ফাইনালি আমরা ক্যাঙ্গারু দেখতে যাওয়ার সকালে আইসা পৌঁছাইলাম। ছয়টায় ঘুম ছাড়তেই আমরা বুঝতে পারলাম যে আজকে ক্যাঙ্গারু দেখতে যাওয়া যায়।

মূল: হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ: নাজিমুর রশীদ

খাচার মধ্যে ঐদিন মাত্র চারটা ক্যাঙ্গারু ছিল। একটা পুরুষ, দুইটা মহিলা আর একটা নতুন জন্ম নেয়া ক্যাঙ্গারু।

আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ড খাঁচার সামনে দাঁড়ায়া ছিলাম। এই চিড়িয়াখানা নিতান্তই অখ্যাত। অ্যাকচুয়ালি পশুপাখির তুলনায় এইখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা কম। তারপরেও আমরা এইখানে আসছি শুধুমাত্র বাচ্চা ক্যাঙ্গারু দেখার উছিলায়।

একমাস আগে আমরা লোকাল পত্রিকায় বাচ্চা ক্যাঙ্গারুর জন্মের খবর পাইছিলাম এবং এর পর থাইকাই বাচ্চা ক্যাঙ্গারু দেখার জন্য পারফেক্ট সকালের অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু সেই সকাল আর আসে না। এক সকালে ঝুম বৃষ্টি হইতে থাকে, তার পরের সকালে আরও বেশি এবং অবশ্যই এরপরে সবকিছু কাদায় মাখামাখি হইয়া থাকে। দেখা গেল তুফান আইসা সব লণ্ডভণ্ড কইরা দেওয়ার জোগাড়, অথবা আমার গার্লফ্রেন্ডের দাঁতে ব্যথা। জীবন আসলে এরকমই যেইখানে কিছু না কইরা এইভাবে এক মাস পার করে দেওয়া যায়।  আমার মাঝেমধ্যে মনে হইতে থাকে আমি অনেক কিছুই করছি, আবার মাঝেমধ্যে মনে হয় কিছুই করি নাই। পত্রিকাওয়ালা বিল নিতে না আসলে হয়ত বা মাস যে শেষ হইছে সেটাও টের পাইতাম না।

ফাইনালি আমরা ক্যাঙ্গারু দেখতে যাওয়ার সকালে আইসা পৌঁছাইলাম। ছয়টায় ঘুম ছাড়তেই আমরা বুঝতে পারলাম যে আজকে ক্যাঙ্গারু দেখতে যাওয়া যায়। হাত মুখ ধুইয়া, বিলাইরে খাবার দিয়া আমরা রওনা দিলাম।

“বাচ্চা ক্যাঙ্গারুটা কি এখনও বাইচা আছে? কী মনে হয় তোমার?” সে আমারে ট্রেইনের মধ্যে প্রশ্ন করল।

“মইরা গেলে নিশ্চয়ই পত্রিকায় আসত।”

“এমনও তো হইতে পারে যে ক্যাঙ্গারু মরে নাই। হয়ত বা অসুস্থ। কোনো হাসপাতালে।”

“আমার মনে হয় সেইটা নিয়াও পত্রিকায় আর্টিকেল ছাপা হইত।”

“ধরো নার্ভাস ব্রেইকডাউন হইল। কোনো ঝোপঝাড়ে লুকাইতেছে।”

“বাচ্চা ক্যাঙ্গারুর নার্ভাস ব্রেইকডাউন?”

“মা ক্যাঙ্গারুর। হয়ত বা কোন ট্রমার পর বাচ্চারে নিয়া একটা অন্ধকার রুমে লুকাইতেছে।”

মেয়েরা সম্ভাব্য সবকিছুই ভাইবা রাখে।

“আজকে বাচ্চা ক্যাঙ্গারু দেখতে না পারলে মনে হয় না আর কোনোদিন দেখতে পারব।”সে তার কথা চালায়া যাইতে থাকল।

“মেবি।”

“তুমি কি বাচ্চা ক্যাঙ্গারু দেখছ আগে?”

আমি মাথা নাড়াইলাম।

“তোমার কি মনে হয় তুমি আর দেখার সুযোগ পাইবা?”

