page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

এলিমেন্টারি, শার্লক!

‘শার্লক’ নামে একটা টিভি সিরিজের যখন দুনিয়াজোড়া জয়জয়কার, আমি তখন তুলনায় কম জনপ্রিয় ‘এলিমেন্টারি’ নামে একটি সিরিজ দেখতে শুরু করেছি। এটি শার্লক হোমস কাহিনিরই আরেকটি মডার্ন অ্যাডাপটেশন, তবে কিনা এটি বানানো আমেরিকায়, দেখানোও হচ্ছে আমেরিকান টিভি চ্যানেল সিবিএস-এ।

‘শার্লক’ সিরিজটা বানানো হয়েছে ব্রিটেনে, হোমসের নিজের দেশে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবিসি এটার সঙ্গে জড়িত। দেখানোও হয় বিবিসি ওয়ান টেলিভিশনে।

 

তাহলে আমরা টিভিতে দুটি শার্লক হোমস সিরিজ পাচ্ছি। দুটিই পাশাপাশি চলছে। একটি ব্রিটিশ। আরেকটি আমেরিকান। আমার পছন্দ আমেরিকান হোমস। সেটা শুধু এ কারণে না যে, ব্রিটিশ সিরিজের চেয়ে আমেরিকান সিরিজের কাহিনির কাঠামো অনেক বেশি ক্রিয়েটিভ। এর পেছনে আরেকটা দূরঘোরানো ইতিহাস আছে। আমি বিশ্বাস করি, ঠিকুজি ঘাটলে আমরা নির্ঘাত জানতে পাবো, ২২২বি বেকার স্ট্রিটের এই পরামর্শক গোয়েন্দা আদতে খাঁটি আমেরিকান চিজ। ফলে আমেরিকানরাই হোমসের পালস ধরতে পারবে।

হোমসের মধ্যে মার্কিন রক্ত ঢুকল কী করে? সেটা ঢুকেছে তার জন্মের সূত্র ধরেই। হোমস তো আসলে প্যারিসে বসবাসকারী গোয়েন্দা দ্যুপোঁর অনুকরণমাত্র, যার লেখক এডগার অ্যালান পো ছিলেন মার্কিন নাগরিক। তিনটি দ্যুপো গল্পের দুটিই মেরে দিয়েছেন কোনান ডয়েল—‘পার্লয়েন্ড লেটার’ হয়েছে ‘আ স্ক্যান্ডাল ইন বোহেমিয়া’ আর ‘দ্য গোল্ড বাগ’ হয়ে গেছে ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ড্যান্সিং মেন’।

আর্মচেয়ার ডিটেকটিভ আর তার এক ছায়াসঙ্গীর কাঠামোটিই পো থেকে নেওয়া। হোমসের কথার মধ্যে যে আত্মম্ভরী আওয়াজ পাওয়া যায়, সেটা দ্যুপোঁর কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি। তাছাড়া পরিপাটি বাবু পরিবেশের ভিক্টোরিয়ান লন্ডনে কোকেনসেবী এক অপরিপাটি যুবক আর যুদ্ধফেরত অপেশাদার ডাক্তারের চরিত্র আসলে তখনকার অগোছালো নিউইয়র্ক শহরের সঙ্গেই বেশি মানানসই।

হোমস তখন তখনই লন্ডনে বসবাসকারী মার্কিন ক্যারেকটার। এক লুকানো ইমিগ্র্যান্ট।

আমেরিকান টিভি সিরিজের নামটা লক্ষ্য করুন। ‘এলিমেন্টারি’। হোমসের একনিষ্ঠ পাঠকমাত্রই জানবেন, এখানে অ্যালিউশনটা কী?

হোমস মাঝে মাঝে তার বন্ধু ওয়াটসনের বুদ্ধির তারিফ করতে গিয়ে খোঁচা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলত, ‘এলিমেন্টারি!’ অপরাধ বিশ্লেষণ বা ডিডাকশনে ওয়াটসনের দক্ষতা যে কতটা কাঁচা, সেটা বোঝানোর জন্যে এই খোঁচাটা দিত হোমস। এটা আসলে উল্টোপথে হোমসের মগজের সাবলাইমিটি বোঝানোর একটা তরিকামাত্র। সিরিজের টাইটেলে হোমসের নাম ব্যবহার না করে হোমস ক্যাননের একটা অ্যালিউশন ব্যবহার আমেরিকান প্রডিউসারদের বাণিজ্যিক সাহস ও ম্যাচিউরিটির পরিচায়ক বটে।

‘এলিমেন্টারি’ নামক আমেরিকান সিরিজ বাজারে এসেছে ২০১২ সালে। ততদিনে তার ব্রিটিশ কাউন্টারপার্ট ‘শার্লক’ দ্বিতীয় বছরে পা দিয়েছে এবং দুনিয়াজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছে। ফলে মার্কিন হোমস রঙ্গমঞ্চে পা-ই রেখেছে তেরচা-বেকায়দা অবস্থায়, ব্রিটিশ সিরিজের একটা বাজারি রেসপন্স হিসেবে, একটা ‘দুই নাম্বার মাল’ পরিচয়ে।

ওই অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। আসেও নি। আমেরিকান হোমস পেশী না ফুলিয়ে বরং মাথানিচু বিনম্রতা বজায় রেখে চলেছে। এখনও সেটার পরিচয় একটা মডারেটলি পপুলার সিরিজ হিসেবে। তাই বলে ভাবার অবকাশ নেই, ‘এলিমেন্টারির’ প্রতি আমার পক্ষপাতের পেছনের কারণ দুর্বলের প্রতি বাঙালির স্বভাবসুলভ দ্রবীভূত স্নেহপরবশতা। ব্রিটিশ হোমসের চেয়ে মার্কিন হোমস আসলেই সুপিরিয়র। ইন্টেলেকচুয়ালি।

আমেরিকান লেখকরা হোমসের প্রতি অনেক বেশি সুবিচার করতে পেরেছেন, তার কারণ মার্কিন সাংস্কৃতিক বাতাবরণ তাদের গোড়া থেকেই কিছু অ্যাডভানটেজ দেয়। ন্যায়বিচার বা জাস্টিস ডেলিভারির অ্যাডভানটেজ।

সেটা কী?

ভালো করে লক্ষ্য করুন, লন্ডনে এ যুগের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের এই কনসালটেটিভ ডিটেকটিভের সত্যিকার ভূমিকাটি কী? অপরাধীকে শনাক্ত করে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা? সেটা তো উপরিতল মাত্র। আসল ভূমিকাটি দেখতে হলে তাকাতে হবে হোমসের বড় ভাই মাইক্রফট হোমসের দিকে।

মাইক্রফট ব্রিটিশ প্রশাসনিক এস্টাবলিশমেন্টের ভেতরের লোক, কেনসিংটন প্রাসাদের একজন প্রোটেকটর। প্রাসাদ যখন বিপদে পড়ে, নিখুঁত পরিপাট্যে স্যুটেড মাইক্রফট তখন হোমসের দ্বারস্থ হয়। হোমসের সকল মেন্টাল ফ্যাকাল্টি এস্টাবলিশমেন্টের সুরক্ষায় নিবেদিত। হোমস হলো একবিংশ শতকের ব্রিটিশ সুপারম্যান, লন্ডনের টিউবে জঙ্গি হামলার ষড়যন্ত্র থেকে যে ব্রিটেনকে বাঁচাবে। এ কারণে বেকার স্ট্রিটে আমরা যে প্রখরবুদ্ধি সদাচঞ্চল যুবককে পাই, সে আসলে এক অতিকায় ডিসপ্যাশনেট রোবট, মানুষের নৈমিত্তিক দুঃখসুখের সঙ্গে যার কোনো যোগ নেই। যার দোতলা লিভিংরুম আসলে গগনচুম্বী। ডয়েল তার হোমসকে চেষ্টা করেও এতটা ডিসপ্যাশনেট বানাতে পারেন নি। ডয়েলের হোমসের বেহালার করুণ সুর বেকার স্ট্রিটের গলিপথে গড়িয়ে গড়িয়ে নামে, এক্কাগাড়ির ঘোড়ার খুরের সঙ্গে মিশে যায়।

আর আমেরিকান হোমস?

