‘ডেভেলাপমেন্ট সেক্টর’-এর কাজ মানেই বিদেশ থেকে মূল টাকাটা আসবে।

যে কোনো বিষয়ের পিছনের পলিটিক্স খোঁজা ভাল। এতে যেমন বিষয়টাকে নানা প্রেক্ষিত থেকে ক্রিটিক্যালি দেখার সুযোগ হয় তেমনি আলোচনায় একটা ভরিক্কি ভাবও আসে। এইজন্যই শুরুতে ‘শব্দের রাজনীতি’ বললাম।

কিন্তু বলেই মনে হল ‘পলিটিক্স’ শব্দটা ঠিক আছে কিন্তু ‘রাজনীতি’ শব্দটা কেমন যেন ছোট পরিসরের; রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমি যে কারণে ‘রাজনীতি’ ব্যবহার করছি তার পরিসর আরেকটু বড়। তাহলে কোন শব্দ ব্যাবহার করব?

—‪বিশ্বরাজনীতি?

ভাল্লাগছে না।

—‪শব্দের ডিসকোর্স?

না, বড় বেশি একাডেমিক। শব্দ নিয়ে শব্দাশব্দি বাদ, এর চেয়ে বরং মূল গল্পে আসি।

farjina-malek-snigdha-logo

২০০৯ সালে প্রথম যখন বেসরকারি সংস্থায় কাজ শুরু করি তখন ‘এনজিওতে কাজ করি’ বলাটাই চালু ছিল।

সবাই তাই বলত, আর তাই আমিও ওভাবেই বলতাম—‪”আমার নাম ফারজিনা, আমি অমুক এনজিওতে কাজ করি।”

আমার বস ছিলেন এক ইংলিশ এবং বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী ভদ্রমহিলা। প্রথম যে জিনিসটা তিনি আমাকে বোঝালেন সেটা হল তিনি আমার ‘বস’ না, তিনি হলেন ‘সুপারভাইজার’। আর বললেন তাকে নাম ধরে ডাকতে; সিস্টার বা ম্যাডাম যেন না বলি।

তিনি হেলথ প্রফেশনালস, ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কাজ করছেন। খুব ভাল করেই বুঝতেন, এই দেশে নার্সদেরকে ‘সিস্টার’ ডাকা হয়, ‘ম্যাডাম’ ডাকটা এনজিওতে কালচারের সাথে যায় না। অন্যদিকে তার ইংলিশ নামের সাথে ‘আপা’—‪সেটাও বড় কিম্ভূত শোনায়।

তাই ফাইনাল হল তাকে আমি নাম ধরেই ডাকব আর তিনি আমাকে ‘সুপারভাইজ’ করবেন।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার সুপারভাইজারের অনেক ভিনদেশী বন্ধুবান্ধব ছিল যারা ওই এনজিওটার উপদেষ্টা, ডোনার, ফান্ডরাইজার অথবা নেটওয়ার্ক বাড়াতে কাজ করত। তাদের মধ্যে অনেকেই আমাদের কাজকে ‘চ্যারিটি ওয়ার্ক’ বলতেন।

আমি তত দিনে বুঝে গেছি ইন্ডিভিজুয়্যাল (যারা কিনা বেশির ভাগ সময়ই বয়স্ক) ডোনাররা যদি ‘চ্যারিটি’ বলে টাকা দেয় তো দেক, কিন্তু বিজ্ঞ সমাজে আমরা যা করি তাকে ‘চ্যারিটি ওয়ার্ক’ বলতে পারব না। ওটা ওল্ড ফ্যাশনড। ওতে ‘বেনিফিসিয়ারিজ’দের সাথে হায়ারারকি বাড়ে; একই সমতলে থেকে কাজ করা যায় না।

