page contents
Breaking News

কাজুও ইশিগুরো’র ছোটগল্প—আ ভিলেজ আফটার ডার্ক

২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল জয়ী ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো’র জন্ম ১৯৫৪ সালে জাপানের নাগাসাকিতে। তার বয়স যখন ৫ বছর, তখন তার পরিবার ইংল্যান্ডে চলে আসে। ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাংলিয়া থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে মাস্টার্স করা এ লেখকের প্রথম উপন্যাস ‘আ পেইল ভিউ অফ হিলস’ বের হয় ১৯৮২ সালে।

তার প্রথম দুই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট জাপানে হলেও তার লেখায় জাপানিজ লেখকদের তেমন প্রভাব নাই বলে জানিয়েছেন ইশিগুরো। বরং প্রচুর সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন বলে ইয়াসুজিরো ওজু’র মতো জাপানিজ ফিল্মমেকারদের প্রভাব তার সাহিত্যে আছে।

কাজুও ইশিগুরো  (জন্ম. নাগাসাকি, জাপান, ৮/১১/১৯৫৪)

৭টি উপন্যাস ও কয়েকটি ছোটগল্পের পাশাপাশি ৪টা সিনেমার চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি। এছাড়া তার উপন্যাস ‘দ্য রিমেইন্স অফ দ্য ডে’ এবং ‘নেভার লেট মি গো’ অবলম্বনে সিনেমাও বানানো হয়েছে।

তার এই ছোটগল্পটি ২০০১ সালের মে মাসে দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয়।


আ ভিলেজ আফটার ডার্ক

কাজুও ইশিগুরো

অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন

একটা সময় ছিল যখন টানা কয়েক সপ্তাহ জুড়ে গোটা ইংল্যান্ডের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা ঘুরে বেড়ালেও আমার মাঝে এক ফোঁটা অবসাদ কাজ করত না; যখন এই ভ্রমণ আর কিছু না হলেও অন্তত উদ্দীপনাটা যোগাতে পারত। কিন্তু এখন বয়স হয়ে গেছে। সহজেই দিশাহারা হয়ে যাই। তাই রাত নামার একটু পরেই যখন গ্রামে এসে পৌঁছালাম, তখন সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল। কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে কয়দিন আগেও আমি এই গ্রামে থাকতাম, আমার কথা আর কাজের কতটা দাম ছিল এখানে।

কিছুই চিনতে পারি না। অল্প আলোয় মোড়া রাস্তাগুলিকে ঘিরে সেই চিরাচরিত পাথরের কুটির, আর আমি যেন অনন্তকাল যাবৎ এই রাস্তা ধরে ঘুরপাক খাচ্ছি। একসময় রাস্তাটা অনেক সরু হয়ে আসল। এবড়ো-খেবড়ো দেয়ালগুলিতে আমার হাতের ব্যাগ আর কনুই ঘষটানো ছাড়া আগানোই যাচ্ছিল না আর। তবু আমি ধৈর্য্য ধরে এগিয়ে গেলাম; হয়ত এই অন্ধকারে পথ হাতড়িয়ে কোনোমতে মোড়ের মাথায় পৌঁছে যাব—যেখানে গেলে কোনদিকে যেতে হবে সেই ধারণাটা অন্তত নেওয়া যাবে—অথবা গ্রামের কারো সাথে দেখা হয়ে যাবে, এই আশায়। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পার হয়ে গেলেও দুইটার একটাও হল না। এক ধরনের ক্লান্তি বোধ করা শুরু করলাম আমি। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম এই অবস্থায় হুট করে যে কোনো একটা বাসায় গিয়ে দরজায় নক করতে থাকাটাই বরং ভাল হবে। আমাকে চিনতে পারবে এমন কেউ হয়ত দরজা খুলে দিবে একসময়।

বেশ নড়বড়ে একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি। উপরের পাল্লাটা এত নিচু যে ঢুকতে হলে রীতিমত হামাগুড়ি দেওয়া লাগবে আমার। দরজাটার কোণা থেকে মৃদু আলো গড়িয়ে আসছিল। কিছু মানুষের হাসি ও কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল ভেতর থেকে। তাদের কথা বলার মাঝেও যেন তারা ঠিকমত শুনতে পায়, তাই বেশ জোরে দরজা ধাক্কালাম আমি। আর ঠিক সেই সময় আমার পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল, “হ্যালো।”

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। বছর বিশেক বয়সের একটা মেয়ে একটু দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। ছেঁড়া জিন্সের প্যান্ট আর জীর্ণ একটা জাম্পার গায়ে।

“আপনি এই কিছুক্ষণ আগেও আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে আসলেন,” মেয়েটা বলল, “আমি ডাক দিয়েছিলাম আপনাকে।”

“তাই নাকি? সরি, আমি খেয়াল করি নাই।”

“আপনি ফ্লেচার না?”

“হ্যাঁ।” মনে মনে বেশ খুশি হলাম আমি।

“আমাদের কটেজের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ই ওয়েন্ডি আপনাকে চিনতে পেরেছে। আমরা সবাই বেশ উত্তেজিত হয়ে গেছিলাম। আপনি ওই দলের লোক না? ডেভিড ম্যাগিস আর উনার সাঙ্গপাঙ্গদের দল?”

