চা খেতে খেতে বাড়িয়ে দিলাম আমার আর নাসিরের কবিতা। তিনি খুলেও দেখলেন না।

(আগের পর্ব)

ইতোমধ্যে হাবীব ভাইয়ের সাথে একবার পরিচয় হয়েছে। কিন্তু তখনো ঠিক মত আমার নামটা মনে গাঁথে নি। পরে তা টের পাই। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। আমি প্রথম প্রথম যথারীতি হাবীব ভাইয়ের সাথে দেখাই করতে গিয়েছি। কোনো লেখা নিয়ে যাই নি। তবে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কবিতা ছেপেছেন কবি সাযযাদ কাদির। হাতে বিচিত্রা নিয়ে হাজির হলাম। টেবিলে রাখলাম। মনে মনে চাচ্ছি, হাবীব ভাই বিচিত্রায় আমার কবিতাটা দেখুক। কিন্তু তিনি ছুঁয়েও দেখলেন না। কারণ, বিচিত্রা বের হবার সাথে সাথেই তো তিনি অফিস কপি পেয়ে যান।

কালামকে ডেকে চা খাওয়ালেন। এক ফাঁকে বললেন, লেখা নিয়ে এসেছো?

—না হাবীব ভাই। আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি।

খুব শান্ত ভাবে নিঃশব্দে হেসে বললেন, সবাই তো লেখা নিয়ে আসে আর তুমি দেখা করতে আসো?

—জ্বি। আপনাকে দেখে পাঠ্য বইয়ের সেই মেঘনা পাড়ের ছেলে বলে মনে হয় না!

আবারো হাসলেন। বললেন, কবিতাটা তোমার খুব ভালো লেগেছে?

—আসলে আমরা ছোটবেলায় যা পড়ি, তা আমাদের কোমল ব্রেনে-মনে গেঁথে থাকে! এখনো আছে। তা ছাড়া সেই কবিতার মেঘনা বাদ দিয়ে ‘ব্রহ্মপুত্র’বসিয়ে দিলেই আমার কৈশোর খুঁজে পাই।

—এখন কী বই পড়ছো?

তাকে খুশি করার জন্য বললাম, মেঘ বলে চৈত্রে যাবো

আমার চালাকিটা হয়ত বুঝতে পেরে তিনি চুপ করে রইলেন।

হাবীব ভাই এবং মহিলা পাতার দায়িত্বে নিয়োজিত কথাশিল্পী মাফরুহা চৌধুরী এক রুমে মুখোমুখি বসতেন। মাফরুহা আপার সাথেও খুব খাতির হয়। সে কথা আরেক দিন বলা যাবে।

ইতোমধ্যে আরো কে কে যেন এলেন। কেউ লেখা দিয়ে গেলেন। কেউ দিলেন বই, লিটল ম্যাগাজিন। কেউ কেউ মাফরুহা আপার টেবিলের সামনে থেকে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। তখন আমি তাদের কাউকেই চিনি না! প্রায় সদ্য গ্রাম থেকে আসা বলে কিছুটা সংকোচ ছিল। তাই ভিড় এড়িয়ে যেতাম। তবে অনেক পরে এখানেই পরিচয় হয়েছিল তুষার দাশের সাথে। সেদিনের মত চলে এলাম। আসার সময় হাবীব ভাই মৃদু সুরে বললেন, লেখা নিয়ে এসো।

রোববারের সাহিত্য সাময়িকী বের হবার পর দু’দিন তার কাজে চাপ কম থাকে। তখন কথা বলার সুযোগ বেশি। সেই সময়টা বেছে নিয়ে আড্ডা দিতে যেতাম। এখানে ‘আড্ডা’ শব্দটি একটু ভিন্ন ব্যাখ্যার দাবি করে। কারণ, সেই অর্থে যথার্থ আড্ডা নয়। দূরত্ব বজায় রেখে আলাপচারিতা।

এদিকে পলাশীতে জহির খানের বাসায় নাসির আহমেদ কিছুদিন ছিলেন। তিনিও ভোলা থেকে ঢাকায় সদ্য এসেছেন জীবন ও জীবিকার জন্য। কবি হবার জন্য নয়।

