page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

কেন এই সময়ের বাচ্চারা এত খাপছাড়া, বেয়াদব আর কর্তৃত্বপরায়ণ!

নিউ ইয়র্কের ড. লিওনার্ড স্যাক্স ২৭ বছর ধরে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ও সাইকোলজিস্ট হিসাবে কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাবা-মা, শিক্ষক, সামাজিক কর্মী, কাউন্সেলর, স্কুল সাইকোলজিস্ট, কিশোর অপরাধের বিচারের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের জন্য ওয়ার্কশপ আয়োজন করে আসছেন। তিনি একজন বাবা। সম্প্রতি তার চতুর্থ বই ‘দ্য কলাপস অব প্যারেন্টিং’ প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি পেনসিলভানিয়ার এক্সটনে বাস করেন। স্যাক্স মনে করেন, এখন আমেরিকান পরিবারগুলি কর্তৃত্বের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। পরিবারে বাচ্চারা কর্তৃত্বে থাকে, তারা মানসিক এবং শারীরিক উভয় দিক দিয়েই খাপছাড়া হয় এবং এ কারণে তাদের ভুগতে হয়। তিনি এই সমস্যার সমাধান হিসাবে পারিবারিক শৃঙ্খলা নতুন করে সাজাতে বলছেন। দি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এ ব্যাপারে ড. লিওনার্ড স্যাক্সের সাথে যে আলাপ করেছে তা নিচে যুক্ত হলো।

leonard-sax

ড. লিওনার্ড স্যাক্স

প্রশ্ন: ‘দ্য কলাপস অব প্যারেন্টিং’ বলতে আপনি আসলে কী বুঝিয়েছেন?

স্যাক্স: একটি ১০ বছরের ছেলের সাথে একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি লিখেছি। ছেলেটি বসে বসে তার মোবাইলে একটি গেম খেলছিল, সে আমাকে আর তার মাকে পাত্তা দিচ্ছিল না, আমি তার মায়ের সাথে তার পেট ব্যাথার ব্যাপারে কথা বলছিলাম। তার মা আমাকে তার পেট ব্যাথা সম্পর্কে বলছিল, আর সে তার মাকে তখন বলল, “চুপ করো মা, তুমি জানো না তুমি কী বলছ”—বলে সে হাসছিল।

১৯৯০ বা ২০০০ এর দিকে এটা বেশ অস্বাভাবিক ছিল, কিন্তু এখন এটা খুবই সাধারণ ঘটনা। বাচ্চারা, ছেলেমেয়ে সব বাচ্চাই এখন বাবামাকে অসম্মান করে, একে অন্যকে সম্মান করে না, তারা নিজেদের সম্মান করে না। এটা তাদের কথাবার্তা বা অন্যান্য আচরণেই ফুটে ওঠে। সেই মা-টি কিছুই করলো না, তাকে শুধু কিছুটা বিব্রত দেখালো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কালচার এমনভাবে বদলে গেছে যে তাতে বাচ্চাদের আসলেই ক্ষতি হয়েছে।

প্রশ্ন: এই বইটি আসলে কী সম্পর্কে?

স্যাক্স: বাবা-মা থেকে সন্তানে কর্তৃত্ব চলে আসার ব্যাপারে এই বই। আমি মনে করি, আপনার উচিৎ বাচ্চাদের সাথে বড় মানুষের মত ব্যবহার করা। তারা প্রাপ্তবয়স্কদের মত আচরণ করবে এমন আশা করা উচিৎ, আমি মনে করি এটাই তাদের সাথে বড়দের মত আচরণ করা, যদিও কারো সাথে বড়দের মত আচরণ করা বিষয়টি অস্পষ্ট।

এর মানে কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়।

american-1

আমেরিকান পরিবার

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের দেশে এখন খুব সাধারণ ব্যাপার ৮ বছর অথবা ১২ বছর বয়সী বাচ্চাদের বিভিন্ন স্কুলে নিয়ে যায়, শিক্ষার ক্ষেত্রে বাবা-মা কনসালট্যান্টের কাজ করে। বাবা-মা রেকমেন্ড করে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় বাচ্চারা। আমি অনেক ঘটনা দেখেছি যেখানে বাচ্চারা স্পষ্টতই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাবা-মা সেটা বুঝতে পারলেও এর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারে নি, তারা বাচ্চার সিদ্ধান্তের ওপর আরেকটা সিদ্ধান্ত দিতে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে। পরে বাচ্চাকেই সমস্যায় পড়তে হয়।

প্রশ্ন: অন্য উদাহরণগুলি কী কী?