“আই ডোন্ট নো।”

“এর জন্যই আমি এত ভাবতেছি।”

“আমি কখনও কোনো জিরাফরে বাচ্চা জন্ম দিতে দেখি নাই, অথবা তিমি সাঁতার কাটতেও দেখি নাই। বাচ্চা ক্যাঙ্গারু নিয়া এত লাফালাফি কেন?”

“কারণ এইটা বাচ্চা ক্যাঙ্গারু।” সে উত্তর দিল।

তর্কে ইস্তফা দিয়া আমি পত্রিকা পড়তে থাকলাম। কোনো মেয়ের সাথে এখনও তর্কে জিতা হয়ে ওঠে নাই।

ক্যাঙ্গারুটা বাইচা আছিল যদিও। কিন্তু পত্রিকার ছবির তুলনায় তারে অনেক বড় দেখাইতেছিল। আমার গার্লফ্রেন্ড কিছুটা হতাশ হইল বটে।

“এইটা ত বড় হয়ে গেছে।” সে বলল।

আমি তার কাঁধের উপর দিকে হাত নিয়া জড়ায়া ধইরা সান্ত্বনা দেয়ার একটা বৃথা চেষ্টা চালাইলাম। সে মাথা নাড়াইল। আমি আরও কিছু বলতে চাইতেছিলাম কিন্তু সেইটা ত আর বাচ্চা না থাকা ক্যাঙ্গারুরে বাচ্চা বানায়া দিবে না। তাই চুপই থাকলাম।

পাশের দোকান থেকে দুইটা চকোলেট আইসক্রিম নিয়া আইসা দেখি সে এখনো খাঁচায় হেলান দিয়া ক্যাঙ্গারু দেখতেছে।

“এইটা আর বাচ্চা নাই।”

“তুমি শিওর?”

“হ্যাঁ। বাচ্চা ক্যাঙ্গারু মা ক্যাঙ্গারুর থলের মধ্যে থাকে।” আমি তার কথায় সম্মতি জানাইয়া আইসক্রিম খাইতে থাকলাম।

মা ক্যাঙ্গারুরে খুইজা পাওয়া যায় নাই। বাবা ক্যাঙ্গারুরে সহজেই পাওয়া গেল—চারটা ক্যাঙ্গারুর মধ্যে সে সব থাইকা বড় আর শান্ত। যেন কোনো কম্পোজার, যার প্রতিভা শুকায়া গেছে। সে এক জায়গায় বইসা কিছু একটা যেন খুজঁতেছিল। বাকি দুইটাই ছিল মহিলা, আইডেন্টিকাল। এদের মধ্যে যে কেউই বাচ্চা ক্যাঙ্গারুর মা হইতে পারে।

“এদের মধ্যে কেউ একজন মা।” আমার গার্লফ্রেন্ড বলল।

“মা নয় কোনটা?” সে আর উত্তর দেয় না।

বাচ্চা ক্যাঙ্গারুটা খাঁচার ভিতর ঘুরাইতে থাকে। কোনো কারণ ছাড়াই মাটি খোঁড়ে। বাপের চারদিকে ক্লকওয়াইজ চক্কর দেয়। আবার মাঝেমধ্যে মহিলা ক্যাঙ্গারু দুইটারে বিরক্ত কইরা আসে।

“ক্যাঙ্গারু এত তাড়াতাড়ি বড় হয় কীভাবে?”

“শত্রুদের কাছ থাইকা বাঁচার জন্য।”

“কোন শত্রু?”

“মানুষ।” আমি উত্তর দিলাম , “মানুষ বুমেরাং দিয়া ক্যাঙ্গারু হত্যা কইরা খায়।”

“বাচ্চা ক্যাঙ্গারু মায়ের থলের মধ্যে থাকে কেন?”

“যাতে সে মায়ের সাথে তাড়াতাড়ি পালাইতে পারে। বাচ্চারা ধীরগতির।”

“তাইলে তারা নিরাপদ?”

“হ্যাঁ। তারা ছোটদের প্রটেক্ট করে।”

“কত দিন?”

আমি জানতাম ক্যাঙ্গারু দেখতে আসার আগে আমার ক্যাঙ্গারু নিয়া পইড়া আসা উচিত ছিল।

“দুয়েক মাস।”

“এই ক্যাঙ্গারুর বয়স এক মাস।” সে ক্যাঙ্গারুর দিকে পয়েন্ট কইরা বলে, “তাইলে তো মা ক্যাঙ্গারুর থলের মধ্যে ঢুইকা যাইতে পারে যে কোনো সময়।”

“হুম।”

“থলের মধ্যে থাকতে পারাটা নিশ্চয়ই মজার। কী বলো?”

