page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

এলা থেকে সিন্ডারেলা

সিন্ডারেলা দেখলাম। রূপকথা আমার ভালো লাগে। এইখানে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-খারাপের বিভেদগুলা স্পষ্ট থাকে, একটার থিকা আরেকটারে আলাদা করা যায়, কম কনফিউজিং।

সেই ছোটবেলায় পড়া গল্পটা প্রায় ভুইলাই গেছিলাম। খালি মনে ছিল ওর সৎ মা আর সৎ বোনেদের কথা । সিন্ডারেলা শুনলেই মনে হয় দিন নাই, রাত নাই একটা মেয়ে সমানে ঘর মুছতেছে আর থালা-বাসন ধুইতেছে। আগে পরের কিছুই মনে আসে না, যেন আদি থেকে অনন্ত তার এই বিরামহীন ঘর মুছা আর হয়রান চেহারা… এই রকম একটা ধারণা মনে গেঁথে থাকায় নামটা শুনলেই ক্লান্ত লাগত।

‘সিন্ডারেলা’ শুনলেই সাধারণত যে মাথানত আর অসহায় একটা চরিত্রের কথা মনে আসে, মুভির মেয়েটা কিন্তু মোটেই সেই রকম না। তার নাম যে প্রথমে এলা ছিল এইটাই তো জানতাম না! এইখানে এলা থেকে সিন্ডারেলা হওয়ার যে প্রক্রিয়া সেইটা অনেক বিশ্বাসযোগ্য।

movie-review-logo

ডিজনির এইরকম মুভিগুলায় সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে এদের আলো আর রঙের কারসাজি। এলার জন্ম, তার বাবা মায়ের সাথে মুহূর্তগুলায়, কী সুন্দর সুন্দর ফুল চারপাশে, পাখি, আর গাছ, তার মধ্যে ওদের সম্মিলিত হাসির প্রতিধ্বনি বাতাসে মিশতেছে… বোঝা যায় এই হাসিটুকু এইভাবেই আকাশে বাতাসে ঘুরতে থাকবে ওরা মাটিতে মিশার পরেও।

আলোগুলাও কত নরম, মোমবাতির আলোর মতন। এই আলো শুধু উষ্ণতা দেয়, পোড়ায় না (দৃষ্টিপাত-এর সেই হতভাগ্য চারুদত্ত আধারকারের আগুনের ঠিক উল্টা)।

মায়ের সঙ্গে সিন্ডারেলা।

মায়ের সঙ্গে সিন্ডারেলা।

২০০৮ সালে আমি নিউজিল্যন্ড ছিলাম, তখন একবার অ্যান এনরাইট আসছিলেন একটা লেখকদের সেমিনারে, তার আগের বছর উনি বুকার প্রাইজ পাইছিলেন দ্যা গ্যাদারিং-এর জন্য। কথা বলতে বলতে একসময় বলছিলেন ‘প্রতিটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই কোনো না কোনো ভাবে ড্যামেজড।’ সিন্ডারেলা সিনেমার প্রথম অংশে এলাকে দেখে আমার এই কথাটা মনে হইছিল। একদম শুরুতে তার ভেতরে কোনো দুঃখবোধ বা শূন্যতা ঢোকার সুযোগ পায় নাই। তার দুনিয়া পরিপূর্ণ আর আনন্দময়। বাবা মায়ের প্রচণ্ড ভালোবাসায়, আশেপাশের প্রকৃতি, পশুপাখির সাথে মিলেমিশে সে বড় হইতেছিল। ন্যারেটর এইরকমই বলছিল—‘এলার বাবা যদিও রাজা ছিলেন না, এবং মা রানি না, এলা তবুও রাজকন্যা ছিলো।’ তখনও সে কিছুই হারায় নাই।

