page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

করটিয়া কলেজে চার বছর (১)

১.

বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষায়তনের মতই করটিয়া সা’দত কলেজ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ছাত্র ও শিক্ষকদের অনেকেরই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের ফলে কলেজটি বিভিন্ন দিক থেকে চাপের মুখে ছিল। ছাত্রের অনুপস্থিতি ও রীতিমত ক্লাস না হওয়ার ফলে ছাত্র বেতন আদায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল।

অন্য দিকে মুক্তিযোদ্ধারা কলেজ বন্ধ রাখার জন্যে আর পাকিস্তানি আর্মি কলেজ খোলা রাখার জন্যে চাপ দিচ্ছিল।

কলেজের আর্থিক দুরবস্থার কারণে কলেজের সাধারণ কর্মচারী ও শিক্ষকদের এক বছরের বেশি সময়ের বেতন বাকি পড়ে গিয়েছিল।

প্রায় ৫০ বছরের পুরানো এই কলেজের সমস্ত শিক্ষক কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ক্রমাগত ঋণ নেয়ার ফলে তহবিলে আর এক টাকাও বাকা ছিল না। এহেন অবস্থায় শিক্ষক কর্মচারীদের অসন্তোষ চরমে পৌঁছাই ছিল স্বাভাবিক।

স্বাধীনতার পর করটিয়া কলেজে ইকনমিকসে অনার্স খোলার দরখাস্তের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শর্ত সাপেক্ষে অনার্স খোলার অনুমতি দেয়। শর্তানুসারে কলেজের ইকনমিকস বিভাগে বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।

কলেজ গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান তদানীন্তন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব আবদুল মান্নান তদানীন্তন ডি পি আই জনাব আবু রুশদ মতীন উদ্দিনকে অনুরোধ করেন একজন প্রিন্সিপাল কাম ইকনমিকসের শিক্ষক দেওয়ার জন্যে।

ডি পি আই সাহেব এ ব্যাপারে আমার সাথে আলাপ না করেই প্রিন্সিপাল সিদ্দিকীকে (কমার্স কলেজ চিটাগাং) টেলিগ্রাম করেন আমাকে রিলিজ করার জন্যে এবং সরকারী ডেপুটেশনে করটিয়া কলেজে প্রিন্সিপাল হিসাবে যোগদানের জন্যে।

আমি বললাম, আমি প্রিন্সিপালশিপের কী জানি যে আমাকে প্রিন্সিপাল করা হল?

তিনি বললেন, কর্তৃপক্ষের আদেশ, অমান্য করার উপায় নেই।

আমি বললাম, স্যার! আপনি একজন সাকসেসফুল প্রিন্সিপাল, আমাকে বলে দিন কী করলে সফল হতে পারব।

তিনি বললেন, সফলতা আল্লাহর কাছ থেকে আসে, আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি।

পরদিন তিনি আমাকে রিলিজ করে দিলেন এনং ওনার বাসায় খাওয়ার দাওয়াত দিলেন।

বুলবুলসহ ওনার বাসায় খাওয়ার টেবিলে বসে অনেক কথা, ওনার জীবনে অনেক আনন্দের মুহূর্ত, অনেক বেদনার মুহূর্ত এবং প্রত্যেকটি ঘটনাকে তিনি কীভাবে গ্রহণ করেছিলেন তা ধীরে ধীরে বর্ণনা করলেন।

তারপর বললেন, দেখুন, আপনি হয়ত সারা দিন কাজ করে বাসায় ফিরেছেন বিশ্রাম নেবার জন্যে, অলসভাবে ঘুমের ঘোরে শুয়েও পড়েছেন। এমন সময় কেউ হয়ত আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। কী করবেন? ওই লোকের সাথে দেখা না করলে আপনাকে কেউ দোষ দিতে পারবে না। কিন্তু যদি কষ্ট স্বীকার করে আপনি তার সাথে দেখা করেন, এর সুফল অনেক। দেখবেন অনেক সমস্যা আপনা-আপনি সমাধান হয়ে গেছে।

স্যারের এই উপদেশ আমি সারা জীবন ধরে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেছি এবং আমি ঠকি নাই।

 

২.

