page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

ক্রীতদাসেরা মানুষ না সম্পদ?

১৯৬২ সালে আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র তখন কলেজের অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন সাহেব আমাদের ইংরেজী পড়াতেন। অধ্যক্ষ হিসাবে তিনি ছিলেন সুদক্ষ প্রশাসক। ছাত্র শিক্ষক সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন আবার ভয়ও করতেন। কিন্তু ক্লাসে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক এবং নির্মল হাস্যরসিক। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর হাসাতেন তিনি।

একদিন ক্লাসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জানো ‘স্ট্যান্ডার্ড অব লিভিং’ কী জিনিস?

আমরা এক এক জন এক এক রকম উত্তর দিলাম। মোটামুটি আমরা অনেকেই বলতে পেরে ছিলাম স্ট্যান্ডার্ড অব লিভিং হচ্ছে জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের একটা মাপকাঠি। কিন্তু ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছিলাম না।

তিনি বললেন, জীবনমানের একটা সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেয়া আসলেই খুব কঠিন। এ লেভেল অব ম্যাটারিয়েল কমফোর্ট বলা যেতে পারে। তবে এটা শুধু ম্যাটারিয়েলও নয়, মানসিক এবং পারিপার্শ্বিক স্বাচ্ছন্দ্যও এর সাথে জড়িত।

ali ahmad rushdi png

তিনি বললেন, গত মাসে আমার চৌকিদারের বেতন বেড়েছে ১০ টাকা মাসে। এখন সে আরেকটি বিয়ের কথা ভাবছে। অন্য দিকে আমি জানি এক ছেলে বিদেশ থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়ে ফিরেছে, বললাম, এখন একটা বিয়ে করো। বলে কি ওর নাকি বিয়ে করার যোগ্যতাই হয় নি।

আমরা সবাই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলাম।

স্যার তখন বলে উঠলেন, আই ম্যারিড হোয়েন আই ডিডন’ট নো হোয়াট ম্যারিজ ওয়াজ।

আমরা আবারও হেসে উঠলাম। এভাবে হাসি আর আনন্দের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদেরকে স্ট্যান্ডার্ড অব লিভিং এর মত জটিল জিনিস বুঝিয়েছিলেন।

আরেক দিনের ক্লাসে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের মধ্যে কত জন ‘গ্যাটিসবার্গ অ্যাড্রেস’ পড়েছো?”

আমাদের ক্লাসের কেউ হাত তুলল না।

তিনি নিরাশ হয়ে বললেন, “ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ কী? এখনকার ছাত্রদের কত কিছু জানতে হয়। উত্তম-সুচিত্রার লেটেস্ট ছবি কোনটি? মালা সিনহা কার সাথে প্রেম করলো? কিংবা ভারতের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা কে—উত্তম কুমার নাকি দীলিপ কুমার?
আমরা সবাই হেসে উঠলাম। আমাদের হাসি থামিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, “আমাদের সময়ে লেখাপড়া ছাড়া ছাত্রদের আর তেমন কিছু করার ছিলো না। আমরা যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি সেই বয়সেই আমরা আব্রাহাম লিঙ্কনের গ্যাটিসবার্গ এড্রেস পড়েছিলাম, এখনও তা মনে আছে।” বলেই তিনি পুরো ‘গ্যাটিসবার্গ অ্যাড্রেস’ মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন।

২.
এই বক্তৃতায় আব্রাহাম লিঙ্কন গৃহযুদ্ধের (১৮৬১-১৮৬৫) প্রেক্ষাপটে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার মূল মন্ত্র ‘সকল মানুষ সমান’ (হিউম্যান ইকুয়ালিটি) নীতির নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

এই ব্যাখ্যায় রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যসমূহের স্বাধিকারের তূলনায় রাজ্যের তথা রাষ্ট্রের সকল মানুষের সম অধিকারের প্রশ্নটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে হিউম্যান ইকুয়ালিটির কথা বলা হয়েছিল তা ঐ দেশে বসবাসকারী ক্রীতদাস ও তাদের মালিকদের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করতে পারে নাই।

lincoln-2

আব্রাহাম লিঙ্কন (১৮০৯-১৮৬৫)

স্বাধীনতা ঘোষণার ৮১ বছর পরেও ১৮৫৭ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস তার এক রায়ে বলেছিলেন, “slaves were so far inferior that they had no rights which the white man was bound to respect.”