আর যারা জ্ঞানী, যারা অভিজ্ঞ তারা বলেন ‘চ্যারিটি ওয়ার্ক’ বড়জোর একটি ‘ক্ষণস্থায়ী’ বিষয় হতে পারে যাকে তারা ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ বলতে বেশি আগ্রহী। লম্বা সময় ধরে ‘চ্যারিটি’ চলতে থাকলে ‘বেনিফিসিয়ারিজ’দের ভিক্ষা স্বভাব তৈরি হয় এবং তা সযত্নে লালিত হয়। আমার সুপারভাইজারও আমাকে তাই বোঝালেন। তার উপর আবার ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ কাকে বলে, কীভাবে হয় তাও বোঝাতেন। আমি খুবই খুশি—নতুন দুনিয়াতে নতুন নতুন ‘জারগন’ শিখি।

farzina-3-9এখন আমি বলি—‪”আমি ফারজিনা, আমি ডেভেলাপমেন্ট সেক্টরে কাজ করি।”

আগের “এনজিও তে কাজ করি” থেকে “ডেভেলাপমেন্ট সেক্টরে কাজ করি” বলতে আমার বেশি ভাল লাগে। আমি তখনও জানি না যে ‘উন্নয়ন’ নিয়ে বিরাট তর্ক তারও অনেক আগে থেকে চলছে।

কে উন্নত, কে অনুন্নত, উন্নয়নের মডেল, কে কার উন্নয়ন করবে, কোন ঢঙে করবে—এসব নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক ঝগড়া।

আমি চিন্তা করি, ভুল কাজ করছি কি?

আমাদের কাজ কি থেমে যাবে?

আমার সুপারভাইজার একদিন এটা নিয়ে কথা বলছিল। তার বক্তব্য হল, টার্মনিওলজি থেকে কাজের উদ্দেশ্য অনেক বেশি জরুরি। ‘বেনিফিসিয়ারিজ’রা উপকৃত হচ্ছে কিনা সেটাই মূল বিষয়। আমার মনে হয় ‘ঠিক কথা’।

আমার আরেক কলিগ, সে বলে ‘শব্দ’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরা কাজ ভেস্তে যেতে পারে ঠিক শব্দ প্রয়োগ না করলে। আমার মনে হয় ‘এটাও ঠিক কথা’। আলোচনা আরও আগায়। ‘পার্টিসিপেটরি অ্যাপ্রোচ’ (বেনিফিসিয়ারিজ দের) যোগ করে ‘ডেভেলাপমেন্ট’কে মোটামুটি জাস্টিফাই করার আলোচনা চলতে থাকে। সময়ে সময়ে আবার ‘হিউম্যান রাইটস’ অ্যাপ্রোচও যোগ হয়।

আমি মুগ্ধ হয়ে তাদের কথাবার্তা শুনি; কথার মধ্যে সুন্দর সুন্দর, কঠিন আর একাডেমিক শব্দের প্রয়োগে আমার মুগ্ধতার পরিমাণ আরও বাড়তে থাকে।

farzina-3-5এই ধরণের তাত্ত্বিক আলোচনায় আমিও একটা পার্ট—‪ভাবতেই ভাল লাগে। এরপর আমি আরও একটা এনজিওতে দুই তিন বছর কাজ করেছি। সেখানে আমরা ‘বেনিফিসিয়ারিজ’দের ‘বেনিফিসিয়ারিজ’ বলতাম না। কারণটা পরিষ্কার—‪তারা তো আসলে কোনো বেনিফিট নিচ্ছে না কারও কাছ থেকে। তারা যা পায় এটা তো আসলে তাদের অধিকার। সরকারেরই অধিকারটা নিশ্চিত করার কথা ছিল। কিন্তু সম্পদের অভাব, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা—‪এসব কারণে তারা পারছে না বলে বেসরকারি সংস্থাগুলি দেশ বিদেশ (মূলত বিদেশ) থেকে টাকা আনছে আর তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের ‘অধিকার অর্জন’-এর চেষ্টা করছে।

‘বেনিফিসিয়ারিজ’-এর আর কোনো ভাল নাম না পেয়ে আমরা তাদের বলতাম ‘গ্রুপ মেম্বার’।

এটা অবশ্য আমাদের কাজের ধরনের সাথেও যেত; কারণ আমরা গ্রুপে গ্রুপে কাজ করতাম। আর আমরা নিজেদেরকে বলতাম ‘টিম মেম্বার’। ‘গ্রুপ মেম্বার’ আর ‘টিম মেম্বার’ এর একটা পার্থক্য তো আছেই, আর পার্থক্য মানেই কি হায়ারারকি? সেটা নিয়ে অবশ্য কখনও আলোচনা হয় নি। ‘আমরা আরও অনেক বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা করতাম। ‘গ্রুপ মেম্বার’দের ‘ডিগনিটি’ ‘সক্ষমতা’ ‘অধিকার’ এই বিষয়গুলি নিয়ে আমরা আনুষ্ঠানিক/ অনানুষ্ঠানিক ভাবে বহু আলোচনা করেছি। ‘ডিগনিটি’ আর ‘সক্ষমতা’ কীভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে—‪সেই বিষয় নিয়েও যেমন আলাপ হত একই ভাবে এই ‘ডিগনিটি’ বোধ কীভাবে আমরা ‘হাপিশ’ করে দিলাম (আবার সেই দয়া-দাক্ষিণ্যের সংস্কৃতির মানে ‘চ্যারিটি’র কথা চলে আসে) সেটা নিয়েও আলোচনা হত।

বেনিফিসিয়ারিজ
গুগল-এ ‘বেনিফিসিয়ারিজ’, এনজিও আর বাংলাদেশ লিখে সার্চ দিলে এই ছবি পাওয়া যাবে। চেয়ারে বসা যারা তারা সম্ভবত ‘টিম মেম্বার’।

আরেকটা দলের মানুষ নিয়ে আমরা খুব বেশি তর্ক করতাম, তাদের আমরা ‘পার্টনার’ বলে ডাকতাম আর আমরাও নিজেদেরকে তাদের ‘পার্টনার’ বলে দাবি করতাম। এরা স্থানীয় এনজিও ছিল আর প্রকল্পের কাজ গুলি তারা ইমপ্লিমেন্ট করত। আমাদের ভিতরে ক্রমাগত একটা চর্চা চলতো যাতে সত্যি সত্যিই আমাদের আচরণে, কথায়, বা কোনো ধরনের অভিব্যক্তিতে ‘ডোনার’ ভাবটা না আসে। আমাদের এক কলিগ অবশ্য বলত—‪”আমরা এমন একটি ডোনার অর্গানাইজেশন যারা পার্টনার নামে পরিচিত।”

যখন এই সংস্থায় কাজ করতাম তখন আমি নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিতাম এভাবে—‪”আমি ফারজিনা, আমি অমুক একটা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে কাজ করি।” যারা এনজিও এর সাথে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত তারা তো জানেন এখানে ‘ন্যাশনাল’ আর ‘ইন্টারন্যাশনাল’ এর পার্থক্য কেবল ‘স্থানিক’ নয়; এ এক ভীষণ রকমের মর্যাদার পার্থক্য।

পরে যখন অস্ট্রেলিয়ায় আসলাম, প্রথম প্রথম খুব এনজিও, ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশন, হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন এগুলিতে ‘কাজ’ খুঁজতাম। অবশ্য আসার পর পরই বুঝে গেছি এখানে ‘চাকরি’ খোঁজা লাগবে ‘কাজ’ খোঁজা যাবে না। চাকরি আর কাজের পার্থক্য নিশ্চয়ই ‘ইমিগ্রেন্ট’ মাত্রই ভাল ভাবে বোঝেন।

এখানকার চাকরির বাজারটা বুঝতেও আমার বেশ কিছু দিন সময় গেছে; এমন কি এরা যে ‘ডেভেলাপমেন্ট সেক্টর’কে ‘কমিউনিটি ওয়ার্ক’ বলে তাও আমি প্রথম দিকে বুঝি নি। আর এদের বেসরকারি পর্যায়ের কাজগুলিও আমাদের থেকে অনেক আলাদা।

আমার কাছে ‘ডেভেলাপমেন্ট সেক্টর’-এর কাজ মানেই বিদেশ থেকে মূল টাকাটা আসবে। সরকারই যে এদের টাকার একমাত্র উৎস হবে—‪তা কে জানতো? এর উপর আবার যারা ‘কমিউনিটি ওয়ার্ক’ করে তাদেরকে বলা হয় ‘এজেন্সি’। আর আমার তো ‘এজেন্সি’ মানেই ইনস্যুরেন্স কোম্পানিদের কথা মনে হয়।

বেতন
বাইরে না বললেও ভিতরে ভিতরে আমি নিজেও এমনই; সকল সততা ঠিক রেখে বেতনটা বেশি খুঁজি।—‪লেখক

এরকম একটা ‘এজেন্সি’ বা ‘অর্গানাইজেশন’-এ আমি কিছুদিন যাবৎ ‘চাকরি’ (আমার কলিগরা অবশ্য কাজ বলে, কিন্তু বাঙালী হিসেবে আমি এটাকেই চাকরি বলি) করি। এখানে চাকরি করে আরও অদ্ভুত সব শব্দ শিখি। এরা ‘বেনিফিসিয়ারিজ’ বা ‘গ্রুপ মেম্বার’দের বলে ‘ক্লাইন্ট’। আমার অভিজ্ঞতায় এটা তো রীতিমত ‘দোকান’-এর শব্দ!

আমাদের এনজিও-এর ‘ক্লাইন্ট’রা হল পারসন উইথ ডিসএ্যাবিলিটিজ। তাদের ‘সোশ্যাল ইনক্লুশন’ নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাজ করি।

আমরা তাদের নিয়ে বিভিন্ন ক্লাবে যাই, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে করে ঘুরাঘুরি করি, লোকাল মার্কেটে কেনাকাটা করি; আর তাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করা হয় আমাদের অফিসে। এভাবে করে তাদেরকে সমাজে ‘ইনক্লুড’ করি।

কিন্তু বাইরে থেকে আসা একজন মানুষ হিসেবে আমি বুঝি না তারা সমাজ থেকে ‘এক্সক্লুডেড’ হল কোন প্রক্রিয়ায়। যেখানে প্রতিটা যানবাহনে, শপিং মলে, বড় বিল্ডিং-এ র‍্যাম্প থাকে; যেখানে পারসন উইথ ডিসএ্যাবিলিটিকে কোনো ভাবে কেউ অপমানজনক কিছু বললে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়া পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে সেখানে কোন প্রক্রিয়ায় তারা আসলে ‘এক্সক্লুডেড’ হয় সেটা আমার জানার খুব ইচ্ছা হয়।

আমার খুব মনে হয় গায়ে ‘ডিসএ্যাবিলিটি’ তকমা বসিয়ে আমরা তাকে ‘এক্সক্লুড’ করছি না তো?

তাই যখন আমাকে বাসায় জিজ্ঞেস করল, আমি আসলে কী চাকরি করি, আমি বলি আমরা মানুষের শরীর ও বুদ্ধির বিভিন্ন ভাবে অ্যাসেসমেন্ট করি, তারপর ‘পারসন উইথ ডিসএ্যাবিলিটি’ নাম দিয়ে তাদেরকে ‘কমিউনিটি’ থেকে ‘এক্সক্লুড’ করি আর ফাইনালি তাদেরকে ‘কমিউনিটি’তে ‘ইনক্লুড’ করার জন্য কাজ করি। আর এটাকে আমরা ‘কমিউনিটি ওয়ার্ক’ বলি।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য