করটিয়া সা’দত কলেজ অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম কলেজ। ১৯২৬ সালে আটিয়ার চাঁদ ওয়াজেদ আলী খান পন্নী পিতামহ সা’দত আলী খান পন্নীর নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের উপরে ঢাকা থেকে ৫৫ মাইল দূরে এবং টাঙ্গাইল থেকে ৫ মাইল আগে ৩৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক অনন্য অবদান রেখে যাচ্ছে।

প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ এই কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন। ১৯২৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২১ বছর তিনি এই পদে বহাল ছিলেন।

ibrahim-kha-1

ইবরাহীম খাঁ (১৮৯৪ – ১৯৭৮)

১৯৩৮ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি কলেজটি পরিদর্শন করতে আসেন এবং কলেজের জন্যে মোটা অংকের অনুদান বরাদ্দ করেন। ওই বছরই কলেজটি ডিগ্রি কলেজে উন্নিত করা হয়।

শোনা যায়, শেরে বাংলার সফরের সময় করটিয়ার জনসাধারণ প্রধানমন্ত্রীর কাছে করটিয়াকে  একটি আদর্শ গ্রামে পরিণত করার জন্যে আবেদন করেছিল। প্রতি উত্তরে তিনি বলেছিলেন, করটিয়াকে আর কী করে আদর্শ করব, এ গ্রাম তো আদর্শ গ্রামেরও আদর্শ।

এই আদর্শ গ্রামের আদর্শ কলেজের কথা অতি ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছিলাম। বইতে পড়েছিলাম চাঁদ মিয়া সাহেব নামে বাংলার এক সুসন্তান তার গরীব প্রজাদের জন্যে কলেজ করেছেন যাতে তাদের সন্তানেরা নিজের বাড়িতে থেকে পান্তা ভাত খেয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে।

ভাবতে ভাল লাগত, আহা রে আমার বাড়ি যদি করটিয়ার আশেপাশে হত! আমার অজান্তেই আল্লাহ আমার মনের গভীরে এই ভাবনার কথা জানতেন এবং আমার ভাগ্য নির্ধারিত করে রেখেছিলেন।

 

৩.

ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের পাশেই সাদাত কলেজের বিরাট দীঘি। কানায় কানায় ভর্তি এই পুকুরের চার পাশ ঘিরে দিন রাত শোনা যায় তারুণ্যের ধ্বনি। ছাত্র-ছাত্রীদের লীলায়িত চলাফেরার ছবি ফুটে উঠে দীঘির পানিতে। এই দীঘির দক্ষিণ পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি রাস্তা কলেজ মসজিদ পর্যন্ত। সেখান থেকে আবার পুকুরের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া গাছের নিচ দিয়ে রাস্তাটি চলে গেছে অধ্যক্ষের অফিস পর্যন্ত।

অফিসের দুটি দরজা—একটি দক্ষিণ দিকে আরেকটি পশ্চিম দিকে। দুটিতেই নীল লম্বা পর্দা বাতাসের সাথে সাথে দোল খাচ্ছে। পশ্চিম দিকের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছয় ফুট লম্বা সুন্দর ও সুঠামদেহী শ্মশ্রুমণ্ডিত মুন্সি।

ঠিক সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নাজুর মতো পাগড়ি পড়া মুন্সি আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। ভিতরে ভাইস প্রিন্সিপাল এবং দু’ চার জন প্রবীণ শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।

ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব স্টেনো-টাইপিস্ট মাখন মিয়াকে ডাকলেন আমার জয়েনিং রিপোর্টের ডিকটেশন নেওয়ার জন্যে। আমি ডিকটেট না করে নিজেই লিখে দিলাম জয়েনিং রিপোর্ট। এই ভাবে ১২ ডিসেম্বর ১৯৭২ সাল ভাগ্য আমাকে করটিয়া সা’দত কলেজের প্রিন্সিপালের চেয়ারে বসিয়ে দিল, যা আগে কখনো ভাবতেই পারি নি।

ধীরে ধীরে প্রবীণ ও নবীন শিক্ষকগণ, শিক্ষক সমিতির চেয়ারম্যান, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীবৃন্দ দেখা করলেন এবং যথারীতি শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। লক্ষ্য করলাম প্রবীণ শিক্ষকদের কেউ কেউ আমার যা বয়স তার চেয়েও বেশি সময় ধরে ওই কলেজে শিক্ষকতা করছেন। তাদের অনেকেরই এই কলেজের প্রিন্সিপাল হওয়ার মত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দুই রয়েছে। কাজেই এদের কেউ যদি তাদের তুলনায় বয়সে তরুণ ও অনভিজ্ঞ প্রিন্সিপালকে মেনে না নেন তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নাই।

