কবি নাসির আহমেদ ইচ্ছে করলে কাছ থেকে দেখা আহসান হাবীবকে নিয়ে একটা বই লিখতে পারতেন।

(আগের কিস্তি)

আহসান হাবীব মানুষের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মিলিয়ে দেখেছেন, লিখেছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রি শেষে’ (১৯৪৮) থেকে শুরু করে সর্বশেষ ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’ (১৯৮৫) পর্যন্ত সাতটি গ্রন্থেই তিনি তার কবিতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন।

তার কবিতার বইয়ের চেয়ে শিশু সাহিত্য রচনায় প্রায় দ্বিগুণ। তবু কবি হিসেবেই পরিচিত। তার চেয়েও বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন বিরল সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে। তার দৃঢ়তা, নির্মোহ বিচারগুণ এবং আপোসহীনতার বিকল্প এখনও তৈরি হয় নি।

এই মানুষটির সাথে আমার অনেক স্মরণীয় দিন আছে। তার মধ্যে মিরপুর আমার বাসায় বেড়াতে যাওয়া আমার জন্য এক পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার এবং স্মরণীয় ঘটনা। সময়টা ১৯৮২ সালের দিকে। সেদিন সাথে যাবার কথা ছিল আনা ইসলামের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার যাওয়া হয় নি।

 

দিন-তারিখ মনে নেই। কোনো এক সোমবার দুপুরে দৈনিকবাংলা থেকে একটা ভাঙাচুরা বেবি টেক্সি নিয়ে আমরা দু’জন রওনা হলাম। যাবার পথে পুরানা পল্টনের মোড়ে টেক্সি থামিয়ে বিক্রমপুর ভাণ্ডারে বগুড়ার দই খুঁজে পেলেন না। শশুর বাড়ির জেলার পছন্দের দই না পেয়ে মিষ্টি কিনলেন। কাওরান বাজার গিয়ে বেবি টেক্সি নষ্ট হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও স্টার্ট নিল না। পরে একটা রিকশা নিলাম।

তখন রিকশা চলত মেইন রোড দিয়ে। দীর্ঘ পথে আমাদের টুকরো টুকরো আলাপচারিতা চলল। আমাদের আলাপ রিকশাওয়ালাও মন দিয়ে শুনলেন, অভিভূত হলেন। তার একটা কারণ ছিল বটে। রিকশা থেকে নেমে হাবীব ভাই নিজেই ভাড়া দিলেন। আমাকে কিছুতেই সুযোগ দিলেন না!

রিকশাওয়ালা চলে যাবার সময় বললেন, স্যার আমার বাড়িও পিরোজপুরে, শংকরপাশায়। আপনি বাসায় কখন যাবেন?

—বিকেলে।

—স্যার, আপনার বাসা কোথায়?

—মগবাজার রেলগেট।

—আমি মিরপু্রের রিকশা চালাব এবং ফেরার সময় আপনাকে নিয়ে যাব। যাবেন?

—ভালোই তো। এসো।

—বাদ আছর আসব।

—তোমার নাম কী?

—নাসির স্যার।

নামটা শুনে আমি আর হাবীব ভাই দু’জনেই হেসে উঠলাম। হাবীব ভাই বললেন, তোমার নামটা মনে থাকবে। ভুলব না!

দুপুর থেকে বিকেল অবধি ছিলেন হাবীব ভাই। দুপুরে খাবার আয়োজন ছিল গ্রাম থেকে আনা সুগন্ধি চালের খিচুড়ি আর গরুর মাংস। তখন আমাদের বাসা ছিল নারীবর্জিত। আমার ছোট ভাই নোমান চমৎকার রান্না করতেন। তার হাতের খিচুড়ির খবর অনেক লেখকই জানতেন।

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল।

তবে সেদিন হাবীব ভাই খিচুড়ির কথা বলেন নি। বলেছিলেন অনেক কথা। আমার বাসার সামনে একটা নিম গাছ আছে। হাবীব ভাই খুব মিষ্টি করে হেসে বললেন, আমি তো দু’টো গাছ দেখতে পাচ্ছি। নিম গাছ আর বকুল গাছ!