তার ড্যামেজড হওয়া শুরু হয় মায়ের মৃত্যু থেকে। ঠিক আগের মুহূর্তেই সবকিছু ঠিকঠাক। মা তাকে বই পড়ে ঘুম পাড়াইতেছে, কপালে চুমু খেয়ে ফিরতেছে। তারপরেই হঠাৎ হাঁটতে গিয়ে আর পারল না। এতই আকস্মিক। ওর মা মারা যাওয়ার সময় ওরে বলতে থাকে—“সাহসী হইয়ো, কাইন্ড হইও।”

cind212

সিন্ডারেলার সৎ মা ও সৎ বোন দুইজন।

এই ‘কাইন্ডনেস’-এর অনুবাদ করতে বললে আমি দয়া বা করুণা না বলে ‘মায়া’ বলবো। যার জন্য মায়া লাগে, তার সাথে এক প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়ানো যায়, দয়া অথবা করুণার জন্য হায়ার গ্রাউন্ড লাগে। এলার মা কাইন্ডনেস-এর সাথে কারেজ-এর কথাও কেন বলছিল? মাঝে মাঝে মানুষ বেশি কাইন্ড হয়ে যাইতে পারে, এইজন্য? ছাড় দিতে দিতে নিজেই কোণঠাসা হইতে পারে, তখন আর কাইন্ডনেস এবং উইকনেস-এর তফাৎ বুঝতে পারা যায় না। মায়া অথবা সহানুভূতির সাথে সাহস থাকলে একই সাথে নরম আর দৃঢ় হওয়া যায়।

মায়ের কথা এলা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে তার সারা জীবনে। মুভিতে মৃত্যু যেমন সহজভাবে জীবনের সাথে মিশছে সেইটা সুন্দর। ভালোবাসার মানুষটা না থাকতে থাকতেও থাকে। এলা আর ওর বাবারে দেখায় আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেছে, আবার বাইরে বেড়াইতেছে, হাসতেছে। এইখানে ন্যারেটর খুব সুন্দর করে বলে, “সময়ের সাথে সাথে আমাদের দুঃখগুলা স্মৃতি হয়ে যায়।” আমার মাথার মধ্যে তখন গান বাজতেছিলো “মরণ বলে আমি তোমার জীবন তরী বাই…।” এলা যে তার মায়ের না থাকারে এত সহজেই মেনে নিল, এইখানে তার কারেজ বুঝতে পারা যায়। বাইরের থেকে তখনও সে একই রকম। বাবা আর সে একসাথে বই পড়ে, খাওয়া দাওয়া করে, হাসে।

cinderela48

এলা ও সৎ মা।

সিন্ডারেলার বাবা যখন আবার বিয়ে করতে চায়, তখন বাংলা গল্পগুলায় যেমন থাকে যে মেয়ের দেখাশোনা করার কেউ নাই, তাই বাবা তার মায়ের অভাব পূরণ করার জন্য বিয়ে করল। এইখানে মোটেই সেইরকম না। এলার বাবা জানতে চায়, সে যদি বিয়ে করে মেয়ের আপত্তি আছে কিনা, তার আরেকবার সুখী হওয়ার অধিকার আছে কিনা… অরিজিনাল বইটা পড়ে দেখতে হবে সেইখানেও বিষয়টা কি এইরকমই ছিল? নাকি সম্পর্ক বিষয়ে আধুনিক মানুষের অবস্থানের সাথে তাল রেখে স্ক্রিপ্টও একটু আপডেটেড হইছে।

তার মায়ের কাছ থেকে আরো একটা জিনিস সে শিখছিল, সেইটা হইল বিশ্বাস করা। একটা দৃশ্যে এলা ইন্দুর হাতে নিয়ে ওদের সাথে কথা বলতেছিল। তখন একটা আলাপ আছে এইরকম—

মা—তুমি কি এখনো বিশ্বাস করো যে এরা তোমার কথা বুঝতে পারে?

এলা—পারে না, মা?

মা—হ্যাঁ। আমার তো মনে হয় আমরা যদি ঠিকমতো শুনতে চাই তাইলে পশুপাখিরা আমাদের সাথে কথা বলে, আমাদের কথাও বুঝতে পারে। নইলে ওদের দেখাশোনা কেমনে করবো আমরা?

এলা—আর আমাদের দেখাশোনা কে করে?

মা—ফেইরি গডমাদারেরা করে, জানো না?

এলা—তুমি ফেইরি গডমাদারে বিশ্বাস করো?

মা—আমি তো সবকিছুতেই বিশ্বাস করি!

এলা—তাইলে আমিও সবকিছুতে বিশ্বাস করি!

আমার মনে হয় এইরকম বিশ্বাস থাকলে সবকিছুকে, সবাইকেই আপন লাগে। তখন মানুষের মনের ভিতরেই একটা খুশি থাকে, শান্তি থাকে, যা তার চারপাশের সবাই টের পায়। এলার মায়ের বলে যাওয়া কাইন্ডনেসও বোধহয় এই বিশ্বাসের একটা ধরন। তাই এলা ছাড় দেয়। সে সবাইরে খুশি দেখতে চায়। তার সৎবোনেদের নিজের ঘর ছেড়ে দেয়। সৎ মা যখন তারে অ্যাটিকের ঘরে থাকতে পাঠায়, সেইটাও সহজেই মেনে যে নেয়, এইটা কখনোই ওর দুর্বলতা বা অসয়হায়ত্ব ছিল না।

cinderela2

এলা অ্যাটিকের সেই ধুলা আর ইন্দুরভর্তি ঘরের বিছানা বালিশ ঝাড়তে ঝাড়তে পায়চারী করে, গান গায়, ইন্দুরদের সাথে দোস্তি করে। আর মুভিতে ঘরটায় কেমন নরম আর আপন একটা আলো ছিল। সবকিছু মায়াময় লাগতে থাকে সেই আলোতে। দর্শক হিসাবে আমরা বুঝতে থাকি আনন্দবোধটা মনেরই একটা পর্যায়।

বাবা মারা যাওয়ার পরে এলা আরো একা হয়ে গেছিল। সৎ মায়ের অত্যাচারও ধাপে ধাপে বাড়ছিল। সে এরমধ্যে থেকেও খুশিমনেই সব মানতে চাইত। কিন্তু একদিন সম্ভব হইল না। সেদিন অ্যাটিকের ঘরে ভীষণ শীতের চোটে সে রান্নাঘরে চিমনির সামনে ঘুমাইছে আর চিমনির কালো ছাই এসে মুখে লাগছে। ছাইয়ের ইংরাজি ‘সিন্ডার’। এইটা নিয়ে ওর সৎ বোন আর সৎ মা হাসাহাসি করে তার নাম দিলো সিন্ডারেলা… সে অভিমানে দুঃখে ঘোড়া ছুটাইতে ছুটাইতে বনের মধ্যে চলে গেল। এইটা তার আরেকটা ড্যামেজড হওয়ার দৃশ্য। শৈশবের সেই এলা তার দুনিয়ার একটু একটু করে হারাইতে হারাইতে সিন্ডারেলায় রূপান্তরিত হইল। কী ভালনারেবল লাগতেছিল তখন তারে!

অথচ এর মধ্যেই যখন দেখল একটা হরিণ রে মারার জন্য একদল শিকারী ছুটে আসতেছে, সে হরিণরে বলল পালাইতে… হরিণও আবার তার কথা বোঝে!

এখানেই রাজপুত্রের সাথে দেখা। কেউওই কারো পরিচয় দেয় নাই। রাজপুত্র অবাক হইছিল এই গহীন বনে একলা মেয়েটা কী করে, তার কোনো সাহায্য দরকার কিনা। মেয়েটা তার কাছ থেকে কথা আদায় করে নিলো যে ওরা হরিণটারে মারবে না। যেভাবে সে কথা বলল, আমার ভাল্লাগছে। সিন্ডারেলা খুব ফেমিনিন, তার গলার স্বর নরম, বলার ভঙ্গি কোমল। নিজের কথাগুলা বলার জন্য তার পুরুষালী হওয়ার দরকার হয় নাই। রাজপুত্র যখন তারে বলছিল হরিণটারে তো মারতেই হবে, কারণ তারা শিকারে আসছে, আর এইরকমই হইছে সব সময়। উত্তরে সে বলছিল—”এইরকমই হয় বলে এইরকমই হইতে হবে তা তো আর না।” রাজপুত্র অবাক হয়ে হাসে আর আমরা বুঝতে পারি যে এই বান্দার তো শিকার টিকার সব মাথায় উঠল।

সিন্ডারেলা ছবির পরিচালক কেনেথ ব্রানাহ (জন্ম. বেলফাস্ট, ইউকে, ১৯৬০)

সিন্ডারেলা ছবির পরিচালক কেনেথ ব্রানাহ (জন্ম. বেলফাস্ট, ইউকে, ১৯৬০)

একটা কথা মনে হইছে, এলার মা তারে সাহস আর সহানুভূতির কথা যেমন বলে গেছেন, বুদ্ধি করে চলার কথাও বইলা যাইতে পারতেন। এমন না যে সে বুদ্ধিমতী না, কিন্তু ডিপ্লোমেসি বোধহয় একটা গ্রে জায়গায় থাকে রূপকথার। শেষের দিকে, যখন সৎ মা বুইঝা ফেলে যে রাজপুত্র যারে খুঁজতেছে সে সিন্ডারেলাই তখন তার সাথে গোপন চুক্তি করতে যায়, বন্ধ ঘরে। সিন্ডারেলা তার কথা শুনে খেপে গিয়ে বলে—”আমার বাবা রে আমি তোমার কাছ থেকে বাঁচাইতে পারি নাই, কিন্তু রাজপুত্ররে বাঁচাবো, তার জন্য আমার যা খুশি হোক গা!” শুইনা সৎ মা তারে ঘরে তালা দিয়া রাইখা দেয়। এখন বুদ্ধির কাজ হইত যদি সে তখন তখন রাজি হইত, পরে রাজপুত্ররে আসল ঘটনা বলত। এইটা আমার কাছে মনে হয় যে ডিসঅনেস্টি না, বরং জান বাঁচানো ফরজ টাইপ জিনিস, এবং আরো এফেকটিভ ভাবে সে প্রোটেক্ট করতে পারত নতুন রাজারে।

রানিবেশে এলা।

রানিবেশে এলা।

এইটা অবশ্য রূপকথা, তাই ঠিক সময়ে সিন্ডারেলা গান গেয়ে উঠছিল আর ইন্দুরগুলা জানালা খুলে দিছিল, তাই শেষরক্ষা হইল। রিয়েল লাইফে ওইরকম কিউট ইন্দুর আমরা কই পাবো?

ক্যাপ্টেন, যে রাজপুত্রের বন্ধুও। মুভিতে সে একজন কালো লোক। এইটাও ভালো লাগছে। সে-ই খুঁজে পায় শেষ পর্যন্ত সিন্ডারেলারে। জানালা দিয়ে ভেসে আসা গান শুনে। সৎ মায়েরে জিজ্ঞেস করে “বাড়িতে কি আরো কেউ আছে, নাকি আপনার বিড়ালটা গান গাওয়া শিখছে?”

রাজপুত্রের সাথে আবার দেখা হওয়ার দৃশ্যটাও সুন্দর। সিন্ডারেলা ওর নাম কিন্তু এলা বলে না, বলে ‘সিন্ডারেলা’। এই নামের ভিতরে ওর জখম হওয়ার ইতিহাসও আছে। সবকিছু নিয়েই সে রাজপুত্রের কাছে যায়।

সৎ মাটারে এরকম নিরঙ্কুশ খারাপ না দেখায়ে তার ভালনারিবিলিটি, ইনসিকিউরিটিগুলা আরেকটু ভালোভাবে দেখানো যাইত বোধহয়।

কিন্তু সবই তো বুঝলাম, এই মুভিতে বিড়ালটারে যে ভিলেইন বানাইছে তার কী হবে?

About Author

লুনা রুশদী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৭৫, করোটিয়া। শৈশব কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে লেখাপড়া নবম শ্রেণী পর্যন্ত, তারপর ১৯৮৯ থেকে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে লা-ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, পরবর্তীতে বৃত্তি নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এ স্নাতোকত্তর লেখাপড়া সিডনির ইউ.টি.এস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি নিয়ে দশ বছর নিউজিল্যান্ড থাকার পর বর্তমানে মেলবোর্ন প্রবাসী। মেলবোর্নে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখার মাধ্যমে লেখালেখির শুরু - প্রথম বাংলাদেশি পত্রিকা ‘অঙ্কুর’ সম্পাদনা ছাত্রজীবনে। বাংলায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালে। এরপর বিভিন্ন বাংলাদেশি ও ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখি। প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি গল্প নিউজিল্যান্ডের ‘লিসেনার’ পত্রিকায় ২০১১ সালে। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ অরুন্ধতি রায় এর ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাব্‌লিক’ (২০১২), উপন্যাস ‘আনবাড়ি’ (২০১৩) প্রকাশক শুদ্ধস্বর।