কলেজের জীবন্ত ইতিহাস নওশের আলী সাহেব। হেড ক্লার্ক হিসাবে পরিচিত এই লোকটি প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর সাথে একটা খাতা আর একটা কলম নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখনো সেই অফিসকেই আঁকড়ে ধরে আছেন। বললেন, নতুন প্রিন্সিপালের যোগদানের পর পরই তিনি চাকরি ছেড়ে দেবেন এই শর্তে তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

আমি কিছু না বলেই ভাবলাম, চিন্তার কোনো কারণ নাই, আমার স্বার্থেই আপনার চাকরির মেয়াদ আবার বৃদ্ধি করা হবে।

ali-ahmad-1970

১৯৭০ সালে লন্ডনের রিজেন্ট পার্কে, স্ত্রী সুলতানা রুশদীর সঙ্গে।

১৪ ডিসেম্বর আমার মিনিস্টার মান্নান সাহেবের সাথে দেখা করার কথা ছিল। তিনি গভার্নিং বডির চেয়ারম্যান। কিন্তু ওই দিনই বিশাল এই পৃথিবীতে আমি ভয়ানক রকম একা হয়ে যাই। এখন আর শিবলী নাই, বাইরে যাবার সময় আমার গলা জড়িয়ে গালের সাথে গাল মিলিয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে চেপে ধরার কেউ নাই, তাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার বায়না নাই, মায়ের কোল থেকে নেমে মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে চিৎকার করে আমাকে ফিরাবার কোনো চেষ্টা নাই।

তবু বাইরে যাবার কোনো ইচ্ছা আমার নাই। দুই পা, দুই হাত, সমস্ত শরীর যেন পাথর হয়ে গেছে, কিছুতেই নাড়ানো যাচ্ছে না। মিনিস্টার সাহেবের সাথে দেখা করার কোনো উৎসাহ আর আমার মধ্যে অবশিষ্ট নেই।

পরদিন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল খন্দকার মোহাম্মদ হোসেন (ঠাণ্ডু মিয়া)সাহেব আসলেন দেখা করতে। শিবলীর মৃত্যুসংবাদ তিনি করটিয়াতেই পেয়েছিলেন। আমার বনানীর ঠিকানা তিনি জানতেন না কাজেই সরাসরি প্রফেসর কে টি হোসেনের বাসায় চলে যান এবং সেখান থেকে কে টি হোসেনসহ বনানীতে মেঝো ভাইয়ের বাসায় আসেন।

দুজনেই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং অনেকক্ষণ যাবৎ কোনো কথা না বলে জড়িয়ে ধরে রাখেন। আমি কিছুতেই কান্না সম্বরণ করতে পারছিলাম না। ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, আপনার দুঃসংবাদের কথা শুনে কলেজের প্রায় সব শিক্ষকরাই চলে আসতে চেয়েছিলেন ঢাকায়, আমি তাদের বারণ করেছি। এত লোক এখানে আসলে আপনাকে আরো কষ্টই দেওয়া হত। আমার মনে হয় আপনি কলেজে আসলে ভাল বোধ করবেন। সেখানে দশ হাজারেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী আপনার অপেক্ষা করছে। তাদের ভিড়ের মাঝে আপনি আপনার ছেলেকে খুঁজে পাবেন।

প্রফেসর কে টি হোসেনও বললেন কোনো একটা ব্যস্ততার মধ্যে থাকাই এখন আমার জন্যে শ্রেয়। আমি ভাবলাম, একাকিত্ব হচ্ছে আমার মনের ভিতরে। কলেজের দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রী আমার একাকিত্বের নাগাল পাবে কী ভাবে? তবে হ্যাঁ, আমার ব্যস্ততা হয়ত বা একা থাকার ব্যাথাও উপশম করতে পারবে।

ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব আমাকে নিয়ে মান্নান সাহেবের বাসায় গেলেন। তিনিও জেনেছিলেন আমার ছেলের মৃত্যুসংবাদ। যথারীতি সান্ত্বনা বাণীর পর আমাকে বললেন, ইচ্ছা করলে আমি দু’এক সপ্তাহ ঢাকাতেই থেকে যেতে পারি, এই মুহূর্তে কলেজ নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই।

আমি বললাম, না। আমি সেখানেই যেতে চাই।

উনি তাতে সায় দিয়ে বললেন, তাই ভাল।

ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব ওই দিনই চলে গেলেন করটিয়াতে, আমি গেলাম পরদিন। পরদিন কলেজে গিয়ে দেখি ওইদিনই ছাত্রসংসদ ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আমার সম্বর্ধনা।

sadat-collage-4

সরকারী সা’দত কলেজ, করটিয়া, টাঙ্গাইল

৪.

