page contents

কড়ি দ্য ‘মাস্টারশেফ’!

শেয়ার করুন!

কড়ির যখন দুই বছর বয়স, তখন থেকেই সে একটা গান গাইত—‘সো ইয়ামি সো ইয়ামি দেয়ারস আ পার্টি ইন মাই টামি।’ মানে অনেক রকম খাবার দাবার তার পেটের ভিতরে ঢুকে মনের সুখে নাচানাচি করতেছে। এই গান গাওয়ার সময় তার হাতের পাতা পেটের উপরে ঘুরাইতে থাকত। একবার ডাইনিং টেবিলে ওকে বসায়ে গানটা ভিডিও করছিলাম, তবে হায়, সেই ভিডিও এখন কালের অতলে তলাইয়া গেছে।

ছয় সাত বছর বয়সে একবার তার ফুপুকে ছোটবেলার স্মৃতি বলতেছিল। ওর নাকি সবচেয়ে আনন্দের সময় ছিল আমাদের বাসায় শীতের সকাল। ওই সময় আমরা ক্যারাম ডাউনস-এর বাসায় ছিলাম, আমাদের বাসাকে কড়ি ডাকে ‘নানা হাউস’। তো নানা হাউসে কড়ি আসত ছুটির দিনগুলাতে। বেশ সকাল সকাল ঘুম ভাঙলে রান্নাঘরে এসে দেখত আম্মা কিছু না কিছু করতেছে।

luna 2 a logo

বাড়ির বাকি সব তখনও ঘুমে। আম্মা নাকি তাকে সোফায় বসায়ে পায়ের উপরে কম্বল মুড়ে দিত। তারপরে মাত্র বানানো ধোঁয়াওঠা নুডলসের প্লেট দিত তার হাতে। এই গল্প বলার পরে ওর ফুপুর প্রাণ সে অতিষ্ট করে দিছিল নানুর মতন নুডলস বানায়ে দেয়ার জন্য। এবং শেষ পর্যন্ত ঘোষণা করল তার নানু হইলো মাস্টারশেফ, ওইরকম আর কেউ পারে না।

kori-10

‘মাস্টারশেফ জর্জ ক্যালম্বারিস এর সাথে কড়ি ও তার বান্ধবী রেমি।’—লেখক

‘মাস্টারশেফ’ একমাত্র টিভি অনুষ্ঠান যেটা আম্মা খুব নিয়ম করে দেখে। সব প্রতিযোগীদের নাম-ধাম ইতিহাস থেকে শুরু করে বিচারকদের হাঁড়ির খবর জানে। এই অনুষ্ঠান কড়িও দেখে। অস্ট্রেলিয়ার মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতার যে তিনজন বিচারক আছেন তাদের মধ্যে একজনের নাম জর্জ। উনি মেলবোর্ন থাকেন এবং তার বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট আছে শহরে।

কড়ি আর ওর বন্ধু রেমি একবার জর্জের রেস্টুরেন্টে খাইতে গেছিল এবং গিয়ে তার সাথে ছবিও তুলছে। সেইটা নিয়ে বাসায় কত হুলস্থুল! উত্তম কুমার এসে দরোজায় নক করলেও বোধহয় আম্মা এত খুশি হইত না!

কড়ি যে আসলেই বড় হইতেছে বুঝতে পারলাম এক শনিবারের সকালে। আগের রাতে অনেক রাত করে ঘুমাইছিলাম। ঘুম ভাঙলো কোনো কিছু ওভেনে বেকড হইতে থাকার গন্ধে। বেকিং-এর গন্ধের সাথে সুখের সম্পর্ক আছে মনে হয়। মনে হইতে থাকে দুনিয়ার সবাই খুব কাছাকাছি। অনেক গল্প বা সিনেমাতেও দেখছি বেকিং-এর সাথে প্যাশন রিলেট করে। বোধহয় একটা ভরাট ভাব আছে এর মধ্যে। শান্ত একটা গৃহী ভাব।

