page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

কেন ফুটবল খেলা ঘৃণা করতেন বোর্হেস?

হোর্হে লুইস বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬) ছিলেন একজন আর্জেন্টাইন ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, কবি ও অনুবাদক। আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। লেখাটি বোর্হেসের ফুটবল সর্ম্পকিত অবস্থান নিয়ে শ্যাজ ম্যাথুর রচনা ‘Why Did Borges Hate Soccer?’ থেকে অনূদিত।

বোর্হেসের অভিমত হল, ফুটবল জনপ্রিয় কারণ বোকামিও জনপ্রিয়। প্রথমেই মনে হয়, এই আর্জেন্টাইন লেখকের ‘দি বিউটিফুল গেম’ এর প্রতি বিদ্বেষ আজকালকার দিনের আর দশজন সাধারণ ফুটবল বিদ্বেষীর মতই। ফুটবলের প্রতি তাদের অলস বিদ্রূপ এখন প্রায় জিকিরে পরিণত হয়েছে:  সকার খুব বিরক্তিকর, খেলা বেশিরভাগ সময় অমীমাংসিত থাকে, মিথ্যা ইনজুরি আমার পছন্দ না ইত্যাদি।

এবং এটা সত্য। বোর্হেস ফুটবলকে ‘নান্দনিকভাবে কুৎসিত’ বলেছেন। তিনি বলেছেন, সকার হল ইংল্যান্ডের বড় অপরাধগুলির একটি। এবং স্পষ্টতই ইচ্ছা করে তিনি ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম খেলার দিন নিজের একটা লেকচারের জন্য সময় নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু খেলার প্রতি বোর্হেসের এরকম অনাগ্রহজনিত মনোভাব নান্দনিকতার চেয়ে অন্য একটি জটিল বিষয় থেকে এসেছে।

তার সমস্যা ছিল ফুটবল ভক্তদের কালচার নিয়ে। তিনি এটার সাথে বিংশ শতাব্দীর কিছু ভয়াবহ রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতাদের প্রতি অন্ধ সমর্থনের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তার জীবদ্দশায় তিনি আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নিহিত ফ্যাসিজম, পেরোনিজম এমনকি অ্যান্টি সেমিটিজমের কিছু উপাদান দেখেছিলেন।

সুতরাং জনপ্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলন এবং আর্জেন্টিনায় জনপ্রিয় সংস্কৃতি হিসেবে ফুটবলের প্রতি তার গভীর সন্দেহের অর্থ আছে। (তিনি একবার লিখেছিলেন ফুটবলে ক্ষমতা বা আধিপত্যের যে ধারণা রয়েছে তা আমার ভয়াবহ মনে হয়।) বোর্হেস যেকোনো ধরনের ডগম্যাটিজম (যে কোনো মত সম্পর্কে অন্ধ বিশ্বাস) এর বিরোধিতা করতেন। সুতরাং যে কোনো ধর্ম বা মতবাদের প্রতি তার দেশের মানুষের শর্তহীন প্রেমকে তিনি স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের চোখে দেখতেন।

এই খেলা নিয়ে বোর্হেসের আরেকটি মতামত হল, ফুটবল খুব শক্তভাবে জাতীয়তাবাদের সাথে সম্পর্কিত।

তিনি বলেছেন, জাতীয়তাবাদ শুধু নিজের পক্ষের মতামতকেই অনুমোদন দেয়, এবং যে মতবাদ ভিন্নমত, অস্বীকৃতিকে  বাতিল করে দেয় সে মতবাদ হল গোঁড়ামি এবং বোকামির মিশ্রণ। জাতীয় দল জাতীয়তা কেন্দ্রিক উত্তেজনা তৈরি করে, ফলে ন্যায়বিচারহীন একটা সরকারের একজন স্টার খেলোয়াড়কে মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে বৈধ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আসলে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজনের সাথে এটাই হয়েছে: পেলে। “যখন তার সরকার রাজনৈতিক বিরোধীদের শেষ করে দিচ্ছিল, তারা গোলের দিকে বল নিয়ে যাওয়া পেলের একটি বিশাল পোস্টার বানায়, সেখানে শ্লোগান ছিল, কেউ এখন এই দেশকে থামাতে পারবে না”, লেখক ডেভ জিরিন তার নতুন বই ‘ব্রাজিল ড্যান্স উইদ দ্য ডেভিল’ এ এই কথাগুলি লিখেছেন।

“যখন তার সরকার রাজনৈতিক বিরোধীদের শেষ করে দিচ্ছিল, তারা গোলের দিকে বল নিয়ে যাওয়া পেলের একটি বিশাল পোস্টার বানায়, সেখানে শ্লোগান ছিল, কেউ এখন এই দেশকে থামাতে পারবে না”

