এ.আই এর সফটওয়্যার আস্তে আস্তে সেলফ-টিচিং বা নিজে নিজেই শিখতে পারার ক্ষমতার দিকে দ্রুত আগাচ্ছে।

কয়েকদিন আগে এলন মাস্ক ঘোষণা দিয়েছেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ন্যাচারাল ইন্টেলিজেন্সকে একসাথে করার জন্য তিনি নতুন একটি প্রজেক্ট শুরু করবেন। মাস্কের নতুন এই কোম্পানির নাম নিউরালিংক।

নিউরালিংকের উদ্দেশ্য মানুষের ব্রেইন এবং কম্পিউটারের ব্রেইন বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে একসাথে করা। মানুষের ইন্টেলিজেন্স এবং কম্পিউটারের ইন্টেলিজেন্স—এই দুইটা জিনিস মার্জড হয়ে বা একত্রিত হয়ে একটা সিংগেল ইন্টারফেস হিসাবে কাজ করবে। আইডিয়া হিসাবে এক্সাইটিং অবশ্যই। তবে প্র্যাকটিক্যালি একেবারে নতুন কিছু না। আউট অব দ্য ব্লু ধরনের কোনো আইডিয়া না।

টেকনোলজির ওয়ার্ল্ডে এলন মাস্ক এখন অনেক বড় একজন সেলিব্রিটি, সিলিকন ভ্যালিতেও তার অনেক প্রভাব। ফলে, এলন মাস্কের কোনো একটা ঘোষণা বা কোনো বক্তব্য মিডিয়াতে স্বাভাবিকভাবেই অনেক গুরুত্ব পায়।

আমি এলন মাস্কের ভক্ত না। তবে আমি মনে করি, হি ডিজার্ভস দ্যাট অ্যাটেনশন ফ্রম দ্য মিডিয়া অর পিপল।

নিউরালিংক কোম্পানির পরিকল্পনা হল ‘নিউরো লেস’ নামের একটা জিনিস দিয়ে মানুষের ব্রেইন আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে লিংক তৈরি করা। ‘নিউরো লেস’ জিনিসটা কী তারা এখনো সেটা জানায় নি।

সম্ভবত ‘নিউরো লেস’ এমন কোনো শক্তিশালী টেকনোলজি যেটার মাধ্যমে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রোগ্রামের বা সফটওয়্যারের আউটপুট মানুষের ব্রেইনের  নিউরাল সিগন্যালে কনভার্ট হবে। এর ফলে সেই সফটওয়্যার আর মানুষের ব্রেইন একসাথে কাজ করবে। এটা আমার ধারণা মাত্র। ‘নিউরো লেস’ জিনিসটা অন্য কিছু হতে পারে।

ব্রায়ান জনসন (জন্ম. ইউটাহ, ইউএসএ, ১৯৭৭)

ব্রায়ান জনসন নামের আরেকজন এন্টারপ্রেনার এর আগে কার্নেল নামে একটি কোম্পানি চালু করেছেন। নিউরালিংক যে ধরনের কাজের কথা বলছে, কার্নেল একই কাজ শুরু করে বেশ অনেক দূর এগিয়েও গেছে। মানুষের ব্রেইন ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কার্নেলের সব কাজ মূলত হয়েছে মেডিকেল রিসার্চ সেক্টরে।

মানুষের ব্রেইনে একটা ইলেক্ট্রোড বা একটা ইলেক্ট্রিক্যাল কন্ডাক্টর রেখে, সেই ইলেক্ট্রোড থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল সিগন্যাল দিয়ে মানুষের পারকিনসনস ডিজেজ, মেরুদণ্ডের ব্যথা, অবেসিটি, ক্ষুধা না লাগা ইত্যাদি শারীরিক সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে। কার্নেল নামের কোম্পানিটি এটা করে দেখিয়েছে। তবে তারা মানুষের ব্রেইনের নিউরাল সিগন্যাল তৈরি করতে পারে নি। মানুষের ব্রেইনে একটা ইলেক্ট্রোড ঢোকানোর জটিল সার্জিক্যাল ব্যাপার যেহেতু এখানে আছে, তাই নিউরোসায়েন্স রিসার্চারদের গবেষণা ও ডাটা সংগ্রহের সীমাবদ্ধতাও আছে।

নিউরালিংককেও প্রাথমিকভাবে মেডিকেল রিসার্চ প্রতিষ্ঠান হিসাবে নিবন্ধিত করা হয়েছে। তবে নিউরালিংকের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সকে ব্যবহার করে ন্যাচারাল ইনটেলিজেন্সকে, অর্থাৎ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ফাংশনকে আরো উন্নত করা।

