কৃত্রিম জরায়ুর পক্ষে-বিপক্ষে

শেয়ার করুন!

১৯৩২ সালে অলডাস হাক্সলির ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড উপন্যাসে বিশাল এক ফ্যাকটরিতে ভবিষ্যতের শিশু উৎপাদনের বর্ণনা ছিল। একই চিত্র এসেছে লোগান’স রানেও। সেখানে দ্রুত মানবসংখ্যা বৃদ্ধির আশায় গর্ভবতী বানানো মেয়েদের ভ্রূণ বের করে নেয়া হয় কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের মাধ্যমে। ফিলিপ কে. ডিকও তার দি ডিভাইন ইনভেশন উপন্যাসে সিনথেটিক বা কৃত্রিম জরায়ুর বিষয়টি সামনে এনেছিলেন।

কৃত্রিম জরায়ুর বৈজ্ঞানিক, সামাজিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক দিক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মাদারবোর্ড পত্রিকায় নিবন্ধ লিখেছেন প্রখ্যাত ভবিষ্যৎবাদী লেখক সাংবাদিক দার্শনিক জোলটান ইস্টভান। জোলটান ইস্টভান বেস্টসেলিং উপন্যাস ট্রান্সহিউম্যানিস্ট ওয়েজার-এর লেখক। মানুষের স্বাভাবিক সামর্থ্যের বাইরে ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে তা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখেন তিনি।  লেখাটি তার   Artificial Wombs Are Coming, but the Controversy Is Already Here’ থেকে অনূদিত।

আসছে কৃত্রিম জরায়ু, এবং বিতর্কও শুরু হয়ে গেছে

জোলটান ইস্টভান

ট্রান্সহিউম্যান প্রযুক্তির যেসব জিনিস আসছে সামনে তার একটি মানুষকে হয়তো মুগ্ধ করবে বা হয়তো দ্বিধায় ফেল দেবে। এর নাম একটোজেনেসিস—এটি মানবদেহের বাইরে কৃত্রিম জরায়ুতে ভ্রুণ রেখে তা আস্তে আস্তে বড় করবে।

সন্তানের জন্যে মানুষের যে সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাতে মৌলিক বদল ঘটাতে যাচ্ছে একটোজেনেসিস। নারী-শরীরের ব্যাপারে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি  এবং পুনরুৎপাদনের অধিকার সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে এই একটোজেনেসিসের।

এটি তাই সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিতর্কের উৎস।

একটোজেনেসিস শব্দটি ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেবিএস হ্যাল্ডেন উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ২০৭৪ সালের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ জন্ম মানুষ নিজে দিবে। তার উপলব্ধির থেকেও দ্রুত বিজ্ঞান এগিয়েছে। এবং সম্ভবত তার ধারণা বেশ রক্ষণশীল ছিল। আমার মত কোনো কোনো ভবিষ্যৎবাদীর ধারণা, ২০ বছরের মধ্যে একটোজেনেসিস শুরু হবে এবং ৩০ বছরের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে।

এটা নিতান্ত কাল্পনিক কোনো ধারণা না। প্রথমত চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়নে বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে কাজ করছেন।  সম্প্রতি একটি অলাভজনক দৈনিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং ন্যায়বিচার ইস্যুতে এ সংক্রান্ত খবর এবং বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সাংবাদিক সোরায়া চেমালি একটোজেনেসিস ক্ষেত্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানী এবং তাদের গবেষণা নিয়ে লিখেছেন।

এই লেখায় দুটি সফল প্রচেষ্টার কথা এসেছে।  সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের বাঁচাতে জান্টেন্ডো বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি অধ্যাপক ড. ইয়োশিনরি কুয়াবারা অ্যামনিওটিক ফ্লুইড রাখা ট্যাঙ্ক আছে এমন একটি মেশিনে সফলভাবে ছাগলের ভ্রূণ স্থাপন করেছেন।