৯১ নবাবপুর রোডের তখন আওয়ামী লীগের অফিস; তিন অথবা চার তলায়। আর নিচে সিঁড়ির পাশের বা দিকের স্পেসে মফিজুর রহমান রোকনের সাপ্তাহিক গণমুক্তির অফিস। ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি আমি যোগ দিয়েছি সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আর নিউজে নাসির আহমেদ। আপাতত পয়সা দিবে না। দু’জনেই বিনা বেতনে শিক্ষানবীশ। জহির খানের মাধ্যমে নাসির যোগ দিয়েছে। আর কাজ খুঁজতে খুঁজতেই এখানে আমার আসা।

রোকন ভাই আমার অবস্থা শুনে একটা ‘জায়গীর’ ঠিক করে দিলেন। মিরপুরের এক কমিশনারের বাসায় লজিং মাস্টার হিসেবে থাকব। বিনিময়ে তার ছেলেকে পড়াব এবং পড়ব বাংলা কলেজে। আর সপ্তাহে দু’এক দিন এসে সাহিত্য পাতার কাজ করব। ফলে ভাসমান নগর জীবনের সাগরে একটু খড়কুটোর অবলম্বন পেলাম। আর এখানেই বন্ধুত্ব হল নাসিরের সাথে।

আমাদের কারো কাছেই টাকা-পয়সা নেই। গ্রাম থেকে আমি ট্রেনে চড়েছি মাত্র সত্তর টাকা নিয়ে। নাসির কত টাকা নিয়ে লঞ্চে উঠেছিল তা জানি না। তবে দু’জনেরই পকেট ফাঁকা। শাহবাগের রেডিওতে ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে মাঝে মধ্যে বিশ-ত্রিশ টাকা পাই। জীবিকা হিসেবে সেটাই একমাত্র সামান্য সম্বল। তখনও কবিতা লিখে সম্মানী পেতে শুরু করি নি। কবিতা লিখে প্রথম কুড়ি টাকা সম্মানী পাই সাপ্তাহিক বিচিত্রা থেকে। লড়াই করা জীবনে তখন সম্মানের চেয়ে সম্মানীটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

দৈনিক বাংলার গেটের সাথে বাঁকানো সিঁড়ি পেরিয়ে অ্যাকাউন্ট সেকশনে গিয়ে বিলটা তুলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলাম। বার বার নাড়াচাড়া করে দেখি কুড়ি টাকা। যদ্দুর মনে পড়ে, টাকাকে আবেগে চুমু খেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, কুড়ি টাকা যেন অনেক টাকা, অ. নে.. ক…। নিজেকে খুব বড়লোক মনে হতে থাকে।

আমি লোক তাই, গরীব লোককে সামান্য ধারও দিলাম। ক’দিনে সেই কুড়ি টাকাও ফুরিয়ে গেল। দুএক টাকা ভেঙে ভেঙে খরচ করি। নাসির আর আমি মিলে নবাবপুর রোডের ফুটপাতের চায়ের দোকানে ইংরেজি S অক্ষরের মত শুকনো কুকিস বিস্কিট আর এক কাপ চা ভাগাভাগি করে লাঞ্চ করি।

এবার কবিতা নিয়ে যাব হাবীব ভাইয়ের কাছে। গেলাম। যখন যাব তখন নাসির আহমেদও নিউজপ্রিন্টের প্যাডে দু’টি কবিতা দিলেন হাবীব ভাইকে দেয়ার জন্য। আর আমি রুলকরা খাতার পাতায় কবিতা লিখলাম। কিন্তু নিজের হাতের লেখা নিজেরই পছন্দ হল না। আবারও খুব সুন্দর করে যত্ন করে লেখার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম, হাতের লেখা দেখেই হাবীব ভাই কবিতা পছন্দ করবেন।

সেই দিনগুলোতে আমি।—লেখক

দৈনিক বাংলায় গিয়ে দেখি ছোট্ট লিফটা বন্ধ। কারেন্ট নাই। আমি তখনো লিফটে চড়তে ভয় পাই। কবর-কবর মনে হয়। দম আটকে আসতে চায়। যদি লিফটের ‘দড়ি’ ছিঁড়ে যায় অথবা বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে কী অবস্থা হবে।

সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে হাবীব ভাই উপরে উঠছেন। একবারে সরাসরি উঠতে পারতেন না। ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। কারণ, হাঁপানি ছিল। ক্লান্ত হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে তিন তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এই  দৃশ্য আমার মনে গেঁথে ছিল। তার মৃত্যুর পর একটি কবিতাও লিখছিলাম। যার বিষয় ছিল, তিনি প্যাচানো প্যাচানো ভাঙা ভাঙা সিঁড়ি ভেঙে শ্বাসকষ্ট নিয়ে উপরে উঠলেন আর নামার সময় দ্রুত লিফটে নেমে সরাসরি কবরে চলে গেলেন! আহসান হাবীব স্মারকগ্রন্থে সেই কবিতাটা আছে।

