংশোদ্ভূত এই মেয়র কঠিন নীতিপরায়ণ মানুষ ছিলেন। নিজের সততা, পরিশ্রম এবং কর্মদক্ষতায় সত্তর দশকে এই শহরের নিম্নমুখী অর্থনৈতিক অবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন এই যাদুকরী শক্তির মানুষ এড কোচ।

murad hai 3 logo

চির কুমার এই মেয়র ২০১৩ সালে বয়সজনিত কারণে মারা যান। মৃত্যুর আগে এই ভদ্রলোক তার ১২ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি নিজের তিন ভাগিনা, নিজের আজীবনের বিশ্বস্ত সেক্রেটারি এবং সমাজসেবা মূলক কাজে দান করে গেছেন। এই মানুষ তার কর্মকাণ্ডের জন্য মানুষের কাছে এতই সমাদৃত ছিলেন যে মানুষ আজো অনেক শ্রদ্ধাভরে তার কথা স্মরণ করে। কুইন্স কাউন্টি থেকে ম্যানহাটানে প্রবেশ করতে হাডসন নদীর উপর স্থাপিত ব্রিজ যার আসল নাম হল ‘কুইন্স বরো ব্রিজ’। এই মহান মানুষের সন্মানে তার জীবিতাবস্থায় সেই ব্রিজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘এড কোচ ব্রিজ’।

ed-coach-2
মেয়র এড কোচ

এড কোচের মেয়াদ শেষ হলে মেয়র হিসাবে আসেন আরেক ডেমোক্র্যাট ডেভিড ডিনকিন্স (১৯৯০-৯৩) কৃষ্ণাঙ্গ মেয়র ডিনকিন্সের সময়ে আমার এই শহরের জীবন শুরু হয়। তখন দেখেছি এই শহরে কালোদের তাণ্ডবলীলা। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম অবনতি হয়েছে তখন। রাস্তাঘাটে, দোকানপাটে, ট্রেনে-বাসে ছিনতাই, রাহাজানি, জখম, খুনের পরিমাণ এতই বাড়ে যে কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়ে যায়।

এসব কোনো গল্প নয়। আমি নিজে সেই সময়ের কালোদের কীর্তিকলাপের চাক্ষুষ সাক্ষী। ওদের ভয়ে দিনের বেলাতেও বিদেশী পর্যটকেরা রাস্তায় হাঁটতে ভয় পেতো। সাহায্য চাওয়ার নামে বলা যায় মানুষজনকে পয়সা দিতে জবরদস্তি করত। পুলিশের সংখ্যাবৃদ্ধির বাজেট পেলেও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে তার শাসনামল রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। নিজে মানুষ হিসাবে অনেক সুশিক্ষিত, প্রতিভাবান, সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ঝুলি থাকা সত্ত্বেও এই মেয়র নিউইয়র্ক শহরের অর্থনৈতিক ধ্বস আটকাতে পারেন নি।

তার আমলের সব চাইতে বড় দুর্ঘটনা ছিল ব্রুকলিন ক্রাউন হাইটসের কালো এবং ইহুদিদের ভিতর দাঙ্গা। সামান্য সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী শহরে কালোরা যে তাণ্ডব চালায় এবং সেই অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে মেয়রের হিমশিম অবস্থা তার দ্বিতীয়বারের পুননির্বাচন একেবারেই সমূলে ধ্বংস করে দেয়।

ঘটনাটা ঘটে ১৯৯১ সালের ১৯ আগস্ট। ইহুদিদের একজন ধর্মীয় নেতার মৃতদেহ বহন করা গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ক্রাউন হাইটসে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো দুই কৃষ্ণাঙ্গ বালকের উপর চড়ে যায়। সেখানে এক বালকের মৃত্যু হয়। কালোরা ইহুদিদের এই কার এক্সিডেন্টকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রচার করে জমায়েত হতে শুরু করে। ইহুদিদের বাড়িঘরে ইট পাটকেল ছোড়ে। পাহারায় আসা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ভ্রমণ করতে আসা অস্ট্রেলীয় ইহুদি যুবককে একা পেয়ে ছুরিকাঘাত করে। হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এসব কিছু মিলিয়ে পুরো ব্রুকলিন এলাকা জুড়ে প্রচণ্ড অস্থির অবস্থার সৃষ্টি হয়।

dinkins-rudi
বিদায়ী মেয়র ডিনকিন্স ও পরবর্তী মেয়র জুলিয়ানি

অনেক মানুষজন এবং পুলিশ হতাহত হয়। এই ঘটনা ভাল ভাবে সামাল দিতে না পারার কারণে মেয়র ডিনকিন্সকে তার রি-ইলেকশনে ভরাডুবি খেতে হয়। তার মেয়াদ শেষে এই মেয়র শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। বর্তমানে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে শিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন।

