করটিয়া কলেজে চার বছর (২)

শেয়ার করুন!

আগের কিস্তি

৫.

স্বাধীনতার আগে করটিয়া কলেজের একটি ডিগ্রী পরীক্ষা ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিল নকলের দাবিতে। ছাত্ররা স্লোগান দিয়েছিল এবং ডিসি ও পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছিল শিক্ষকদের পরিবর্তে সেনাবাহিনী দিয়ে পরীক্ষায় গার্ড দেওয়া হউক।

স্বাধীনতার পর গঠিত তদন্ত কমিটি এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে এমন লোকও আছেন যারা ছাত্রদের ওপর সেনাবাহিনীর তুলনায় বেশি লাঞ্ছনাদায়ক। প্রকৃত পক্ষে ছাত্রদের এই দাবিটি ছিল একটি পলিটিক্যাল মেন্যুভারিং। তারা আসলে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা দিতে চায় নি, চেয়েছিল নকল ধরা শিথিল করতে।

আমার যতটুকু মনে পড়ছে ১৯৭৩ সালের প্রথমার্ধে যে ডিগ্রি পরীক্ষাটি হয়েছিল সে পরীক্ষার ছাত্ররা হল ছেড়ে বের হয়ে এসেছিল নকলের দাবিতে। এবার তাদের যুক্তি ছিল সংসদ নির্বাচনে যদি ভোট নকল হতে পারে তাহলে পরীক্ষার হলে নকল হলে দোষ কী?

ছাত্রদের প্রতি পরীক্ষার হলে নমনীয় ব্যবহার করার জন্যে আমি শিক্ষকদের অনুরোধ করেছিলাম। টাঙ্গাইল থেকে আগত ম্যাজিস্ট্রেটদেরকেও এই মর্মে অনুরোধ করেছিলাম যে আমার সাথে আলাপ না করে যেন কোনো পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা না হয়।

কলেজের গেট।
কলেজের গেট।

টাঙ্গাইলের তদানীন্তন ডিসি ড. শাহ মোহাম্মদ ফরিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সিনিয়র সহকর্মী ছিলেন। সেই সুবাদে অনুরোধ করেছিলাম আমার ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার জন্যে। কোনো দিক থেকেই সহযোগিতার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু ছাত্রদের দাবি ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি।

আমার কাছে মনে হয়েছে যে তাদের দাবিটি ছিল আসলে নকলের স্বাধীনতার দাবি। অর্থাৎ পরীক্ষার হলে প্রক্টরদের দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্রদের স্বাধীন ভাবে নকলের সুবিধা করে দেওয়া। এমন কি ছাত্ররা যেন অবাধে প্রশ্নপত্র বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারে এবং বাইরে থেকে উত্তরপত্র ভিতরে আসতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করাও প্রক্টর এবং পরীক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব।

বলা বাহুল্য আমরা তখনো এত অ্যাডভান্স মননশীলতায় অভ্যস্ত হই নি। এমনকি এখনো যে সব দেশে কিংবা অত্যাধুনিক ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষার হলে ছাত্ররা বই খুলে লিখতে পারে সেখানেও বাইরে থেকে নকল সাপ্লাই দেওয়ার অনুমতি নাই। আমরাও সে অনুমতি দিতে পারি নি। তাছাড়া বই খুলে লেখার অনুমতির জন্যে সেই ভাবে প্রশ্নপত্র তৈরিও করা হয় নি। এমতাবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিদর্শক টিম এল এবং হাতে নাতে এক ছাত্রকে নকল সহ ধরে আমার কাছে নিয়ে আসল।

আমরা এই ছাত্র সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেব তা ঠিক করার আগেই ছাত্ররা একযোগে হল ছেড়ে বের হয়ে এল, তারা পরীক্ষা দেবে না। দুই ঘণ্টা যাবৎ আমি নিজে এবং প্রবীণ নবীন সব শিক্ষকগণ মিলে ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝাবার বৃথা চেষ্টা করলাম, বেশির ভাগ ছাত্রদেরকে আর পরীক্ষায় বসাতে পারলাম না।