সেই সকাল বেলায় আমার খোলা জানালা দিয়ে পাখির ডাক শুনতেছিলাম। নরম রোদ ঢুকে গেছিল ঘরে, আর নিচের তলায় সবার কথা বলা হাসির শব্দের সাথে সাথে ওই খিদা লাগানো গন্ধটা।

kori-2

‘নানাভাইয়া, কড়ি আর গরম গরম স্কোন’—লেখক

kori-5

‘এক ফ্যামিলির দুই মাস্টারশেফ।’—লেখক

কোনো মতে রেডি হয়ে নিচে নেমে দেখি ধুমধাম লেগে গেছে পুরা। কড়ি একদম নিজে নিজে স্কোন বানাইছে। ওইগুলা তখন ওভেন থেকে নামানো হইতেছে। এর পরের কয়েক মুহূর্ত বেহেশতে ছিলাম। গালুম গুলুম কইরা খাইলাম আর অবাক হইলাম সে কই থেকে শিখছে এতসব। এই বিষয়ে তার ইন্টারভিউ নিলাম। তরজমা দিতেছি নিচে:

লুনা—এই হইল আমাদের মাস্টারশেফ কড়ি। উনি অনেক ব্যস্ত। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও কয়েক মিনিট সময় বের করে আমাকে একটা সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হইছেন। হ্যালো কড়ি, আপনি কেমন আছেন?

কড়ি—আমি ভালো আছি, আপনার খবর কী?

লুনা—আমি তো মহা আনন্দে আছি, বিশেষ করে আপনার বানানো স্কোন খাওয়ার পরে। এই সম্পর্কে কিছু বলেন আমাকে।

কড়ি—রেসিপিটা পাইছি স্কুল থেকে। আমার স্কুলের আফটার কেয়ার প্রোগ্রামের অংশ হিসাবে একটা কুকিং ক্লাবে ছিলাম। আমরা স্কোন বানাচ্ছিলাম সেখানে আমার এত্ত মজা লাগছে যে আমি রেসিপিটা মুখস্থ করে ফেলে ওইটা বাসায় নিয়ে গেছিলাম।

লুনা—খুবই মজা ছিল। আর আমাদেরকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্যও অনেক ধন্যবাদ। এত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠছেন আপনি, যা মোটেই আপনার রোজকার অভ্যাস না। আপনি তো মনে হয় সবার আগে ঘুম থেকে উঠছেন আজকে, না?

কড়ি—না… মা উঠছে সবার আগে।

লুনা—তারপরে নানু, তারপরে আপনি?

কড়ি—হ্যাঁ।

লুনা—তো মা কি একটু হেল্প করছে এইটা বানানোতে?

কড়ি—মা ছিল আমার অ্যাসিসট্যান্ট শেফ। উনি হেল্প করেছেন ওভেন ঠিক করে দিতে, যেসব কাজে বাচ্চাদেরকে হেল্প করতে হয় বড়দের। কাজেই ওভেনটা মার দায়িত্বে ছিল।

লুনা—কিন্তু বাকি সব আপনি করছেন?

কড়ি— হ্যাঁ সবকিছু।

লুনা—ওয়াও। খুবই জোস হইছে আর সারপ্রাইজ যে আমাদের ভালো লাগছে তা তো বুঝতেই পারতেছেন। এর পরের বার যখন বানাবেন, তখন আমাকে দেখাবেন কীভাবে বানায়, তাই না?


ইউটিউব ভিডিও: cori the masterchef

কড়ি—হ্যাঁ, আর আমি রেসিপিটা আমার ব্লগে দিব।

লুনা—আপনার ব্লগের ঠিকানা দেন, যাতে আমরাও দেখতে পাই।

কড়ি—আপনার ফেসবুক পেইজে লিঙ্ক পাওয়া যাবে।

লুনা—তথাস্তু। আমাকে পাঠাইয়েন।

কড়ি—ঠিকাছে।

লুনা—আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ কড়ি। আর মজার নাস্তার জন্যেও।

কড়ি—আপনি ওয়েলকাম।

kori-6

‘নানাভাইয়া, নানু এবং কড়ি।’—লেখক

আজকে তার জন্মদিন। এই জন্মদিনটা অন্যরকম। ১ তারিখে ওর ছোট বোন আসছে দুনিয়ায়। তাই এইদিনে খুব বেশি হইচই করা হবে না। কালকে রাতে ওদেরকে যখন দেখতে গেছিলাম, কিছুক্ষণ পর পর মনে করায়ে দিচ্ছিল আর ঠিক কয় ঘণ্টা পরে ওর জন্মদিন শুরু হবে। তারপরে বলল, “আমি একটা ফ্যামিলি পার্টি চাই।”