বকুল গাছ বলার কারণটা হচ্ছে, আমার মুখোমুখি বাসায় বাংলাদেশ বিমানের নূর মোহাম্মদ খান সাহেবের বাসা। তার বেশ ক’টি মেয়ে। তার মধ্যে বকুল ছিল সবচেয়ে সুন্দরী। হাবীব ভাইয়ের কথা শুনে বকুল চা-নাস্তা নিয়ে দেখা করতে এসেছিল। তখন মজা করে বললেন, গেটে পা দিয়েই একটা মিষ্টি ফুলের গন্ধ পাচ্ছিলাম।

বকুল তো হাসতে হাসতে যেন আরো সুবাস ছড়িয়ে দিল।

সেদিন হাবীব ভাই অনেক ব্যক্তিগত কথা বলেছেন। নিজের কথা, সাহিত্যের কথা, সাহিত্যিকদের কথা, সাহিত্যের পাতার কথা।

তখন আমাদের বাড়িটা টিনের ঘর। ভেতরে কাঁচাপাকা উঠোন। দেয়াল ঘেষে একটা পেয়ারা গাছ। বারো মাসই ছোট ছোট পেয়ারা ধরত। আরো ছিল একটি আম ও কাঁঠাল গাছ। খুব কম আম ধরত কিন্তু কাঁঠাল হত না। বিকেল বেলায় গাছের নিচে উঠোনে প্লাস্টিকের টি-টেবিল আর প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে শুরু হল আমাদের আলাপচারিতা আর পেয়ারা খাওয়া।

আমাদের সাথে যোগ দিলেন আমার খালাত ভাই রাহীব আহসান বাবলু। বাবলু লেখালেখি না করলেও পাঠক হিসেবে পণ্ডিত। তার জন্ম করাচি। সেই করাচি আর কলকাতা দিয়ে গল্প শুরু হল। বৃটিশ-ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের গল্প। এই ফাঁকে আবারো বকুল বিকেলের চা নাস্তা নিয়ে এল। পাশের বাড়ির মেয়ের আতেথিয়তায় অভিভূত হলেন।

সেদিন হাবীব ভাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেটি ছাপা হয়েছিল আমার সম্পাদনায় সূচিপত্রের শেষ সংখ্যায়। তিনি আমার অনুরোধে আমাদের আলাপচারিতা নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন আমার জন্যে। সেটিও সূচিপত্রে ছাপা হয়েছিল তার আগের সংখ্যায়। তবে সূচিপত্র দেরিতে প্রকাশ হবার কারণে তিনি লেখাটি দৈনিকবাংলার বিশেষ একটি সংখ্যায় ছেপে ছিলেন।

কী ভাবে বৃটিশ আমলে কাজের সন্ধানে কলকাতায় গেলেন। শুরু হলো জীবন যুদ্ধ! (তার সেই সময়ের সাথে আমার ঢাকায় আসার সময়ের সাথে মিলাতে থাকি।) বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ১৭ টাকার বেতনে চাকরি পেয়েছিলেন দৈনিক তকবিরে। এছাড়াও মাসিক সওগাতসহ অন্যান্য ছোটখাটো পত্রিকা এবং আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট পদে কাজ করতেন। পরে ইত্তেহাদে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিভাগে যোগ দেন আবুল মনসুর আহমদের মাধ্যমে। (তার সেই সময়ের সাথে আমার ঢাকায় আসার সময় মিলাতে থাকি।) দেশবিভাগের কারণে পাকিস্তান আমলে আবার কলকাতা থেকে ঢাকায় এলেন। নতুন দেশে নতুন চাকরি। ফ্রাংকলিন প্রোগ্রামস উপদেষ্টা। একদিন ফোন এলো দৈনিকবাংলা থেকে। ফোন করে ডেকে নিয়ে দৈনিকবাংলায় সাহিত্য পাতার দায়িত্ব দিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। এ সব অজানা কথা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলাম। এক সময় কমরেড পাবলিশার্স নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন!