প্রফেসর খলিলুর রহমান ও আরো কিছু শিক্ষক ছাত্রদের পিছু পিছু বাস স্টেশন পর্যন্ত গিয়ে তাদেরকে বাস থেকে টেনে নামাবার চেষ্টা করেছেন, কোলে করে আনবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পরীক্ষা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের এতই প্রবল যে তারা আর ফিরে আসল না।

পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে যারা, মাত্র এক বছরের মাথায় তারাই আন্দোলন করছে নকলের স্বাধীনতার জন্যে, এটাই কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এরাই সেই সব ছাত্র যারা শিক্ষকদের তুলনায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা দিতে অধিকতর আগ্রহী?

নকলের দাবি সর্বজনীন এ কথা আমি সেদিনও বিশ্বাস করি নি আজও করি না। মুষ্টিমেয় কিছু ছেলেপিলে নিজেদের অন্যায় আবদারকে সর্বজনীন বলে চালিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে। তাদের ধারণা ছিল সব ছাত্র পরীক্ষা না দিয়ে বের হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ আবার পরীক্ষা নিতে বাধ্য হবে।

কিন্তু আমরা এ কথা পরিষ্কার করে বলে দিয়েছিলাম যে যারা পরীক্ষা বর্জন করবে কোনো ক্রমেই তাদের পরীক্ষা আবার নেওয়া হবে না। দ্বিতীয়তঃ এ সব ছাত্রদেরকে সা’দত কলেজের মাধ্যমে কখনো প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসাবেও পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবে না।

এই প্রচারনার ফলে বেশ কাজ হয়েছিল। পরের দিনের পরীক্ষায় বেশ কিছু ছাত্র ফিরে এসেছিল এবং যথারীতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল।

এই সময় একদিন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এসেছিলেন পরীক্ষা দেখতে। তিনি এই কলেজেরই ছাত্র ছিলেন। শিক্ষকদের প্রায় সবাইকেই তিনি চেনেন। ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই কাদেরীয়া বাহিনীর অন্তর্গত মুক্তিযোদ্ধা ছিল।

ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু মিয়াকে তিনি যুদ্ধের সময় দেলদুয়ার ক্যাম্পে বেশ কিছু দিন আটক রেখেছিলেন। তিনি কাউকে কিছুই না বলে সোজা পরীক্ষার হলের দিকে পা বাড়ালেন। ওনার সাথে আরও দুজন বডিগার্ডও রয়েছেন। পরীক্ষা কমিটির একজন শিক্ষক এ ব্যাপারে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। আমি এর আগে কাদের সিদ্দিকীর সাথে পরিচিত ছিলাম না। আমি এগিয়ে গিয়ে ওনাকে আমার পরিচয় দিলাম এবং অধ্যক্ষের অফিসে আসার জন্যে অনুরোধ করলাম।

উনি অনুরোধ রক্ষা করলেন এবং কিছুক্ষণ পর আমিসহ পরীক্ষার হল ঘুরে ঘুরে দেখলেন। এর পরেও কাদের সিদ্দিকীর সাথে আমার আরেকবার দেখা হয়েছিল। সেবার তিনি নিজে ড্রাইভ করে ওনার নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত আউলিয়াবাদ কলেজ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

আমি সা’দত কলেজে থাকাকালীন সময়ে কলেজ গভর্নিং বডিতে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকীর বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীও ছিলেন। তিনি তখন কালিহাতি থানা থেকে আওয়ামী লীগের এমপি। নিজ গ্রামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। কলেজের সব ছাত্রের জন্যে বিনা খরচে হোস্টেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল ওখানে। কলেজের আশে পাশের এবং পাশ্ববর্তী গ্রামের কিছু জমিতে ইরি ধান চাষ করা হত এবং লাভের টাকা দিয়ে কলেজ ও হোস্টেলের খরচ চলত।

কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে এই গ্রামের নাম ছিল ভণ্ডেশ্বর। পরে এর নামকরণ করা হয় আউলিয়াবাদ। এই কলেজ দেখার জন্যে তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজ গ্রামে। দেখে আমি অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলাম এবং বাংলাদেশের সকল অঞ্চলে এমন মহৎ উদ্যোগের অপেক্ষায় ছিলাম। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর লতিফ সিদ্দিকী যখন জেলে ছিলেন তখন কলেজের বিরুদ্ধবাদী কিছু লোক ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে লিখেছিল কলেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যে। আমার শিক্ষক ড. খলিলুর রহমান সাহেব তখনও বোর্ডের চেয়ারম্যান। আমি অনুরোধ করেছিলাম কলেজটির  যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখার জন্যে। স্যার আমাকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিলেন।

latif-s-and-k-s
দুই মুক্তিযোদ্ধা ভাই—বামে লতিফ সিদ্দিকী, ডানে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

লতিফ সিদ্দিকীর বাবা আব্দুল আলী মোক্তার সাহেব এসেছিলেন একবার ইকনমিক্স অনার্স কোর্সে এক ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে।  ভর্তির জন্যে আমরা যে নিম্নতম যোগ্যতা ঠিক করে দিয়েছিলাম এই ছেলেটি তার মধ্যে পড়ে না। আমি তাই মোক্তার সাহেবকে আমার অপারগতা জানালাম।

তিনি বললেন, ছেলেরা যখন প্রিন্সিপালের বাসায় এসে ককটেল মারবে তখন আর আমাদের সুপারিশ লাগবে না এমনিতেই ভর্তি হয়ে যাবে।

আমি বললাম, ককটেলের দরকার কী? আপনার ছেলেই তো গভর্নিং বডির মেম্বার, তাকেই বলুন না কেন?

এ ব্যাপারে জনাব সিদ্দিকী কখনোই আমাকে কিছু বলেন নি, কোনো ছাত্রও ইট পাটকেল নিয়ে আসে নি।

সা’দত কলেজ পরিচালনা পরিষদে আরও যারা ছিলেন তাদের মধ্যে নাগরপুরের এম পি হুমায়ুন খালেদ, মির্জাপুরের এম পি ফারুক সাহেব, টাঙ্গাইলের এম পি সামসুর রহমান শাহজাহান, তোফাজ্জল হোসেন প্রমুখের কথা মনে পড়ছে। এরা সবাই সা’দত কলেজের ছাত্র ছিলেন। লতিফ সিদ্দিকী ছাত্র সংসদের ভিপিও ছিলেন।

আমার সময়ে ছাত্রদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল জাসদপন্থী। ছাত্র সংসদের ভিপি, জিএস সহ বেশির ভাগ সদস্যই ছিল জাসদপন্থী। শিক্ষকদের মধ্যেও অনেকে জাসদপন্থী ছিলেন। বোটানির প্রফেসর আখতার হোসেন সাহেব জাসদের টিকিটে জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন।

সকল রাজনৈতিক দলের কাছেই আমার গ্রহণযোগ্যতা ছিল কারণ আমি নিরপেক্ষ ছিলাম। তাছাড়া আমি দায়িত্ব গ্রহণের আগে কলেজের যে অরাজক অবস্থা ছিল সে অবস্থায় আর কেউ ফিরে যেতে চায় নি। ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু মিয়া সম্পর্কে একটা ভীতিও আমার সপক্ষে কাজ করেছিল। অনেকেই মনে করতেন ওই কলেজে প্রিন্সিপাল এসে থাকতে না পারার কারণ হচ্ছে ভাইস প্রিন্সিপালের উচ্চাভিলাষ। কেউ কেউ মনে করতেন ভাইস প্রিন্সিপালের ভাইস শব্দটি শাব্দিক অর্থেই সত্যি। কিন্তু তিনি আমাকে তাড়াতে চেয়েছেন বলে আমার কখনো মনে হয় নি।

একবার মিনিস্টার সাহেবের মিন্টু রোডের বাসায় পরিচালনা পরিষদের সভা শেষে রূপসী বাংলার সামনে এসে ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব আমার হাত চেপে ধরেছিলেন। মিটিং চলাকালীন সময়ে কথা প্রসঙ্গে মিনিস্টার সাহেব ভাইস প্রিন্সিপালকে এই মর্মে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন যে তিনি যদি তার স্বভাব না পাল্টান তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে না।

Panni_hall
ওয়াজেদ আলী খান পন্নী হল।

তিনি ধরে নিয়েছিলেন মিনিস্টার সাহেব সম্ভবতঃ তাকে কলেজ থেকে বাদ দেওয়ার কথা চিন্তা করছেন। আমাকে বললেন, তিনি আমার জন্যে একটি মজবুত খুঁটি হিসাবে কাজ করছেন। ওনাকে সরিয়ে দিলে আমি একটি নির্ভরযোগ্য সাপোর্ট হারাবো।

আমি ওনাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলাম যে আমার তরফ থেকে ওনার কোনো ভয় নাই। আমার তখন মনে হয়েছিল উনি কলেজে না থাকলে অন্যান্য সিনিয়র প্রফেসরগণ উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠবেন, প্রাইভেট কলেজে এটাই স্বাভাবিক।

 

৬.

অপেক্ষাকৃত জুনিয়র শিক্ষকগণ আমাকে অন্ধভাবে ভালবাসতেন। রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যে কোনো সময় ডাকলেই তারা এসে হাজির এবং যে কোনো কাজ করার জন্যে প্রস্তুত। এইসব শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় আমি একটা কো-অপারেটিভ শপ খুলেছিলাম করটিয়া কলেজে। দোকানটি কলেজ ও কলেজের ছাত্রদের জন্যে খুবই উপকারে এসেছিল।

ঢাকা চক বাজার বাবু বাজার ও টিসিবি (Trading Corporation of Bangladesh) থেকে আমাদের দোকানের জিনিসপত্র আসতো। তাছাড়া আমাদের দোকানের জন্যে ভাড়া কিংবা কর্মচারীদের বেতন বাবদ কোনো খরচ নাই, অপচয় নাই। ফলে আমরা করটিয়া বাজারের তুলনায় অনেক শস্তায় জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারতাম। তাছাড়া বাজার থেকে জিনিস আনার ক্ষেত্রে যে সিস্টেম লস হত সেটা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল কো-অপারেটিভ খোলার ফলে।

স্বাধীনতার পর পর বাংলাদেশে অন্যান্য জিনিসের সাথে সাথে কাপড়ের অভাব ছিল চরমে। লোকমুখে শুনেছি এবং খবরের কাগজে দেখেছি রোজই কাফনের কাপড় চুরির খবর।

বুলবুল ঘরে পরার জন্যে দু এক খানা কাপড় রেখে প্রায় সবই দিয়ে দিয়েছিল ভিক্ষুকদের। কারণ তাদের লজ্জা নিবারণ করা ছিল একেবারেই দুঃসাধ্য। বহু ভিক্ষুক ছালা পরিহিত অবস্থায় ভিক্ষা করতে আসত। এমনি এক ছালা পরিহিত হিন্দু ভিক্ষুক প্রায়ই আসত আমাদের বাসায়। এসে মা জননীকে ডেকে বলত, মাগো, পেটে ভাত না থাকলে কেউ দেখে না কিন্তু পরনে কাপড় না থাকলে জঙ্গলে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। বুলবুল তাকেও এক খানা শাড়ি দিয়ে দিয়েছিল ধুতি আকারে পরার জন্যে।

এমনি এক দুঃসময়ে তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকার জেলা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে কাপড় বিতরণ শুরু করেছিল। এই কার্যক্রম করটিয়া কলেজে আমার যোগদানের আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু কলেজের ছাত্রদের জন্যে ভিন্ন ভাবে কিছু বরাদ্দ পাওয়ার কথা কেউ চিন্তা করে নি। আমি ব্যাপারটা ডেপুটি কমিশনার শাহ ফরিদকে জানালাম। তিনি আমাকে এ সংক্রান্ত পরবর্তী সভায় উপস্থিত থাকার জন্যে বললেন। শীঘ্রই বৈঠক বসল এবং আমিও উপস্থিত হলাম। বৈঠকে ডিসি সাহেব সা’দত কলেজকে কিছু বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন।

