গবেষণা বলছে, উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটির কারণে আপনি আরো ভাল করতে পারেন

শেয়ার করুন!

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বেশিরভাগই অ্যাংজাইটির রোগী হয়ে থাকেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো কিছুর আতঙ্ক বা ফোবিয়ায়। আবার কেউ কেউ আক্রান্ত সাধারণ অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই, এই রোগীরা তাদের অস্বস্তির জগৎ থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে থাকেন।

অনেকের ক্ষেত্রেই অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার নির্ণয় করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু সন্দেহ নেই, বেশিরভাগ মানুষেরই অ্যাংজাইটির অভিজ্ঞতা হয়েছে জীবনের কোনো না কোনো সময়। বক্তৃতা দেয়ার আগে কারো হার্টবিট বেড়ে গেছ। বেতন বাড়াতে বলার সময় ভয়ে হাত ঘেমে গেছে কারো। অস্বস্তিকর ভীতির এই অনুভূতি অস্বাভাবিক কিছু নয়।

অ্যাংজাইটি থেকে পালাতে গিয়ে অনেকেই ঝুঁকি নিতে চায় না। অনেকেই নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরোতে চায় না। কারণ অ্যাংজাইটি অস্বস্তিকর। আর এ থেকে মুক্তির সহজতম উপায় হল অ্যাংজাইটির জন্ম দেয় এমন সব কিছুকে এড়িয়ে চলা।

অনেকেই নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরোতে চায় না। কারণ অ্যাংজাইটি অস্বস্তিকর।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাংজাইটি সবসময় খারাপ না। বরং অ্যাংজাইটির ফলে আপনার পারফর্ম্যান্স আরো ভাল হতে পারে যদি আপনি জানেন একে কীভাবে সামলাতে হয়।

 

অ্যাংজাইটি কী?

আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, অ্যাংজাইটি হল এক ধরনের আবেগ যার উৎস টেনশন, দুশ্চিন্তা বা কোনো শারীরিক পরিবর্তনের (যেমন রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া)। এর লক্ষণগুলি মানুষভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। এবং যে দুশ্চিন্তার ফলে অ্যাংজাইটি হয়, অ্যাংজাইটির পরিমাণ তার মাত্রার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে।

ফলে, কারো হয়ত মাথা ঘোরাতে পারে প্লেনে চড়ার ভয়ে। আবার অন্য কেউ নার্ভাস হয়ে যেতে পারেন ডেইটে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে গিয়েই।

 

অ্যাংজাইটির কারণ

অ্যাংজাইটি খুবই স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর একটি আবেগ। এটি মূলত আপনাকে ভবিষ্যৎ বিপদের ব্যাপারে আগাম সতর্কবাণী দিয়ে থাকে।

যখন আপনি ভয়ংকর কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, আপনার মধ্যে ফাইট-ওর-ফ্লাইট প্রতিক্রিয়া চালু হয়। অর্থাৎ, হয় আপনি নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পরিস্থিতিটা মোকাবেলা করবেন (ফাইট), নয়ত একই কারণে আপনি পালাবেন (ফ্লাইট)। দুক্ষেত্রেই আপনার মধ্যে যে তীব্র ইচ্ছাশক্তি জেগে ওঠে তা আপনাকে অস্তিত্ব রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।

কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই কিছু কিছু পরিস্থিতিতে অ্যাংজাইটিতে আক্রান্ত হন যা আসলে তাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয় এমন কিছু না। যেমন, চাকরির ইন্টারভিউ, বা নিজের জন্য কোনো কথা বলা, বা বক্তৃতা দেয়ার সাথে জীবনের ঝুঁকি জড়িত নয়। কিন্তু ওইসব পরিস্থিতিতে আপনার শরীর একই রকম প্রতিক্রিয়া করতে পারে যেন বা আপনি এক হাতে ধরে কোনোমতে ঝুলে আছেন উঁচু কোনো স্থান থেকে।

 