“হ্যাঁ। কিন্তু ম্যাগিস তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিল না। তুমি আলাদা করে তার নাম বলতেছ দেখে অবাক হলাম। তার চাইতেও অনেক বাঘা বাঘা লোক ছিল ওইখানে।” গড় গড় করে আরো অনেকগুলি নাম বলে গেলাম আমি। প্রতিটা নাম শুনেই সে সায় দেওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। বোঝা গেল, সবাইকেই চিনে সে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। “কিন্তু এরা সবাই তো নিশ্চয়ই তোমার সময়ের চাইতে অনেক আগেকার লোকজন। তুমি এসব ব্যাপারে জানো দেখে বেশ অবাক লাগছে।”

“আমাদের আগেকার হলেও আপনাদের সব ব্যাপারে আমরা একেকজন এক্সপার্ট। আমাদের চেয়ে বয়সে বড় ওই সময়কার যারা আছে, তাদের চাইতেও আমরা অনেক বেশি জানি। ওয়েন্ডি তো শুধু আপনার ছবি দেখেই আপনাকে চিনে ফেলেছে।”

“তোমাদের মত ইয়াং ছেলেপেলে যে আমাদের ব্যাপারে এত ইন্টারেস্টেড, সে সম্বন্ধে কোনো ধারণাই ছিল না আমার। সরি, আমি তখন তোমাকে খেয়াল করি নাই। আসলে এখন বয়স হয়ে গেছে তো, তাই ঘোরার সময় জায়গা চিনতে একটু সমস্যা হয়।”

দরজার পেছন থেকে বেশ হইচইয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এবার আরো অস্থিরভাবে ধাক্কা দিলাম আমি। যদিও মেয়েটার সাথে সাক্ষাতের এখানেই সমাপ্তি টানার তেমন ইচ্ছা করছিল না।

সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “সেই সময়কার সবাই আপনারা এ রকম। কয়েক বছর আগে ডেভিড ম্যাগিস এসেছিলেন। ‘৯৩ বা ‘৯৪ তে হয়ত। একটু বেখেয়ালি টাইপের। এত ট্রাভেলিং করলে মনে হয় এ রকমই হয়।”

“ম্যাগিসও তাহলে এসেছিল? ইন্টারেস্টিং। ও কিন্তু তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিল না। এ রকম ধারণা মাথা থেকে একদম দূর করে ফেলো। আচ্ছা, এই কটেজে কারা থাকে বলতে পারো?” দরজায় আবারো ধাক্কা দিলাম আমি।

মেয়েটা বললো, “পিটারসনরা থাকে এখানে। অনেক পুরানো লোকজন ওরা। আপনাকে চিনতে পারবে হয়ত।”

“পিটারসন…” নামটা থেকে কিছু মনে পড়ল না যদিও।

“আমাদের কটেজে চলেন না? ওয়েন্ডি তো আপনাকে দেখে খুবই এক্সাইটেড হয়ে গেছে। আমাদের বাকিদেরও একই অবস্থা। সেই সময়কার কারো সাথে কথা বলতে পারা আমাদের জন্য বড় একটা সুযোগ আসলে।”

“তোমাদের সাথে কথা বলতে পারলে আমারও খুব ভালো লাগবে। কিন্তু তার আগে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিই। এখানে পিটারসনরা থাকে তো, তাই না?”

আবারো দরজায় দুম দুম করে ধাক্কা দিলাম আমি। অনেক জোরেশোরে। শেষ পর্যন্ত দরজাটা খুলে দিল কেউ। আলো আর উষ্ণতা ছিটকে পড়ল রাস্তার উপর। বুড়া একজন লোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে খুব ভাল করে দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “ফ্লেচার নাকি? না তো, তাই না?”

“হ্যাঁ, আমি ফ্লেচার। এই কিছুক্ষণ আগেই এসে পৌঁছালাম। গত কয়েকদিন হল ট্রাভেলিংয়ে বের হয়েছি।”

কিছুক্ষণ চিন্তা করে নিলেন তিনি। তারপর বললেন, “ভেতরে আসো তাহলে।”

ভাঙাচোরা, অগোছালো একটা রুমে ঢুকলাম আমি। চারিদিকে অমসৃণ সব কাঠ আর ভেঙে যাওয়া আসবাবপত্র। ভেতরের আলোর একমাত্র উৎস ফায়ারপ্লেসে পুড়তে থাকা একটা গাছের গুড়ি। রুমজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কুঁজো হয়ে বসে থাকা কয়েকজনের অবয়ব দেখতে পেলাম সেই আলোতে। বুড়া ভদ্রলোক আমাকে ফায়ারপ্লেসের পাশে একটা চেয়ারে বসার আহ্বান জানালেন। তার অনিচ্ছা দেখে সহজেই বোঝা গেল, কিছুক্ষণ আগে ওই চেয়ার ছেড়েই তাকে উঠতে হয়েছিল। চেয়ারে বসার পর দেখি, মাথা ঘুরিয়ে রুমের বাকিদেরকে বা অন্য কোনোকিছুই ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আগুনের ওই অল্প অল্প তাপ আরাম দিচ্ছিল খুব। এক মুহূর্তের জন্য শুধু তার শিখার দিকেই তাকিয়ে থাকলাম। মনোরম এক ক্লান্তি ছড়িয়ে গেল আমার ওপর। পেছন থেকে কিছু কণ্ঠ শোনা যেতে থাকলো—তারা জানতে চায়, আমি ভাল আছি কিনা, অনেক বেশি দূর থেকে এসেছি কিনা, ক্ষুধা লেগেছে কিনা। আমি চেষ্টা করলাম নিজের মত করে সবগুলির উত্তর দিতে, যদিও জানতাম কোনোটারই উত্তর ঠিকঠাক হয় নাই। চলতে চলতে একসময় তাদের প্রশ্ন বন্ধ হয়ে গেল, আর আমি বুঝতে পারলাম আমার উপস্থিতি ভারি এক অস্বস্তিবোধ তৈরি করছে সবার উপর। কিন্তু এই উষ্ণতা ও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেক বেশি আরাম বোধ করছিলাম আমি, তাই সেদিকে আর তেমন পাত্তা দিলাম না।

