page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

কুটুম ও খানাব্যবস্থা

অত্যন্ত শুকনো এই দোকানদারের সঙ্গে আমার কথা হয় নিয়মিত। বিভিন্ন দোকানির সঙ্গে কেনাকাটার সময় আমার লাগাতার কথাবার্তা হয়। কখনো কখনো আমার কেনা জিনিসপাতির তুলনায় কথিত শব্দাবলী গুরুতরভাবে ভারী হয়ে থাকে। অল্পবিস্তর সময় ছাড়া কখনোই তাতে দোকানিদের তেমন ওজর-আপত্তি করতে বা বিরক্ত হতে দেখি নি। তবে এসব পড়শির নাম জানার ক্ষেত্রে আমার অস্বস্তি এবং বিস্মৃতি দুই-ই কাজ করে। আমি নাম জানতে চাইতে আরাম পাই তাঁদেরই যাঁদের নাম ও সেলফোন নম্বর আমার সেলফোনে তুলবার কারণ থাকে।

পানির কল সারেন যিনি, বিদ্যুতের কাজ করেন যিনি, এমনকি সেলফোনে ফ্লেক্সি করেন যিনি এঁদের নাম ও ফোন নম্বর যুগপৎ জিজ্ঞেস করে আমি অনায়াসে ফোনে ভরে রাখি। এসব ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই ধরনের চাতুর্যও আমি করে থাকি। এসব অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গরিব মানুষজনের নাম ভুলে যেতে পারি আশঙ্কায় আমি তাঁদের পেশাবর্গও নামের আগে বা পরে লিখে থাকি। স্মার্টফোন পরে খুঁজে দেয় ভুল যাওয়া নাম, প্রয়োজনের সময়। এসব চাতুর্যের কারণে শুরুতে আমি খানিক বিব্রতও থাকতাম মনে মনে। তবে পরে ধীরে ধীরে নানাবিধ প্রবোধ দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছি।

manosh chy logo

ফোনে নথিভুক্তির শর্ত বিবেচনায় শুকনো এই দোকানদারের নামও থাকতে পারত আমার ফোনে। কারণ একটা চারপেয়ে চা-পান-সিগ্রেটের দোকান চালানো ছাড়াও তিনি ও তাঁর পরিজনেরা মিলে ফোনে ফ্লেক্সিও করে আসছিলেন অনেক দিন। কিন্তু কোনো একটা কারণে তাঁর নাম আমার ফোনে রাখা হয় নি, বা তাঁর নাম জানা হয় নি, বা জানা হলেও মনে নেই আর। ফলে তাঁর একটা নাম এখানে ধরে নিতে হবে। ধরা যাক তাঁর নাম আয়েশা।

আয়েশাকে শুকনো বলতে এতটুকু সমস্যা হবার কিছু নেই। ওজনে মাপলে তাঁকে ৪০ কেজি করানো অসম্ভব হবে। তিনি ৩৫-এর আশপাশে থাকবেন বলে আমার ধারণা। এরকম শুকনো, হাসিখুশি-পান-খাওয়া মুখ, আর বিয়ে-সংসার সব মিলে হিসেব নিকেশ করে তাঁর বয়স নির্ণয় খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিসেব-নিকেশ করলে তাঁকে ২২/২৩-এর বেশি সায় দেয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু তাঁর রুগ্ন ও শ্রমক্লিষ্ট চেহারায় মাঝেমধ্যেই সেটা অন্তত ১০ বছর বেশি মনে হয়।

তাঁর এই দোকান উত্তরার এই পাড়ার মোড়ের এপাশ-ওপাশ মিলে কমবেশি লাগাতারই আছে। এপাশ-ওপাশ কারণ মাঝেমধ্যেই রাস্তার পাশের এসব দোকানের ‘উচ্ছেদ’ হতে হয়। পরে আবার কোনো প্রভাবশালী লোকের স্নেহে-সুপারিশে আবার বসেন। এরকম। মাঝেমধ্যে এরকম পুনর্বার বসার আগে কিছু সময় পার হয়ে যায়। নেহায়েৎ প্রতিদিন চারপেয়েটা দেখার অভ্যাস বলে হয়তো আরেক অপেক্ষাকৃত স্থাপিত দোকানে জিজ্ঞেস করে জেনে নিই ‘কই গেল?’!