যাই হোক। আমি তিন তলায় তাকে পেয়ে তার ব্যাগটা নিয়ে চাইলাম। তিনি দিলেন না। বললেন, আমি পারব। দু’জন এক সাথে উঠলাম চার তলায়। উঠেই কালামকে চা দিতে বললেন। তার জন্য লিকার চা আর আমার জন্য দুধ চা। পাশে ‘সাত ভাই চম্পা’র পরিচালক আফলাতুন আর দুই আর্টিস্ট সৈয়দ লুৎফুল হক আর অলোকেশ ঘোষের রুমের পর একটা ছোট চায়ের ঘর। সেখান কাপ-পিরিচের কথাবার্তা ভেসে আসে। শীতের কুয়াশার মতো ধোঁয়া প্যাচানো চা এলো।

চা খেতে খেতে বাড়িয়ে দিলাম আমার আর নাসিরের কবিতা। তিনি খুলেও দেখলেন না। টেবিলে অনেক কাগজপত্র। তার নিচে গুঁজে রেখে দিলেন। যথারীতি খবর নিলেন, এখন কী করছো? বললাম, পড়ছি আর পড়াচ্ছি!

অনেকক্ষণ দু’জনে চুপচাপ। আসলে নিভৃতচারী হাবীব ভাই ছিলেন নরম মনের মৃদুভাষী মানুষ। তাকে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনেছি বলে মনে পড়ে না। সেদিন আমাদের কথা আপাতত ফুরিয়ে গিয়েছিল অথবা নতুন কোনো কথা বলার বিষয় তৈরি হয়নি কিংবা তিনি নিজের ভেতর নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিলেন।

আগে মাত্র তিনটি প্রথম শ্রেনীর দৈনিক ছিল, সেখানে আমরা নিয়মিত লিখছি। দৈনিক সংবাদ, সাহিত্য সাময়িকী বের হত বৃহস্পতিবার। দৈনিক ইত্তেফাক, সাহিত্য পাতা বের হত শুক্রবার আর দৈনিকবাংলার সাহিত্য পাতা বের হত রোববার।

আমরা সারারাত অপেক্ষা করতাম সকাল বেলার জন্য। কখন ভোর হবে? কাছের বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সাহিত্য পাতা দেখব। কারা কারা লিখছেন, কী লিখছেন? আমাদের এই প্রতীক্ষার কথা বাসস্ট্যান্ডের হকাররা জানতেন এবং অনেকের সাথেই খাতির হয়ে গিয়েছিল।

রোববার বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি, নাসিরের কবিতা ছাপা হয়েছে। তখন নাসির নিজের নাম লিখেছিলেন ‘ছ’ দিয়ে। অর্থাৎ নাছির আহমেদ। পরে তিনি নিজেই বানান চেঞ্জ করে বলেছিলেন, নো। ছাগলের ‘ছ’ ত্যাগ করতে হবে।

তখন বিআরটিসির লোকাল বাসে ষাট পয়সা (স্টুডেন্ট হিসেবে হাফ ভাড়া ত্রিশ পয়সা) দিয়ে মিরপুর ঢাকায় আসি।  গুলিস্থানে নেমে হেঁটে ৯১ নবাবপুর রোডে যাই। সেদিন পল্টনে নেমে হারুন হাবীবের সাথে বিএসএসে দেখা করে হাবীব ভাইয়ের কাছে যাই।

আমাকে দেখেই বললেন, তোমার কবিতা তো ছেপে দিয়েছি।

—হাবীব ভাই, আমার কবিতা ছাপা হয় নি। নাসিরের কবিতা ছাপা হয়েছে।

—তাই?

—জ্বী।

মনে হল তখনও তিনি নাসির আর দুলালকে আলাদা করতে পারেন নি। সাথে সাথে তিনি প্রেসে পাঠানোর জন্য এন্ট্রি খাতা খুলে দেখলেন। বললেন, তোমার কবিতাও প্রেসে দিয়েছি। কম্পোজ হয়েছে। যাবে।

(কিস্তি ৩)