তবে পেছন থেকে প্রশ্ন বন্ধ হয়ে যাবার কয়েক মিনিট পরেও যখন সেই নীরবতা ভাঙল না, তখন আমার আশ্রয়দাতাদের কিছুটা সৌজন্য দেখাতে চাইলাম আমি। চেয়ারটা ঘুরিয়ে নিলাম। আর ঘুরে বসার সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম আমি ঠিক কোথায় এসেছি। হঠাৎ করেই সুপরিচিতির এক তীব্র অনুভূতি আমাকে জব্দ করে ফেলল। যদিও আমি এই কটেজটাতে খুব ভেবেচিন্তে আসি নাই, কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি, জায়গাটা আমার খুবই পরিচিত। এ কটেজেই তো আমি গ্রামের প্রতিটা বছর পার করেছি। রুমের একেবারে কোণায় চোখ চলে গেল আমার—যেখানটা একসময় একান্তই আমার জায়গা ছিল। ওখানে জাজিম পেতে আমার শান্ত মুহূর্তগুলি কেটেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়ে। বই পড়েছি আর গল্প করেছি। যেই এসেছে তার সাথেই গল্প করেছি। গ্রীষ্মের দিনে জানালাগুলি, আবার কোনো সময় দরজাগুলিও খোলা রাখতাম আমরা—যাতে সতেজ বাতাস দমকা ঢুকে যেতে পারে। ওই দিনগুলিতে কটেজের চারিদিক ঘেরা থাকত খোলা মাঠে। বাইরে থেকে আমার বন্ধুদের গলা শোনা যেত। লম্বা ঘাসে অলস বসে কবিতা আর দর্শন নিয়ে আলাপ করত ওরা। অতীতের এই অমূল্য সব খণ্ড প্রচণ্ডভাবে ফিরে আসছিল আমার স্মৃতিতে। সেই স্মৃতিতে আচ্ছন্ন না থাকলে আমি হয়ত তখনই উঠে  গিয়ে আমার রুমের ওই কোণায় গিয়ে বসে পড়তাম।

আবার কেউ একজন কথা বলে উঠল। হয়ত কোনো প্রশ্ন ছিল, আমি ঠিকমত শুনলাম না। উঠে দাঁড়িয়ে রুমের কোণটায় ছায়ার দিকে তাকালাম ভাল করে। একটা সরু খাট দেখা যাচ্ছে, পুরানো পর্দা দিয়ে ঢাকা। আমার জাজিমটা যেখানে পাতা ছিল মোটামুটি সেটুকু জায়গা নিয়েই খাটটা পড়ে আছে। ওদিকে তাকিয়ে খুব লোভ হচ্ছিল আমার। বুড়া লোকটা কিছু একটা বলছিলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে আমি বলে উঠলাম—

“দেখেন, কিছু মনে করবেন না, খোলাখুলিই বলি। আসলে আজ সারাদিন অনেক জার্নি করেছি আমি। আমার একটু শোয়া দরকার। কয়েক মিনিটের জন্য হলেও চোখটা বন্ধ করে থাকতে চাই। তারপর আপনাদের যত ইচ্ছা আলাপ করা যাবে।”

বোঝা গেল, রুমের ভেতরের সবাই এখন অস্বচ্ছন্দ বোধ করছে। তারপর নতুন একটা কণ্ঠ এক রকম বিষণ্ণ হয়েই যেন সাড়া দিল, “শুয়ে পড়ো, সমস্যা নাই। ঘুমায় নাও। আমাদের ব্যাপারে চিন্তা করো না।”

ততক্ষণে আমি আসবাবের জটলা পার হয়ে আমার জায়গাটার দিকে হাঁটা শুরু করে দিয়েছি। স্যাঁতসেঁতে খাটটায় গা এলিয়ে দিতেই ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠল। আর পাশ ফিরে শোয়ার সাথে সাথে আমার জার্নির প্রতিটা ঘণ্টার ক্লান্তি যেন পেয়ে বসল আমাকে। তন্দ্রার মাঝে শুনতে পেলাম, বুড়া লোকটা বলছেন, “এটা ফ্লেচার। গড, কত বয়স হয়ে গেছে ওর!”

একটা মহিলার কণ্ঠ শোনা গেল, “এইভাবে ঘুমাতে দেওয়া কি ঠিক হল? কয়েক ঘণ্টা পর ওর ঘুম ভাঙলে আমাদেরও তো ওর সাথে জেগে থাকতে হবে।”

“এক ঘণ্টার মত ঘুমাক,” অন্য কেউ একজন বলল, “এক ঘণ্টা পর না উঠলে আমরাই ওকে ডেকে দিব।”

সেই মুহূর্তে প্রবল অবসাদ যেন আঁকড়ে ধরল আমাকে।

খুব যে আরামের একটানা ঘুম হয়েছিল তা না। ঘুমের মাঝেই জেগে উঠছিলাম বার বার, পেছনে বসে থাকা লোকদের কথা শোনা যাচ্ছিল সব সময়। একবার শুনতে পেলাম, কোনো মহিলা বলছেন, “আমি যে কী মনে করে ওকে অত পছন্দ করতাম জানি না। এখন তো কেমন নোংরা নোংরা লাগে দেখতে।”

প্রায় ঘুমন্ত অবস্থাতেই চিন্তা করলাম, কথাগুলি কি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা নাকি ডেভিড ম্যাগিসকে নিয়ে আলাপ করছিল ওরা? বেশিক্ষণ ভাবার সুযোগ হল না। ঘুমিয়ে পড়লাম আবারো।

এরপর যখন ঘুম ভাঙে, তখন রুমটাতে অন্ধকার বেড়ে গেছে। শীত শীত লাগছিল। অল্প আওয়াজে তখনো ওরা আলাপ করে যাচ্ছে, কিন্তু ওদের কোনো কথাই বুঝতে পারছিলাম না আমি। এ রকম ভাবে ঘুমিয়ে পড়ায় গোটা ব্যাপারটাতে বেশ বিব্রত বোধ করছিলাম এখন। নড়াচড়া না করে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরে আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম তাই। কিন্তু মনে হয় কিছু একটা দেখে ওরা টের পেয়ে গেল যে আমি জেগে আছি। আলাপ বাদ দিয়ে একজন মহিলা বলে উঠলেন, “আরে, দেখো দেখো।” ফিসফিস চলল কিছুক্ষণ। তারপর শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম, কেউ একজন আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আলতো করে আমার কাঁধের ওপর হাত রাখলেন তিনি। তাকিয়ে দেখি একজন মহিলা, আমার উপর ঝুঁকে দেখছেন। পুরা রুমটা ভাল ভাবে দেখতে না পারলেও বোঝা গেল, জ্বলন্ত কাঠের শেষ কিছু ছাইয়ের আগুনে রুমটা আলোকিত হয়ে আছে। কেবল ছায়ার আবরণে ওই মহিলার মুখটা বোঝা যাচ্ছিল।