আর যেসব নারী সন্তান ধারণে অক্ষম এবং জরায়ুতে যাদের ভ্রূণ বাড়ে না তাদের জন্যে কাজ করছেন ড. হেলেন হাং-চিং লিউ। তিনি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজনন ঔষধ ও অনুর্বরতা কেন্দ্রের পরিচালক। ২০০৩ সালে তিনি এবং তার দল ইঁদুরের ভ্রূণ বড় করার চেষ্টায় প্রায় পুরোপুরি সফল হন। এই প্রক্রিয়াতে তারা বায়ো-প্রকৌশল প্রয়োগ করা এক্সট্রা জরায়ুতে ইনিজিনিয়ারিং করা অ্যান্ডোমেট্রিয়াম টিস্যু যোগ করেছিলেন।

helena1
ড. হেলেন হাং-চিং লিউ

আরো সাম্প্রতিক কালে, ড. হেলেন হাং-চিং লিউ ১০ দিন ধরে একটি মানব ভ্রূণের বৃদ্ধি ঘটিয়েছেন কৃত্রিম জরায়ুতে। তার কাজের আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী এই ধরনের গবেষণা কাজের জন্য তিনি ১৪ দিন সময় পান। এটা জটিল হলেও তার লক্ষ্য বহিস্থ জরায়ুকে কাজ করানো।

একটোজেনেসিস প্রযুক্তি আপাতভাবে দেখতে সহজ হলেও খুব জটিল একটি প্রক্রিয়া। মূলত অ্যামনিওটিক তরলে ভর্তি একটি অ্যাকুরিয়ামে একটি বাড়তে থাকা জীবন্ত ভ্রূণের সাথে কিছু ফিডিং টিউব এবং পর্যবেক্ষণ করার তার লাগানো থাকে। এই টিউবগুলির মাধ্যমে সেই ভ্রূণে অক্সিজেন, পুষ্টি ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। আর তারগুলি ট্যাঙ্কের ভিতরের সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। সবকিছু মিলে একটা ম্যাট্রিক্স ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়।

যদিও কৃত্রিম মানব ভ্রূণ বৃদ্ধির প্রযুক্তি এর মধ্যেই হস্তগত তবু  ঠিক ভাবে ভ্রূণ বৃদ্ধির পরীক্ষা-নীররিক্ষায় কম পক্ষে আরো একটা দশক লেগে যাবে। এই দেরির বড় কারণ বিতর্কিত এই ধারণা বিষয়ে নৈতিক বাধা ও অস্পষ্ট আইন।

মানবদেহ ছাড়াই প্রজাতির এই বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে অনেক দূরের ব্যাপার মনে হয়। এমনকি এটা যদি সত্যিই ঘটে, প্রশ্ন আসে যে মানুষ এটা ব্যবহার করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করবে কিনা। আমি বলব যে হ্যাঁ। এর কারণ খুব স্পষ্ট—যন্ত্রণা, পরিশ্রম, সময়ক্ষেপণ এগুলির পাশাপাশি সন্তান জন্ম দেওয়া মায়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও।

একটোজেনেসিসের মানে দাঁড়াচ্ছে বাধ্যতামূলকভাবে সন্তান জন্মদানের দায়িত্ব আর নারীদের বইতে হবে না। অথবা নয় মাস পেটে বাচ্চা বহন করার সময় এরকম বিরক্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হবে না যে, আমি যে পানি পান করি তা কি আমার সন্তানের মস্তিষ্কের বৃদ্ধিতে খারাপ প্রভাব ফেলছে? আমাকে যে ফ্লু ভাইরাস আক্রান্ত করেছে তা কি আমার সন্তানের শরীর নষ্ট করে ফেলবে? গতরাতে আমি যে অর্ধেক গ্লাস মদ খেয়েছি তা কি আমার সন্তানের আইকিউ কমিয়ে দেবে?

বরং বেশি গুরুত্বের দিক জন্ম নেওয়া শিশুর স্বাস্থ্য। প্রাকৃতিকভাবে জন্মদানে ঝুঁকি অনেক বেশি। একটোজেনেসিস তার নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। এই প্রক্রিয়াতে ভ্রূণের প্রতিটি হার্টবিট, পা নাড়ানো, প্রতিটি মুহূর্ত যত্নের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়। একেবারে জাইগোট অবস্থা থেকে শিশুর প্রথম শ্বাস গ্রহণ পর্যন্ত। শিশু যে পুষ্টি পায় তা মাপা হয়, প্রতিটি মুহূর্তের ভিডিও হয়, সঠিক টাইমিং এর জন্য প্রতিটি হার্টবিট বিশ্লেষণ করা হয় এই প্রক্রিয়ায়।