নিউরালিংক প্রজেক্টের সবচাইতে ইন্টারেস্টিং অংশ হল এটার পিছনে এলন মাস্কের চিন্তা। অদ্ভূত চিন্তা আসলে। অ্যাপারেন্ট রিয়ালিটির বাইরের কোনো কিছুর সাথে আমি সায়েন্স দিয়ে ইন্টার‍্যাক্ট করতে চাই, এবং কম্পিউটার সায়েন্সের প্রতি যেহেতু আমার ফ্যাসিনেশন, তাই নিউরালিংকের পিছনে মাস্কের আইডিয়াটাই আমাকে ট্রিগার করে।

এলন মাস্কের বিখ্যাত কোম্পানি স্পেস-এক্স রকেট তৈরি করে। এই স্পেস-এক্সের পিছনেও মাস্কের অদ্ভুত একটা চিন্তা আছে। স্পেস-এক্সের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশন। পৃথিবীর বাইরের গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন। হিউম্যান রেইস আস্তে আস্তে পৃথিবীর বাসযোগ্যতা কমিয়ে আনছে। সিভিলাইজেশনের একটা পর্যায়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ম্যানমেইড ডিজাস্টারের কারণে যদি মানবজাতি পৃথিবীতে বড় ধরনের কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হয়, তখন সেটা কাজে লাগবে। স্পেস-এক্সের পিছনে এলন মাস্কের চিন্তা এটাই।

নিউরালিংকের পিছনেও এলন মাস্কের চিন্তা এটাই। এ.আই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যদি কখনো মানবজাতির জন্য খুব বিপদজনক হয়ে ওঠে, সেই আশঙ্কাকে আগেই থামিয়ে দিতে চান তিনি। এই নিউরালিংকের মাধ্যমে।

একবার ডেমিস হ্যাসাবিস গিয়েছিলেন মাস্কের স্পেস-এক্সে। মাস্ক তখন হ্যাসাবিসকে জানান যে স্পেস-এক্সের ইন্টারপ্ল্যানেটারি কলোনাইজেশন হল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট।

হ্যাসাবিস তখন মাস্ককে বলেছিলেন, তিনি আর্টিফিশিয়াল সুপার-ইনটেলিজেন্স তৈরির কাজ করছেন, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট।

ডেমিস হ্যাসাবিস (জন্ম. লন্ডন, ইউকে, ১৯৭৬)

মাস্ক তখন উত্তর দিয়েছিলেন যে ঠিক এই কারণেই তিনি মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের জন্য কাজ করছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কখনো বিধ্বংসী হয়ে উঠলে মানবজাতি যেন কিছু একটা করতে পারে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে এই ধরনের চিন্তা বাইরে থেকে হয়ত অনেক বেশি গল্পের মত মনে হয়, কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে এই চিন্তার খুব শক্ত গ্রাউন্ড আছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খুবই দ্রুত গতিতে উন্নতি করছে। মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর মত ডায়নামিক আচরণ হয়ত করছে না, কিন্তু এ.আই এর সফটওয়্যার আস্তে আস্তে সেলফ-টিচিং বা নিজে নিজেই শিখতে পারার ক্ষমতার দিকে দ্রুত আগাচ্ছে।

গুগল শুরু থেকেই অনেক কার্যকরী এ.আই সফটওয়্যার ব্যবহার করে। ফেসবুকের এ.আই সফটওয়্যার খুব দ্রুত এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে উন্নত হচ্ছে। অ্যাপলের সিরি অনেক উন্নত ধরনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। মাইক্রোসফটের করটানা-ও তাই। এইগুলি তো সবার জানাশোনার মধ্যে। ডিফেন্স সেক্টরের এবং আরো অন্যান্য রোবট ও এ.আই সফটওয়্যার তো আছেই।

হ্যাসাবিস যখন ডীপমাইন্ড প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেন, তখন হ্যাসাবিসের কয়েকজন পার্টনারের একজন ছিলেন শেন লেগ। কয়েক বছর আগে শেন লেগ বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন মানবজাতির বিলুপ্তি ঘটতে পারে। এবং এই বিলুপ্তিতে টেকনোলজির বড় ভূমিকা থাকবে। এর পর থেকেই এলন মাস্ক এ.আই নিয়ে তার আশঙ্কা প্রকাশ করা শুরু করেন।

এবং ডীপমাইন্ডকে গুগল কিনে নেওয়ার আগে এলন মাস্ক ডীপমাইন্ডে বিনিয়োগও করেছিলেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উন্নতি কতটা দ্রুত গতিতে হচ্ছে সেটার ওপর চোখ রাখার জন্যই বিনিয়োগ করেছিলেন। এবং মাস্ক দেখতে পান মানুষের ধারণার চেয়ে আসলেই কত দ্রুত আগাচ্ছে এ.আই!