আমি সম্বর্ধনার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। এমনিতেই আমি স্বাগত কিংবা বিদায় কোনো সম্বর্ধনাই পছন্দ করি না তদুপরি আমার মনের অবস্থা যা তাতে সম্বর্ধনা নেবার মত অবস্থা ছিল না। আমি বলে দিলাম এই মুহূর্তে আমি সম্বর্ধনা নিতে পারব না। কিন্তু ভাইস প্রিন্সিপাল ও মনসুর নাছোড়বান্দা। মনসুর ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি)। করটিয়া কলেজে বাংলা অনার্সের ছাত্র।

ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, সব কিছুর ব্যবস্থা হয় গেছে এখন এটা না হলে ছাত্রদের মন ভেঙ্গে যাবে এবং আরেকবার আয়োজন করতে গেলে অনাহুত আর্থিক ক্ষতিও হবে।

আমি বলতে পারতাম সব কিছুর ব্যবস্থা তো আমার কাছে জিজ্ঞেস করে করা হয় নি। কিন্তু তা আর বলা হয় নি।

আমি তাদের সাথে অডিটরিয়ামে গেলাম এবং তাদের সাথেই ডায়াসে আসন নিলাম।

গভীর মনোযোগের সাথে একের পর এক ছাত্র ও শিক্ষকদের বক্তব্য শুনে গেলাম অনেক ক্ষণ ধরে। এই সব বক্তৃতায় কথার ফুলঝুরি যেমন ছিল আবার অনেক তথ্যবহুল ইতিহাসও বের হয়ে আসছিল। বক্তৃতার আক্ষরিক বক্তব্যকে ছাড়িয়ে একটি বিশেষ সুর ধ্বনিত হচ্ছিল দশ হাজার ছাত্র বিশিষ্ট এই ঐতিহ্যবাহী কলেজে আর্থিক দৈন্য কেন থাকবে?

কে বা কারা এর জন্যে দায়ী?

ছাত্র শিক্ষক কর্মচারীদের অগণিত সমস্যার সমাধান কোথায়?

নব নিযুক্ত অধ্যক্ষ হিসাবে এই সব প্রশ্নের জবাব আমাকেই দিতে হবে।

সম্বর্ধনার জবাবে আমি বললাম, লন্ডনে সেন্টস্টিফেন হাস্পাতালে আমার যখন চাকরি হয় তখন হাস্পাতালের গভর্নর আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন হাসপাতালের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ ব‍্যক্তিটির নাম কী? আমি হাসপাতালের অধ্যক্ষ বা গভর্নরের নাম করি নি, সেখানকার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক বা সার্জনের নামও করি নি। বলেছিলাম হাস্পাতালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির নাম রোগী। তেমনি এই কলেজের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মিনিস্টার মান্নান সাহেব নন, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ কিংবা অন্য কোনো শিক্ষক নন, কলেজের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির নাম ছাত্র।

ছাত্ররা সব এক জোটে হাত তালি দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আমি বললাম, দেখ, বক্তৃতা বা হাত তালিতে আমি বিশ্বাসী নই। আমি কথা দিচ্ছি কলেজের সার্বিক উন্নতির জন্যে, ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণ্যের জন্যে আমি এবং আমার শিক্ষক কর্মচারী সবাই মিলে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাব। কিন্তু তোমাদের কথা দিতে হবে তোমরা আমাদের সাথে ছাত্রসুলভ ব্যবহার করবে। আমি আমার হারানো ছেলেকে তোমাদের মাঝে খুঁজে পেতে চাই।

সম্বর্ধনায় বক্তাদের মুখেই জানতে পারলাম এই কলেজে ছাত্রদের মত শিক্ষকদের মধ্যেও দলাদলি ছিল এবং আছে।

১৯৬৬ সালে কলেজের তদানীন্তন ভিপি শাজাহান সিরাজকে রক্তাক্ত অবস্থায় কলেজের পুকুর পাড়ে ফেলে রাখার যে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল অনেকে মনে করেন শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলিই এর জন্যে দায়ী ছিল।

pukur-sadat-2

“১৯৬৬ সালে কলেজের তদানীন্তন ভিপি শাজাহান সিরাজকে রক্তাক্ত অবস্থায় কলেজের পুকুর পাড়ে ফেলে রাখার যে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল অনেকে মনে করেন শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলিই এর জন্যে দায়ী ছিল।”