লিঙ্কন তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, যে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্ষেত্রে সবাই সমান, তাঁদের সরকার তাঁদের দ্বারাই গঠিত এবং তাঁদের জন্যেই কাজ করে সে দেশের কোনো ক্ষয় নাই।—”government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth.”

৩.
স্যার যখন Gettysburg Address এর এই শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করছিলেন তখন তাঁর উচ্চারণ, কণ্ঠস্বর আর আবেগ দেখে আমাদের মনে হয়েছিল আমরা আব্রাহাম লিঙ্কনের কণ্ঠেই এই শব্দগুলি শুনছি।

‘গ্যাটিসবার্গ অ্যাড্রেস’ হচ্ছে গৃহযুদ্ধের সময় ১৮৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষণ যাতে তিনি আমেরিকার দাসপ্রথা বিলোপের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার আগ পর্যন্ত তিনি বলে আসছিলেন দাসপ্রথাকে আর সম্প্রসারিত হতে দেওয়া হবে না এবং এক সময়ে দাসপ্রথা আপনা থেকেই শেষ হয়ে যাবে।


Abraham Lincoln, Gettysburg Address from the movie ‘Saving Lincoln’

আব্রাহাম চেয়েছিলেন দেশকে শিল্পায়িত করতে এবং কৃষির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে। তিনি সম্যক বোঝতে পেরেছিলেন যে দাসপ্রথার ওপর ভিত্তি করে তুলা ও তামাকের মত কৃষিপণ্য উৎপন্ন করলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত কমে আসবে এবং দাসদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে আরও নতুন এলাকা কৃষির আওতায় আনতে হবে। তিনি চেয়েছিলেন উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সমতা থাকুক এবং একে অপরের সম্পূরক হিসাবে উন্নতি লাভ করুক।

দেশকে দ্রুত শিল্পায়িত করার জন্যে শ্রমিকের দরকার। দাসনির্ভর কৃষি থেকে শিল্প এলাকায় লোকবল পাঠানো অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহজসাধ্য ছিল না। এই কারণে উত্তরের শিল্পায়িত রাজ্যগুলি প্রথম থেকেই দাসপ্রথার বিরোধী ছিল। অপর দিকে দক্ষিণের আখ, তুলা ও তামাক উৎপাদনকারী রাজ্যগুলি দাসপ্রথা বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিল।

cotton-gin

এলি হুইটনি মিউজিয়ামে প্রদর্শনের জন্য ‘কটন জিন’ ডিভাইস। জিন ইনজিনের সংক্ষিপ্ত শব্দ।

৪.
১৭৯৩ সালে এলি হুইটনি (Eli Whitney) যখন কটন জিন আবিষ্কার করেন তখন কটন সিড থেকে তুলার পৃথকীকরণ কাজে শ্রমিকের দক্ষতা পঞ্চাশ গুণ বেড়ে যায় এবং সেই অনুপাতে দক্ষিণাঞ্চলে দাসদের চাহিদাও বেড়ে যায়। সুতা প্রসেসিং-এর এই নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে তুলার বীজ তুলার ভিতর থেকে অক্ষত অবস্থায় বের করা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায়, তুলার বীজ থেকে আরও তুলা, তেল ও খাবার উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল এবং তুলা উৎপাদন অধিকতর লাভজনক হিসাবে গণ্য হচ্ছিল।

১৮৬০ সালের নির্বাচনে দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষপাতী রিপাবলিকান পার্টি জয় লাভ করে। ফলে দাসপ্রথার পক্ষের লোকেরা ভাবলো এইবার দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কাজেই দক্ষিণ অঞ্চলের ৭টি প্রদেশ ১৮৬১ সালের ৪ মার্চ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা ঘোষণা করে।

ঐ দিনই অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অবিচ্ছেদ্য রাষ্ট্র হিসাবে পুনঃব্যক্ত করেন।

বিচ্ছিন্নতাবাদী অঙ্গরাজ্যগুলি নিজেদের নাম দিয়েছিল কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা (Confederate States of America, CSA)।

অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন সিএসএকে একটি বেআইনি সংগঠন হিসাবে আখ্যায়িত করেন এবং তাদেরকে বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করার আহবান জানান। জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, যে সব স্টেটে দাসপ্রথা বিদ্যমান আছে সেখান থেকে এই সিস্টেম এই মুহূর্তে বিলোপ করার কোনো ইচ্ছা তাঁর নাই। তবে তিনি তাঁর সব শক্তি দিয়ে আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করবেন।

smut-island-1

১২ এপ্রিল ১৮৬১, কনফেডারেট বাহিনী প্রথম গোলা নিক্ষেপ করে ফোর্ট সামটারে। দুর্গের পতন ঘটে ও আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

প্রেসিডেন্টের আহবানে সাড়া না দিয়ে সিএসএ ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল সাউথ ক্যারোলিনায় অবস্থিত আমেরিকান সেনাবাহিনীর ব্যারাক আক্রমণ করে। বাধ্য হয়েই অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন সিএসএ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

১৮৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মেরিল্যান্ডের এনটিট্যামের (Battle of Antietam) যুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী সেনাবাহিনীর একাংশকে পরাজিত করার পর গ্যাটিসবার্গ নামক স্থানে যে ভাষণ দেন সেই ভাষণেই তিনি দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। তখনও যুদ্ধ চলছিল যা শেষ হয় ১৮৬৫ সালে ৯ এপ্রিল কনফেডারেট আর্মি জেনারেল রবার্ট লির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।

battle-of-antietam1

ব্যাটল অব এনটিট্যাম (সেপ্টেম্বর ১৭, ১৮৬২)

দাসপ্রথার বিতর্ক শুধু দাসদের সুখ স্বাচ্ছন্দেরই ব্যাপার ছিল না বরং এই প্রথা স্বাধীন আমেরিকার চেতনা, চৈতন্য ও মননশীলতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা তাও বিচার্য ছিল। তাছাড়া দাসপ্রথা ছিল আমেরিকান শাসনতন্ত্রে স্বীকৃত একটি বিধান যদিও প্রায় সবাই বিশ্বাস করতো যে আমেরিকার ফসলি জমির পক্ষে আরও অধিক সংখ্যক দাস ধারণ করা সম্ভব ছিল না।

৫.
১৭৮৭ সালে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক সম্মেলনে ডেলিগেটদের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের আইন পরিষদে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে প্র্তিটি রাজ্য জনসংখ্যা অনুপাতে প্রতিনিধি পাঠাবে। তবে জনসংখ্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলি ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে।

দাস রাজ্যগুলির দাবি ছিল দাসদেরকে স্বাধীন লোকদের মতোই জনসংখ্যার অন্তর্ভুক্ত করা হউক। যেহেতু দাসদের ভোট নাই এই ব্যবস্থার ফলে দাসরাজ্যের শ্বেতাঙ্গরা কংগ্রেস সভায় অপেক্ষাকৃত অধিক সংখ্যক সদস্য পদ পাবে। অপর দিকে দাসমুক্ত রাজ্যের লোকেরা দাসদেরকে জনসংখ্যার অন্তর্ভুক্ত না করার পক্ষপাতী ছিল। এই ব্যবস্থার ফলে দাস ও দাসমুক্ত উভয় রাজ্যেই ভোটারদের অনুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। যেহেতু ক্রীতদাসেরা ভোটার না কাজেই আইন সভায় তাদের কোনো প্রতিনিধি থাকার কথা নয়।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন উত্তরের দাসমুক্ত রাজ্যগুলি দাসদের ভোটার হওয়ার ব্যাপারে কোনো আপত্তি করে নি বরং দাসদের মুক্তি পাওয়ার পর তারা দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারবে তথা শিল্পশ্রমিক হিসাবে জীবন শুরু করতে পারবে এমন একটা আশাও বিরাজ করছিল।

একজন স্বাধীন লোকের অনুপাতে একজন ক্রীতদাস শতকরা একশত ভাগ সমান নাকি শতকরা শূন্যভাগ সমান এই দুই অবস্থার মাঝামাঝি অনেক সমঝোতা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। শেষমেশ তিন পঞ্চমাংশ প্রস্তাবটি উভয় দলের কাছে গৃহীত হয়।বলা বাহুল্য, তিন পঞ্চমাংশ প্রস্তাবটি ছিল একটা পলিটিক্যাল কম্প্রোমাইজ মাত্র। এই প্রস্তাবের সাথে ক্রীতদাসদের ভালোমন্দ খুব একটা জড়িত ছিল না।

এই ব্যবস্থার ফলে ১৮৬৫ পর্যন্ত আমেরিকান আইনসভায় দাস রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল। অর্থাৎ ক্রীতদাসদের একেবারে গোনায় না ধরলে কিংবা এক পঞ্চমাংশ বা দুই পঞ্চমাংশ ধরার তুলনায় তিন পঞ্চমাংশ ধরার কারণে দক্ষিণের রাজ্যগুলি অপেক্ষাকৃত বেশি প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে একজন ক্রীতদাসকে একজন স্বাধীন লোকের শতকরা একশত ভাগ সমান না ধরার কারণে দাস রাজ্যগুলির কেন্দ্রীয় সরকারকে যে হারে ট্যাক্স দিতে হতো তার চেয়ে কম দিতে হয়েছে।

১৮০৪ সালে উত্তরাঞ্চলীয় সব কয়টি প্রদেশে (ম্যাসন-ডিক্সন লাইনের উত্তরে যে সব প্রদেশ) দাসপ্রথা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করার আইন পাস হয় এবং ১৮০৭ সালে ফেডারেল কংগ্রেস দাসদের আন্তর্জাতিক ব্যবসা নিষিদ্ধ করে দেয়। (কিন্তু দাসপ্রথা তখনও আইনসিদ্ধ ছিল।)

প্রস্তাবিত মিসৌরি রাজ্যকে দাসরাজ্য হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা এই নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং একটা সমঝোতাপূর্ণ সমাধান বের করা হয় ১৮২০ সালে। এই সমঝোতার আওতায় লুসিয়ানা টেরিটরিকে দুইভাগ করে উত্তরাঞ্চলকে ফ্রি রাজ্য এবং দক্ষিণাঞ্চলকে দাসরাজ্য হিসাবে ইউনিয়নভুক্ত করা হয়।

আমেরিকার ফেডারেল আইনসভায় দাসপ্রথার পক্ষের ও বিপক্ষের রাজ্যগুলির মধ্যে একটা ব্যালান্স সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে ইউনিয়নভুক্ত অর্ধেক রাজ্য হবে দাসরাজ্য আর অর্ধেক হবে ফ্রি। কিন্তু এই সমঝোতাও বেশিদিন টিকে নি।

১৮০৩ থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত ক্রয়, পারস্পরিক সন্ধি, আলোচনা কিংবা যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পরিধি অনেক গুণে বেড়েছিল। ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত যে সব রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয় তাদের মধ্যে প্রায় সবাই দাস রাজ্য (Slave State) হিসাবেই যোগদান করেছিল। লুসিয়ানা, মিসৌরি, আরাকান্স, ফ্লোরিডা, আলাবামার দক্ষিণাঞ্চল, মিসিসিপি এবং টেক্সাস এর অন্তর্ভুক্ত ।

অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব কয়টি রাজ্যই ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে ছিল।

১৮৩৫ থেকে ১৮৪৪ পর্যন্ত আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যসংখ্যা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কংগ্রেসে দাসত্ব মুক্তির প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ ছিল। আমেরিকান ইতিহাসে এই নিয়ম গেগ রুল হিসাবে পরিচিত।

৬.
১৮৪৫ সালে দাসরাজ্য হিসাবে টেক্সাসের অন্তর্ভুক্তির পর মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধে প্রাপ্ত সমগ্র অঞ্চল দাসরাজ্য হিসাবে আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গিভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করার স্বার্থে উত্তরাঞ্চলের দাসমুক্ত রাজ্যগুলি দক্ষিণাঞ্চলের প্লান্টেশন এলাকাগুলিকে দাসরাজ্য হিসাবে হলেও ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করায় সায় দেয়। আমেরিকান ইতিহাসে এই সমঝোতাকে ১৮৫০-এর সমঝোতা বলা হয়। প্রথম দিকে এই সমঝোতার অংশ হিসাবে বলা হয়েছিল দাসরাজ্যে বসবাসরত দাসদের সন্তানেরা স্বাধীন হিসাবে বিবেচিত হবে। কিন্তু পরে এই শর্ত ছাড়াই এই সব রাজ্য ইউনিয়নভুক্ত হয়।

ড্রেড স্কট (১৭৯৯-১৮৫৮)

ড্রেড স্কট (১৭৯৯-১৮৫৮), ছবি. ১৮৫৭

rojar-b-taney

রজার ব্রুক ট্যানি (১৭৭৭-১৮৬৪)

১৮৫৭ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস রজার বি. ট্যানির কোর্টে একটি বিচার অনুষ্ঠিত হয়। এই কেইসের বাদী ছিলেন মিসৌরির অধিবাসী ড্রেড স্কট নামে এক ক্রীতদাস। ড্রেড তাঁর মালিকের সাথে ইলিনয় ও মিনিসোটাতে কয়েক বছর কাটিয়ে মিসৌরিতে ফিরে আসার পর তাঁর মালিক তাঁকে সেনফোর্ড নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রী করে দেয়। ড্রেড তখন সেনফোর্ডের নামে মামলা করে। ড্রেড স্কটের দাবি হলো যেহেতু তিনি ফ্রি রাজ্যে অনেক দিন বসবাস করেছেন কাজেই তিনি স্বাধীন এবং তাঁকে বিক্রী করা বেআইনি।

চিফ জাস্টিস ট্যানি ১৮২০ সালের মিসৌরি সমঝোতাকে সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করেন এবং ড্রেড স্কটের মামলা নাকচ করে দেন। এই রায়ের মূল বক্তব্য হচ্ছে দাসেরা মানুষ নয় বরং সম্পদ (private property) মাত্র। দাসরাজ্য কিংবা ফ্রি রাজ্য মালিক যেখানেই থাকুক না কেন সম্পদের মালিকানা যেমন মালিকেরই থাকে, দাসদের ক্ষেত্রেও তাই। তারা তো আর মালিকদের মতো মানুষ নয়।

বেসরকারী উদ্যোগের চ্যাম্পিয়ন হিসাবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনও ক্রীতদাসদেরকে ‘সম্পদ’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর ডাইরিতে লিখেছিলেন, “the southern states would be taxed according to their numbers and their wealth conjunctly, while the northern would be taxed on numbers only”. জেফারসনের মতে দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্যে সরকারের কোনো দায়িত্ব ছিল না। তিনি মনে করতেন “That government is best which governs least.”

