page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

গুলবাগ, পটুয়াখালী

এক দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে সিদ্ধান্ত হইল আমরা পটুয়াখালী থাকব না, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই বরিশাল শিফট করব।

আমরা তিনজন না অবশ্য, আমি আর আম্মু শুধু।

বাবা যেহেতু তখন পটুয়াখালীতে গ্রামীণ ব্যাংক যোনাল অফিসে ছিল, তাই বাবার শিফট করা সম্ভব না। বাবা মেসে থাকবে। শুক্র, শনিবারের ছুটিতে বরিশাল আসবে আমাদের সাথে দেখা করতে।

আমার টুয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শেষ হইছে। বছরের মাঝামাঝি সময়। আমি এমনিতেও পড়াশোনা করতাম না বেশি, পরীক্ষা শেষ হওয়ায় আরও ফুরফুরা মেজাজে ছিলাম।

বরিশাল শিফটের কথা শুইনা খুশি হইছিলাম, কারণ তখন আমি আমার সমস্ত কাজের এবং অকাজের গুরু হিসাবে আমার খালাত বোন শান্তা আপুরে মানি। শান্তা আপুদের দুইটা বাসা, দুইটাই একতলা, পাশাপাশি। একটা খালি থাকে। দুইটা রুম সেইটাতে। আমাদের এর বেশি দরকার হবে না।

ঠিক হইল আমরা ওইখানেই থাকব। এইটা শোনার পর ক্যালেন্ডার নিয়া হিসাব-নিকাশ করতে বসছিলাম। প্রতিদিন আম্মুর সাথে ঘ্যান ঘ্যান করতাম যাওয়ার ডেট আরও আগানোর জন্য।

আম্মু আমার কথারে বিশেষ পাত্তা দিত না। আমি প্রতিদিন কোনো না কোনো আর্জি নিয়া হাজির হইতাম, তাই আর্জিগুলি মূল্যহীন হইয়া পড়ছিল।

আম্মু পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে আলাপে আর মালপত্র গোছগাছে মহাব্যস্ত। আমাদের পাড়া মানে পটুয়াখালীর গুলবাগের মোটামুটি সবার সাথে আম্মুর খাতির ছিল মারাত্মক। আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকতাম, সেইটা দোতলা ছিল, বাইরে সিঁড়িওয়ালা। বাড়িওয়ালা সৌদি আরব থাকতেন। তার বৌ তাই বাপের বাড়ি থিকা আর এইখানে আসত না। মাসের প্রথমে ভাড়া নেওয়ার জন্য একবার আসত।

আমরা দোতলায় থাকতাম। নিচতলায় কুসুম আন্টিরা থাকতেন। আমি ওনারে পছন্দ করতাম না। কারণ হইল, উনি আমারে একদিন একটা ভারি কথা বলছিলেন। আমি ছোটকাল থিকাই ভারি কথাবার্তা এড়ায়া চলি।

ওনার সামনে একদিন আমের বারা খাওয়ার সময় উনি আমারে বলছিলেন, “তোমার মত স্মার্ট আর লক্ষ্মী মেয়ের আমের বীচিরে আমের বারা বলা ঠিক না।”

আমি তখন এবং এখনও আমের বীচিরে বারা-ই বলি। তাতে আমার স্মার্টনেস কইমা যায় বইলা আমার মনে হইত না।

এই থিকা ওনার সাথে কথাবার্তা বলতাম না আমি। তবে আম্মুর সাথে তার খাতির গলায় গলায় খাতিরের চেয়েও কিছু বেশি ছিল। আম্মু শুঁটকি ভর্তা করলেও কুসুম আন্টিরে না দিয়া খাইত না। কুসুম আন্টির বাসায় আলু শাক ভাজা হইলেও সেইটা আমাদের বাসায় পৌঁছাইত।

কুসুম আন্টি আম্মুরে সাহায্য করতেন মালপত্র কার্টুনে ভরতে, কাচের জিনিসপত্র গুছাইতে।

স্কুলের নাচের অনুষ্ঠান

একসময় খাট, টিভি, ফ্রিজ ছাড়া মোটামুটি সব প্যাকেট হইয়া গেল বাবার সাহায্য ছাড়াই। বাবা অফিস থিকা নয়টা দশটার আগে আসতে পারে না। আইসা আর কাজ করার অ্যানার্জি থাকে না। ভাত খাইয়া সোজা ঘুমাইতে চইলা যায়।

আম্মু আর কুসুম আন্টিই জিনিসপত্র গুছায়ে ফেললেন। ওনার ছেলে তূর্যরেও ডাকা হইত ভারি কাজের জন্য।

আমাদের বাসা থিকা একটু বাদে তালুকদার বাড়ি। সামনে ফটক, তারপর অল্প একটু ইটবিছানো রাস্তা, ভেতরে টিনের প্রায় ভাঙাচোরা বাসা। পিছনে একফালি উঠানের পর বিশাল পুকুর। চারপাশে বড় বড় গাছপালা। একটুও রোদ পড়ে না পানিতে। পুকুরের পানিতে শ্যাওলা পইড়া সবুজ হইয়া ছিল। পুকুরের পরে বড় কইরা দেয়াল টাইনা দেয়া। দেয়ালের উপরের সিমেন্টের আস্তরণ ভাইঙা ভাইঙা পড়তেছে।

তালুকদার বাড়ির বড় তালুকদার ছিলেন না, মারা গেছেন অনেক আগে। তার সাত মেয়ে। ছেলে নাই। ছোট তালুকদার আছেন, তার এক মেয়ে, এক ছেলে। ছেলে থাকায় তার ক্ষমতা বেশি। তার মেয়ে আর বউ কঠিন পর্দানশীল মানুষ ছিলেন। তাদের বাসায় গেলেই তারা বসাইয়া একটা দুইটা হাদিস শুনাইত। ফাতেমা আন্টি, ছোট তালুকদারের মেয়ে, এত বেশি পর্দানসিন যে কোনোদিন স্কুলেও যায় নাই। তবে পাড়ার সব খবর মানে কে কার লগে প্রেম করে, কে কার লগে পালাইয়া গেছে—সব তার নখদর্পণে।

আম্মু তারে জিজ্ঞেস করত সে এতকিছু জানে কেমনে ঘরের মধ্যে থাইকা। ফাতেমা আন্টি রহস্যের হাসি হাইসা মাথার কাপড় আরও একটু টাইনা দিয়া বলতেন, সব খবর রাখে সে। আর সামনের রুমের টিনে ফুটা কইরা নিছে। সেইখান থিকাও রাস্তায় কী হইল না হইল জানা যায়। পর্দায় থাকা হইল আবার খবরও রাখা হইল!

বড় তালুকদারের ছোট দুই মেয়ে যমজ ছিল, হাসি আন্টি আর খুশি আন্টি। এদের আমি খুব পছন্দ করতাম। তারা দুইজন দোতলায় থাকত তাগো বাসার। আমি কাঠের খাড়া সিঁড়ি বাইয়া তাগো সাথে গিয়া বইসা পাখির আলাপ করতাম।

একটা টিয়া পাখি পালত তখন। বারান্দায় থাকত। আমি বারান্দায় গিয়া টিয়া পাখিরে আমার নাম মুখস্থ করানোর চেষ্টা করতাম। মাঝেমধ্যে খাবার দিতাম। হাসি খুশি আন্টি খুব লুডু খেলতেন। তাগো খেলা দেখতাম পাশে বইসা।

এদের সবাইর কাছ থিকা বিদায় নিয়া আম্মু একদফা কান্না শেষ কইরা আমারে নিয়া অত্যন্ত বিরক্তির সাথে বিস্ময় প্রকাশ করতে শুরু করল। এরা প্রত্যেকে আমি চইলা যাইতেছি তাই কান্নাকাটি করতেছে, অথচ আমি বরিশালে যাওয়ার জন্য অধীর। ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ দিই, তারিখ কাটি, হিসাব করি আর ঘ্যান ঘ্যান করি।