কমিটিতে উপস্থিত এক মুক্তিযোদ্ধা তখন ডিসির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল, “আপনি জানেন ওই চেয়ারে আপনাকে কে বসিয়েছে? আমরা বসিয়েছি। কাজেই আমরা যা বলব এবং যেই ভাবে বলব, ঠিক সেইভাবে আপনাকে চলতে হবে।”

এই কথার প্রতি উত্তরে ডিসি সাহেব আর কিছু না বলে আমাকে নিচু গলায় বললেন, “এ যাত্রা আর আপনাকে কিছু দেওয়া গেল না, তবে শীঘ্রই আপনার জন্যে ব্যবস্থা করব।”

তিনি কথা রেখেছিলেন। খুব শীঘ্রই আমরা পর পর দুই লট কাপড় পেয়েছিলাম। প্রতিবারেই আমরা যা আশা করেছিলাম, তার চেয়ে ঢের বেশি বরাদ্দ করা হয়েছিল।

নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ছাত্র বেতন বাবদ আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। অথচ শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ওই সময় দিতে না পারলেও বাকির খাতায় জমা হচ্ছিল এবং কলেজের দেনা দিনে দিনে বাড়তে ছিল। যুদ্ধোত্তর কালে এই বকেয়া বেতন ওঠানো ছিল নৈতিকতার পরিপন্থী এবং প্রশাসনিক দিক থেকে অবাস্তব।

শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করে আমি নিয়ম করে দিলাম যে কাপড় পাওয়ার জন্যে ছাত্রদের কমপক্ষে এক মাসের বেতন দিতে হবে এবং শিক্ষক কর্মচারীরা কাপড় পাবেন তাদের বকেয়া বেতনের বিপরীতে।

ছাত্র শিক্ষক কর্মচারী সবাই খুশি হয়েছিল এই সিদ্ধান্তের ফলে। দুই লট কাপড় বিতরণের সাথে সাথে কম পক্ষে দুই মাসের ছাত্র বেতন উসুল হয়ে গেল, টাকার অংকে তা তিন লক্ষ টাকার চেয়েও বেশি।

কলেজের আর্থিক দুর্গতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম এই অবকাশে। কাপড় বিতরণের সমস্ত দায়িত্ব বহন করেছে কলেজ কো-অপারেটিভ সোসাইটি। নিঃস্বার্থ সেবার এমন দৃষ্টান্ত খুবই বিরল।

 

৭.

প্রিন্সিপালের বাস ভবনে বুলবুল, আমি ও বাচ্চু ছাড়াও দেলু ও হীরা থাকত দুটি রুমে। দেলু লন্ডন তাজমহল হোটেলের মালিক আশরাফ সাহেবের ছোট ভাই আর হীরা বুলবুলের ছোট ভাই। হীরা তখন ইকনমিকস অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র আর দেলু মেট্রিক পরীক্ষার্থী। দেলু থাকত বাসায় ঢুকবার পথে ডান দিকের একটি রুমে যেটা আগে প্রিন্সিপালের খাস কামরা হিসাবে ব্যবহার করা হত।

একদিন হীরা চলে গেছে ঢাকায়। বাসার বাবুর্চি বারেক ও বয় বীরু খাওয়া-দাওয়ার পর বাড়ির ভিতরের দরজা ও বাইরের গেইট বন্ধ করে চলে গেছে নিজ নিজ বাড়িতে।

রাত দুইটার দিকে হঠাৎ দেলুর কান্না শুনতে পাই, ঠিক কান্না নয় একটা চাপা গোঙানির মতো। আমরা দুজনেই তাড়াতাড়ি উঠলাম এবং দ্রুতবেগে দেলুর রুমের দিকে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখি দেলু হাত পা বাঁধা অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে এবং অচেতন অবস্থায় ভাইও ভাইও করে কান্নার শব্দ করছে। বিদ্যুতের তার দিয়ে হাত পা বাঁধা এবং মুখে সেলু ট্যাপ লাগানো।

আমি তাড়াতাড়ি ওর হাতের বাঁধন ছুরি দিয়ে কেটে দিলাম এবং মুখের সেলু ট্যাপ ওঠায়ে নেওয়ার পর কাঁপতে কাঁপতে প্রথম যে কথাটি ওর মুখ থেকে বের হয়ে এল তা হচ্ছে—ভাই আপনি এখানে থাকবেন না, ওরা আপনাকে মেরে ফেলবে।

দেলুর কাছে পরে শুনেছি সন্ত্রাসীরা প্রথমে এসে দেলুকে নির্দেশ দেয় আমাকে ডেকে দেওয়ার জন্যে। দেলু তাদের কথা মত আমাকে না ডাকার ফলে সমস্ত রোষ তখন ওর ওপরে গড়ায়। তাদের অত্যাচারে ও ভয়ে দেলুর কাপড় চোপর নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

১৯৭০ সালে স্ত্রী সুলতানা রুশদীর সঙ্গে।
১৯৭০ সালে স্ত্রী সুলতানা রুশদীর সঙ্গে।

আমি তখন বাসার গেইট খুলে বাইরে আসি এবং নাইট গার্ডদের নাম ধরে ডাক দেই। চার জন নাইট গার্ডের সবাই এসে হাজির। আমি তাদেরকে নিয়েই অফিসে গেলাম এবং এক্সচেন্জের মাধ্যমে থানার সাথে যোগাযোগ করলাম।

ইতিমধ্যে খবর পেয়ে কয়েকজন শিক্ষকও এসেছেন আমার সাথে দেখা করতে। যথারীতি বিভিন্ন রকম থিওরির জন্ম হতে লাগল, কী কারণে সন্ত্রাসীরা আমার বাসায় এসেছিল। কারও মতে এটা ছিল নিতান্তই একটা ডাকাতির উদ্দেশ্যে আক্রমণ। আবার কারো কারো মতে আমাকে মারার জন্যেই এসেছিল তারা।

কেন তারা আমাকে মারবে? আমি তো কোনো অন্যায়কারী নই। বলা হল, মার্ক্সবাদী লেলিনবাদীদের কিংবা সিরাজ শিকদারের লোকদের হাতে মৃত্যুর জন্যে সমাজের দুষ্ট লোক হওয়ার দরকার নেই। সমাজের নামকরা একজন হলেই হল। তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে আতঙ্কের সৃষ্টি করা।

মাত্র কয়েকদিন আগেই করটিয়া বাজারের অদূরে আজিজ সাহেব নামে এক ব্যক্তিকে খুন করা হয়। অনেকের ধারণা সিরাজ শিকদারের লোকেরাই তাকে মেরেছে।

আজিজ সাহেবও ভাল লোক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। কেউ কেউ অবশ্য এমনও মন্তব্য করলেন, কলেজের যে গ্রুপটি বাইরে থেকে প্রিন্সিপাল আনবার বিরোধী এটা তাদেরই কাজ।

আমার মনে হল, আমাকে মারতেই যদি তাদের আগমন তাহলে দরজা ভেঙেও তারা আমার রুমে ঢুকতে পারত, কিংবা আমি যখন অফিসে গেলাম তখনো মারতে পারত। আর যাই হোক এটা আমাকে মারার উদ্দেশ্যে করা হয় নি বলে মনে হল। একটা থিওরি অবশ্য এমনও আছে যে এদের আসল উদ্দেশ্য ছিল আমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া, অদূর ভবিষ্যতে তারা একটা কিছু ঘটাতে যাচ্ছে তখন যেন আমি বেশি সাহসী ভূমিকা না নিতে পারি।

পরদিন খবর পেয়ে ডিসি সাহেব ও এস পি সাহেব দুজনেই দেখা করতে আসলেন। তাদের নির্দেশে ওইদিন থেকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ছয় জন পুলিশের একটি দল রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা আমার বাসা পাহাড়া দেবে বলে সাব্যস্ত হল।

(কিস্তি ৩)

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

SHARE
Previous articleমাছ, রেড মিট নাকি চিকেন — শিশুর জন্যে কোনটা?
Next articleব্যাকআপ প্ল্যান—লক্ষ্য অর্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে!
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here