page contents
Breaking News

গলির মুখে বেতো ঘোড়া

অফিসের গাড়ি ধরার জন্যে আমারে মিনিট পাঁচেক হাঁটতে হয়। বাসার গলি দিয়া বাইর হইয়া মাঝারি রাস্তায় যাইতে দেড় মিনিট আর মাঝারি রাস্তা ধইরা বড় রাস্তায় যাইতে বাকি সাড়ে তিন মিনিট।

আজকে বাসার গলি দিয়া বাইর হইবার সময় দেখি রাস্তার মুখে আড়াআড়ি খাড়ায়া রইছে একটা বেতো ঘোড়া।

umme-farhana-logo

আমার দেরি হইয়া যাইতেছিল, অফিসের বাস মিস হইলে লোকাল বাসে যাইতে হবে, লোকাল বাসের বিশ্রী সিটে বইসা যাওয়ার চাইতেও বড় ঝামেলা হইলো বাস থাইকা নাইমা অনেক খানি ভাঙ্গা রাস্তা রিকশা কিংবা ভ্যান গাড়িতে ঝাঁকি খাইতে খাইতে যাইতে হয়।

এত সকল ব্যাপার মাথায় থাকার পরেও আমি পকেট থাইকা মোবাইল ফোন বাইর করলাম, ছবি তোলার জন্যে। ফোনে চার্জ প্রায় নাই, তবু একটা ছবি তোলার চেষ্টা করলাম।

আমার যে একখানা ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল ফোন আছে এইটা আমি প্রায়ই ভুইলা যাই। ফোনকে আমার কথা বলার যন্ত্র বইলা মনে হয়। সম্ভবত আমি যুগের তুলনায় অনাধুনিক বইলাই এইটা হয়। আজকালের মানুষ দেখি শীতে কাবু হইয়া কম্বল গায়ে দিলেও ছবি তোলে, বইয়ের শেলফে টিকটিকি মইরা পইড়া থাকলেও তোলে।

আমি ছবি তুলতে চাইলাম কারণ এইটা অত্যন্ত বিরল ঘটনা যে আবাসিক এলাকায় হঠাৎ কইরা একটা বেতো ঘোড়া আইসা উপস্থিত হইবো। আমি যে মাঝারি রাস্তা ধইরা অফিসের গাড়ির জন্যে হাঁটি সেই রাস্তায় অনেক গরু বইসা থাকে। মালিকবিহীন গরু। কিন্তু ঘোড়া কোনোদিন দেখি নাই।

ঘোড়া শুধু ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে সাহেব পার্ক, যেইটারে এখন জয়নুল আবেদিন পার্ক নাম দেওয়া হইছে, সেইখানে দেখা যায়। পার্কে বেড়াইতে আসা বাচ্চাকাচ্চাদেরে ঘোড়ার গাড়ি চড়ানের জন্যে কই থাইকা হাড্ডিসার কতগুলা ঘোড়া নিয়া আসছে, সেইগুলাই অবসর সময়ে পার্কের আশপাশে চড়তে থাকে।

gangafaring-1

“দেখি রাস্তার মুখে আড়াআড়ি খাড়ায়া রইছে একটা বেতো ঘোড়া।”—ছবি. লেখক

গরু দেইখা আমি অভ্যস্ত হইয়া গেছি দেইখা আমার এতে অবাক লাগে না, কিন্তু মমেনসিং নতুন আসছে এমন যে কেউ এই সকল বেওয়ারিশ গরু দেইখা বিস্মিত হয়।

আমি শুনতে পাইছি যে এই সব গরু নাকি বেওয়ারিশ না, এদের মালিক হইলো শহরের বিভিন্ন মন্দির।

সত্যাসত্য জানি না, যাচাইও করি নাই। ‘বৃষোৎসর্গ’ বইলা একটা ব্যাপার মনে হয় আছে, মুসলমানেরা যেমন ‘সদকা’র মুরগী ছাইড়া দেয় তেমনি গরু কিন্না কোনো একটা মানত কইরা ছাইড়া দিতে হয়।

আমি এমনিতে পশুপ্রেমী না। জীবনেও কোনো পশুপক্ষী আমি পালি নাই। কিন্তু এই বেওয়ারিশ গরুগুলারে ডাস্টবিনের কুকুরের সঙ্গে গুঁতাগুঁতি কইরা সবজির খোসা খুঁজতে দেখলে আমার খুবই কষ্ট লাগে। সবজি কাটার সময় প্রতিবার আমার মনে হয়, এই মটরশুঁটির ছাল আর ফুলকপির ডাঁটিগুলা ইউজ করা ডায়াপার কনডম আর স্যানিটারি ন্যাপকিনের লগে মাখামাখি হউনের আগেই ওই গরুগুলারে দেওয়া যাইতো। ওরা একটু আরাম কইরা খাইতে পারতো।

