page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

কান যে কানের কথা বলে

কান বা নাক ইন্টারেস্টিং জিনিস। কবিতায় কবি বলেন, ঐ নিয়াছে এই নিলো না, কান নিয়াছে চিলে। কেন চিল খালি কান নেয়? কান বা নাক নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।

শারীরবৃত্তীয় কাজের জন্য না, ঐ কারণে জ্যাকের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াদিই গুরুত্বপূর্ণ। এই আলোচনার কান ও নাক শরীরের অংশের চাইতে, বেশি চিন্তার অংশ হিসেবেই বিবেচিত।

আজেরি লেখক আকরাম আইলিসলির কান কাইটা আনতে পারলে পুরস্কারের ঘোষণা দেন আজারবাইজানের পলিটিশিয়ান। কেন দেন?

চিত্রশিল্পী ভ্যান গগ তার কান কাইটা প্রেমিকারে উপহার দিছিলেন এমন কাহিনী শোনা যায়। অবশ্য সাম্প্রতিককালে গবেষকেরা বলেছেন এক ফ্রেঞ্চ বন্ধুর সাথে তর্কযুদ্ধের পরে মারামারির এক পর্যায়ে সম্ভবত ভ্যান গগ কান হারাইছিলেন। কানের কথা আসলে ভ্যান গগের কথাও চলে আসে। ভ্যান গগের ফ্রেঞ্চ বন্ধু কি তারে অপমান করতেই কান কাইটা নিছিলেন?

muradul-islam-logo

প্রাচীন আসিরিয়ানরা শাস্তি দিত কান নাক ইত্যাদি কাইটা। স্যাক্সন ইংলান্ডেও এইরকম কান কাটা শাস্তি ছিল। আরো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় কান ও নাক কাটা শাস্তি পাওয়া যাবে। এই কান ও নাক কাটা তীব্র অসম্মানের বস্তু ছিল।

রামায়ানের যুদ্ধটাই হইল এক নাক কাটারে কেন্দ্র কইরা। রামের ভাই লক্ষণ রাবনের বইন শুর্পনখার নাক কাইটা দিছিলেন।

প্রবাদে আছে নিজের নাক কাইটা অপরের যাত্রা ভঙ্গ বা লজ্জায় নাক কান কাটা যাইবার কথা। লজ্জায় প্রতিদিন অনেকেরই নাক কান কাটা যায় বলে তারা লেখে থাকেন।

শাস্তি পাইতে থাকা অপরাধী কান ধইরা থাকে বা উঠবস করে কিংবা মাপ চাইতে গিয়া অনেক সময় লোকে কান ধরে। এইটা করে বুঝাইতে যে সে লজ্জিত। কেমন লজ্জিত? কান কাটা গেলে যেরকম লজ্জিত হইতে হয় সেইরকম। অথবা সে কান ধইরা এইটা বুঝাইল যে ধরো তোমার সাথে যে আকামটা করছি তাতে আমার কান কাইটা দিলাম, এখন মাপ কইরা দেও।

মাস্টরেরা ছাত্রদের কানে ধরাইয়া উঠবস করান। উঠবস একটা ব্যায়ামই। ব্লাড সার্কুলেশন বাড়ে বলে ছাত্রের মনযোগ বাড়ে ইত্যাদি পড়িয়াছি। তাই উঠবসের ব্যাপারটা বাদ, কানে ধরাটা ইন্টারেস্টিং।

স্কুলের মাস্টররে বড় মাস্টর পলিটিশিয়ান কান ধরাইলেন আমরা সাম্প্রতিককালে দেখলাম। এক্ষেত্রে কারণ ছিল (যা বলা হইছে), তিনি একটা অপরাধ করছেন (ধর্মরে কটূক্তি) এবং এর জন্য তারে শাস্তি দিছেন বড় মাস্টর। (যদিও এইভাবে শাস্তি দেয়া বে আইনি।)

অর্থাৎ, অপরাধীরে (এই ঘটনার ক্ষেত্রে বলা যাক তথাকথিত, যেহেতু এ ব্যাপারে ভিন্নমত আছে) লজ্জামূলক শাস্তি বা অপমান করতেই এই কানে ধরানি।

স্কুল মাস্টররে এই কান ধরানির প্রতিবাদে অনেকে কানে ধইরা প্রতিবাদ করতেছেন। তাদের কথা হইল, তারা লজ্জিত হইছেন একজন মাস্টরের প্রতি পলিটিশিয়ানের এমন আচরনে। তারা তাদের বুর্জোয়া সম্মানের পজিশন স্কুল মাস্টরের কানে ধরারে মানতে পারেন নাই। ফলে তারা কানে ধরতে ধরতে, দুখী দুখী পোজ দিয়া ছবি তুইলা জানাইছেন তারা লজ্জিত। স্কুল মাস্টরেরা রাস্তায় বেতনের জন্য মানববন্ধন করলে, অনশন করলে এমনকী পুলিশের আক্রমণের শিকার হইলেও এমন প্রতিবাদ দেখা যায় নাই। এর মাধ্যমে কানে ধরার গুরুত্বটা বুঝতে পারা যায়।

মানুষ কেমনে কীসের প্রতিবাদ করবে এটা তার ব্যাপার। কিন্তু এই প্রতিবাদের ভেতরে যারা বুর্জোয়া লজ্জা ও অপমানের কান ধরা বিষয়টা দূর হইয়া গেল ভাবতেছেন তাদের ধারণা ঠিক নয়। যারা কান ধরতেছেন তারা কানে ধরারে লজ্জামূলক স্থান থেকে হটানোর কোনো উদ্দেশ্যে করতেছেন না। তাদের উদ্দেশ্য, সেই প্রাচীন বা প্রচলিত বুর্জোয়া উদ্দেশ্যই, অর্থাৎ লজ্জিত হওয়া। ফলে এরে বৈপ্লবিক কিছু মনে করা যাবে না। উপরন্তু এইটা কান ধরার লজ্জামূলক স্থানরে আরো বেশি আসন দেয়।

এই ধরনের আরেকটা প্রতিবাদ হইছিল ফুটবল দুনিয়ায়। বার্সার দানি আলভেজরে কলা ছুঁইড়া দিছিল ভিলারিয়ালের এক রেসিস্ট সমর্থক। তার মেসেজ ছিল এইরকম, তুই বান্দর, কলা খা। এইটা ইউরোপের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই বলা যাক। নিচের ছবিতে আছে বেলজিয়ামের এক মানব চিড়িয়াখানায় কালা মানুষের বাচ্চারে খাবার দিচ্ছেন এক ইউরোপিয়ান ধলা মহিলা।

muradul-12348

ব্রাসেলস, বেলজিয়াম, ১৯৫৮: মানব চিড়িয়াখানা

দানি আলভেজর তার উপরে আসা এই রেসিস্ট অ্যাটাকরে হিউমার দিয়া ডিল করছিলেন। তিনি কলায় এক দুই কামড় দিছিলেন। এরপরে অনেক ফুটবলারেরা এবং অনেক সমর্থকেরা উই আর অল মাংকিজ, সে নো টু রেসিজম বলে কলা খাওয়ার ছবি পোস্ট করছিলেন তাদের নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া টাইমলাইনে। তাদের কলা খাওয়ার যে অবস্থান ছিল তা স্পষ্ট এইরকম যে, আমরাও কলা খাই। কলা খাওয়া কোনো লজ্জার বিষয় না।

রেসিজমের বিরুদ্ধে এইটা ইন্টারেস্টিং একটা প্রটেস্ট ছিল।

কান ধরা এবং কলা খাওয়া এই দুই প্রটেস্টের চেহারা এক হলেও চরিত্রগত দিক থেকে এদের মিলানি যাবে না।  কারণ কলা খাওয়া প্রটেস্ট কলা খাওয়ারে লজ্জামূলক স্থানে যে দেখাইতে চাইছে রেসিস্ট সমর্থক তার বিরুদ্ধে খাড়ায় এবং এর প্রতিবাদ করে। কিন্তু কানে ধরা প্রটেস্ট কানে ধরার বুর্জোয়া লজ্জামূলক অবস্থানে তারে রাইখাই, কানে ধরানির প্রতিবাদ করে। দুইটা ভিন্ন বিষয়।

Tagged with:

About Author

মুরাদুল ইসলাম

জন্ম. জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট। প্রকাশিত বই 'মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী', 'গ্যাডফ্লাই', 'কাফকা ক্লাব', 'রাধারমন এবং কিছু বিভ্রান্তি' ইত্যাদি। ওয়েবসাইট: muradulislam.me