মেয়র ডিনকিন্সকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়ে আসেন রিপাবলিকান দলের টিকিটে রুডলফ জুলিয়ানি। ব্রুকলিনে জন্ম নেয়া ইটালিয়ান বংশোদ্ভূত জুলিয়ানি পেশায় এখন আইনজ্ঞ।

এই দেশের আইন ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে সার্থক আইনজীবী এবং কঠোর আইনের প্রয়োগকারী হিসাবে জুলিয়ানির অনেক সুনাম আছে। জবুথবু অর্থনীতি, ভেঙে পড়া আইনের শাসন, শহরের চরম অবনতির অবস্থায় নিউইয়র্ক শহরের মেয়র হিসাবে হাল ধরেন জুলিয়ানু। ১৯৯৪ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দুই মেয়াদে আট বছর মেয়র হিসাবে কাজ করে এই শহরের আইনের শাসন পুনর্প্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি, দীর্ঘকালের অপরাধ চক্র মাফিয়াদের বংশ বিনাশ করে গেছেন এই মেয়র। সে সময়ে নিউইয়র্কে থাকার কারণে আমি এর জ্বলন্ত সাক্ষী।

কোনো মানুষের ভিতর তার কাজের প্রতি এত নিষ্ঠা থাকতে পারে সেটা জুলিয়ানিকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। জুলিয়ানির সময়ের আগ পর্যন্ত বাসে-ট্রেনে একা ভ্রমণ করতে ভয় লাগতো। রাতে-বিরাতে একা বাইরে যেতে ভয় লাগতো। কিন্তু জুলিয়ানি মানুষের মন থেকে সেই ভয় দূর করে দিয়েছেন। ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সময় দেখেছি এই মেয়র কেমন করে এই শহরে সব কিছু সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সারা পৃথিবীতে সুনাম কুড়িয়েছেন। যার জন্য তাকে বলা হয় আমেরিকার মেয়র।

rudy-guiliani-4
টাইম ম্যাগাজিনের পারসন অব দি ইয়ার রুডি জুলিয়ানি

আমরা বন্ধুরা গল্প করতাম, ইস, যদি জুলিয়ানিকে কিছু দিনের জন্য ঢাকা শহরের মেয়র বানানো যেতো তাহলে মনে হয় কিছুদিন পর মনেই হত না ঢাকা বাংলাদেশের অংশ। বরং মনে হত আমেরিকার অপরাধমুক্ত পরিচ্ছন্ন কোনো শহর।

রিপাবলিকান দল রুডি জুলিয়ানিকে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসাবে মনোনয়ন দিলে নির্ঘাত পাশ করে যাবেন। আমি তাহলে রেজিস্টার্ড ডেমোক্র্যাট হয়েও জুলিয়ানিকে শুধু ভোট দিব না, তার পক্ষে ক্যাম্পেইন করবো নিঃসন্দেহে, স্বতস্ফূর্তভাবে। কারণ ব্যক্তিগত ভাবে আমি কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করি না। যারা সমাজের ও মানুষের ভাল করে আমি সব সময় তাদের জয়গান করি।

জুলিয়ানির পর ২০০২ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এই শহরের মেয়র ছিলেন বিলিয়নিয়ার বড়লোক মাইকেল ব্লুমবার্গ। পৃথিবীর প্রথম সারির ধনী ব্যক্তিদের ভিতর একজন ইহুদি ধর্মের এই মেয়র তার ১২ বছর মেয়াদে অপরাধ হয়ত বাড়তে দেন নাই অনেক কিন্তু এমন কিছু ভাল কাজও করেন নাই। শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক পয়সা ঢেলেছেন। স্কুলের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। নিজে শহরের তহবিল থেকে মাত্র এক ডলার বেতন নিয়েছেন বছরে। কিন্তু শহরের সব উন্নয়ন কাজ তার এবং তার আত্মীয়স্বজনের প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিয়েছেন। ব্লুমবার্গের নিজের সম্পত্তির পরিমান ৩৫.৪ বিলিয়ন ডলার (২০১৫)।

michel-bloomberg-56
মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ

এই দেশের মানুষেরা সরাসরি চুরি করে না আমাদের দেশের বেকুব রাজনীতিকদের মত। এরা বানিয়ে খায়। কাজ করে নিজেদের লোকজন দিয়ে। নিজের চোদ্দগোষ্ঠীকে প্রতিষ্ঠিত করে দেন শক্ত আইনী ভিতের মাধ্যমে সরাসরি কোনো অনিয়ম না করে। এই জন্য মেয়াদ শেষে চলে গেলেও এদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার বিশেষ কোনো প্রমাণ পায় না কেউ।

আরেকটা ব্যাপার হলো, এই দেশে আগের মানুষ যা কাজ করে যায়, পরের মানুষ এসে সেটা কখনো পরিবর্তন করে না। সমালোচনা করে না যদি নিজের দলের নাও হয়। বরং অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে ফেলে। মেয়র ব্লুমবার্গের শহরে গাড়ি চালানোর ট্রাফিক আইনগুলি আমার একদম পছন্দ নয়। বিশেষ করে ম্যানহাটানে রাস্তাঘাটের যে পরিবর্তন করেছেন তাতে স্থানীয় ব্যবসাগুলি অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ মানুষ আমার খুব পছন্দের না হলেও তাকে অনেক খারাপও বলতে পারছি না।

জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি নন। বলা হয় নিজের টাকার জোরেই তিনি ৩ বার মেয়র হয়েছেন। এই মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হতে ব্লুমবার্গ নিজের তহবিল থেকে নির্বাচনী প্রচারনায় ২৬৮ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছেন। শুধু তাই নয়। নিজের মেয়াদের সময়ে স্বীয় তহবিল থেকে বিভিন্ন সমাজসেবা মূলক কাজে ৩৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। বার বার দল পরিবর্তন করলেও এই মানুষ সত্যিকার অর্থে কোনো দলের টিকিটের তোয়াক্কা করেন নাই। উচ্চশিক্ষিত, ধুরন্ধর ভাবে সফল এই ব্যবসায়ী শখের বশে ৩ মেয়াদের জন্যে এই শহরের মেয়রের পদে থেকেছেন। তার সেই দীর্ঘ মেয়াদকালে তিনি মেয়রের সরকারী বাসভবনেও থাকেন নাই। থেকেছেন নিজের বাসায়।

ব্লুমবার্গের পর এসেছেন বর্তমান ডেমোক্র্যাট মেয়র বিল ডি ব্লাসিও। ইটালিয়ান বংশোদ্ভূত ব্লাসিও আমার দৃষ্টিতে একেবারেই অপছন্দের মানুষ। আমার মনে হয়েছে ইমিগ্র্যান্ট ভর্তি হাজার রকমের মানুষের ভিন্নধর্মী শহর নিউইয়র্কে এত নরম ভদ্রলোক মেয়র দিয়ে কোনো কাজ হবে না।

Bill-De-Blasio-6
নির্বাচনের আগের দিন লন্ড্রির কাপড় কাঁধে বর্তমান ডেমোক্র্যাট মেয়র বিল ডি ব্লাসিও ও তার স্ত্রী।
Bill-De-Blasio-1
স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রসহ ডেমোক্র্যাট মেয়র বিল ডি ব্লাসিও।

দুই বছর পার হতে চলেছে তার মেয়াদ কালের। শহর দেখে মনে হয়, সরকারী মানুষেরা এখন কোনো কাজই করে না। সব কিছু খুব বেশি ঢিলে-ঢালা ভাবে চলে। জায়গায় জায়গায় ময়লা উপচে পড়ছে। রাস্তাঘাটে গৃহহীন, নেশাখোর মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। ছিঁচকে চুরি, রাহাজানি বাড়ছে। অর্থনীতি নিম্নমুখী। ওয়াল স্ট্রিট খুব শান্ত। বাড়িঘরের কেনাবেচা স্তম্ভিত। বেকার সমস্যা কমছে না। শহরের পুলিশ বাহিনী এই মেয়রের নানা রকম বাচাল কথাবার্তায় বিরূপ হয়ে আছে।

আমার দৃষ্টিতে এই মেয়রের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অনেক অভাব রয়েছে। জানি না—এখনো তার মেয়াদকালের অনেক সময় বাকি—কেমন কাটবে বাকি দিনগুলি।

নিউইয়র্ক, ১০ আগস্ট, ২০১৫