page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

“এবং আহমদ ছফা তাকে গুরু বলতেন।”—আহমাদ মাযহার

সাদ রহমান: আপনার এই বইমেলায় কোনো বই আসছে?

আহমদ মাযহার: আমার একটা বই আসি আসি করছে আর কি। আমার বলতে আমার লেখা বই নয়। লেখা প্রাবন্ধিক, গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্টকার—বিশেষ করে তার পরিচয় প্রাবন্ধিক, আবদুল হক। তার উপরে আমি কাজ করছিলাম দীর্ঘকাল ধরে। তিনি একটি অসম্পূর্ণ আত্মজীবনী লিখেছিলেন। এবং তিনি দিনলিপি লিখতেন প্রায়শই। তার দিনলিপি, অসম্পূর্ণ আত্মজীবনী এবং তার বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো লেখা, আত্মজীবনীমূলক যেই লেখাগুলো ছিলো, সেগুলো প্রাসঙ্গিক অংশ নিয়ে আমি একটা সম্পাদনা করে ওই বইটা বের করছি।

সাদ: বইটার নাম?

মাযহার: বইটার নাম ‘আমার জীবনকথা, স্মৃতিকথা ও দিনলিপি’।

সাদ: আবদুল হক, উনার যে অসম্পূর্ণ জায়গা, কোন জায়গা থেকে আপনের কাজটা করতে হইছে বিশেষভাবে?

boimela-logo-2016

মাযহার: উনি তো আসলে, অল্পবয়স থেকেই, খুব একটা দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম, এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তিনি তার অটোবায়োগ্রাফির এক জায়গায় লিখছেন যে, তিনি যখন ম্যাট্রিক পাশ করলেন, তখন তাকে দেখতে লোকজন আসছে। তার মানে এরকম একটা অঁজপাড়া গা থেকে তিনি এসছেন। এবং ম্যাট্রিকে তিনি প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে উচ্চমাধ্যমিক পড়েন তিনি করটিয়া কলেজে। এবং সেটাও অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে তাকে ঘোড়ায় চড়ে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসতে হয়েছিল। সেরকম একটা পরিবেশ থেকে আসা। কিন্তু তিনি, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে পড়তে তার মধ্যে সাহিত্যচর্চার বাসনা তৈরি হয়। এবং তিনি সারাজীবন এটা নিজের অন্তরে লালন করেছেন, সাহিত্যচর্চা করেছেন।

ahmadmazhar-bookআরেকটা ব্যাপার ছিল তার, সেটা হচ্ছে রাজনীতি সম্পর্কিত গভীর পর্যবেক্ষণ এবং সমাজ নিয়ে ভাবনা। তাতে করে যদি তাকে আমরা যদি বলি সাহিত্যিক—শুধু সাহিত্যিকরা একটু একরকমের হয়, কিন্তু তার সাহিত্যভাবনা ছিল সমাজ এবং রাজনীতিকেন্দ্রিক। আমি যখন তার দিনলিপি এবং এই অসম্পূর্ণ আত্মজীবনীটি নিয়ে যখন টেক্সট তৈরি করি, তখন আমি চেষ্টা করেছি তার যে সাহিত্যিক অবস্থান থেকে জীবনকে দেখা, সেটাকে গুরুত্ব দেওয়ার। এবং মোটামুটি দীর্ঘ… দিনলিপিতে যে লেখাগুলো আছে, সেগুলোকে যোগ দিলে বোঝা যায় যে তিনি আত্মজীবনীতে যা লিখতেন, হয়ত সেকথাই উনি লিখেছেন। আবার কোনো কোনো জায়গায় এরকম আছে যে, তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছেন, কিন্তু দিনলিপি থেকেও তার সমর্থন কোথাও কোথাও পাওয়া যায়।