“তো ফ্লেচার, এখন  ওঠো তাহলে,” বললেন তিনি, “তোমার সাথে একটু কথা বলা দরকার। আমি অনেকদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। প্রায়ই তোমার কথা মনে পড়ত।”

তার চেহারাটা ভাল করে দেখার চেষ্টা করলাম। বয়স চল্লিশের উপর, এই আধা অন্ধকারেও তার চোখে এক নীরব দুঃখ স্পষ্ট। কিন্তু একদমই চিনতে পারলাম না তাকে।

“সরি, ঠিক চিনতে পারতেছি না আপনাকে,” বললাম আমি, “আমাদের আগে দেখা হয়ে থাকলে প্লিজ মাফ করবেন, আজকাল কিছুই চিনতে পারি না।”

উনি বললেন, “ফ্লেচার। আমি তখন সুন্দর ছিলাম আরো, বয়স কম ছিল। তোমাকে কতটা সম্মান করতাম আমি। তোমার প্রতিটা কথাই সব প্রশ্নের উত্তর বলে মনে হত আমার কাছে। এতদিন পর আবার তুমি ফিরে এসেছ। অনেক বছর ধরেই কথাটা বলতে চাচ্ছিলাম। আজকে বলি, তুমি আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছ ফ্লেচার।”

“এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। হ্যাঁ, অনেক কিছু সম্বন্ধেই আমার ধারণা ভুল ছিল। কিন্তু কখনোই এমন দাবি আমি করি নাই যে, সব কিছুর উত্তর আমার কাছে আছে। সে সময় আমি শুধু বলেছি যে, এই বিতর্কে অংশ নেয়াটা আমাদের সবারই দায়িত্ব। সাধারণ লোকদের চাইতে তখনকার সব ইস্যু নিয়ে আমরা জানতাম অনেক বেশি। সেই আমরাই যদি হেলাফেলা করে বলতাম, আমরা এখনো সবকিছু বুঝে উঠতে পারি নাই—তাহলে ব্যবস্থা নিত কে? কিন্তু না, আমি কখনোই বলি নাই যে আমার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে। এ রকম বলাটা খুবই আনফেয়ার হবে।”

অদ্ভুত নরম এক কণ্ঠে তিনি বললেন, “এ রুমে আমি ঢুকলেই আমাকে আদর করে দিতে তুমি। এই কোণায় বসে কত উল্টাপাল্টা কাজ করেছি আমরা। মানুষের চোখে হয়ত খারাপ, কিন্তু আমাদের কাছে সেগুলি ছিল অপূর্ব সুন্দর। ভাবতে অদ্ভুত লাগে যে তোমার এ শরীর এক সময় কতটা উত্তেজিত করে ফেলত আমাকে। আর এখন দুর্গন্ধ ওঠা ছেঁড়াবেড়া কাপড়ে কী অবস্থা তোমার! অথচ আমি এখনো কত আকর্ষণীয়। চেহারায় বয়সের একটু দাগ পড়েছে ঠিকই। কিন্তু গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আমি এমন সব কাপড় পরে ঘুরি যাতে আমার ফিগারটা ভালোভাবে বোঝা যায়। কত ছেলে এখনো পেতে চায় আমাকে! কিন্তু তোমাকে এখন আর কোন মেয়ে চাইবে, বলো? গন্ধ ওঠা ময়লা কাপড় আর মাংসের দলা ছাড়া তুমি আর কিছুই না।”

আমি বললাম, “তোমার কথা আমার মনে নাই। আর এখন তো সেক্সের সময়ও পাওয়া যায় না। অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করা লাগে। আরো অনেক সিরিয়াস বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা লাগে আমার। ঠিক আছে, তখন অনেক ব্যাপারেই আমার ধারণা ভুল ছিল। কিন্তু আমি বাকিদের চাইতে নিজের ভুলের খেসারত দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। দেখো, আজ পর্যন্ত আমি ট্রাভেলিং করে বেড়াচ্ছি। এক মুহূর্তের জন্যেও থামি নাই। আমি ঘুরে বেড়াই আর নিজের করা ক্ষতিগুলি শুধরানোর চেষ্টা করি বার বার। ওই সময়কার খুব বেশি লোক এ রকম কিছু করেছে বলে জানা নাই আমার। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, নিজের ভুল শুধরানোর জন্য ম্যাগিস এতটা পরিশ্রম করে না। আমার ধারেকাছেও না।”

আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সে।

“মনে করে দেখো, তোমার চুলে এভাবে আঙুল বুলিয়ে দিতাম আমি। কী বেহাল অবস্থা এখন তোমার! আমি শিওর তোমার শরীর ভর্তি সব রকম জীবাণু পাওয়া যাবে।” আমার চুলের নোংরা জটের মাঝে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছিল ও। হয়ত আমার মাঝে কামভাব জাগাতে চাচ্ছিল, কিন্তু আমি সে রকম কিছু বোধ করলাম না। বরং মনে হচ্ছিল যেন মায়ের হাতের ছোঁয়া পাচ্ছি। আসলেই যেন এক মুহূর্তের জন্য আমি নিরাপত্তার গর্ভে ঢুকে গিয়েছিলাম আবার। আবারো ঘুম পাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে হাত বোলানো বন্ধ করে আমার কপালে জোরে একটা চাপড় মারল সে।

“আমাদের সাথে এসে বসো এখন। ঘুম তো হয়েছেই। অনেক কিছুর ব্যাখ্যা দিতে হবে তোমাকে আজ,” এটুকু বলে উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল।