বেওয়ারিশ বিড়ালদেরে দেখলেও আমার খারাপ লাগে। এই জন্যে না যে আমার বিড়ালপ্রীতি আছে, বরং এই জন্যে যে বিড়াল খুবই পরিষ্কার প্রাণী। যে প্রাণীর স্বভাব হইলো পরিষ্কার থাকা সে যখন নোংরা ঘাইটা খাবার খুঁজে তখন বুঝতে হবে সে অনাহারে অর্ধাহারে কোনো মতনে বাঁইচা আছে।

আমরা যখন ডিবি রোডের বাসায় থাকতাম, আমাদের বাথরুমের ভেন্টিলেটরের কাচ ভাঙা ছিলো। পাশের বাসার রাজীব ভাইয়ের জন্যে রাখা মাছ চুরি কইরা একটা বিড়াল পলাইতাছিল আর সেইটার দিকে প্রতিহিংসা নিয়া রাজীব ভাই ইট ছুঁইড়া মারছিল। দেওয়ালের উপর দিয়া দ্রুত হাঁইটা বা দৌড়াইয়া যাওয়া বিড়ালের গায়ে না লাইগা ঢিলটা আইসা লাগছিল আমাদের বাথরুমের ভেন্টিলেটরে।আজকাল প্রায় সকল বাসাই ফ্ল্যাট বাসা। খোলামেলা বাসাগুলাতেও রান্নাঘরের জালনায় নেট লাগানো থাকে। তাই বিড়ালেরা কারোর পাকের ঘর থাইকা ফ্রেশ মাছ ভাজা চুরি কইরা খাইতে পারে না।

আমার মেজো চাচারে আমি আড়ালে ডাকি ওকোঙ্কো। ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ পড়ার পর থাইকা তারে আমি এই নাম দিছি কারণ সে একজন অথরিটারিয়ান প্যাট্রিয়ার্ক, আমার আব্বার মৃত্যুর পর সে নিজেরে বাড়ির অঘোষিত কর্তা ভাইবা নিয়া সবার উপরে ছড়ি ঘোরায়।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সকলেই উঠানওলা একটা এল শেপের বাড়িতে থাকতো। ওই বাসায় বিড়ালরা আসা যাওয়া করতো, কেউ তাদেরে পালতো না, তবু তারা মোটামুটি খায়াদায়া পোষার মতন হইয়া গেছিলো। ওকোঙ্কো একদিন বিনা কারণে বাড়ি মাইরা একটা কিশোর বয়সী বিড়ালের মাজা ভাইঙ্গা দিলো। বিড়ালের জান শক্ত বইলা সে তক্ষুনি মরে নাই, পেয়ারা গাছের তলে পইড়া কাতরাইতেছিলো।ওকোঙ্কো তখন একটা তার পেঁচাইয়া বিড়ালটার গলায় আটকাইয়া অরে রাস্তার ডাস্টবিনে মরার লাইগ্যা ফালায়া দিয়া আসলো।

আমার ৮/৯ বছরের জীবনে এর চেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্য আমি আর দেখি নাই। এমনিতে বিড়াল আমার প্রিয় না কারণ আমাদের একটা পালা কবুতর (আমি নিজে পালি নাই, বাসার ছাদে ঘর বানাইয়া রাখা হইছিলো) বিড়ালের হাতে জখম হইয়া জান দিছিলো। কবুতরটারে আমলকী গাছের নিচে কবর দেওয়া হইছিলো। তবু ওকোঙ্কোর ঠাণ্ডা মাথায় বিড়াল হত্যার দৃশ্য আমি সহজে নিতে পারি নাই। এত বছর পরেও আমার সেই দিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে।

একবার আমার বাসার দরজা খোলা পাইয়া একটা বিড়াল ঢুইকা মাত্র জ্বাল দেওয়া এক লিটার দুধের সসপ্যানে মুখ দিলে আমি বিড়ালটার প্রতি খুব রাইগা গেছিলাম। কিন্তু বিড়াল জালনা দিয়া পালাইয়া যাওনের পরে দুধটা সিঙ্কে ঢাইলা ফালায়া দেওনের সময় আমার মনে হইলো, দুধটা যেহেতু আমি খাবোই না, তাইলে অরেই দিয়া দিতাম। কিন্তু ডাকলে ত আর সে আসবে না, আমি বাথরুম থাইকা সসপ্যানের ঢাকনা পড়ার আওয়াজ পাইয়া পাকঘরে উঁকি দিয়া তারে দুধ খাইতে হাতেনাতে ধইরা ফেলার সময় সে অত্যন্ত হিংস্র ও শত্রুতাভাবাপন্ন দৃষ্টি নিয়া আমার দিকে চায়া ছিলো।

জাহাঙ্গীরনগরে আমি যখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, ২০০৬ সালে, ওই সময় ট্রান্সপোর্টে একটা কুকুরের বাচ্চার সঙ্গে আমার মোটামুটি খাতির হইছিলো। মেয়ে কুকুর হইলেও তার নাম ছিলো টাইক। ট্রান্সপোর্টের পাশের আল বেরুনি হলের বর্ধিত ভবনের ছেলেদের মধ্যে কেউ অরে এই নাম দিছিলো। ওর আরেক সহোদরের নাম ছিলো স্পাইক, সে ছেলে না মেয়ে তা আমি জানতাম না। তবে টাইক অত্যন্ত সুন্দরী ছিলো। টাইকরে কুকুরনিধনযজ্ঞের সময় হত্যা করা হয়। সেই সময় আমি ক্যাম্পাসে ছিলাম না। থাকলেও যে কিছু করতে পারতাম তাও না। কারণ টাইকরে আমার চেয়েও বেশি আদর করতো এমন অনেকেই ক্যাম্পাসে ছিলো, তারাও কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু করতে সমর্থ হয় নাই।

পশুপক্ষীর প্রতি অহেতুক নৃশংসতা দেইখা মানুষ এতই অভ্যস্ত হইয়া গেছে যে এই নিয়া কেউ কোনো কথা কইলেও সেইটারে আদেখলামি ভাবে। মানুষের প্রতিই মানুষের সহমর্মিতা নাই, পশুর প্রতি থাকবো ক্যান?

আমি নিজেও একবার এইরকম অসংবেদনশীল আচরণ করছিলাম। ট্রান্সপোর্টের আড্ডায় এক জুনিয়র ছেলে কইতেছিলো যে তার খালা নাকি পোষা পক্ষী মারা যাওনের পরে দুই দিন ভাত খায় নাই। শুইন্যা আমি কইলাম, “আমার আব্বা মারা গেছিলো সকাল নয়টায়, অইদিন দুপুরে তিনতলার প্রতিবেশীর বাসায় গিয়া রুই মাছ দিয়া পেট ভইরা ভাত খাইছিলাম আমি।” এই কথার পরে ছেলে আর কিছু কইলো না। আমার ব্যাঙ্গ কিংবা বিদ্রূপ বেশ স্পষ্ট ছিলো। আমার বাপ মরার পরে শোক পালনের অবকাশ আমাদের ছিলো না দেইখ্যা যে আর কারো পোষা পক্ষীর মৃত্যুতে ভাত না খাইয়া শোক পালনের বিলাসিতা করার অধিকার নাই তা তো আর না।

এইটা টাইক নামের মাদী কুকুর, জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসের। ছবি লেখকের তোলা।

টাইক নামের মাদী কুকুর, জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসের। ছবি. লেখক

অনেক দিন পরে আমি কুকুর পোষার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আমার এক সহকর্মী কইতেছিলেন, “ম্যাডাম, আপনি যে টাকা কুকুরের পিছনে খরচ করবেন সেই টাকা দিলে অনেক মানুষের বাচ্চার অনেক উপকার হবে।” আমি উনার লগে তর্কে জড়াই নাই। মানুষ যে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ প্রাণী, এদেরে যে কলিজা কাইট্যা বিরান (ভুনা) কইরা খাইতে দিলেও এরা সন্তুষ্ট হবে না তা আমি আরো এক যুগ আগেই বুইঝ্যা গেছিলাম। কিন্তু আমি তাই বইলা মিসএন্থ্রপ না। মানুষের লগে সকল সম্পর্ক ত্যাগ কইরা রবিনসন ক্রুসোর মতন একাকী দ্বীপে বসবাস করার কোনো ইরাদাও আমার নাই। কিন্তু আমার সীমিত সামর্থ দিয়া কুকুর পালার বিলাসিতা না কইরা অসহায় এতিম মানুষের বাচ্চাদেরে সাহায্য করার পরামর্শ যিনি দিলেন তারেও আমার কাছে খুব বেশি মানবিক মনে হয় নাই।

মানুষ একমাত্র প্রাণী যারা নিজেদের প্রজাতিরে ধ্বংস করার জন্যে বোমা বানায়। তবু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, অনুভূতিগত উৎকর্ষ বুঝাইতেও আমরা ‘মানবিক’ শব্দটাই ব্যবহার করি, এই মাত্র আমিও করলাম।

তবে অন্যান্য প্রাণীর প্রতি দয়া মায়া করুণা ইত্যাদি দেখাইতে গেলে যখন মানুষ কইতে চায় যে আপনে নিজেও তো মানুষের প্রতি দ্বেষ নিয়া অন্য প্রাণীর প্রতি আদরের পরাকাষ্ঠা দেখাইতেছেন, তাইলে আপনের মধ্যে আর যুদ্ধ কইরা যারা অন্য মানুষ মারে তাগর মধ্যে তফাৎ কুনখানে? তাদেরে আমার বলতে ইচ্ছা করে যে আমি যেমন মানুষ মারার পক্ষে না তেমন মানুষেরে দয়া মায়া করুণা ইত্যাদি দেখানেরও পক্ষে না। মানুষ পশুপক্ষী না যে তাদেরে আমার দয়া দেখাইতে হবে, করুণা করতে হবে।

আমি যদি কোনো দেবী হইতাম তাইলে তা করতে পারতাম হয়তো।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।

Leave a Reply