যাওয়ার দিন চইলা আসল।

আমি আমার পছন্দের ক্রিম কালার স্কার্ট পইরা বাসার সামনে হাঁটাহাঁটি করতেছি। হাসি খুশি আন্টি এক বক্স হেয়ার ব্যান্ড দিয়া গেছে আমার জন্য। কুসুম আন্টি একটা গেরুয়া রঙের স্কার্ট কিনা দিছিলেন, একটুও পছন্দ হয় নাই (কুসুম আন্টিরে পছন্দ করতাম না এইজন্য সম্ভবত)। আম্মুর পাড়া প্রতিবেশীদের ভালোবাসায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ার মত অবস্থা। চোখ ছল ছল করে কথা বলার সময়ে। মনে মনে হয়ত বলতেছিল, না গেলেই পারতাম!

আমাদের পটুয়াখালী ছাড়ার প্রধান কারণ আম্মু চাইত আমি বরিশালের স্কুলে অ্যাডমিশান দিই। টিকব কিনা পরের ব্যাপার, না টিকলে পরের বছর আবার দেওয়াবে এমন। অ্যাডমিশানের জন্য যেখানে কোচিং করতে হইত, সেইখানেও আবার প্রথমে একটা পরীক্ষা নিত। সেই পরীক্ষায় টিকলে সেইখানে কোচিং করতে পারব আর কি। ত্রিশ মার্কসের পরীক্ষা, ছাব্বিশ পাইছিলাম যতদূর মনে পড়ে।

অনেক ভিড় হয় এই পরীক্ষার দিন, বারান্দায় পেপার লাইছাও অনেকের বসা লাগে। অনেকে সিঁড়িতে বইসা পরীক্ষা দেয়। আমি তাড়াতাড়ি যাওয়ায় বেঞ্চে বসার সুযোগ পাইছিলাম।

সবাই অপরিচিত তখন। আমি বেঞ্চের এক কর্নারে বসছি, পাশে এক মেয়ে আছে। বেশ চটপটে মনে হইতেছিল। বরিশালের কিন্ডারগার্ডেনেই পড়ে—বুঝলাম, কারণ অন্যান্য বেঞ্চের কিছু মেয়ে তার পরিচিত। কিন্তু একসাথে বসতে পারে নাই। তারা দেরি কইরা আসছে। পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে আমারে সেই মেয়ে কী যেন একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিল। আমি তখন অপরিচিত কারও সাথে একদম কথাবার্তা বলতে পারি না। আমি আর মুখ তুইলাই তাকাই নাই তার দিকে।

পরীক্ষার রেজাল্ট দিল কিছুক্ষণ পর। অ্যালাউ হইছিলাম। কিন্তু খুশি হইতে পারতেছিলাম না। আশেপাশের সব মেয়েরা একজন আরেকজনের পরিচিত। তাদের একেকজনের নাম অ্যানাউন্সের পর তারা আরেক বান্ধবীরে জড়ায়া ধরে। আনন্দ বিনিময় হয় তাদের মধ্যে। বারান্দায় আম্মু দাঁড়ায়া ছিল। আমার চোখে পানি দেইখা ভাবছিল, চার মার্কস কম পাইছি তাই মন খারাপ হইছে। কাছে আইসা বলল, “বোকা মেয়ে নাকি! এইটায় কম পাইলে কিছু হইবে না। ”

পরীক্ষা দিয়া বাসায় আইসা সেই প্রথম আমি কান্নাকাটি করি।

এই পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি পরিচিত আর অপরিচিতর পার্থক্য বুঝতাম না। আমার চেনা ক্লাসরুমের সাথে ঐ অপরিচিত ক্লাসরুমের তফাৎ কোথায় তা জানতাম না। আমি ভাবতাম সব টিচার-ই বোধহয় আমার স্কুলের শাহানা ম্যাডাম, রত্না ম্যাডামদের মত হন। কেউ যে রাতারাতি আমার পটুয়াখালীর সেই বেস্টফ্রেন্ড হইয়া উঠবে না—এই প্রথমই বুঝতে পারলাম।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সানজিদা আমীর ইনিসী
সানজিদা আমীর ইনিসী

জন্ম. বরিশাল ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক (দ্বিতীয় বর্ষ)।

Leave a Reply