ট্যানির মতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে “জন্ম সূত্রে সব মানুষ সমান” (all men are created equal) হওয়ার কথা বলা হয়েছ তার মধ্যে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ক্রীতদাসেরা পড়ে না। কারণ ঘোষণাপত্রের প্রণেতারা নিজে এবং যাদের জন্যে এই ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়েছে তারা কেউ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ক্রীতদাস ছিল না। পক্ষান্তরে ড্রেড স্কট কৃষ্ণকায় এবং আমেরিকার নাগরিক হওয়ার কোনো যোগ্যতাই রাখে না। শ্বেতাঙ্গ লোকেরা কোনো ক্রমেই কালোদের কোনো অধিকারের কাছে মাথা নত করতে পারে না। একজন কৃষ্ণকায় ব্যক্তি তার নিজের স্বার্থেই অন্য আর দশটা পণ্যের মতো ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ইচ্ছানুসারে হাত বদল হবে।

দক্ষিণাঞ্চলের ডেমোক্রেটরা এই রায়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন কিন্তু উত্তরের রিপাবলিকানদের কাছে এই রায় ছিল সংবিধানের অপব্যাখ্যা মাত্র।

দাসপ্রথার পক্ষপাতী দক্ষিণের সাদা লোকেরা অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও আরেকটা ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিল। সাদারা মনে করতো কালোরা স্বাধীন হলে তাদের সাথে একত্রে বসবাস করা মোটেই সম্ভব হবে না।

৭.
দাসমুক্তির প্রায় দেড় শত বছর পরেও আমেরিকান-আফ্রিকানরা শিক্ষায়-দীক্ষায় ধন-সম্পত্তি ও পদমর্যাদায় শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। প্রফেসর গুণার মিরডালের সারকুলার কজেশন থিওরির বাস্তব রূপ এই আমেরিকান-আফ্রিকানরা।

শুরুতে গরীব বলেই গরীবরা দারিদ্র ছাড়িয়ে উপরে উঠার যেসব পথ আছে সেগুলির নাগাল পায় না। পাক-ভারত-বাংলাদেশ, এশিয়া, ইউরোপ আমেরিকা সর্বত্র একই চিত্র। এখন আর দাসপ্রথা নেই কোথাও। কিন্ত দাসদের চেয়েও ঘৃণ্য জীবন যাপন করছে অনেকেই।

nel-simon-12

মনুমেন্ট ফর ইমানসিপেশন, শিল্পী. নেল সাইমন

আন্তর্জাতিক শ্রম প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে জানা যায়, আধুনিক পৃথিবীতে প্রায় ৩৬ মিলিয়ন লোক তাদের নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিনা বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। দাসপ্রথার শুরুতে যেমন আফ্রিকা তথা যেসব দেশ বিভিন্ন কারণে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সমর্থ ছিল না সেখান থেকে লোকজনকে ধরে ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাস হিসাবে বিক্রি করতো তেমনি আধুনিক বিশ্বে দারিদ্র ও নানা রকম আর্থ-সামাজিক চাপে পড়ে মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

এই সুযোগে এক শ্রেণীর দালাল বৈধ চাকরির লোভ দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের টাকা নেয় এবং এশিয়া আফ্রিকা আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। অবস্থার চাপে পড়ে এদের যে কোনো কাজই করতে হয় এবং কাজ ছেড়ে পালাবারও কোনো উপায় থাকে না।

৮.
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত Disposable People: New Slavery in the Global Economy বইতে কেভিন বেইলস (Kevin Bales) বলেন, আধুনিক বিশ্বে দাসেরা অনেক শস্তা। দাসেরা এখন আর বিনিয়োগের উপযুক্ত কোনো সামগ্রী হিসাবে গণ্য নয়।

Kevin-B.-Bales

কেভিন বেইলস: ফ্রি দ্য স্লেভস-এর কো-ফাউন্ডার ও সাবেক প্রেসিডেন্ট।

new-slavery1

তার মতে ১৮৫০ সালের দিকে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে একজন ক্রীতদাসের মূল্য ছিল প্রায় চল্লিশ হাজার ডলার (এখনকার দামে) আর বর্তমান পৃথিবীতে গড়ে নব্বই ডলার।

ঊনিশ শতকে আফ্রিকার জঙ্গলে একজন লোক ধরা এবং ক্রীতদাস হিসাবে আমেরিকায় চালান দেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে দাসেরা অসুস্থ হলে তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ করে না কেউ। নদীতে কিংবা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিলেই হলো— দায়িত্ব খালাস।

এই অবস্থার অবসান চাই।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।