এর মধ্যে কিছু আরো মজার ব্যাপার আছে। তিনি কিন্তু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সহপাঠি ছিলেন। তিনি ফররুখ আহমদের সহপাঠি ছিলেন। তারপর সিকান্‌দার আবু জাফর তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সমকাল পত্রিকার যদি আমরা কোনো একজন লেখককে বলি যে তিনি সমকাল পত্রিকার প্রোডাক্ট তাহলে আমরা আবদুল হকের নাম বলতে পারি। তিনি প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। এই যে বাংলাদেশ নামটি যখন গৃহীত হয়, আমার ধারণা, আবদুল হকের প্রবন্ধে বাংলাদেশ নামটির তাত্ত্বিক যে ব্যাখ্যা ছিল, সেগুলি বাংলাদেশ নামকরণের পিছনে একটা ভূমিকা রেখেছে। এবং তিনি বাঙালী মুসলমানের যে মানস চেতনা, সেটাকে তিনি অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন। ছাত্রজীবনে তিনি কাজী আবদুল ওদুদের কবিগুরু গ্যাটে বইয়ের পাণ্ডুলিপি কপি করেছিলেন, ডিকটেশন নিয়ে।

সাদ: বিশেষভাবে আবদুল হক, উনার অসমাপ্ত জীবন নিয়ে কাজ করার কী কারণ? আপনি কি এরকম আরো কাজ করতেছেন?

মাযহার: আমি আসলে আবদুল হকের মৃত্যুর পর তার, বাংলা একাডেমি থেকে আমাকে বলা হয় তার একটা জীবনী রচনা করার জন্য। জীবনী রচনা করতে গিয়ে তার সমস্ত লেখা আমি পড়ি, তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং পড়তে পড়তে তখনই আমার এই পাণ্ডুলিপিটা হাতে আসে। এবং তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ, বইয়ের সংগ্রহ, আমি দেখি। তিনি নিজে কীভাবে জীবনযাপন করতেন তার পরিচয় পাই। এভাবে তার দ্বারা আকৃষ্ট হই।

এবং আমি এক জায়গায় দেখলাম, ডায়রিতে এক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে, আহমদ ছফা তার কাছে যাচ্ছেন, এবং আহমদ ছফা তাকে গুরু বলতেন, সেটা উনি লিখছেন যে, ছফা বলেছেন তিনি আমাকে গুরু হিসেবে ভাবেন। এটাও আমার কাছে একটা চাঞ্চল্যকর তথ্যই মনে হয়েছে। যেটা আমি ঠিক আগে কোথাও পাই নি। আমি বুঝতে পারি যে, আহমদ ছফাও কিছু কিছু চিন্তা ভাবনায় যে কথাবার্তা বলেছেন, তার সঙ্গে আমি একটা ধারাবাহিকতা পাই আর কি। আমি বলবো না যে, আহমদ ছফার ভাবনা তার ভাবনা একেবারেই একই রকম। তা নয়। কিন্তু একটা ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। এবং তার সঙ্গে অনেক তর্কবিতর্ক করেছেন বিভিন্ন সময়, সেরকম কিছু চিহ্ন পাওয়া যায়। এরকম অনেকের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল, তাদের কথা এখানে তিনি বলেছেন।

সাদ: শেষে এই যে পুরা বইটা লিখতে আপনার কি… বিগত কিছুদিনের ভিতরেই কাজটা করছেন?

মাযহার: এটা আমি কাজটা করছি অনেক বছর ধরে। আমি জড়ো করেছি। বার বার পড়েছি। তার লেখাগুলো বার বার পড়েছি। কোন জায়গা থেকে কোথায় নেব, কীভাবে বিন্যস্ত করব, কোন এন্ট্রি কোন জায়গায় বসাবো, তার তারিখক্রম কী হবে। এগুলো নিয়ে ভাবতে—টানা তো কাজ করি নি। অন্যান্য কাজের মাঝে মাঝে, মাঝে মাঝে এগুলো করেছি।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ১৭/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও

About Author

সাদ রহমান
সাদ রহমান

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৬। কবিতার বই: 'কাক তুমি কৃষ্ণ গো' (২০১৬)।