ব্রাজিলিয়ান যে সামরিক স্বৈরশাসকের অধীনে থাকাকালীন পেলে খেলেছিলেন সেই ধরনের সরকার জনগণের সমর্থনের জন্য  জাতীয় দলের সাথে ভক্তরা যে বন্ধন গড়ে তোলে তার সুবিধা নিতে পারে। আর বোর্হেস এই জিনিসটা নিয়েই ভয় পেতেন এবং ক্ষুব্ধ ছিলেন।

তার ছোট গল্প ‘টু বি ইজ টু বি পারসিভড’-এ হয়ত ফুটবলের প্রতি তার বিদ্বেষের ব্যাখ্যা আছে। গল্পের মাঝপথে দেখা যায় আর্জেন্টিনায় ফুটবল একটি খেলা হিসেবে পরিগণিত হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে এবং দৃশ্যের জগতে জায়গা করে নিয়েছে। এই কাল্পনিক জগতে দৃশ্যই প্রধান জিনিস হিসাবে রাজত্ব করে: খেলার উপস্থাপনটাই আসল খেলার জায়গা দখল করে নিয়েছে। “এই খেলাগুলির রেকর্ডিং স্টুডিও এবং পত্রিকা অফিসের বাইরে কোনো অস্তিত্ব নেই”, একটি ফুটবল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ক্ষোভের সাথে বলে। ফুটবল খেলা গোঁড়ামিকে এত গভীরভাবে উৎসাহ দেয় যে সমর্থকরা কোনো কিছুকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই টিভি এবং রেডিওতে চলতে থাকা অস্ত্বিত্ববিহীন খেলা দেখে:

“অনেকদিন হল স্টেডিয়াম তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে এবং ভেঙে যাচ্ছে। এখনকার দিনে সবকিছুই টেলিভিশন এবং রেডিওতে মঞ্চস্থ হয়। খেলা সম্প্রচারকারীদের মিথ্যা উত্তেজনা কখনো আপনাকে সন্দেহ করায় নি যে সবকিছুই আসলে ভান? সর্বশেষ বুয়েনস আইরেসে ১৯৩৭ সালের ২৪ জুন সকার ম্যাচ খেলা হয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে খেলার ভিতরের স্বরের সাথে নাটকের ধরন মিলিয়ে একজন সিঙ্গেল ব্যক্তি বা অভিনেতার দ্বারা একটি বুথে বা টিভি ক্যামেরার সামনে এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।”

গল্পটি গণ আন্দোলন নিয়ে বোর্হেসের অস্বস্তির কথা বলেছে। মিডিয়া ফুটবল পূজা করার গণসংস্কৃতি তৈরি করেছে, এবং, ফলে, ম্যানিপুলেশনের জন্য এটা সুবিধাজনক হয়েছে। গল্পটিতে মিডিয়াকে এ কারণে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বোর্হেসের মতে, মানুষ একটি বিশাল ইউনিভার্সাল পরিকল্পনা, নিজেদের থেকে বড়  একটা কিছুর অধীন এই ব্যাপারটা অনুভব করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কারো জন্য ধর্ম এই কাজটা করে, কারো জন্য করে ফুটবল।

বোর্হেসের লেখায় চরিত্রগুলি প্রায়ই এই ইচ্ছাকে আঁকড়ে ধরে, আদর্শবাদী হয়ে যায় অথবা ধ্বংসাত্মক কিছু করে। ‘ডিউটসচেস রিকুয়েম’ গল্পের ন্যারেটর নাৎসি হয়ে যায়, ‘দ্য লটারি ইন ব্যাবিলন’ এবং ‘দ্য কংগ্রেস’ গল্পের ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ সংস্থাগুলি অনেক বড় ব্যুরোক্রেসিতে রূপান্তরিত হয় এবং শারীরিক শাস্তি অথবা বই পোড়ানোর বিধান জারি করে।

আমরা বড় কিছুর অংশ হতে চাই, এত বেশি মাত্রায় চাই যে, যেসব ত্রুটি নিয়ে এই বিশাল পরিকল্পনা বা গ্র্যান্ড প্ল্যান গঠিত বা এই গ্র্যান্ড প্ল্যানের মধ্যেই নিহিত সেই ত্রুটিগুলির ব্যাপারে অন্ধ হয়ে যাই। এবং তখন ‘দ্য কংগ্রেস’ এর বর্ণনাকারী আমাদের যেমন মনে করিয়ে দেয় এই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভগুলির ফাঁদ জোরালোভাবে প্রমাণ করে: “আসল ব্যাপারটি হল আমাদের অনুভব করা যে আমাদের পরিকল্পনা বা গ্র্যান্ড প্ল্যান আমরা একাধিকবার কৌতুকবশত তৈরি করেছি, তা সত্যিই গোপনে টিকে আছে, এবং সেটা হল এই পৃথিবী এবং আমরা।”

এই বাক্যটিই নিখুঁতভাবে বর্ণনা করতে পারে পৃথিবীর মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ ফুটবল নিয়ে আসলে কেমন অনুভব করে।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক

Leave a Reply