১.
বাড়িতে গেলে শেষ রোজার দিন আর রোজা রাখা হয়ে ওঠে না। ঘুরতে গিয়ে রোজা ভেঙে ফেলি। এ নিয়ে তিনবার এমন হল।

জুনের ২৫ তারিখে কোনো ভাবনা ছাড়াই ঘুরতে বের হই বাসা থেকে। সাথে আমার চাচাত ভাই বাপ্পি ছিল। ময়মনসিংহ শহরের গোহাইলকান্দিতে আমাদের বাসা। ভাবছিলাম নজরুলের ত্রিশাল দেখতে যাব। পরে আর মন চাইল না। যেহেতু ময়মনসিংহে বাড়ি তাই আশপাশের কোনো কিছু দেখার বাকি নাই। পরিচিত জায়গা ভাল লাগে না। তাই নিজ এলাকা ছেড়ে বের হলাম।

প্রথমে চুরখাই। সরু রাস্তা।  এক লোককে জিজ্ঞেস করলাম, এই রাস্তা কেমন? যাওয়া যাবে কিনা? বললেন, রাস্তায় পেক আছে। পেকের (কাদা) চিন্তা করে আর সেই রাস্তায় যায় নাই। কিছু দূর সামনে গিয়ে আরেকটা রাস্তা  পেলাম। রাস্তার পাশে তালগাছ। মনে হচ্ছিল, এই রাস্তাটা ভাল হবে। অামরা পানি  দেখতে পাব ক্ষেত-খামারের। বর্ষাতে খাল বিল গাঙে পানি জমে সাদা হয়ে যায়, দেখতে ভাল লাগে।

যাচ্ছি, যাচ্ছি। দেখি কিছু বাড়ি পর পর গরু জবাই করছে। সবাই একত্রে বসে মাংস কোপাচ্ছে। মনে হচ্ছিল কোরবাণীর ঈদ লেগেছে। আমাদের এলাকায় এত গরু কেউ জবাই করে না। যেতে যেতে দেখি রাস্তায় কাদা  ভরা। রিকশা ভ্যান ইজিবাইক, সবার চলাচলে কষ্ট হচ্ছে। সাইকেলওয়ালারাও নেমে যাচ্ছে। আমাদেরও নামতে হল।

বাইক দিয়ে যাওয়া খুব কষ্টকর। বার বার নামতে হয়। পাকা রাস্তায় ফেরত যাব, সেই উপায়ও নেই। অনেক ভেতরে চলে এসেছি। দোকানে দোকানে জিজ্ঞেস করছি, আর সামনের দিকে যাচ্ছি।

চোখে পড়ল একটা সাইন বোর্ড। এলাকার নাম ভাবখালী। এই ভাবখালীতে আমার এক বন্ধু থাকত। রতন। মনে পড়ল, ভাবখালী বাজারে রতনের বাবার পাইকারি চালের দোকান ছিল। কলেজে যখন পড়ি তখন ওর সাথে তেমন পরিচয় ছিল না আমার। ভার্সিটি ভর্তি কোচিং করতে গিয়ে ঘনিষ্ঠতা হয়।

ও তখন আমার বাসায় আসত। ওর কোনো বোন ছিল না বলে আমার বোনদেরকে বোন ডাকত। পরে আমার ছোটবোনের এক বান্ধবীর সাথে ওর প্রেম হয়। বছর খানেক প্রেম করার পরে রতনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি ফোন দিলে ও ফোন ধরত না, কোনো যোগাযোগও করত না। ওর সাথে দেখা করতে ওর বাসায়ও গেছি। বলেছে যে যোগাযোগ রাখবে। পরে আবার যেই সেই। তার পর থেকে ওর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নাই।

ভাবখালী বাজার ছেড়ে সামনে এগোতেই দেখি ডান দিকে একটা নদী। আমার চাচাত ভাই গল্প বলল, এই নদীর পাড় থেকে সাইকেল চালিয়ে এসে পাখির বাচ্চা নিয়ে গেছে। আমি সেখানে যেতে চাইলাম। ও বলল, সেটা আরো পেছনে। রোদে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছি। তাই যাওয়ার ইচ্ছে হল না আর।

২.
একটু সামনে গিয়ে দেখি একটা কাঁঠাল গাছ, সাথে একটা বাড়ি। বাড়ির পেছনে একটা ছোট ছেলে দা দিয়ে নারকেল গাছের পাতা কোপাচ্ছে। ছবি তুললাম ওর। সামনে তাকিয়ে দেখি চর। সেখানে অনেক গরু, কোনোটা ছাড়া কোনোটা বাঁধা অবস্থায় ঘাস খাচ্ছে।

একটা মেয়ে বাসন মাজছে সেখানে। কথা হল নূর ইসলাম মিয়ার সাথে। উনি  কৃষি কাজ করেন। সবজি ও ধান চাষ করেন। নিজেদের খাওয়ার জন্যে তিনি মাছও মারেন। তবে মাছ বিক্রি করেন না। তার চারটা গরু আছে। যেখান থেকে নূর ইসলাম মিয়া মাছ ধরেন সেইটা আমি ভেবেছিলাম নদী। তিনি বললেন, এটা ফুলপুর ডোবা। এলাকার লোকেরা এ নামেই ডাকে। ব্রহ্মপুত্র আসল নদী হচ্ছে  চরের ওপাড়ে।  দেখলাম অনেকেই মাছ ধরছে ডোবায়।

এখানে প্রায় প্রতি বাড়িতেই গরু পালা হয়। আমাদের হাতে ক্যামেরা দেখে নূর ইসলাম মিয়া বললেন, আরেকটু আগে আসলে বড় জাল দিয়ে মাছ ধরার ছবি তুলতে পারতেন।

আমি যেখানে ওনার সাথে কথা বলছিলাম সেটা দড়ি ভাবখালী গ্রাম। ডোবা পার হয়ে কাশিয়ার চর। চরের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ। কাশিয়ার চরটা ডোবা আর ব্রহ্মপুত্র নদের মাঝখানে পড়েছে। এটা ভাবখালী ইউনিয়নের ভেতরে। পূর্বে কাশিয়ার চর আর পশ্চিমে ভাবখালী চর।

ডোবা পার হয়ে চরে গেলাম নৌকায়। সাথে ছিল দুইটা ছোট ছেলে, নাম জিজ্ঞেস করা হয় নাই। ওদের ভীষণ আগ্রহ দেখতে পেলাম ছবি তোলার। নৌকা যখন মাঝখানে তখন ওরা নৌকা থেকে পানিতে ঝাঁপ দিল গোসল করতে। এবং আমাকে বলছে, “ছবি তুলুইন আমরা গোসল করতাছি।” ওরা দিনে কত বার গোসল করে কে জানে! পানির মধ্যেই থাকতে হয়।

পাড়ে ভিড়ে দেখি একটা ছাউনির ভেতরে নৌকা বানাচ্ছেন দু্ই জন। আমাদের ডেকে ছায়ায় বসতে বললেন। আগ্রহ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, চরে পানি ওঠে না? বললেন, না এখানে পানি ওঠে না, উচু জায়গা তো তাই।

বিশ্রাম নিয়ে আমরা একটা বাড়ির উপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে গেলাম। যাওয়ার সময় দেখি একটা লোক ঘর মেরামত করার জন্য বাঁশ ফালি করছেন। আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দিলেন, “এইদিক দিয়ে যান, সামনে নদী পাবেন।”

চরে পাটশাক, ডাটাশাক, পুঁইশাকের ক্ষেত আছে। চরের এক একটা বাড়ি দূরে দূরে। পাশাপাশি কোনো বাড়ি নাই।

 

চরে যাবার রাস্তা, বর্ষায় উজান থেকে পানির ঢলও নামে এই দিক দিয়ে।

নারকেল গাছের পাতা কাটতে দা নিয়ে দাড়িয়ে আছে শিশু, তার ভাই আনন্দে লাফাচ্ছে।

কিছু গরু দড়ি ছাড়া কিছু  বাঁধা অবস্থায় ঘাস খাচ্ছে।

ডোবায় এসে বাসন মাজছে গা’য়ের মেয়ে।

মাছ মারা শেষে রোদে জাল শুকাচ্ছে।

ডোবায় দল বাঁধা হাঁস।

নৌকায় মাছ ধরে বাড়ি ফিরছেন তারা।

শিশু বাবার সাথে মাছ ধরতে এসে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

চরের একটি বাড়ি।

ফসলি জমিতে পানি  উঠছে।

পাট ক্ষেত।

খেয়া জাল দিয়ে মাছ  ধরছে দুই ভাই।

দেশি মাছ। বাইল্যা, চাঁদা, চিকরা, চিংড়ি, পুঁটি ইত্যাদি।

দুই জনে মিলে নাও বানাচ্ছে।

বিক্রির জন্যে পাট শাক তোলা হচ্ছে।

বাঁশ দিয়ে ঘর বানাবেন তিনি।

বাড়ির পেছনে ব্রহ্মপুত্র নদ।

পুঁই ক্ষেত।

নদীর পাড়ে এমন অনেক কলা গাছ আছে, এটা বিচি কলা গাছ।

দুই চরের মাঝে ব্রহ্মপুত্র নদ।

পাট ক্ষেতের ভেতর দিয়া হাটার রাস্তা।

চরে প্রত্যেক বাড়ির  সামনেই এমন ভাবে গরু পালন করা হয়।

খড়ে পোকা খাচ্ছে মোরগ-মুরগি।

বাড়ি  ফিরছেন।

পাড় ভাঙনে পাট ক্ষেত পানিতে চলে যাচ্ছে।

পাড় ভাঙছে।

মাথায় ঝুড়ি বেধে মাছ ধরছেন, সন্ধ্যায়ও বাড়ি ফিরেন নি।

দুইটা বক।


ইউটিউব ভিডিও: কাশিয়ার চর, ভাবখালী, ময়মনসিংহ

About Author

সাঈদ রূপু
সাঈদ রূপু

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় অনার্স।