আমি প্রথমবারের মত পাশ ফিরে রুমটা ভাল করে দেখলাম। মেঝের জটলা কাটিয়ে ফায়ারপ্লেসের পাশে একটা রকিং চেয়ারে গিয়ে বসল সেই মহিলা। নিভে যেতে থাকা আলোতে আরো তিনজনকে কুঁজো হয়ে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন ওই বুড়া লোকটা। বাকি দুইজন মহিলা, মনে হয় কাঠের একটা ট্রাঙ্কের উপর বসে আছেন। দুইজনের বয়স আমার সাথে কথা বলে যাওয়া মহিলার কাছাকাছিই হবে।

বুড়া লোকটা খেয়াল করলেন যে আমি পাশ ফিরেছি। তাই ইশারায় বাকিদের বুঝিয়ে দিলেন যে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছি আমি। চারজনে চুপচাপ শক্ত হয়ে বসলেন। তাদের হাবভাব দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, আমি ঘুমে থাকা অবস্থায় তারা আমাকে নিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা করেছেন। এমনকি সেই আলোচনা কোথায় এসে ঠেকেছে তাও প্রায় আন্দাজ করে নেওয়া যায়। যেমন আমি বুঝতে পারছিলাম, কটেজের বাইরে দেখা হওয়া অল্পবয়সী মেয়েটাকে নিয়ে তারা বেশ দুঃশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে তার বন্ধুবান্ধবের ওপর আমার কী প্রভাব পড়তে পারে সেটা নিয়েও তারা চিন্তিত।

বুড়া লোকটা নিশ্চয়ই বলেছেন, “ওদের তো বয়স কম, বোঝে না। মেয়েটা দেখলাম ওদের সাথে দেখা করার জন্য দাওয়াত দিচ্ছে ওকে।”

সেটা শুনে ট্রাঙ্কের উপর বসে থাকা মহিলাদের একজন নিশ্চয়ই বলেছেন যে, “ও আর এখন তেমন ক্ষতি করতে পারবে না। আমাদের সময় ওর দলের লোকেরা সবাই তরুণ আর আকর্ষণীয় ছিল দেখতে। তাই আমরা সহজেই ওদের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আর এখন তো হঠাৎ কখনো ওদের দুই একজনকে দেখা যায়, তাও আবার জরাজীর্ণ বিধ্বস্ত অবস্থায়। এসব দেখে বরং তাদেরকে নিয়ে শোনা সব গল্পের ভ্রম কেটে যাবে। যাই হোক, এ ধরনের লোকেরা তাদের অবস্থান অনেক পালটে ফেলেছে এখন। নিজেরাই ঠিকমতো জানে না কীসে বিশ্বাস করে তারা।”

তবু বুড়া লোকটা মাথা ঝাঁকিয়ে থাকতে পারেন, “আমি দেখেছি মেয়েটা কেমন করে কথা বলছিল ওর সাথে। ঠিক আছে, ওকে দেখে এখন উদভ্রান্ত মনে হতে পারে। কিন্তু একবার ওর অহঙ্কারের তেলে ঘি পড়লে দেখো কী হয়। কমবয়সী ছেলেমেয়েদের তোষামোদ পেয়ে গেলে ওরা সবাই তখন হা করে ওর সব কথা শুনবে। আর আটকানো যাবে না ওকে। আবার আগের মত অবস্থা হবে তখন। তাদেরকে দিয়ে সব কাজ করিয়ে নিবে ও। কমবয়সী এই মেয়েগুলির কাছে বিশ্বাস করার মত তেমন কিছুই নাই এখন। ওর মত একটা গন্ধ ওঠা ভবঘুরেও তাদেরকে আশার আলো দেখাতে পারে।”

আমি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাদের আলোচনা এভাবেই চলেছে হয়ত। কিন্তু এখন সবাই কেমন অপরাধীর মত নীরবে বসে আছে। শেষ আগুনের মৃদু আলোর দিকে তাদের চোখ। একটু পর উঠে দাঁড়ালাম আমি। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, ওরা এখনো অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করলাম, দেখি কেউ কিছু বলে কিনা। কেউ মুখ খুলল না দেখে শেষ পর্যন্ত বললাম, “আচ্ছা, এতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকলেও আন্দাজ করতে পারতেছি ঠিক কী নিয়ে আলাপ করছিলা তোমরা। জেনে তোমাদের ভাল লাগবে যে—তোমরা যে ভয় পাচ্ছিলা, ঠিক সেই কাজটাই করব আমি। আমি এখনই ওই ছেলেপেলেদের কটেজে যাব। তারপর ওদেরকে বলব তাদের সব শক্তি আর স্বপ্ন কাজে লাগিয়ে কী কী করতে পারে তারা। ওদেরকে জানাব, এই পৃথিবীতে ভাল কিছু চিরতরে রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কীভাবে কাজে লাগাতে হয়। নিজেদের দিকে তাকাও একবার, কী করুণ অবস্থা তোমাদের! কোনো কিছু করার ভয়ে, আমার ভয়ে, ম্যাগিসের ভয়ে, আমাদের ভয়ে এই ছোট কুটিরে কীভাবে গুটিসুটি মেরে বসে আছো। শুধু আমরা কয়েকটা ভুল করেছিলাম বলে কোনো কিছু করার সাহস পর্যন্ত তোমাদের হয় না। কিন্তু ওই তরুণ ছেলেমেয়েরা এখনো অত নিচে নামে নাই—তা তোমরা বছরের পর বছর ওদেরকে যত নিষ্কর্মা হওয়ার শিক্ষাই দিয়ে থাকো না কেন। ওদের সাথে আধাঘণ্টা কথা বলেই আমি তোমাদের সব অপচেষ্টা ভেস্তে দিব।”

“দেখছো?” বুড়া লোকটা বাকিদেরকে বলল, “আমি বলতেছিলাম না এ রকম কিছুই হবে? ওকে আটকানো দরকার। কিন্তু কী-ই বা করতে পারি আমরা?”

আমি তাড়াহুড়া করে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রাতের অন্ধকারে বের হয়ে আসলাম।

মেয়েটা দেখি দাঁড়িয়ে আছে এখনো। আমাকে দেখে মাথা নেড়ে হাঁটতে থাকল সামনের দিকে। আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল বোধহয়।

ঝির ঝির বৃষ্টিপড়া অন্ধকার রাত। কটেজগুলির মাঝের সরু রাস্তা দিয়ে আঁকাবাঁকা হাঁটতে থাকলাম আমরা। কিছু কিছু কটেজ এতই নাজুক হয়ে গেছে যে মনে হল আমার শরীরের এক ধাক্কাতে ভেঙে পড়ে যাবে সব।

মেয়েটা আমার চেয়ে কয়েক কদম দূর দিয়ে হাঁটছিল। আর ঘাড়ের ওপর দিয়ে তাকিয়ে মাঝে মাঝে দেখছিল আমাকে। একবার বলল, “ওয়েন্ডি খুবই খুশি হবে। ও তো তখন আপনাকে একবার দেখেই চিনে ফেলল। আমি যেহেতু আপনাকে দেখতে এসে এখনো যাই নাই, তাই এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছে যে ওর ধারণাই সত্যি। দলবল সবাইকে ডেকে এনেছে নিশ্চয়ই। ওরা একসাথে অপেক্ষা করছে।”

“ডেভিড ম্যাগিসের বেলায়ও কি তোমরা এ রকম আয়োজন করেছিলা নাকি?”

“হ্যাঁ। তাকে দেখে আমরা সবাই খুব খুশি হয়েছিলাম।”

“আমি নিশ্চিত ম্যাগিস ব্যাপারটায় বেশ আনন্দিত হয়েছে। সবসময়ই নিজের গুরুত্ব নিয়ে অনেক অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণ করত ও।”

“ওয়েন্ডি বলে ম্যাগিস নাকি ইন্টারেস্টিং ছিল খুব, আর আপনি ছিলেন ইম্পরট্যান্টদের দলে। সে আপনাকে অনেক গুরুত্ব দেয়।”

বিষয়টা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম আমি।

“আসলে কী, অনেক ব্যাপারে কিন্তু আমার মত পালটে গেছে। এখন ওয়েন্ডি যদি মনে করে আমি আগে যেসব বলতাম, এখনো ঠিক সেরকম কথাই বলব—তাহলে সে খুব আশাহত হবে।”

মেয়েটা মনে হয় আমার কথা শুনতে পায় নি। সে কটেজের জটলার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে হন হন করে।

কিছু সময় পর মনে হলো, আমাদের দশ-বারো কদম পেছন থেকে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো গ্রামবাসী। হাঁটতে বেরিয়েছে হয়ত, তাই আর পেছনে ফিরে দেখি নাই। কিন্তু মেয়েটা একটা স্ট্রিটল্যাম্পের নিচে দাঁড়িয়ে আমার পেছনের দিকে তাকাল একবার। আমিও তাই দাঁড়িয়ে পড়ে পেছনে ফিরে তাকালাম। কালো রঙের ওভারকোট পরে একটা মাঝবয়সী লোক আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। কাছাকাছি এসে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন তিনি, কিন্তু মুখে কোনো হাসি নেই।

“তুমি এসেছ তাহলে?”

খেয়াল করে দেখলাম, লোকটাকে আমি চিনি। আমাদের বয়স যখন দশ, তার পর থেকে ওর সাথে আমার আর কখনো দেখা হয় নাই। নাম রজার বাটন। আমার পরিবার ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার আগে কানাডায় থাকতে যে স্কুলে আমি দুই বছরের জন্য পড়েছিলাম, সেখানে আমার সহপাঠী ছিল সে। খুব একটা ঘনিষ্ঠ ছিলাম না আমরা। রজার খুবই চাপা স্বভাবের ছিল। আর তাছাড়া ওদের বাড়িও ইংল্যান্ডে হওয়ায় আমার পেছনে ঘুর ঘুর করেছিল কিছুদিন। সে সময়ের পর থেকে আর দেখা সাক্ষাৎ হয় নাই আমাদের। স্ট্রিটল্যাম্পের আলোয় ওকে দেখে বুঝতে পারলাম, বয়স তার উপর ভালোই ছাপ ফেলেছে। মাথাভর্তি টাক আর মুখে গুটির দাগ বসে গেছে। ক্লান্তির ভারে শরীরটা যেন ঝুলে আছে একপাশে। এতকিছুর পরও আমার পুরানো সহপাঠীকে চিনে নিতে অসুবিধা হল না।

আমি বললাম, “রজার, আমি এই মেয়েটার বন্ধুদের সাথে একটু দেখা করতে যাচ্ছি। তারা সবাই একসাথে জড়ো হয়ে আমাকে রিসিভ করবে। নাহলে আমি এসেই তোমাকে খুঁজতে যেতাম। অবশ্য ওদের সাথে কাজ সেরে এম্নিতেও তোমার ওখানে যাওয়ার প্ল্যান করে রেখেছি আমি। আজকে রাতে ঘুমানোর আগে হলেও একবার তোমার সাথে দেখা করতাম। ভাবতেছিলাম, এই ছেলেপেলেদের কটেজে যত রাতই হোক, কাজ শেষে বন্ধু রজারের বাসায় একবার যাবই।”

“চিন্তার কিছু নাই,” বলল রজার। এবার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলাম আমরা, “আমি জানি তুমি কতটা ব্যস্ত এখন। কিন্তু আমাদের কথা হওয়া দরকার। পুরানো দিনের স্মৃতিচারণ করলাম না হয়। শেষবার যখন তুমি আমাকে দেখেছিলা, মানে স্কুলে, তখন মনে হয় আমি খুব দুর্বল টাইপের লোক ছিলাম। কিন্তু চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সে এসে সব পালটে গেল। আমি বেশ শক্তপোক্ত হয়ে উঠলাম। অনেকটা লিডার টাইপ। কিন্তু তারও বহু আগে তুমি কানাডা ছেড়ে চলে গেছ। আমি সবসময় ভেবেছি, পনেরো বছর বয়সে এসে আমাদের আবার দেখা হলে কেমন হতো! সবকিছু বেশ অন্যরকম হত বলেই আমার মনে হয়।”

তার কথা শুনে প্রবল বেগে সব স্মৃতি ভেসে আসা শুরু হল। সেই সময়ে রজার বাটন আমাকে আদর্শ মানত, আর তার বদলে আমি অনবরত তাকে ব্যুলি করতাম। কিন্তু কীভাবে যেন আমাদের এক অদ্ভুত বোঝাপড়া হয়ে গেল যে, আমি তাকে তার ভালর জন্যই ব্যুলি করি। যখন মাঠে দাঁড়িয়ে আকস্মিক তার পেট বরাবর ঘুষি মারতাম বা করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় অভ্যাসমাফিক তার হাতটা মুচড়ে কান্নার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি—এ সবকিছুই যেন তাকে শক্ত করে তোলার জন্য করা। এসব আক্রমণ আমাদের সম্পর্কে এমন প্রভাব ফেলল যে, আমাকে সে সম্ভ্রমের চোখে দেখত সবসময়। ক্লান্ত চেহারার মাঝবয়সী এই লোকটার পাশে হাঁটার সময় সে কথাগুলিই মনে করছিলাম আমি।

অনেকটা আমার চিন্তার ধারা আন্দাজ করেই যেন রজার বলে উঠল, “হ্যাঁ, এমনটা হতে পারে যে তুমি আমার সাথে ওইরকম আচরণ না করলে হয়ত পনেরো বছর বয়সে এসে আমার আর এরকম হয়ে ওঠা হত না। আমি সব সময়ই ভেবে এসেছি, আর কয়েকটা বছর পর আমাদের দেখা হলে কেমন হত! আমি তখন আসলেই বেশ হোমড়াচোমড়া লোক ছিলাম।”

আবারো আমরা কটেজের মাঝ দিয়ে ওই সরু রাস্তা ধরে এগোচ্ছিলাম। মেয়েটা তখনো আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এবার বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটছিল সে। মাঝে মাঝে সামনের কোনো মোড়ে তাকে শুধু এক ঝলক দেখা যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, সতর্ক না থাকলে আমরা আর ওর সাথে তাল রাখতে পারব না।

রজার বাটন বলে চলেছে, “এখন অবশ্য আগের চেয়ে কিছুটা নরম হয়ে গেছি। তবে তোমার অবস্থা কিন্তু আরো খারাপ, বন্ধু। তোমার তুলনায় আমার রীতিমতো অ্যাথলেটিক ফিগার। সত্যি কথা বলতে, তুমি তো এখন ছ্যাঁচড়া একটা ভবঘুরে ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার অনেকদিন পর্যন্ত আমি তোমাকে মনে মনে অনেক সম্মান করেছি। ‘আমার জায়গায় ফ্লেচার থাকলে কি এটা করত? আমাকে এ রকম কিছু করতে দেখলে কী মনে করত সে?’ তবে বয়স পনেরো হবার পর আমি তোমার আসল রূপটা ধরতে পারি। তখন অবশ্য প্রচণ্ড রাগ ওঠে আমার। এখনো আগের কথা মনে পড়লে মনে হয়, ফ্লেচার একটা নিতান্তই বাজে লোক। ওর ওই বয়সে আমার চেয়ে ওজন আর শক্তি কিছুটা বেশি ছিল, আর সেই সাথে একটু কনফিডেন্স ছিল বলে সে তার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে। হ্যাঁ, এখন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি কতটা বাজে ও তুচ্ছ একটা লোক ছিলা তুমি। অবশ্য আমি এটা বোঝাতে চাচ্ছি না যে এখনো তুমি ওই রকমই আছো। আমাদের সবার মাঝেই পরিবর্তন আসে। এটুকু আমি মানতে রাজি আছি।”

“তুমি কি অনেকদিন ধরে আছো এখানে?” প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“সাত বছরের মত হবে। এখানকার সবাই তোমার কথা খুব বলে। আমাদের পরিচিতির কথা কখনো কখনো বলি আমি ওদেরকে, ‘কিন্তু ওর নিশ্চয়ই আর আমার কথা মনে নাই। তার ফুটফরমাশ খাটা যে হ্যাংলা ছেলেকে সে সবসময় ব্যুলি করত, তার কথা কি আর সে মনে রেখেছ?’ যাই হোক, এখানকার কমবয়সী ছেলেমেয়েরা কিন্তু আজকাল তোমার কথা অনেক আলোচনা করে। হ্যাঁ, যারা তোমাকে কখনো দেখে নাই তারাই তোমাকে গুরু মানে বেশি। তুমি নিশ্চয়ই সেটার ফায়দা লুটতে এসেছ? তারপরও তোমাকে দোষ দেওয়া যায় না অবশ্য। কিছুটা আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করার অধিকার তোমার আছে।”

হঠাৎ দেখি সামনে খোলা একটা মাঠ। আমরা দু’জনেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি আমরা গ্রাম থেকে বের হয়ে এসেছি, শেষ কয়েকটা কটেজ আমাদের থেকে কিছুটা দূরে। যা ভয় পাচ্ছিলাম, তাই হয়েছে। মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলেছি আমরা। বুঝতে পারলাম, বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে আমরা ভুল রাস্তায় হাঁটছি।

ঠিক সেই সময় চাঁদের দেখা পাওয়া গেল। দেখি, মাঠভর্তি ঘাস অনেকদূর চলে গেছে—চাঁদের আলোয় যতটুকু দেখা যায় তা ছাড়িয়েও বহুদূর।

রজার বাটন ফিরে তাকাল আমার দিকে। জোছনায় তার চেহারাটা কেমন স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে; মনে হল যেন মমতা জড়ানো।

“তবে এখন মাফ করে দেবার সময় এসেছে,” বলল সে, “এত বেশি চিন্তা করো না। অতীতের কিছু জিনিস শেষ পর্যন্ত ফিরে আসবে ঠিকই, কিন্তু অল্প বয়সে আমরা যা করেছি তার জন্যে আমাদের দায়ী করা ঠিক না।”

“একদম ঠিক বলেছ,” বললাম আমি। তারপর ঘুরে তাকালাম অন্ধকারের দিকে। “কিন্তু এখন আমি ঠিক কই যাব বুঝতে পারতেছি না। কিছু ছেলেমেয়ে তাদের কটেজে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওরা আগুন জ্বালিয়ে আমার জন্য গরম গরম চা নিয়ে বসে আছে। হয়ত বাসায় বানানো কেকও আছে, বা ভাল কোনো স্টু রান্না করে রেখেছে ওরা। ওই মেয়েটার সাথে কটেজে ঢোকার সাথে সাথেই ওরা হাততালি দিয়ে উঠত হয়ত। তাদের হাসিভরা সুন্দর চেহারাগুলি ঘিরে থাকত আমাকে। এমনই কিছু সুন্দর মুহূর্ত অপেক্ষা করছে আমার জন্য। কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পারছি না আমি কই যাব।”

রজার বাটন কাঁধ ঝাঁকাল, “চিন্তা করো না। খুব সহজেই যাওয়া যাবে ওখানে। কিন্তু মেয়েটা তোমাকে ভুল বলেছে। ওয়েন্ডির কটেজ তো অনেক দূর। হেঁটে যাওয়া সম্ভব না। বাসে করে যেতে হবে। তাও সময় লাগে অনেক, প্রায় দুই ঘণ্টার জার্নি। তুমি টেনশন করো না, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি কোথা থেকে বাসে উঠতে হবে।”

এই বলে সে কটেজগুলির দিকে হাঁটা শুরু করল আবার। তার পিছু হাঁটতে হাঁটতে আমি বুঝতে পারলাম, বেশ রাত হয়ে গেছে। ওর ঘুম পেয়েছে মনে হল। কয়েক মিনিট আমরা কটেজের মাঝখান দিয়ে হাঁটলাম, আর তারপর সে আমাকে গ্রামের রাস্তার একেবারে মোড়ে নিয়ে এলো। জায়গাটার অবস্থা খুব জীর্ণ। একটামাত্র স্ট্রিটল্যাম্পের পাশে ছোট এক টুকরা সবুজ জায়গা। ল্যাম্পের আলো ছাড়িয়ে কয়েকটা দোকান দেখা যাচ্ছে কেবল, তাও রাত হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে। সবকিছু সম্পূর্ণ নীরব, মাটির ওপর শুধু হালকা কিছু কুয়াশা।

আরো পড়ুন: কাজুও ইশিগুরোর গল্প—’জে এর জন্য অপেক্ষা’

সবুজ জায়গাটার কাছে যাওয়ার আগেই রজার বাটন থেমে গেল। তারপর আঙুল তাক করলো ওইদিকটায়।

“ওইখানে গিয়ে দাঁড়ালেই বাস পেয়ে যাবা। যা বলেছি আর কী, জার্নি কিন্তু খুব ছোট না। দুই ঘণ্টার মত লাগবে। কিন্তু ওই ছেলেমেয়েরা অপেক্ষা করবে নিশ্চয়ই। তাদের কাছে তো বিশ্বাস করার মত তেমন কিছু নাই আজকাল।”

“এখন তো অনেক রাত হয়ে গেছে। তুমি কি নিশ্চিত বাস পাওয়া যাবে?”

“হ্যাঁ। অবশ্যই। অপেক্ষা করা লাগতে পারে। কিন্তু বাস এক সময় আসবেই।” তারপর আমাকে ভরসা দেওয়ার ভঙ্গিমায় কাঁধে হাত রাখল সে, “আমি বুঝতে পারছি, এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ একা একা লাগবে তোমার। কিন্তু বাস এসে পৌঁছালেই আবার চাঙা হয়ে উঠবে তুমি। ওই বাস একটা আনন্দের খোরাক। উজ্জ্বল আলোয় ভরা সেই বাসের যাত্রীরা সবাই হাসিখুশি থাকে খুব। জানালার পাশে বসে সারাক্ষণ আনন্দ আর কৌতুকে মেতে থাকে। একবার ওই বাসে চড়তে পারলে খুব আরাম লাগবে তোমার। অন্য যাত্রীরা কথা বলবে তোমার সাথে, হয়ত কোনো পানীয় বা খাবার খেতে দিবে। ড্রাইভার ঠিকঠাক থাকলে হালকা গানবাজনাও হতে পারে। কিছু ড্রাইভার তাতে উৎসাহ দেয়, আবার কয়েকজন আছে যারা গানবাজনা পছন্দ করে না। তো ঠিক আছে ফ্লেচার, তোমার সাথে দেখা হয়ে খুব ভাল লাগল।”

আমরা হ্যান্ডশেক করলাম। তারপর পেছনে ঘুরে চলে গেল সে। দেখতে দেখতে দুইটা কটেজের মাঝের অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

সবুজ জায়গাটার ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম আমি, ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় ব্যাগটা রেখে দিলাম। কোনো গাড়ির শব্দ পাওয়া যায় কিনা শোনার চেষ্টা করলাম, কিন্তু রাত তখনো একেবারে থম থম করছে। তারপরও রজার বাটনের কাছ থেকে বাসটার বর্ণনা শুনে খুব ভাল লাগছিল। তাছাড়া যাত্রা শেষে আমার জন্য যে অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে তার কথা ভাবছিলাম আমি। দেখছিলাম তরুণ ছেলেমেয়েদের মনোরম সব চেহারা। আমার গভীরে কোথাও যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম আশার আলোড়ন।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)

Leave a Reply