স্যাক্স: বেডরুমে সেলফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। এখন আপনি ১০, ১২, ১৪, ১৬ বছর বয়সী অনেক বাচ্চাকে পাবেন যাদের রাত দুইটায়ও বেডরুমে সেলফোন থাকে। আপনি রাতে ফোনটি নিয়ে চার্জে দিবেন, যাতে ফোনটি তাদের বাবা-মায়ের ঘরে থাকে। কোনো রকম নজরদারি ছাড়া কোনো বাচ্চাকেই বেডরুমে ফোন দেওয়া উচিৎ নয়।

এটা শুধু আমার মতামত নয়। ২০১৩-এর অক্টোবরে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস ইন গাইডলাইন্সে প্রকাশিত হওয়া অফিসিয়াল শিক্ষা এটা। কিন্তু আপনি অবাক হবেন যে, বা হয়ত হবেন না, কত অসংখ্য বাবা-মা এই ব্যাপারটাকে বাচ্চাদের নির্দেশ দিতে অসম্ভব মনে করে। অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানকে নির্দেশ দেওয়ার কর্তৃত্ব তাদের হাতে নেই।

প্রশ্ন: আপনি ফ্যামিলি-ডিনারের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন?

স্যাক্স: গবেষণায় দেখা গেছে, কোনোরূপ বাঁধা বিপত্তি ছাড়াই বাড়িতে ফ্যামিলির একসাথে খাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন। যদি তা না ঘটে তার মানে হলো বাবা-মার সাথে বাড়িতে সময় কাটানোকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানে হলো, এই ব্যাপারটা তেমন কিছু না, এটা বাদ দিলেও চলে বা ভুলে গেলেও চলে।

বাড়িতে খাওয়ার সময়ে ফ্যামিলি হিসেবে যোগাযোগ করাটা আমাদের প্রথম প্রাধান্য। এই কাজের মধ্য দিয়ে আপনি বোঝাচ্ছেন যে ফ্যামিলি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বাচ্চাই এখন দৌড়াচ্ছে কিন্তু কোথাও যেতে পারছে না। তাদের রেজুমিতে অনেক জিনিস যোগ করার চেষ্টা করছে এক্সট্রা কারিকুলার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, কিন্তু তারা জানে না কেন। ১৫ বছর বয়সেই তারা ঝরে যাচ্ছে।

প্রশ্ন: গাড়িতে সময় কাটানোর ব্যাপারে কী বলবেন?

গাড়িতে কান খোচানো চলবে না। সাধারণত যা ঘটে, বাচ্চারা বাবা-মা’র সাথে এনগেইজ করে না। সবাই তাড়ার মধ্যে আছে। গাড়িতে একসাথে যে সময়টা, সেটা খুবই মূল্যবান। গাড়িতে কাটানো সময়ে আপনি আপনার বাচ্চার কথা শুনবেন, আপনার বাচ্চা আপনার কথা শুনবে।

আমার মেয়ের বয়স ৯ বছর এবং ‘ম্যারি পপিনস’-এর প্রায় প্রতিটা গানের লিরিক আমার মুখস্থ।

প্রশ্ন: একটি শিশু অথবা টিনএজ বাচ্চাকে পরিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক হতে বাবা-মা’রা কী ধরনের সহায়তা করতে পারে?

স্যাক্স: প্রথম হলো নম্রতা শেখাতে হবে, যেটা এখন আমেরিকান কোনো বাচ্চার মধ্যেই নেই। আমার সাথে বাচ্চাদের দেখা হলে এই জিনিসটা কী তা আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, এবং তারা আক্ষরিক অর্থেই তা জানে না। থার্ড গ্রেড থেকে টুয়েলভ গ্রেডের ক্ষেত্রে আমি জিজ্ঞাসা করে দেখেছি। এই ক্ষেত্রে থার্ড গ্রেডের বাচ্চাদের চেয়ে হাই স্কুলের বাচ্চারা বেশি অজ্ঞ।

তারা নিজেদের দিয়ে এত বেশি মুগ্ধ যে তারা বুঝতেই পারে না তাদের এই স্থূল সেলফ স্টিম কীভাবে তাদেরকে অপমানজনক অবস্থায় নিয়ে যায়। আমি দেখেছি, একটি মেয়েকে বলা হয়েছিল সে কত দারুণ, অথচ সে এখন ২৫ বছর বয়সে খুবই সামান্য বেতনে একটা কিউবিকলে বসে কাজ করে, দুইটা উপন্যাস লিখেছে কিন্তু কোনো এজেন্ট পায় নি এখনো, সে বিরক্তিকর একটি অবস্থানে আছে এখন।

দ্বিতীয় জিনিসটি হলো, বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানো উপভোগ করুন। একসাথে অনেক কাজ করবেন না। বাচ্চাকে বাইরে নিয়ে যান।

আর শেষ জিনিসটি হলো, বাচ্চাকে জীবনের মানে শেখাবেন। শুধু ভালো একটা চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, অনেক বড় কিছু অর্জনের জন্যও নয়। মানুষ হিসাবে আপনি কে, সেই জায়গা থেকে জীবনের অর্থ শেখাবেন। আপনার কাছে এর উত্তর অবশ্যই আছে।

Tagged with:

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক