page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

কেন ফ্লপ ইমতিয়াজ আলীর ‘তামাশা’

কেউ কেউ শিরোনাম দেখে ভ্রু কুচকাতে পারেন। বলবেন, তামাশা  (২০১৫) কি একেবারেই ফ্লপ?

তবে যে কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সিনেমাটিতে জড়িত নামগুলি দেখে ফেলতে পারেন। পরিচালনায় ইমতিয়াজ আলী, অভিনয়ে রণবীর কাপুর-দীপিকা পাড়ুকোন আর মিউজিকে এ আর রাহমান! ইউটিভি মোশন পিকচারের ডিস্ট্রিবিউশন, উদ্দীপনা জাগানিয়া ট্রেলার ও একটা প্রায় হিট গান নিয়েও সিনেমাটা খুব বেশি দর্শকপ্রিয়তা পায় নি। অথচ ইমতিয়াজের প্রথম সিনেমা ‘সোচা না থা’ বাদ দিলে ‘জাব উই মেট’, ‘লাভ আজ কাল’, ‘রকস্টার’ বা ‘হাইওয়ে’ শুধু ব্যবসাসফলই না—ক্রিটিকদের কাছ থেকে তালি পাওয়া ছবি। তাহলে হঠাৎই তামাশার এই মুখ থুবড়ে পড়া কেন?

নিজের গল্প খুঁজে ফেরা বেদের সঙ্গে তারা।—লেখক

নিজের গল্প খুঁজে ফেরা বেদের সঙ্গে তারা।—লেখক

কী এমন ঘটল ‘তামাশা’র সাথে যে ভারতীয় দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিল?

সে বিষয়ে বলার আগে তামাশার গল্পটা একটু দেখে নেয়া যেতে পারে। সিনেমাটির প্রথমেই দেখি ফ্রান্সের করসিকায় ঘটনাচক্রে রণবীর আর দীপিকার অপরিচয়। হ্যাঁ বিষয়টা অপরিচয়ই আসলে। কারণ দেখা হওয়ার পর তারা ঠিক করে আগামী সাত দিন কেউ কারো আসল পরিচয় জানতে চাইবে না! দুজন মানুষ, যারা এই সাত দিনে পরিচিত হয়ে ওঠে, কিন্তু নাম-ঠিকানায় চিরঅপরিচিতই থেকে যায়—আর হ্যাঁ, প্রেমেও পড়ে যায় তারা।

movie-review-logo

ইমতিয়াজ এই সময়ের প্রেমের তর্জমাটা ভালো করেন বলেই এর আগেও জাব উই মেট বা লাভ আজ কাল দর্শকনন্দিত হয়েছিল। তামাশার বেদ আর তারার মধ্যেও ওই নতুন প্রেমের ঝলকানিটা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু দেখা গেলে কী হবে, খুব দ্রুতই তা মিলিয়েও যায় সিনেমায়। ফলে প্রথম ধাক্কাটা খায় দর্শক। আর এর মধ্যেই দর্শক জানতে থাকে বেদ অর্থাৎ রণবীরের শৈশব। যে-শৈশব একটা প্রথাগত পরিবারের ভেতর বন্দি ছিল। তবে এই বন্দিত্বের মধ্যে কিশোর বেদের কাছে মুক্তানন্দের মতো ছিল গল্প শোনা। না, এই গল্প সে দাদি-নানিদের কাছে শুনত না। শুনত পয়সার বিনিময়ে রাস্তায় গল্প শোনানো এক গল্পকথকের কাছে। সেই গল্পকথকের কাছেই কিশোর বেদ জানতে পারে পৃথিবীর সব গল্পই আসলে একটিই গল্প। পৃথিবীর কোনো কাহিনিরই আসলে কোনো ভিন্নতা নেই। তাই তার আরব্য গল্পের সাথে মিশে যায় হিন্দু পৌরাণিক গল্প। গল্পের এক সময়ের চরিত্র ঢুকে যায় অন্য কোনো সময়ের গল্পে।

"তামাশার একমাত্র জনপ্রিয় গান মাটারগাস্তিতে রণবীর ও দীপিকা। সুর সঙ্গীত এ আর রাহমান।"—লেখক

“তামাশার একমাত্র জনপ্রিয় গান মাটারগাস্তিতে রণবীর ও দীপিকা। সুর সঙ্গীত এ আর রাহমান।”—লেখক

বেদ শোনে। তার সাথে সাথে শোনে দর্শকও। হিন্দি সিনেমার চিরাচরিত সিনেমার বাইরের এই গল্পকথক চরিত্রটি দর্শককে নতুন অভিজ্ঞতার সামনে ফেলে। যা দর্শককে সতেজ করে তোলার সমস্ত উপাদান নিয়ে তৈরি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এই চরিত্রটি শেষপর্যন্ত দিশা পায় না সিনেমাটিতে।

tamasha-2c

বেদ আর তারা। অপরিচিত থাকতে পারাই কি তাদের আনন্দ?—লেখক

গল্পকথকের বয়ানে আমরা জেনে যাই তামাশা সিনেমার মেরুদণ্ডটি। কিংবা বলা ভালো পেয়ে যাই লেখকের জিজ্ঞাসাটি? গল্প। ব্যক্তির গল্প। সব গল্পই কি এক? সবার গল্পই কি এক? এই ধরনের একটা প্রশ্ন নিয়ে দর্শক সিনেমার জার্নি শুরু করে। আর তখন দেখা যায় ক্রোয়েশিয়া থেকে নিজেদের নাম-ঠিকানা না নিয়েই বিচ্যুত হচ্ছে বেদ আর তারা।

এর মধ্যে কেটে যাচ্ছে চার বছর। আর এই চার বছরে তারা কতবারই না খোঁজার চেষ্টা করেছে বেদকে। তবে সত্যি সত্যিই যখন সে বেদকে পেয়ে যায়, পেয়ে প্রথমে খুশি হয়, নিবেদন করে প্রেম, আর তারপর আবিষ্কার করে যে বেদকে সে দেখেছিল ক্রোয়েশিয়ায়, যে-বেদকে পাওয়ার জন্য গত চারটা বছর সে হন্যে হয়ে ছিল সেই বেদের সাথে পেয়ে যাওয়া বেদের ভয়ঙ্কর পার্থক্য।


তামাশা ছবির অফিসিয়াল ট্রেইলার

ক্রোয়েশিয়ায় দেখা উচ্ছ্বল পাগলাটে বেদ এখন শহরের কর্পোরেট চাকরিজীবী। দশটা-পাঁচটা অফিস করে। ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। কিন্তু তারার মনে হয় বেদের গল্প আসলে এমন হওয়ার কথা না। বেদের গল্প আসলে বেদ লিখছে না… লিখছে এই বদ্ধ সময়। বেদকে রোবটে রূপান্তরিত করে চলেছে সামাজিক সিসটেম। যার ভেতর বেদকে ঠেঁসে অন্য কিছু বানিয়ে তোলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বেদ কি তা জানে? হয়তো জানে। কিন্তু এই জানা বেদের ভেতর গুমড়ে গুমড়ে মৃত-প্রায়।
তারা বেদের মরে যাওয়া ইচ্ছাগুলিতেই আবার আলো ফেলে। বেদকে আবার মুখোমুখি করিয়ে দেয় বেদের সাথে। নিজের সাথে নিজের এই সংঘর্ষে কষ্টে ক্ষোভে গুঙিয়ে ওঠে বেদ। তার ভেতরের সব কিছু ভেঙে পড়ে। আর একটা সময় কর্পোরেট চাকরি, টাইমটেবলে যন্ত্রজীবন থেকে সে পালায়। পালিয়ে যায় সেই গল্পকথকের কাছে। মুমূর্ষু গল্পকথকের কাছে এবার সে বেদের গল্প জানতে চায়। কিন্তু গল্পকথক বেদের গল্প বলতে পারে না। বেদের গল্প তার জানা নাই। কারণ বেদের গল্প বেদকেই বলতে হবে। বেদের গল্প বেদকেই শোনাতে হবে দুনিয়ার মানুষের কাছে।

tamasha-5

ক্রোশিয়ায় পরিচয়হীন উচ্ছ্বল বেদ আর তারা।—লেখক

এরপরে বেদ কী করে? ফিরে যায় কি সে কর্পোরেট দশটা-পাঁচটা লাইফে? নাকি ক্রোয়েশিয়ার সাত দিনের বেদ আবার ফেরত আসে বেদের ভেতর? এরকম কিছু জিজ্ঞাসার জন্ম ও উত্তর দিতে দিতে তামাশা শেষ হয়। যদিও তাতে দর্শকের তৃপ্তি হয় কিনা যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। কিন্তু কেন তৃপ্তি হয় না দর্শকের? কেন মন ভরে না তাদের? প্রেম ছিল, এ আর রাহমানের মিউজিক ছিল, তরুণদের বর্তমান সমস্যা, কর্পোরেট লাইফকে প্রশ্নে ফেলা সবই তো ছিল। ছিল সুদৃশ্য লোকেশন, হিট নায়িকা দীপিকার উপস্থিতি তবু কী এমন ‘বিপন্ন বিস্ময়’ যার অনুপস্থিতি ছিল সিনেমাটিতে?

প্রথমেই সিনেমার স্ক্রিপ্টটিকে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারি। তামাশার স্ক্রিপ্টের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ক্যারেক্টার তৈরিতে—বা বলা ভালো ক্যারেক্টার তৈরি না করতে পারাতে। সিনেমাটিতে বেদের ক্যারেক্টার দর্শকের কাছে কিছুটা প্রকাশিত হলেও, আর অন্য কোনো ক্যারেক্টার, হ্যাঁ আপনি ঠিকই পড়ছেন, অন্য কোনো ক্যারেক্টারই তার নিজের ভূমিতে দাঁড়াতে পারে না। এমনকি দীপিকা অভিনীত তারা ক্যারেক্টারটিরও কোনো শিকড় পাওয়া যায় না। ইমতিয়াজের মতো ভালো লেখক-পরিচালক কেন এই দিকটি এড়িয়ে গেলেন, নাকি এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনলেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

তামাশা কোনো আর্ট বা এক্সপেরিমেন্টধর্মী ফিল্ম নয়। ইমতিয়াজ সে-সব কখনো করতেও চান নি। তিনি নিজের স্টাইলে কমার্সিয়াল সিনেমাই বানাতে চেয়েছেন এবং এত দিন তা বানিয়েও এসেছেন। কিন্তু তামাশায় তিনি একটু ঝুঁকিও নিয়েছেন বলে মনে করি। (হতে পারে ধারাবাহিক সাফল্য তাকে এই ঝুঁকিতে উৎসাহী করেছে।)

তার প্রথম ঝুঁকি রণবীরকে কেয়ারলেস চার্মিংবয় হিসেবে প্রেজেন্ট করার পর কর্পোরেট ক্যারিয়ারিস্ট হিসেবে দেখানো। দর্শক হিরোকে সাধারণত এভাবে দেখতে চায় না। বা লম্বা সময় দেখতে পারে না। ফলে সিনেমার মধ্যাংশটিতে দর্শক রণবীরকে কীভাবে গ্রহণ করবে তা বুঝে উঠতে পারে না। রণবীর দর্শকের ভেতর একটা হতাশাও তৈরি করতে পারে। এই হতাশা দর্শককে দ্বিতীয়বার হলের দিকে যেতে বাধা দেয়।

taasdha-2b

ছবির ‘মাটারগাস্তি’ গানে রণবীর-দীপিকা

সিনেমার প্রথমাংশে নন-লিনিয়ার পদ্ধতিতে দেখানো গল্প সাধারণ দর্শকের জন্য কখনো কখনো জটিলতাও তৈরি করতে পারে। ফলে সাধারণ দর্শক প্রথমেই সিনেমাটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। কেউ কেউ বলতে পারেন ইমতিয়াজ একেবারে আমজনতার জন্য সিনেমা বানায় না। সত্য, কিন্তু আমজনতা মুখ ফিরিয়ে নিলে সিনেমারও মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

imtia-dipika

“এমনকি দীপিকা অভিনীত তারা ক্যারেক্টারটিরও কোনো শিকড় পাওয়া যায় না। ইমতিয়াজের মতো ভালো লেখক-পরিচালক কেন এই দিকটি এড়িয়ে গেলেন, নাকি এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনলেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।”

ইমতিয়াজের জন্য আরেকটি ঝুঁকি ছিল রণবীর-দীপিকার জুটি। এই জুটি ইতোমধ্যেই একটা হাইপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে আগের সিনেমা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে। কিন্তু এই জুটির প্রেম-রসায়নে নতুনত্ব তো খুঁজে পায়ই না দর্শক বরং যতটুকু চাওয়া ততটুকুও মেটাতে পারে না। ফলে দর্শক বিরাগভাজন হয়ে ওঠে।

আর এসবের চেয়েও, বড় যে ঝুঁকিটি ইমতিয়াজ তামাশায় নিয়েছেন, তা হলো বাজেট। এই সিনেমার বাজেট প্রায় একশ দশ কোটি রুপি। অথচ ভেবে দেখা দরকার গল্প সত্যি সত্যি এত বড় বাজেট দাবি করে কিনা! গল্পটি হয়তো চল্লিশ কোটির, খুব বাড়তি হলে পঞ্চাশ কোটির। সিনেমার নিট আয় কত? সব মিলিয়ে প্রায় সত্তর কোটি রুপি। ঠিক বাজেটে সিনেমাটি করা হলে কিন্তু লাভের মুখেই থাকত তামাশা

একটি সাক্ষাৎকারে এক সিনেমা-পরিচালক বলেছিলেন, সিনেমা কখনো ফ্লপ করে না, ফ্লপ করে বাজেট। ইমতিয়াজ যদি তা মনে রাখতেন!

About Author

আহমেদ খান হীরক
আহমেদ খান হীরক

জন্ম. ১৯৮১। রহনপুর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, রাজশাহী। গল্পকার। একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলে স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কর্মরত।