ওয়ারেন আর আমি যদিও সমসাময়িক, তবু তার জ্ঞানের পরিধির জন্য তাকে অনেক সময় আমার পিতৃস্থানীয় কেউ বলে মনে হয়।

আমেরিকান বিজনেস ম্যাগনেট ওয়ারেন বাফেটের সাথে বিল গেটসের বন্ধুত্ব বহু দিনের। কর্মক্ষেত্রে তাদের নিজ নিজ পটভূমি এক না হওয়ার পরও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং উৎসাহের জায়গা থেকে তারা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও প্রচণ্ড আন্তরিক। এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে কিছু স্মৃতিচারণা করেছেন বিল গেটস। তাদের প্রথম সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে বাফেটের সাথে কাটানো তার পরিবারের কিছু একান্ত সময় উঠে এসেছে এই লেখায়।

হাসি ও শেখার ২৫ বছর

বিল গেটস

অনুবাদ: 

বেশিরভাগ বন্ধুর সাথেই আমার প্রথম কবে দেখা হয়েছিল, তা মনে নাই। কিন্তু ওয়ারেন বাফেটের সাথে প্রথম সাক্ষাতের দিনটা মনে আছে। ৫ জুলাই, ১৯৯১।

আসলে ওই তারিখটা এত আলাদাভাবে মনে রাখার কারণ সম্ভবত, ওইদিন আমার ও মেলিন্ডার জীবনে খুবই অপ্রত্যাশিত এক বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল—যে বন্ধুত্ব আমাদের জীবনকে সব দিক দিয়েই পুরোপুরিভাবে পালটে দেয়।

বিল ও ওয়ারেন।

ওয়ারেন আমাদেরকে এমন দুই জিনিস করতে শিখিয়েছেন, যা এক জীবনে বার বার করতে থাকা অসম্ভব—বেশি বেশি শেখা ও সেই সাথে আরো বেশি হাসতে পারার ক্ষমতা।

আমাদের বন্ধুত্বের গত পঁচিশ বছরে এই দু’টি কাজ আমরা অনেকবার করে করেছি। মেলিন্ডা আর আমি তো মাঝে মাঝেই ওয়ারেনের বুদ্ধিদীপ্ত কথাগুলি মনে করার চেষ্টা করি। আবার কখনো ওয়ারেনের সাথে কাটানো হাস্যকর মুহূর্তগুলির কথা মনে করে নিজেদের মাঝেই হাসাহাসি করতে থাকি।

ওয়ারেনের সাথে বন্ধুত্বের পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাই আমাদের দু’জনের একসাথে কাটানো কিছু প্রিয় মুহূর্তের কথা বলতে চাই আপনাদের।

শুরুটা ছিল বিব্রতকর
প্রথম দেখায় ওয়ারেন আর আমাকে একসাথে একটু বেখাপ্পা লাগতে পারে। আমি টেকনোলজিতে বুঁদ হয়ে থাকা একজন আঁতেল, অন্যদিকে ওয়ারেন একজন ইনভেস্টর; যিনি কিনা ই-মেইল পর্যন্ত ব্যবহার করেন না। সত্যি কথা বলতে, তার সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার ব্যাপারে আমার কোনো আশাও ছিল না।

১৯৯১ সালে আমার মা যখন ‘হুড ক্যানাল’-এ আমাদের ভ্যাকেশন হোমে কিছু বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য আমাকে ডাকলেন, আমি প্রথমে যেতে চাই নাই। প্রচণ্ড ব্যস্ততার অজুহাত দিয়েছিলাম। মা বললেন, ওয়ারেন নাকি বেশ ইন্টারেস্টিং মানুষ। আমার বিশ্বাস হলো না। বললাম, “দেখো, উনি শুধু কাগজ কিনেন আর বিক্রি করেন। এর তো কোনো বাস্তবিক মূল্য নাই। আমার মনে হয় না আমাদের পছন্দ-অপছন্দে তেমন একটা মিল পাওয়া যাবে।” শেষ পর্যন্ত মা আমাকে রাজি করালেন। আমি সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা থাকব বলে কথা দিলাম। দুই ঘণ্টা পরই আমাকে মাইক্রোসফটে এসে কাজে হাত দিতে হবে—এমন কথা রইল।

বিল ও ওয়ারেন।

তারপর ওয়ারেনের সাথে দেখা হল। আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন তিনি। সফটওয়্যার ব্যবসার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন, মাইক্রোসফটের মতো ছোট একটা কোম্পানি কীভাবে আইবিএম এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আশা করছে। তাছাড়া আমাদের দক্ষতার জায়গা এবং বাজারদর নিয়েও জিজ্ঞেস করলেন। তার প্রশ্নগুলি আমাকে মুগ্ধ করল। এসব প্রশ্ন সচরাচর কেউ জিজ্ঞেস করত না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল অথচ আমরা টেরই পাই নি। তার আচরণে তাকে হর্তা-কর্তা টাইপ লোক বলে মনে হয় নাই কখনো। খুব বিনীত ভঙ্গিতে নিজের কাজ নিয়ে আলাপ করছিলেন তিনি। কথাবার্তায় হাসি-ঠাট্টাও ছিল, কিন্তু পৃথিবী নিয়ে তার একেবারে পরিষ্কার চিন্তাভাবনা আমাকে মুগ্ধ করেছিল সবচাইতে বেশি। সেই প্রথম কথোপকথন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব অনেক গভীর হয়ে যায়।

ব্রেকফাস্টে ওরিও খাওয়া
ওয়ারেনের একটা ব্যাপার দেখে অনেক বেশি অবাক হয়েছিলাম। তিনি ৬ বছর বয়সে যেসব খাবার খেতেন, মোটামুটিভাবে এখনো সেগুলিই খান। ঠিক বাচ্চাদের খাবার না হলেও, তার খাদ্য তালিকায় মূলত থাকে হ্যামবার্গার, আইসক্রিম এবং কোক (এই জন্যেই তার সাথে ডিনারে যেতে খুব মজা লাগে আমার)। শুরুর দিকে একবার আমাদের বাসায় রাত কাটানোর পর ব্রেকফাস্টের জন্য একটা ওরিও’র প্যাকেট খুলে নিলেন তিনি। সাথে সাথে আমার বাচ্চারা তার কাছ থেকে চাইতে শুরু করল। হয়ত কমবয়সীরা তার এসব কাণ্ড দেখে বিভ্রান্ত হবে—কিন্তু এই খাদ্যাভ্যাস তার জন্য বেশ কাজে দেয়।

“তোমার ডাইনিং রুমটা আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে, ওয়ারেন!”
ওয়ারেনের বাড়ি ওমাহা’য় মেলিন্ডা আর আমাকে একবার দাওয়াত দিয়েছিলেন তিনি। গোটা বাড়ি আমাদেরকে ঘুরিয়ে দেখালেন ওয়ারেন। ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখলাম, ওখানকার চেয়ারে কোনো সিট নাই। তিনিও আমাদের মতই অবাক হলেন। চেয়ারগুলি নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, “ঘটনাটা কী?” পরে জানা গেল, অনেক মাস আগেই চেয়ারের সব কুশন তুলে ফেলা হয়েছে নতুন করে লাগানোর জন্য। কিন্তু ওয়ারেন খেয়ালই করেন নাই (উনি নিশ্চয়ই এতদিন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ওরিও আর আইসক্রিম খেয়ে দিন কাটিয়েছেন)। ওইবারের ঘটনা নিয়ে আমরা এখনো হাসাহাসি করি।