“হইতে পারে।”

সূর্য মাথার উপর চলে আসছিল। কড়া রোদের মধ্যে একদল স্কুলের বাচ্চা আশেপাশের কোনো সুইমিংপুলে আইসা চেচামেচি করতে থাকে। আকাশে গ্রীষ্মের মেঘ গম্ভীর ভাব নিয়া সইরা যায়।

“কিছু খাইতে চাও?” আমি তারে জিজ্ঞেস করলাম।

“হট ডগ। আর একটা কোক।”

এক কলেজ স্টুডেন্ট হট ডগ বিক্রি করতেছিল। আমি পিংক ফ্লয়েডের গান শুইনা শুইনা হট ডগের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।

খাবার নিয়া ফিরা আসতেই সে ক্যাঙ্গারুর দিকে আঙুল দেখাইয়া বলল, “দেখো! বাচ্চা ক্যাঙ্গারুটা থলের মধ্যে ঢুইকা পড়ছে।”

আমি তাকায়া দেখলাম সত্যিই একটা মহিলা ক্যাঙ্গারুর থলের মধ্যে থিকা একজোড়া কান আর সামান্য লেজ বার হইয়া আসছে। এই দৃশ্যের দেখা না পাইলে আজকের ট্রিপটাই মাটি হইত।

“থলেটা নিশ্চয়ই অনেক ভারি হইয়া আছে।”

“চিন্তা কোরো না। ক্যাঙ্গারুস আর ভেরি স্ট্রং।”

“সত্যি?”

“অবশ্যই। এইভাবেই তো ওরা সারভাইব করে।”

এই কাঠপোড়া রোদের মধ্যেও মা ক্যাঙ্গারু ঘামে না। তারে দেইখা এমন কেউ মনে হয় যেন মাত্র আয়োমার কোনো সুপারমার্কেট থিকা মাত্র শপিং কইরা আইসা কফি শপে ব্রেক নিতেছে।

“ক্যাঙ্গারুটা বাচ্চারে প্রটেক্ট করতেছে, রাইট?”

“ইয়েপ।”

“বাচ্চাটা ঘুমাইতেছে কিনা ভাবতেছি।”

আমরা হট-ডগ আর কোক খাইয়া ক্যাঙ্গারুর খাঁচা ত্যাগ করার সময় বাবা ক্যাঙ্গারুটা তখনও খাবারের মধ্যে হারাইয়া যাওয়া কোনো নথি যেন খুজতেছিল। মা ক্যাঙ্গারু তার বাচ্চারে নিয়া বিশ্রাম নিতে থাকে। রহস্যময়ী অন্য মহিলা ক্যাঙ্গারুটা খাঁচার মধ্যে ঘুরাইতে থাকে আর নিজের লেজ নিয়া খেলতে থাকে।

দিনের ভাবসাব দেইখা মনে হয় অনেকদিন পর খুব গরম পড়তে যাইতেছে।

“কোথাও বিয়ার খাইতে যাওয়া যায়, কী বলো?”

“সাউন্ডস গ্রেট।” আমি উত্তর দিলাম।
– – –

হারুকি মুরাকামি জাপানিজ সাহিত্যিক। জন্ম ১৯৩৯ সালের ১২ জানুয়ারি, কিয়োটোতে। বর্তমানে টোকিওতে থাকেন। ছোটবেলা থেকেই ওয়েস্টার্ন কালচার দ্বারা প্রাভাবিত। বড় হয়েছেন আমেরিকান লেখকদের বই পড়ে।

হারুকি মুরাকামি (জন্ম. ১৯৪৮, জাপান)

প্রথম চাকরি ছিল একটা রেকর্ডিং স্টোরে। পড়ালেখা শেষ করে স্ত্রীর সঙ্গে ‘ পিটার ক্যাট’ নামের একটা জ্যাঝ বার খুলেছিলেন।

দ্য ওয়াইন্ড আপ বার্ড ক্রনিকল, কাফকা অন দ্য শোর, ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স, নরওয়েজিয়ান উড ইত্যাদি তার লেখা কিছু উপন্যাস। এই গল্প মুরাকামির ‘ব্লাইন্ড উইলো, স্লিপিং উইমেন’ ছোটগল্পের বই থেকে নেয়া।