আয়েশার দোকানের পরিবার-পরিজনের বিষয়টা আসলেই গুরুতর। এই চারপেয়ে দোকানটাকে বিভিন্ন সময়ে আমি চালাতে দেখেছি আয়েশাকে, তাঁর শাশুড়িকে, একজন ‘সচ্ছল-দেখতে’ মামাশ্বশুরকে, গুরুতর অসুখ হবার আগ পর্যন্ত রীতিমত জোয়ানমর্দ আয়েশার শ্বশুরকে। আর আশপাশে মাঝেমধ্যে ঘুর ঘুর করতে দেখেছি অন্তত দুই বা তিনজন বাচ্চাকে। গত ২/৩ বছরের সময়কালে, এই দেখাদেখির মধ্যে আমি কখনোই আয়েশার স্বামী কিংবা তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ির কোনো ছেলেকে এই দোকানে দেখি নাই। বা তাঁরা আশপাশে কখনো থাকলেও দোকানির ভূমিকা কখনোই নেন নাই।

আমার পক্ষে গল্প বা আলাপ জমানোর জন্য আয়েশা বা তাঁর শাশুড়ির মধ্যে কে অধিক সুবিধাজনক তার ফয়সালা সহজ নয়। দুজনেই তুমুল মিশুক। মাঝেমধ্যেই আমাকে আপ্যায়ণের প্রসঙ্গ আমি তুললে আয়েশা এবং তাঁর শাশুড়ি দুজনেই একই রকম উৎসাহ নিয়ে আমাকে আগামী প্রতিবার বিনা পয়সায় চা খাবার উৎসাহ দেন। কখনো কখনো দুজনকে একত্রে দোকানে পাওয়া যায়। তখনো দুজনে পাল্লা দিয়ে গল্প করেন। আমার সঙ্গে খায়খাতির নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনোরকম বিরোধ আমি পাই নাই।

এমনকি আয়েশার তুতো সেই মামাশ্বশুরও দারুণ রকম মিশুক। পান-খাওয়া মুখে প্রায়শই একটা পানের দাওয়াত আমাকে দেন, যা আমি খাই না। মাঝেমধ্যে সাদা লুঙ্গি-সাদা পাঞ্জাবি মামাশ্বশুরকে এর-তার মোটর সাইকেলের পিছনে ভুশভুশ করে কোথাও চলে যেতে দেখি। আবার কখনো আগের দিনের থেকে দুইগুণ মুখ-লাল-করা পানে তাঁকে দেখা যায়। আবার আরেক দিন হয়তো আগের দিনের থেকে বহুগুণ কুচকুচে কালো গোঁফ-দাড়ি-চুলে তাঁকে দেখা যায়। পরিপাটি ছাঁটের রং-করা কুচকুচে কালো চুল-দাড়ি-গোঁফ আর ফকফকা সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবিতে মামাশ্বশুর আমার চোখ কাড়েন নিয়মিত।

আলাপ কঠিন আয়েশার শ্বশুরের সঙ্গে। অসুখ হবার আগ পর্যন্ত আয়েশার শ্বশুরমশাইকে যতবার পেয়েছি, একটা কার্যকরী আলাপ তাঁর সঙ্গে গড়ে তোলা কখনোই সুবিধাজনক মনে হয় নাই। গুরুতর অসুখ হবার পর শ্বশুরকে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে। এই পরিবারের গুরুতর আর্থিক বিপর্যয় ঘটেছে। কাগজে-কলমে সুস্থ হবার পর তিনি দু’একবার দোকানে বসেছেন বটে। সেটা পরিবারের অন্যদের সঙ্গে সময়-কাটানোই বলা চলে। তিনি নিজে সার্বভৌম আর দোকানে বসেন না। আর কথাবার্তা আগের থেকেও কয়েক ভাগ কমিয়ে দিয়েছেন।

সেদিন আয়েশার সঙ্গে গল্প হচ্ছিল ওর দেশের বাড়ি আর ঢাকার বাসা ইত্যাদি নিয়ে। সংক্ষেপে প্রাক-বিবাহ পরিবারের পত্তনি, ওর ঢাকা অভিবাসন, আর বিবাহোত্তর গেরস্থালি ব্যবস্থাপনা—এই ছিল আমাদের আলাপের বিষয়। ময়মনসিংহের এক গ্রামে ওর বাসা। কাজ খুঁজতে খুঁজতে গার্মেন্টসেরই একটা কাজে ঢাকা আসেন। এই দোকানের আসল মালিকের ছেলে অর্থাৎ আয়েশার শাশুড়ির ছেলের সঙ্গে হঠাৎ পরিচয়, প্রেম, বিয়ে। সেই ছেলে আয়েশার ভাষায় কী জানি ‘ধান্দা-মান্দা’ করেন। বিয়ের পর এই বাড়িতে মানে আয়েশার শ্বশুর-শাশুড়ি যে ‘বস্তিবাসা’তে থাকে সেখানে তোলেন আয়েশার বর।

এরপর জানা গেল এই বিয়ে আয়েশার শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রহণ করেন। আয়েশা নিজ উদ্যোগে জানালেন যে আগের বউয়ের সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ি মিলমিশ করে থাকতে রাজি নন। থাকেনও না। তার কারণ হিসেবে আয়েশার দুটো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। এক বউ ‘ভাল’ না। আশপাশের আলাপ হিসেবে এই ‘না-ভাল’কে বুঝতে হবে বউয়ের মেজাজ-মর্জি গরম হিসেবে। অন্য ব্যাখ্যাটা হলো সেই বিয়ে গোপনে আয়েশার বর করেছিলেন। আয়েশাই আসলে তাঁর বরের স্ত্রী, যদিও দ্বিতীয় স্ত্রী। এতক্ষণে দুই বউয়ের হিসেব পাবার পর আমি আয়েশার সঙ্গে গায়ে লেপ্টে-থাকা সেদিনের প্রায় সমবয়সী দুই শিশুর পরিচয় জানতে তৎপর হলাম। যেমন ভেবেছিলাম, তাঁর বাচ্চার সঙ্গে সেদিন কেক-খেতে-থাকা অন্য শিশু হচ্ছে ‘ওই জনের’। আয়েশার সতীনের।

শ্বশুর-শাশুড়ি সমেত আয়েশা থাকেন এক বাসায়। আয়েশার সতীন থাকেন আরেক বাসায়। আয়েশার বর দুই বাসায় যাতায়াত করেন মর্জিমতো। অনুমতিহীন প্রথম বিয়ের খেসারত আর পুত্রের দায়িত্ব হিসেবে আয়েশার বর পরিবারের প্রাত্যহিক খানাপিনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ আয়েশার শ্বশুর, আয়েশার শাশুড়ি, একজন দেওর, আয়েশা আর আয়েশার কন্যা—এই সকলের খানাপিনার ভার আয়েশার বরের। এটা পুরো ভোজনব্যয় কিনা আমি নিশ্চিত নই, তবে ভোজন-ব্যবস্থাপনা অবশ্যই। অন্তত এই আলাপকালে এই ব্যবস্থা। সতীনের কন্যা দোকানে বা বাসায় আয়েশার সঙ্গে ঘুরঘুর করলেও আয়েশা তাঁর সতীনের বাসায় ঘুরতে যান না।

তাহলে আয়েশা কীভাবে খান? এই প্রশ্ন তখন দেখা দিতে বাধ্য। আমি করলাম। আমার জিজ্ঞাসা বেশ দুরূহ লাগছিল আমার, তবে আয়েশার উত্তর বেশ সহজ। আয়েশার শ্বশুর-শাশুড়ি সামান্যই দূরে-থাকা ছেলের বড় বউয়ের বাসায় যান টিফিন ক্যারিয়ার সমেত। ওঁরা ফিরবার সময় আয়েশার জন্য খাবার নিয়ে আসেন। এঁরা খাবার সময়ে আয়েশার সতীন টিফিন ক্যারিয়ার তৈরি করে দেন।

আদাবর, ১৯ জুলাই ২০১৫

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।