বিল ও ওয়ারেন।

বিশ্বমানের উপদেশের জন্য, ২ চাপুন
আমার অফিস টেলিফোনের স্পিড ডায়ালে শুধু দুইটা নাম্বার থাকে—বাসার নাম্বার ও ওয়ারেনের নাম্বার। ওয়ারেন যদি কল দেওয়ার মত সময় পান, তাহলে আমার জন্য সেই সপ্তাহের সবচাইতে স্মরণীয় ঘটনা ওইটাই হয়। আমি সবসময় তার কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখি। দুইজনে মিলে রাজনীতি, বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি, কোন দেশে কী হচ্ছে, নতুন কী কী আবিষ্কার হল—এসব নিয়ে আলাপ করি। সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন লোকের কাছ থেকে এসব ব্যাপার সম্বন্ধে জানতে খুব ইন্টারেস্টিং লাগে। তিনি সবকিছু একজন অর্থনৈতিক বিনিয়োগকারীর দৃষ্টি দিয়ে দেখেন, অন্যদিকে আমার দৃষ্টিকোণ একজন প্রযুক্তিবিদের মত। আমাদের কোম্পানির ট্রাস্টি হিসাবে ওয়ারেনের উপস্থিতি আমার ও মেলিন্ডার চিন্তাভাবনায় অনেক সাহায্য করে। নতুন কোনো চ্যালেঞ্জের সময় আমরা চিন্তা করি, “ওয়ারেন এই জায়গায় কী করতেন?” ফলে সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অনেক সহজ হয়ে যায়। ওয়ারেন আর আমি যদিও সমসাময়িক, তবু তার জ্ঞানের পরিধির জন্য তাকে অনেক সময় আমার পিতৃস্থানীয় কেউ বলে মনে হয়।

আবেগের বিনিয়োগ
ব্যবসায় বিনিয়োগের ব্যাপারে অত্যন্ত তুখোড় হওয়ায় সবাই ওয়ারেনকে ‘ওরাকল অফ ওমাহা’ বলে ডাকত। তবে মানুষের সাথে নিজের ব্যক্তিত্বের বিনিয়োগেও তিনি সমান পারদর্শী। তিনি যখন খুব সহজেই মানুষদের মনোযোগ আকর্ষণ করে শেখার ব্যাপারটা তাদের কাছে খুবই মজাদার করে তোলেন—আমার প্রচণ্ড অবাক লাগে। যদিও অনেক ব্যস্ত শিডিউল থাকে ওয়ারেনের, তারপরও বন্ধুত্বের সম্পর্ক ভালো রাখার ব্যাপারে তিনি অনেক সতর্ক। খুব কম লোককেই এমনটা করতে দেখেছি। ফোন দিয়ে খবরাখবর নেন; যদি এমন কোনো আর্টিকেল চোখে পড়ে যা আমার ও মেলিন্ডার কাজে আসতে পারে, সাথে সাথে তা মেইলে পাঠিয়ে দেন ওয়ারেন।

আরো পড়ুন: ইয়ুভাল নোয়াহ হারারির ‘স্যাপিয়েন্স’ প্রসঙ্গে বিল গেটস

গত ২৫ বছরে ওয়ারেনের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। তার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হল বন্ধুত্বের সংজ্ঞা। আপনি মনে মনে যে রকম বন্ধু চান, নিজে সে রকম একজন মানুষ হতে পারাই প্রকৃত বন্ধুত্বের লক্ষ্য। ওয়ারেনের মতো বুদ্ধিদীপ্ত ও দয়ালু একজন বন্ধু থাকলে যে কেউ নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবে। তিনি সবসময় মানুষদেরকে নিজেদের ব্যাপারে ভালো জিনিসটা উপভোগ করতে সাহায্য করেন। ভাগাভাগি করে নেন নিজের সুখের মুহূর্তগুলি।

এখনো ওমাহায় গেলে (যেখানে আমি প্রায়ই যাওয়ার চেষ্টা করি) ওয়ারেন গাড়িতে করে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে পিক-আপ করতে চলে আসেন।

ওয়ারেন, মেলিন্ডা ও বিল।

এটা হয়ত তেমন কিছুই না, কিন্তু আমার কাছে এর মূল্য অনেক। প্লেনের দরজা খোলার সময় আমি অধৈর্য হয়ে যাই। কারণ, আমি জানি ওয়ারেন কোনো নতুন কৌতুক বা গল্প নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। সেই গল্প শুনতে শুনতে মন খুলে তার সাথে কিছুক্ষণ হাসা ও অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাব আমি।

আপনার বন্ধুত্বের জন্য ধন্যবাদ, ওয়ারেন। অসাধারণ ছিল এই ২৫ বছর। সামনের বছরগুলিতে আপনার সাথে আরো অনেক স্মৃতি জমা করে রাখতে চাই আমি।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য