দেশভাগের পর তার নেতৃত্বে এই পাতাটি হয়ে উঠেছিল নতুন দেশের সাহিত্যের সূতিকাগার। ধীরে ধীরে তিনিও হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তিতুল্য সাহিত্য সম্পাদক! তার হাত দিয়ে লেখা ছাপা মানে এক ধরনের স্বীকৃতি বটে। কারণ, দৈনিকবাংলার সাহিত্য পাতা একটি আদর্শ সাহিত্য পাতার মর্যাদা অর্জন করেছিল তার জন্যই।

শোনা যায়, দৈনিকবাংলার সাহিত্য সম্পাদক থাকা অবস্থায় একই পত্রিকার সম্পাদক কবি শামসুর রাহমান একবার কবিতা পাঠালে তিনি সে কবিতা বদলে দিতে বলেছিলেন। সম্পাদক কবি শামসুর রাহমান আহসান হাবীবের এই অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন’। শামসুর রাহমান প্রধান কবি, শামসুর রাহমান দৈনিকবাংলার সম্পাদক—তার পরও এই সাহসী দৃঢ়তা একমাত্র হাবীব ভাইকেই মানায়। এই সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, আমি তো অমনোনীত করি নি। বদলিয়ে দিতে বলেছি। আরেক বার আল মাহমুদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, রাহমানের কবিতায় রাজনৈতিক বিষয় আর মাহমুদের কবিতায় অশ্লীলতা ছিল।

তরুণদের প্রতি ছিল তার অসম্ভব ভালোবাসা। তাদের ভালোবাসার টানে প্রতিদিন অফিসে যেতেন। তার কথাগুলো সূচিপত্র থেকে তুলে ধরছি:

“রোজই অফিসে না এসে পারি না। না এলে সেদিনকার মতো আমি হারাবো কয়েকটি উজ্জ্বল তরুণ মুখ, যাদের নিত্য সাধনায় ক্রমশ ব্যাপ্ত হয়ে উঠছে আমাদের সাহিত্যের দিগন্ত!… ছোট অফিস কক্ষটি তাই কি এক মোহময়তায় জড়িয়ে আমাকে। প্রবল টান আমি অনুভব করি বাড়িতে শুয়ে শুয়েও। সেই ছোট অফিস কক্ষটিই আজ আমার আনন্দ যাপনের সবচেয়ে প্রশস্ত এলাকা।… তরুণ লেখক আসেন, … কি আগ্রহ লেখক হয়ে ওঠার, আর কি আত্মবিশ্বাস। আমাদের সাহিত্যের বিভ্রান্তি ও বিশৃংখলার কথা যতই বলি না কেন, এই আগ্রহ আর আত্মবিশ্বাস একদিন সব কুয়াশা মুছে ফেলবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না আর।

…তারা চান, আমার হাত দিয়ে তাঁদের লেখা প্রকাশিত হোক। কি করে ফেরাবো এঁদের? প্রবীণ লেখকদের লেখা ছাপানোর সম্পাদকদের ঝুঁকি থাকে সামান্য।… প্রবীণদের লেখায় ভরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে চাকরি করতে পারতাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হলো না।… তারা আমাকে জয় করে নিলেন।… দিনে দিনে এই তরুণেরাই কি করে যেন তাঁদের মনোরম মুঠোয় আমাকে বন্দী করে নিলেন। আমার মনযোগ আর ভালোবাসা তাঁরা কেড়ে নিলেন, নিজেদের ক্ষমতায়!” (সূচিপত্র, পৃ. ৪/৫, সম্পাদক. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, ১৯৮২, ঢাকা।)

তাদের মধ্যে নাসির আহমেদ একজন। বরিশাল বলে আঞ্চলিকতার অভিযোগ আনা যাবে না। কারণ, নিজের ছেলের লেখা ছাপাতেও তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেন নি। এবার ২০১৭ সালে ফরিদ কবিরের বাসায় আড্ডা দিয়ে গিয়ে কবি আশরাফ আহমদ বললেন, “সাবের তোমাদের বন্ধু। ওকে বলো, সে যেন আমার পাতায় না লিখে!”—সেই কথাটি হাবীব ভাই আমাকেও বলেছিলেন অন্য ভাবে।

যা হোক। হাবীব ভাই তখন চোখে ঠিক মত দেখতে পারছিলেন না, পড়তে পারছিলেন না। তাই একজন সহকারী নেয়ার কথা ভাবেন এবং নাসির আহমেদ ১৯৭৯ সালের ১ মে যোগ দেন হাবীব ভাইয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। নাসির সেখানে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথমে সহসম্পাদক এবং পরে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এজন্য নাসির লিখেছেন, হাবীব ভাইয়ের সাথে, সাহিত্যের সাথে আমার জীবনে রিং হয়ে কাজ করেছেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। প্রসঙ্গক্রমে বলছি, ফরিদ কবিরও এ রকম কথা লিখেছেন তার পঞ্চাশতম জন্মদিনের স্মরণিকায় —আমি থাকতাম পুরনো ঢাকার অন্ধকার গলিতে। বাংলা সাহিত্যের রাজপথ দেখিয়েছেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল।

তবে তিনি এক পর্যায়ে নাসিরের উপর একটু বিরক্ত হয়েছিলেন। সে প্রসঙ্গ থাক।

কবি নাসির আহমেদ ইচ্ছে করলে কাছ থেকে দেখা আহসান হাবীবকে নিয়ে একটা বই লিখতে পারতেন। কিন্তু লিখলেন তুষার দাশ (নিঃশব্দ বজ্র: আহসান হাবীবের কবিতা (বাংলা একাডেমি, ১৯৮৫) এবং আহসান হাবীব (জীবনী, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৭] এবং লুৎফর রহমান রিটন (আহসান হাবীবের ছোটবেলা, বিকেল প্রকাশনী, ১৯৮৫)।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা তুষার এবং রিটনকে ‘আহসান হাবীব সাহিত্য পুরষ্কার’ দিতে পারি নি। যারা এই পুরষ্কার পেয়েছেন তারা হলেন—রফিক আজাদ, মুহম্মদ রফিক, সিকদার আমিনুল হক, মঞ্জুরে মওলা, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নুরুল হুদা, শামসুল ইসলাম, মাহমুদুল হক। শেষ দু’জনের অনুষ্ঠান হয় নি।

এই পুরস্কার কমিটিতে আমরা অলিখিতভাবে ছিলাম—কামাল চৌধুরী, মোহাম্মদ সাদিক, তুষার দাশ, মঈনুল আহসান সাবের, শাহাবুদ্দিন নাগরী এবং আমি। আমরা শেষ পর্যন্ত এই পুরষ্কার প্রদান অব্যাহত রাখতে পারি নি। এখানে একটা মজার বিষয় উল্লেখ করি: আমরা আড্ডা বা মিটিং-এ বসতাম, তখন কথাপ্রসঙ্গে আমরা ‘হাবীব ভাই, হাবীব ভাই’ বলতাম। আমাদের সাথে সাবেরও ‘হাবীব ভাই, হাবীব ভাই’ করতেন।