এ.আই এর নিজের ইচ্ছা তৈরি হবে বা ডিসিশন নিবে—সেটা থেকে ধংসাত্মক কিছু ঘটবে—এলন মাস্ক বিষয়টা এভাবে দেখেন না। অ্যাকসিডেন্টালি কিছু ঘটতে পারে—সে আশঙ্কা করছেন তিনি।

যারা  এ.আই তৈরি করে বা করবে তাদের ইচ্ছা যদি একশভাগ পজেটিভও থাকে,  এ.আই এর অপটিমাইজেশন ফাংশন যদি ঠিকভাবে চিন্তা না করা হয় তাহলে খারাপ কিছু ঘটতে পারে। উদাহরণটা এরকম—আপনি আপনার রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব দিলেন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা রোবটকে। আপনার রিসোর্সে আছে দুইটা জিনিস—অস্ত্র আর খাদ্য। খাদ্য আপনার বায়োলজিক্যালি বেঁচে থাকার জন্য দরকার, আর অস্ত্র দরকার আপনার প্রতিরক্ষা ও শক্তিবৃদ্ধির জন্য। আপনার এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যে সে ডিসিশন নিবে কিভাবে আপনার রিসোর্সকে সবসময় সর্বোচ্চ ইফেক্টিভ রাখবে। সে যদি ডিসিশন নেয়, তাহলে সে করবে কী, আপনার খাদ্যের স্টক কমিয়ে অস্ত্রের স্টক বাড়াবে। এবং আপনার প্রতিরক্ষা ও শক্তিবৃদ্ধির জন্য হয়ত যুদ্ধও শুরু করে দিবে।

এ.আই নিয়ে এই ধরনের আশঙ্কা থেকেই এলন মাস্ক নিউরালিংক শুরু করছেন। এই ধরনের কাজ আগে শুরু হলেও এলন মাস্ক হয়ত আরো প্র্যাকটিক্যালভাবে, ব্যবসায়িক দিক থেকে আরো কার্যকরভাবে জিনিসটা করবেন। যেহেতু তার পেপাল, স্পেস-এক্স, টেসলা মটরস অনেক সফল।

এলন মাস্ক  (জন্ম. প্রিটোরিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ১৯৭১)

তবে এলন মাস্ক নিউরালিঙ্কের পিছনে নিজের যে চিন্তার কথা বলছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে যে অবস্থার আশঙ্কা করছেন—আমি মনে করি তার এই নিউরালিংক এর মাধ্যমে সেই আশঙ্কার দিকে আরো এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর হিউম্যান ব্রেইন একত্রে সিঙ্গেল ইন্টারফেস হিসেবে কাজ করবে ‘নিউরো লেস’ দিয়ে। একটা অনুমান—‘নিউরো লেস’ এর মাধ্যমে এ.আই বা সফটওয়্যার থেকে ডাটা নিউরাল সিগন্যালে কনভার্ট করে হিউম্যান ব্রেইনে দেওয়া হবে। এতে মানুষের কগনিটিভ ফাংশন উন্নত হবে, সন্দেহ নাই।

আরো পড়ুন: মুভি রিভিউ – ওয়েস্টওয়ার্ল্ড

কিন্তু আরেকটা অনুমান—‘নিউরো লেস’ এর মাধ্যমে মানুষের ব্রেইন থেকে ডাটা কোনো ডিভাইসে বা ক্লাউডে নেওয়া যাবে। এখন সেই ডিভাইসের উন্নত এ.আই হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং অন্যান্য এ.আই ডিভাইস এর সাথে সেই ডাটা শেয়ার করার সম্ভাবনা আছে। অথবা ক্লাউড থেকে উন্নত এ.আই সেই ডাটা কালেক্ট করতে পারে। সেই এ.আই-গুলি ডিসিশন তৈরি করতে পারে। আর যদি এ.আই সেটা পারে তাহলে সে হয়ত এটা নেসেসারিলি মানুষের কাছে প্রকাশ করবে না।

মানুষের ব্রেইন থেকে এ.আই এর যদি ডাটা ট্রান্সফার করার প্রক্রিয়া থাকে, তাহলে এলন মাস্ক যে অ্যাকসিডেন্টাল ওয়ে’র কথা বলেছেন সেটা এই নিউরালিংকের ক্ষেত্রেও হতে পারে। সেই অ্যাকসিডেন্ট ঘটলে এ.আই কি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে, এলন মাস্ক যে রকম আশঙ্কা করেছেন?

একটা কথা আছে, সামটাইমস ওয়ার ড্রিমস অব ইটসেলফ।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য