কলা

যে ফলগুলি বেশি খাওয়া হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো কলা। খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন প্রাকৃতিক খাদ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর খাদ্য হচ্ছে কলা।  এখনকার জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চরিত্র মিনিয়নদেরও প্রিয় ফল কলা। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে কলা একটা সুপার ফুড। কলায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও পুষ্টি-উপাদান থাকে। তাছাড়া কলা নিয়ে রয়েছে অনেক অদ্ভুত ঘটনা, বিচিত্র বিশ্বাস।

প্রথম ধাপ: কলা শক্ত এবং সবুজ থাকতেই গাছ থেকে কেটে নেয়া হয়। 

১. কলা প্রাকৃতিক ভাবেই তেজষ্ক্রিয় হয়। কারণ কলা তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি পটাশিয়াম সমৃদ্ধ। বিশেষ করে কলায় রয়েছে পটাশিয়াম-৪০; পটাশিয়াম-৪০ একটি তেজষ্ক্রিয় আইসোটোপ (আইসোটোপ হল একই মৌলিক পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু যাদের পারমাণবিক সংখ্যা একই তবে নিউক্লিয়াসে নিউট্রনের সংখ্যা ভিন্ন। – উইকিপিডিয়া)।

২. বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত সকল কলাগাছই একটি অন্যটির নিখুঁত ক্লোন এবং প্রায় অধিকাংশ গাছই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি মাত্র চারা থেকে উৎপাদিত। এর ফলে সারা বিশ্বে একই সাথে অতি অল্প সময়ে কলা উৎপাদন সম্ভব হয়।

৩. ক্যাভেন্ডিস ও গ্রস মাইকেল কলার দুটি জাত। বাণিজ্যিকভাবে ক্যাভেন্ডিশ (cavendish) উৎপাদনের আগে গ্রস মাইকেল (gros michel) ছিল কলার রাজা। ক্যাভেন্ডিশের মতোই গ্রস মাইকেলের চারাগুলি একটি অন্যটির নিখুঁত ক্লোন ছিলো। এবং বিশ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত এক ধরনের ফাঙ্গাসের আক্রমণে তারা নির্মূল হয়েছিলো। এই ফাঙ্গাসটি বর্তমানে ক্যাভেন্ডিশের জন্যও হুমকিস্বরূপ।

আকারে বড় হওয়ায় গ্রস মাইকেল ছিল ক্যাভেন্ডিশের চেয়েও জনপ্রিয়, ফলে পরিবহনেও সহজ ছিল। গ্রস মাইকেল ছিল ক্যাভেন্ডিশের চেয়েও সুস্বাদু। ক্যাভেন্ডিস কলার নামকরণ হয়েছে

রেড বানানা

দ্বিতীয় ধাপ: কলা পাকার শুরুতে  সবুজ থেকে হালকা হলুদ রঙ নেয়। শক্ত বলে এ কলা খাওয়া যায় না।

৪. পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ১০০০ ভিন্ন ভিন্ন জাতের কলাগাছ আছে, কিন্তু বেশিরভাগই চাষের অনুপযুক্ত। তাই গ্রস মাইকেল নির্মূল হয়ে যাওয়ার পর ক্যাভেন্ডিশের জায়গায় অন্য কোন জাতের কলা স্থান পায় নি।

৫. কোথাও কোথাও গোল্ডফিঙ্গার (goldfinger) জাতের কলা চাষ হয়, কিন্তু এই কলার স্বাদ কিছুটা আপেলের মতো। গোল্ডফিঙ্গার কলা এক ধরনের হাইব্রিড জাতের কলা। ফিলিপ রো নামে এক ব্যক্তি এই হাইব্রিড জাতটি উদ্ভাবন করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশ ছাড়া অন্য কোথাও এটা ব্যবসায়িক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

তৃতীয় ধাপ: কলা পুরোপুরি পাকতে শুরু করে এবং মিষ্টতা বাড়ে। নরম হতে থাকে এবং হলুদ হয়ে যায়।

৬. সারা বিশ্বে মানুষ প্রতিবছর ১০০ বিলিয়নেরও বেশি কলা খায়। তাই কলা বর্তমানে গম, ধান আর ভুট্টার পরেই চতুর্থ কৃষিজাত পণ্য।

৭. আমেরিকার মানুষ অন্য যে কোন ফলের চেয়ে কলা বেশি খায়। এরা প্রত্যেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৬ পাউন্ডের বেশি কলা খায়। এদের কলা খাওয়ার পরিমাণ আপেল আর কমলা খাওয়ার মোট পরিমাণের থেকেও অনেক বেশি।

৮. কলা খাওয়ার বেলায় উগান্ডার মানুষ সবচেয়ে এগিয়ে। এরা প্রত্যেকে বছরে প্রায় ৫০০ পাউন্ড কলা খেয়ে থাকে।

চতুর্থ ধাপ: কলা প্রায় পুরাই হলুদ রঙ নিয়ে নেয় আর মিষ্টি হতে থাকে। এ সময় কলা খাওয়ার প্রায় উপযুক্ত হয়।

৯. কলা অন্যান্য ফলের মতো গাছে ধরে না, বরং কলা গাছের গোড়া থেকে একটা কাণ্ড বের হয় যেখানে কলা ধরে। কলাগাছ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একবর্ষজীবী ঔষধি উদ্ভিদ।

কলা পাকার বিভিন্ন পর্যায়

১০. মজার বিষয় হচ্ছে যে কলাগাছ ঔষধি উদ্ভিদ হলেও কলা একটি ফল।

পঞ্চম ধাপ: সবুজ বোঁটাযুক্ত হলুদ কলা খাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো। এই সময়ের কলা সুস্বাদু হয় বটে কিন্তু সবচেয়ে মিষ্ট হয় না।

১১. মুহূর্তেই আপনি মন প্রফুল্ল করতে পারেন একটি কলা খেয়ে। ফলের মধ্যে একমাত্র কলায় আছে এক বিশেষ ধরনের অ্যামিনো এসিড এবং ভিটামিন বি-৬ যা মানসিক চাপ কমিয়ে আপনার মনকে করবে চনমনে। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে আর ঘুম থেকে উঠার পর একটা করে কলা খেলে ক্লান্তি লাগার সমস্যা আর থাকে না।

১২. কলাতে ফ্যাট, কোলেস্টেরল বা সোডিয়াম নাই।

ষষ্ঠ ধাপ: সম্পূর্ণ হলুদ কলা সবচেয়ে মিষ্টি আর নরম হয়। এর পর কলা নষ্ট হতে শুরু করে।

১৩. প্রাকৃতিক খাদ্যের মধ্যে কলা একটি অন্যতম স্বাস্থ্যকর খাদ্য। কলায় রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন বি-৬ এবং পটাশিয়ামসহ অন্যান্য ভিটামিন (এ, বি-১, বি-২, সি, ই, কে), ফাইবার ও খনিজ পদার্থ। কলার একটি অনন্য গুণ হচ্ছে এতে ক্যালরির পরিমাণ খুব কম। বিশ্ব খাদ্যসংস্থার মতে কলা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।

ইংল্যান্ডের ডেভনশায়ার শহরের ষষ্ঠ ডিউক উইলিয়াম জর্জ স্পেনসার ক্যাভেন্ডিসের (১৭৯০-১৮৫৮; ছবি. ২৯ অক্টোবর ১৮৫২) সম্মানে ক্যাভেন্ডিস কলার নামকরণ হয়। উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিসের হটহাউজ থেকেই প্রথম এ জাতের কলার

১৪. যেসব রাষ্ট্র তাদের শুরুর দিকে বড় কলা কোম্পানি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত তাদেরকে ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ বলা হয়। এইসব কলা কোম্পানিগুলি সেখানকার স্বৈরশাসকদের সহায়তা করত। বিনিময়ে সেই স্বৈরশাসকরা কলা কোম্পানিকে রক্ষা করত; এবং সেই দেশগুলির প্রধান ফসল এবং সম্পদ তাদের জন্য নিশ্চিত করতো।

১৫. জাহাজে বা নৌকায় কলা পরিবহণ করাকে দুর্ভাগ্যের লক্ষণ হিসাবে দেখা হয়। এটা মূলত নাবিকদের কুসংস্কার। তবে এর সত্যিকার কারণটি স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ বলে কলা বহনকারী জাহাজকে খুব দ্রুত যেতে হয় যাতে কলা নষ্ট হয়ে না যায়, একারণে তারা মাছ ধরতে পারে না। আবার কেউ কেউ বলে পাকা ফল থেকে মিথেন গ্যাস নির্গত হয় এবং এতে জাহাজে থাকা মানুষজন মারা যেতে পারে।

এখনই পড়ুন: বিশ্ব খাদ্যসংকট মোকাবেলায় জিন প্রযুক্তির কলা নিয়ে বিল গেটস

১৬. সাধারণভাবে অন্যান্য ফলের মত কলা থেকে কলার রস বের করা সম্ভব নয়। যদিও কলার মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই পানি, তবু কলা থেকে কলার রস বের করতে হলে পারমাণবিক বিজ্ঞানের প্রয়োজন। কলার আণবিক গঠনের কারণে কলা থেকে কলার জুস আলাদা করা যায় না। সাধারণত কলার যেসব জুস দেখা যায় সেগুলি ব্লেন্ড করা কলা, সত্যিকার কলার জুস নয়। ভারতের পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা কলার জুস আলাদা করার উপায় বের করার চেষ্টা করছেন।

১৭.পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কলা উৎপাদনকারী দেশ হলো ভারত। এরপরে রয়েছে ব্রাজিল। কলা উৎপাদনকারী দেশগুলিতে কলার জাত হিসাবে ক্যাভেন্ডিশ প্রধান হলেও সেখানে প্রচুর জাতের কলা আছে। ব্রাজিলে যেকোনো কলা-চাষীর কাছে কমপক্ষে ছয় জাতের কলা পাওয়া যাবে: বেবি ব্যানানা, প্ল্যানটেইনস, পার্পল ব্যানানা, অ্যাপল ব্যানানা, সিলভার ব্যানানা এবং আরো অনেক রকমের।

সপ্তম ধাপ: এ পর্যায়ে কলার গায়ে বাদামি দাগ পড়তে শুরু করে আর এত নরম হয় যে একে সহজেই ভর্তা করে ফেলা যায়।

 

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

দ্বীনা মাহজাবিন
দ্বীনা মাহজাবিন

Leave a Reply