আমার বাসায় সেদিন বিকেল পর্যন্ত ছিলেন। হাবীব ভাই কথা বলতেন খুব কম। কিন্তু সেদিন নিজ থেকেই নিজেকে খুলে ধরলেন। বললেন বেশ কিছু দুঃখজনক ঘটনা। কবি ওমর আলীকে বাসায় থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেই সুযোগ নষ্ট করেছেন। কষ্ট পেয়েছেন কিছু কবি ও সাহিত্য সম্পাদকদের আচরণে। মফস্বল থেকে কোনো কবি উত্তরাধিকারে লেখা কবিতা বা কবিগান, জারিগান নিয়ে আসলে রফিক আজাদ তাকে বাংলা একাডেমি থেকে হাবীব ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে মজা পেতেন। কিন্তু তিনি বিরক্ত হতেন। সহে যেতেন নীরবে। গ্রাম থেকে সেই গ্রাম্য কবিকে ফেরাতে তার খুব কষ্ট হত।

আবার এমন ঘটনাও ঘটেছে, এক কবি এসেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা ছাপতে। হাবীব ভাই বললেন, এটা তো ছাপা যাবে না। তখন সেই কবি জিয়াকে নিয়ে কবিতা দিলেন। হাবীব ভাই এবারো একই কথা বললেন। তখন তিনি তার কবিতার থলি থেকে এরশাদকে নিয়ে লেখা কবিতা বের করে দিলেন। হাবীব ভাই আবারো কিছুটা বিরক্ত হয়ে তাকে ফিরিয়ে দিলেন। তখন সেই কবি দৈনিক বাংলার বাণী বের করে বললেন, কবি নির্মলেন্দু গুণ তো ঠিকই ছাপছেন।

আসলে নির্মল দা তো কবিতা হিসেবে ছাপেন নি। ছেপেছেন ‘বঙ্গবন্ধু’ নাম দেখে। তখন হাবীব ভাই পাগল কবিকে বললেন, একটা নিয়ে দৈনিক দেশ পত্রিকায় আর আরেকটা দৈনিক জনতায় যেতে পারেন। দৈনিক বাংলা হবে না।

এ রকম ছোট ছোট বেশ বেদনার কথা সেদিন শেয়ার করেছিলেন। টুকরো টুকরো সেই ছিঁটেফোঁটা লিখেছেনও। যেমন: “বার বার ডাকে লেখা পাঠিয়েও লেখা ছাপা না হোলে সবশেষে যে চিঠিটি আসে সেটিতে কবিতা বা গল্প থাকে না; থাকে অশ্লীল গালাগালে ভর্তি একটি চিঠি, কখনো একটি ব্লেড… (সূচিপত্র, পৃ. ৪/৫। সম্পাদক. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, ১৯৮২, ঢাকা)।

রাজনৈতিক নিরপেক্ষ হাবীব ভাই একবার জীবনে বড় ভুল করেছিলেন রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে। সাতষট্টিতে জুন মাসে ঢাকায় নবাব বাড়ির শাহাবুদ্দিন, পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী হিসাবে ফতোয়া দিলেন, রবীন্দ্র সঙ্গীত হিন্দু সঙ্গীত, ইসলামের পবিত্রভূমি পাকিস্তানে তা চলবে না। তাই রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ! তেইশে জুন সরকারীভাবে এই ঘোষণাটি জারি করা হল। পঁচিশ জুন ঢাকার ঊনিশ জন বুদ্ধিজীবী এই ফতোয়া বা ঘোষণাকে নিন্দা ও প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিলেন। উত্তরে চল্লিশ জন তমুদ্দুনপন্থী নামিদামি মানুষ রবীন্দ্রবর্জনকে স্বাগত জানান। কবি সৈয়দ আলী আহসান তাদের অন্যতম।

এই বিবৃতিতে সই করাটা ছিল সবার সাথে ঝাঁকের কৈ’য়ে যুক্ত হয়ে, বিবৃতিদাতাদের অনুরোধে তাদের মুখ রক্ষা করা। তিনি স্বউদ্যোগে বা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তা করেন নি।

তারা বিবৃতিতে বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষী পাকিস্তানীদের সংস্কৃতির অবিচ্ছদ্য অঙ্গ  নয়। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এবং রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করলে পাকিস্তানী সংস্কৃতির মূল নীতিটাকেই বিরোধিতা করা হয়।

রবীন্দ্রবর্জনের পক্ষে বিবৃতিদাতা ৪০ জন বুদ্ধিজীবীদের হলেন: ১. মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, ২. বিচারপতি আবদুল মওদুদ, ৩. আবুল মনসুর আহমদ, ৪. আবুল কালাম শামসুদ্দিন, ৫. অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, ৬. মজিবর রহমান খাঁ, ৭. মোহাম্মদ মোদাব্বের, ৮. কবি আহসান হাবীব, ৯. ফররুখ আহমদ, ১০. ড. কাজী দীন মোহাম্মদ, ১১. হাসান জামান, ১২. আশরাফ সিদ্দিকী, ১৩. বেনজীর আহমদ, ১৪. কবি মইনুদ্দিন, ১৫. অধ্যক্ষ শেখ শরফুদ্দিন, ১৬. আ.কা.ম. আদমউদ্দিন, ১৭. তালিম হোসেন, ১৮. শাহেদ আলী, ১৯. আ.ন.ম. বজলুর রশীদ, ২০. মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ, ২১. সানাউল্লাহ নূরী, ২২. কবি আবদুস সাত্তার, ২৩. শিল্পী কাজী আবুল কাশেম, ২৪. মুফাখখারুল ইসলাম, ২৫. শামসুল হক, ২৬. ওসমান গণি, ২৭. মফিজ উদ্দিন আহমদ, ২৮. আনিসুল হক চৌধুরী, ২৯. মোস্তফা কামাল, ৩০. অধ্যাপক মোহাম্মদ মতিউর রহমান, ৩১. জহুরুল হক, ৩২. ফারুক আহমদ, ৩৩. শরফুদ্দীন আহমদ, ৩৪. বেগম হোসনে আরা, ৩৫. মাফরুহা চৌধুরী, ৩৬. মোহাম্মদ নাসির আলী, ৩৭. এম. নূরুল ইসলাম, ৩৮. কবি জাহানারা আরজু, ৩৯. কাজী আবদুল ওয়াদুদ, ৪০. আখতার উল-আলম।

এই চল্লিশজনকে বলা হত চল্লিশ চোর। এই উপাধি দিয়েছিলেন কবি আব্দুল গণি হাজারী।

হাবীব ভাইয়ের জীবনের সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয় ছিল রবীন্দ্র বিরোধিতা করে এই বিতর্কিত বিবৃতিতে সই দেয়া। সেই অনুশোচনায় অনুতপ্ত হয়ে তিনি পরবর্তী কালে আর কখনোই কোনো বিবৃতিতে সই করেন নি।

আমার অনেক দিনের কৌতূহল ছিল, তা সেদিন তিনি খুলে বললেন। তবে তিনি বিব্রত বোধ করছিলেন। মনে হয় একটু বিরক্তও হয়েছিলেন।

যাবার আগে ধন্যবাদ দিলেন বকুলকে। আসার পর চা, এখন যাবার সময় তোমার নরম হাতের গরম গরম চা। ধন্যবাদ। তোমাকে অনেক দিন মনে থাকবে।

বকুল দুষ্টামি করে বলল, ধন্যবাদ দিতে হবে না, মনে রাখলে চলবে না। আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবেন। তা হলে খুশি হব।

তোমাকে নিয়ে গান আছে। বকুল বিছানো পথে…।

বকুল আবারো মজা করে হাসতে হাসতে বলল, গান নয়। কবিতা চাই, বকুল বিছানো বিছানায়…।

বিকেল গড়ানো হালকা সন্ধ্যায় নাসির এসে হাজির। শংকরপাশায় যাত্রী এবং চালক এক সাথে একটু একটু করে রাতের দিকে যাত্রা করলেন।

(পরের পর্বে থাকবে সূচিপত্রের শেষ সংখ্যায় প্রকাশিত আহসান হাবীবের সাক্ষাৎকার।)

(চলবে)

কমেন্ট করুন

মন্তব্য