ওই ঘটনার পর পরই প্রিন্সিপাল তোফায়েল আহমাদকে ১৭ বছর দায়িত্ব পালনের পর রাতের অন্ধকারে কলেজ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।

আমি বললাম, আমি এমন এক দেশ থেকে শিক্ষালাভ করে এসেছি যেখানে মতামতের স্বাধীনতাকে সম্মান করা হয়। তবে মত ও মতামতের স্বাধীনতাকে কোনো ক্রমেই এমন পর্যায়ে নামতে দেয়া হবে না যেখানে এহেন ঘৃণিত ও হীন ঘটনা ঘটতে পারে।

আমি এই বলে সবাইকে আশ্বস্ত করলাম অতীতের তিক্ত ঘটনাকে টেনে এনে বর্তমানকে বিষিয়ে তোলার ইচ্ছে আমার নাই। তবে অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে ঘটতে না পারে সেই দিকে আমাদের সবার সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

আমি সবাইকে এই বলে সতর্ক করে দিলাম, কলেজের সব সমস্যা এক দিনে সৃষ্টি হয় নি কাজেই আমার কাছ থেকে কুইক ফিক্স বা দ্রুত সমাধান আশা করলে তাদেরকে নিরাশ হতে হবে।

আমি আরো বললাম, যত দিন আমি সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকব ততদিন আমাকে সহযোগিতা করুন। আমি যদি ভুল করি আমাকে সতর্ক করুন, আপনাদের উপকারের জন্যে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। প্রিন্সিপাল তোফায়েল আহমাদের মত আমি রাতের অন্ধকারে পালাতে চাই না।

আমার মনে হলো সবাই আমার কথা পছন্দ করেছে। আমার বক্তৃতা শেষে অনেকেই এসে আমার সাথে হাত মিলালেন। ছাত্র-ছাত্রীরা দলে দলে আমার অফিসে এসে আশ্বাস দিল, তারা বহু দিন একজন পিতৃতুল্য অধ্যক্ষের অপেক্ষায় ছিল। এখন সেই অপেক্ষার অবসান হল।

অনেক দিন পর গত ফেব্রুয়ারিতে (২০১৬) ঢাকার এক আত্মীয়ার বাসায় কবি সাযযাদ কাদিরের সাথে দেখা। তিনিও আমার প্রথম দিনের বক্তৃতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। কবি সাযযাদ তখন সা’দত কলেজে বাংলার শিক্ষক ছিলেন।

প্রিন্সিপালের বাসাটি প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর চার দিকে দেয়াল ঘেরা বর্গাকৃতির একটি একতলা বিল্ডিং। বাসার ভিতরে কাঁঠাল পেয়ারা সহ অনেক রকম ফল ও ফুলের গাছ। বাসাটির দক্ষিণ দিকে টানা খোলা বারান্দা এবং হল ঘরে প্রবেশের জন্যে দরজা। পূর্ব দিকে বাসায় বসে কাজ করার জন্যে একটি অফিস ঘর এবং তার পাশেই একটি খাস কামরা। ভিতরের দিকে আরো তিনটি রুম। মাস্টারস বেড রুমের সাথে সংযুক্ত বাথরুম। পশ্চিম দিকে পাকঘর। পাকঘরের পাশেই চার দিকে পাকা করা একটি গভীর কূপ ও একটি নল কূপ। বাসার দক্ষিণ দিকের বাগানের পরেই একটি পুকর। পুকুরের পরেই মেয়েদের হোস্টেল। প্রাচীরের বাইরেই একটি শান বাঁধানো ঘাট। প্রিন্সিপালের বাসার পশ্চিম পার্শ্বে টিচার্স কলোনি এবং উত্তর দিকে হিন্দু হোস্টেল।

প্রিন্সিপালের বাসা ও হিন্দু হোস্টেলের মাঝখানে টেনিস ফিল্ড এবং তার পাশেই অতি সুন্দর একটি আটচালা পেভিলিয়ন যা প্রিন্সিপাল তোফায়েল আহমাদের শিল্পীমনের সাক্ষর বহন করে আছে।

বাসা থেকে বের হলেই প্রথমে কলেজ মাঠ এবং মাঠ পেরিয়ে প্রিন্সিপালের অফিস। অফিস পেরিয়ে আরেকটু পুব দিকে গেলে মুসলিম হোস্টেল। হোস্টেলের পাশেই কলেজের বিশাল দীঘি। দীঘির পাড়ে শান বাঁধানো ঘাট। এই ঘাটেই অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল তদানীন্তন ছাত্র সংসদের ভিপি শাজাহান সিরাজকে।

এমন সুন্দর পরিবেশ আর এমন কুৎসিত মন! কী করে সম্ভব? কী করে ঘটতে পারে এমন অমানবিক ঘটনা?

কলেজ বিল্ডিংটি একটি বিশাল দোতালা বিল্ডিং। নিচ তলায় মাঝখানে কলেজ লাইব্রেরি। তার ডানে বামে ক্লাসরুম। দোতলায় শিক্ষক কমন রুম এবং কলেজের পশ্চিম পাশে পেছনের দিকে ছাত্রদের কমন রুম।

কলেজ লাইব্রেরিটি ছিল খুবই সমৃদ্ধ। হাতের লেখা শাহনামা সহ বহু দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ছিল এই লাইব্রেরিতে।

টাঙ্গাইলের ভোলামিয়া সাহেব অন্ত্যন্ত দক্ষতার সাথে লাইব্রেরিটি পরিচালনা করেছেন বহুদিন।

কলেজের ঠিক সামনেই একটি চমৎকার ফুলের বাগান ও বোটানিক্যাল গার্ডেন। এখানে অনেক দুর্লভ গাছের চারা ও মেডিসিনাল প্ল্যান্ট ছিল। বাগানটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন বোটানির বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর আখতার হোসেন ও তারই সুযোগ্য ছাত্র ও সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

১৯৬৬ সাল থেকে সা’দত কলেজে বাংলায় অনার্স কোর্স চালু ছিল। অধ্যাপক খলিলুর রহমান সাহেব বাংলার বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। এই সময়ে তিনি বাংলাদেশ বেসরকারী কলেজ শিক্ষক সমিতির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছিলেন। আমি জয়েন করার আগেই এই কলেজে ইকনমিকসেও অনার্স খোলা হয় এবং আমি থাকতে থাকতেই বাংলায় মাস্টার্স খোলা হয়।

এই সময়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক মীর সোহরাব আলী, সাযযাদ কাদির, জৌশন খান ও মাহবুব সাদিক, তাফাজ্জল হোসেন প্রমুখ।

ইকনমিকসের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন আবদুল মোমেন, সাইফুল ইসলাম, জালাল উদ্দিন, হারিসুল ইসলাম প্রমুখ। শিক্ষকদের মধ্যে আরো যাদের নাম মনে আছে তাদের মধ্যে আছেন সামসুল আলম (পদার্থ বিজ্ঞান), সোহরাব হাসান (পদার্থ বিজ্ঞান), আবদুল মজিদ, আলী নোয়াব (পদার্থ বিজ্ঞান), সোহরাব হোসেন (অংক), ওয়াহিদুজ জমান (অংক), শিব প্রসাদ দেব (ইংরেজি), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম, এ খান, আখতারুজ জমান ও এম ইউ খান। জীববিজ্ঞান বিভাগে ত্যাজেন্দ্র কুমার, আবদুল জলিল, রসায়ন বিভাগে সুবাস দেবনাথ, তোজাম্মেল হক ও মনজুর আলী। দর্শন বিভাগে মুস্ফিকুর রহমান ও আবদুস সাকুর। কমার্স ফ্যাকাল্টিতে প্রফেসর আব্দুর রঊফ, এ পি নিয়োগী, রঞ্জিত কান্ত সরকার ও দেওয়ান আব্দুর রাজ্জাক। এছাড়া রয়েছেন ওয়াজেদ আলী খান (ইতিহাস), আবদুল মালেক (আরবি), জনাব আলী (ফিজিক্যাল এডুকেশন)।

করটিয়া সাদাত কলেজের শিক্ষার মান সম্পর্কে প্রবাদ ছিল যে এই কলেজের বারান্দা দিয়ে হাঁটা আর অন্যান্য কলেজের ভাল ছাত্র হওয়া সমান কথা।

কিন্তু স্বাধীনতার আগে ও পরে ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে শিক্ষার মান দ্রুত নিচের দিকে যাচ্ছিল।

(কিস্তি ২)

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।