আমার ধারণা এই বয়সের জীবনের রহস্য সে বুইঝা ফেলছে। সুখ হইল যখন মজার মজার খাবার পেটের মধ্যে ডিগবাজি দেয় আর আপনজনেরা আশেপাশে থাইকা জ্বালাতন করে।

ওর জন্মদিনের সম্মানে তার রেসিপিটাও দেই এইখানে। আপনারাও খান।

 

***

কড়ির স্কোন বানানোর রেসিপি

kori-12

কড়ির বানানো স্কোন—লেখক

যা যা লাগবে

সাড়ে তিনশো গ্রাম সেলফ রেইজিং ময়দা, ১ চা চামচ বেকিং পাউডার, একটু খানি লবণ, ২ চামচ চিনি, কিউব করা বাটার ৮৫ গ্রাম, দুই কাপের মতন দুধ ময়দা মাখানোর জন্য, ভ্যানিলা এসেন্স, গ্লেজ দেয়ার জন্য ফেটানো ডিম আর পরে পরিবেশন করার জন্য জ্যাম আর ক্রিম।

 

প্রক্রিয়া

১. ওভেন গরম করেন ২২০ সেলসিয়াসে।

২. একটা বাটিতে ময়দা, লবণ আর বেকিং পাউডার ঢেলে মিশান। তার মধ্যে বাটার দিয়ে, আচ্ছা মতন ডলা দিতে দিতে মাখান। ময়দাটা দেখতে একটু দানা দানা বিস্কুটের গুড়ার মতন হবে ডলা খাইতে খাইতে। এইবার চিনি মিশান।

৩. ওভেনে বেকিং ট্রেতে একটা বেকিং কাগজ দিয়ে ট্রেটা রেডি করেন। এদিকে মাইক্রোওয়েভে দুধ গরম করেন ৩০ সেকন্ডের মতন। কুসুম গরম দুধের মধ্যে ভ্যানিলা মিশান।

৪. বাটির ময়দার মাঝখানে একটা গর্ত বানায়ে তার ভিতরে দুধটা ঢালতে থাকেন আস্তে আস্তে আর একটা বাটার মাখানোর ছুরি দিয়ে মিশাইতে থাকেন। শুরুতে বেশ ভিজা ভিজা হবে ময়দাটা। রুটি বানানোর পিড়িতে একটু গুড়া ময়দা ছিটায়ে ময়দার তালটা তার উপরে রেখে বেলতে হবে। কয়েক ভাঁজে বেলতে বেলতে একটা মসৃণ মণ্ড হবে। প্রায় ৪ সেন্টিমিটারের মতন পুরু করে বেলেন।

৫. তারপরে কাটার দিয়ে কেটে কেটে ছোট ছোট স্কোন বানান। নিজের পছন্দ মতন শেইপ বানাইতে পারেন। কাটা স্কোনগুলা ট্রেতে বিছায়ে ফেটানো ডিমের প্রলেপ দিতে হবে গ্লেজ করার জন্য। তারপর ওভেনে দিয়ে ১০ মিনিটের মত বেক করতে হবে। এবং তারপরে জ্যাম, ক্রিম দিয়ে বাড়ির অন্য সবার সাথে বসে বুভুক্ষুর মতন খাইতে হবে।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

লুনা রুশদী
লুনা রুশদী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৭৫, করোটিয়া। শৈশব কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে লেখাপড়া নবম শ্রেণী পর্যন্ত, তারপর ১৯৮৯ থেকে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে লা-ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, পরবর্তীতে বৃত্তি নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এ স্নাতোকত্তর লেখাপড়া সিডনির ইউ.টি.এস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি নিয়ে দশ বছর নিউজিল্যান্ড থাকার পর বর্তমানে মেলবোর্ন প্রবাসী। মেলবোর্নে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখার মাধ্যমে লেখালেখির শুরু - প্রথম বাংলাদেশি পত্রিকা ‘অঙ্কুর’ সম্পাদনা ছাত্রজীবনে। বাংলায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালে। এরপর বিভিন্ন বাংলাদেশি ও ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখি। প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি গল্প নিউজিল্যান্ডের ‘লিসেনার’ পত্রিকায় ২০১১ সালে। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ অরুন্ধতি রায় এর ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাব্‌লিক’ (২০১২), উপন্যাস ‘আনবাড়ি’ (২০১৩) প্রকাশক শুদ্ধস্বর।

Leave a Reply