অ্যাংজাইটি কীভাবে আপনার পারফর্ম্যান্সকে প্রভাবিত করে

এ ব্যাপারে অ্যাংজাইটিকে শত্রু হিসেবে ভাবার চলটাই বেশি। অ্যাথলেট আর পারফর্মারদের সাধারণত বলা হয় যেন তারা তাদের মঞ্চভীতি বা নার্ভাসনেসকে দূর করে। আর সত্যি সত্যিই, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে অ্যাংজাইটির ফলে স্মৃতি ঠিকঠাক কাজ করে না বা মনোযোগ কমে আসে।

কিন্তু কিছু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাংজাইটি সবসময় পারফর্ম্যান্সের মান কমায় না। বরং, এর ফলে পারফর্ম্যান্স আরো ভাল হতে পারে।

জার্নাল অফ ইনডিভিজুয়াল ডিফারেন্সেস-এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় পরিস্থিতি অনুযায়ী মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে নিরীক্ষার ফল আলোচনা করা হয়। গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে, যারা তাদের সেই স্নায়বিক চাপের ঘটনাগুলিকে হুমকি হিসেবে না নিয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন, তারা তাদের অ্যাংজাইটি থেকে বরং শক্তি পেয়েছেন। ইচ্ছাশক্তির এই বৃদ্ধি তাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়ে তাদের পারফর্ম্যান্সকে উন্নত করেছে। গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন, যারা অ্যাংজাইটি থেকে না পালিয়ে বা তাকে না দমিয়ে রেখে বরং তাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারাই ভাল পারফর্ম করতে পেরেছেন। যারা আবেগ ও অ্যাংজাইটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছে তারা তাদের সমস্ত শক্তি লক্ষ্য অর্জনে ব্যয় করতে পেরেছেন।

 

অ্যাংজাইটিকে গ্রহণ করুন

যখন আপনি অ্যাংজাইটির মুখোমুখি হন তখন আপনার কাছে দুটি পথ খোলা থাকে। বাড়তি শক্তি খরচ করে আপনি তা দমিয়ে রাখতে পারেন। কিংবা তা গ্রহণ করতে পারেন। যদিও ব্যাপারটা কিছুটা অস্বস্তিকর, কিন্তু তা সহনীয়। ফলে সবাই আমার হাত কাঁপাকাঁপি দেখে ফেলবে বা আমি যে পারব না তার প্রমাণ আমার অ্যাংজাইটি এই কথাগুলি নিজেকে বলা থেকে বিরত থাকুন। বরং বলুন, “অ্যাংজাইটি থেকে আসা বাড়তি ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগিয়ে আমি বরং আরো ভাল করতে পারি।”

অ্যাংজাইটির মধ্যে থাকা অবস্থাতেও আপনি সফল হতে পারেন যদি এটা ভাবতে পারেন যে এই নার্ভাস অ্যানার্জি কাজে লাগিয়ে আপনি আরো ভাল পারফর্ম করতে পারেন। যদি ভাবেন অ্যাংজাইটি আপনাকে থামিয়ে দিবে, ভবিষ্যৎবাণীর মতই সত্যি হয়ে যেতে পারে তা।

সবচেয়ে ভালো খবরটা হল, অ্যাংজাইটি চলাকালীন সময়ে যদি আপনি তা উপরে উল্লেখিত উপায়ে সঠিকভাবে মোকাবেলা করেন, আপনার মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। ধীরে ধীরে, অ্যাংজাইটিকে মেনে নেয়ার ক্ষমতার ফলে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকবে। এবং আপনি মানসিক চাপকে হুমকি হিসেবে না নিয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে শুরু করবেন।

অ্যাংজাইটির পরিমাণ বেশি হলে সাহায্য নিন

যদি অ্যাংজাইটির ফলে আপনার দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যহত হয়, যেমন কর্মস্থলে যাওয়া, স্কুলে যাওয়া, বা সামাজিক মেলামেশায় সমস্যা হওয়া, তাহলে হয়ত আপনি অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারে ভুগছেন। তবে আশার খবর, অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার নিরাময়যোগ্য।

দুর্ভাগ্যবশত, অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই কাটিয়ে দেন বছরের পর বছর। অথচ যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের সাহায্য নেয়া হবে, তত তাড়াতাড়ি সেরে উঠবেন আপনি।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here