নতুন প্রযুক্তির সাথে সাথে প্রথাগত সামাজিক এবং জৈবিক রীতিনীতিগুলিকে নিরাপত্তা, দক্ষতা, ব্যবহারিকতা ইত্যাদির সাথে অনুশীলন করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একটোজেনেসিস যতটা এক মাত্রিক ব্যাপার মনে হয়, এটি আসলে তা নয়। এর সাথে দার্শনিক এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলিও যুক্ত।

Artificial Wombs1যে দার্শনিক বিষয়টি সবার আগে আসে তা হলো, সমাজ নারীদেরকে যেভাবে দেখে আসছে একটোজেনেসিস তা বদলে দিতে পারে। যা নারীর ব্যাপার তা যদি কৃত্রিম প্রক্রিয়া দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয় তবে কি নারী তার আসল বৈশিষ্ট্য হারাবে? আমার উত্তর হলো—না। বরং একটোজেনেসিস নারীদের গৃহবন্দি অবস্থার মুক্তি দেবে এবং তাদের সন্তান নেওয়ার বয়সের দৈর্ঘ্য বাড়াবে।

তবে কিছু নারীবাদী একটোজেনেসিসকে দেখছেন সংশয়বাদী দৃষ্টি দিয়ে। তারা বলছেন, এটা নারীদের জন্মদানের পবিত্র ক্ষমতার উপর বিজ্ঞনের হস্তক্ষেপ। ফেমিনিস্ট পার্সপেক্টিভ ইন মেডিক্যাল এথিকস বইয়ের একটি লেখায় সাউদার্ন মেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রধান এবং দর্শনের অধ্যাপক জুলিয়েন এস. মারফি লিখেছেন, একটোজেনেসিস নারীবাদীদের মধ্যে মতবিরোধ বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাজনৈতিক দিকটিও জটিল। বর্তমানে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারী এবং আলোচনা ওঠানো বিষয়ের একটা এই পুনরুৎপাদন অধিকার এবং জন্মদান। রক্ষণশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির এবং ধর্মীয় গোষ্ঠির মানুষজন সম্ভবত এই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করবে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী সমাজের মধ্যে যে মিথোজীবি বন্ধন আছে তা নষ্ট হতে পারে।

অনেকে বলছেন, কৃত্রিম জরায়ুতে ভ্রূণ বাড়লে তা মায়ের শরীরের সরাসরি সান্নিধ্য পাবে না। সাংবাদিক এবং অধ্যাপক জন ন্যাসিভেরা আমেরিকা, দি ন্যাশনাল ক্যাথলিক রিভিউতে লিখেছেন, আমি বলতে পারি এই সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত করা একটি মারাত্মক বিষয়।

এই অবস্থায় একটোজেনেসিসের পক্ষের মতামত হচ্ছে কৃত্রিম জরায়ু মা এবং ভ্রূণ দুজনের জীবনকেই নিরাপদ ও সহজ করে তুলবে, যেসব নারী জরায়ু বা জননেন্দ্রিয়ের সমস্যার কারণে সন্তান ধারণ করতে পারছেন না তারা যে সুবিধা পাবেন সে কথা না হয় না-ই বলা হল। কয়েকজন বায়োএথিসিস্ট বা জৈব-নীতিবিশেষজ্ঞরা বলেছেন একটোজেনেসিস সমকামী দম্পতি এবং সিঙ্গেল মানুষকে তাদের সন্তানের ভ্রূনের বৃদ্ধি ঘটানোর জন্য সারোগেট মাদার ব্যবহার করা থেকেও মুক্তি দিবে।

ভবিষ্যতে কী হবে তা বাদ দিয়েই বলা যায়, আমাদের প্রযুক্তি-প্রিয় প্রজাতি নিজেদের কীভাবে দেখে এবং আমাদের সন্তানেরা কীভাবে জীবনে প্রবেশ করবে তার একটি রাস্তা প্রদানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ট্রান্সহিউম্যানের একটি আলোচিত টপিক এই একটোজেনেসিস।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here