নিউ ইয়র্কের এক শহরতলীতে বসবাসকারী এই জৌলুসহীন যুবকের সবচেয়ে বড় লড়াইটা তার নিজের সাথে, মাদকের নেশার বলয় থেকে বেরিয়ে আসার অন্তর্গত লড়াই। ক্রাইম ডিটেকশন তার কাছে একটা এন্টিডোট মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর প্রতি এক ধরনের এমপ্যাথি পোষণ করতে দেখি তাকে। ভিকটিম আর অপরাধীর মধ্যেকার এক ছায়াছন্ন আনব্রিজ্যাবল সড়কদ্বীপে আমরা তাকে বসে থাকতে দেখি। রক্ষা করার মতো কোনো মনুমেন্টাল সামাজিক এস্টাবলিশমেন্ট তার সামনে নেই। তার সামনে কেবল দণ্ডায়মান করপরেট এস্টাবলিশমেন্ট, যা তাকে পিষে ফেলার চেষ্টা করে।

ব্রিটিশ হোমসের মতো আমেরিকান হোমসকে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হয় না যে, সে সমকামী নয়। চেষ্টা করতে হয় না, শুধু এ কারণে নয় যে, তার ছায়াসঙ্গী ওয়াটসনের লিঙ্গই আসলে পাল্টে ফেলা হয়েছে, পাল্টে এক নারী চরিত্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যার নাম জোয়ান ওয়াটসন। চেষ্টা করতে হয় না, কেননা লিঙ্গের প্রশ্নকে তার সমাজ আগেই পাশ কাটিয়ে এসেছে।

অ্যাডাপটেশনের এই জায়গাটায় আমি একটু জোর দেব।

আমেরিকান ওয়াটসন কী করে, কেন নারী হয়ে গেলেন? শুধু ওয়াটসন নারী হন নি, শার্লক হোমসের আর্চ রাইভাল বা সবচেয়ে বড় শত্রু জেমস মরিয়ার্টিও এখানে একজন নারী। কী করে? বাণিজ্যের চাপে? অনেকটা। কিন্তু সেটা তো শেষ কথা নয়। বাণিজ্যের চাপের অন্তর্গত প্রকৃতিটা আসলে কী? প্রকৃতিটা ফ্রয়েডিয়ান। আর যদিচ ফ্রয়েডিয়ান, সেটা মানুষের মৌলিক প্রকৃতির প্রতি অনুগত তো বটে। ফলে ওয়াটসনের লিঙ্গ পরিবর্তন একটা নেচারাল এভোলিউশনারি পথেই ঘটেছে বলতে হবে।

ওয়াটসনের শুধু লিঙ্গান্তর ঘটে নি, জাতিগত পরিচয়ও পাল্টেছে। এখানে তার অরিজিন চাইনিজ। কসমোপলিটান নিউইয়র্কের প্রতিবিম্ব। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর বেল এক গোয়াড় কৃষ্ণাঙ্গ।

লক্ষ্য করতে বলবো শার্লক হোমসের উচ্চতার দিকে। ডয়েলের মূল কাহিনিতে হোমসকে লম্বা হিসেবেই বর্ণনা দেওয়া আছে। ব্রিটিশ টিভি সিরিজের হোমস (বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ) বেশ লম্বাই। কিন্তু মার্কিন শার্লক হোমস (জনি লি মিলার) মাঝারি উচ্চতার। ভিড়ের মধ্যে তাকে আলাদা চেনা যায় না।

এই হোমস অনেক ম্রিয়মান, অ্যাপার্টমেন্টের একতলাতেই তার বসবাস।

চুলচেরা তুলনায় যাওয়ার দরকার নেই। কেবল অ্যাডাপটেশনের ভিন্নতার দিকে মনোযোগ দিলেই অনেক কিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। আমার তো মনে হয়, এই দুই সিরিজ পাশাপাশি রাখলে আমরা আরো অনেক কিছুর সাথে আমেরিকান আর ব্রিটিশ মগজের বেশ কিছু মৌলিক ফারাকের ইঙ্গিত পাবো, যার অনেকগুলো গোড়ায় পলিটিকো-কালচারাল। সেটাও একটা হোমসীয় ডিডাকশন হতে পারে বটে, ‘এলিমেন্টারি’ বলে যেটাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

About Author

শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল